|

সোয়াদার মাতৃভাষা

Published: Tue, 17 Sep 2019 | Updated: Wed, 18 Sep 2019

সোয়াদা খুব ভালো ছাত্রী। সে বার্ষিক পরীক্ষার পর বাবা মার সাথে দাদুর বাড়িতে বেড়াতে গেছে শহর থেকে। দারুণ খুশি দাদুর বাড়ি যেতে পেরে। পড়াশোনার চাপে কোথাও যেতে পারেনা তেমন। দাদুর বাড়িতে গিয়ে চাচাতো ভাই-বোন, চাচা-চাচীকে পেয়ে দারুণ খুশি সে।

সোয়াদা বগুড়ার একটি ইংরেজি মাল্টিমিডিয়া স্কুল এন্ড কলেজে  ক্লাস সেভেনে পড়ে। পড়াশোনায় যেমন খুব ভালো তেমন খুব ভালো ছবিও আঁকে। বই পড়ার নেশাটাও কিন্তু কম না। তবে হ্যাঁ, সে
কিন্তু শুধু ইংরেজি বই-ই পড়ে। সোয়াদা যে স্কুলে পড়ে সে স্কুলে বাংলা নাই।

সেখানে সব ইংরেজিতে পড়ানো হয়। স্কুলটাও খুব নাম করা। সোয়াদার দাদু শিবগঞ্জের এক কলেজের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ছিলেন। এখন অবসর পেয়েছেন। তার দাদুর একটা বিরাট লাইব্রেরিও আছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল, মাইকেল মধুসূধন দত্ত, জীবনানন্দ দাশসহ সকলের বইয়ে ভরপুর সেই লাইব্রেরি। দাদুর বাড়িতে খুব মজা পাচ্ছে সোয়াদা। দাদু তাকে

নিয়ে বেড়াতে গেলেন মহাস্থানগড়, ভাসুবিহার, ভীমের জাঙ্গাল। করতোয়া নদীতে নৌকায় চড়লো সে। এরপর দাদু বড় একটা লাইব্রেরিতে নিয়ে গেলেন। 

লাইব্রেরিতে সোয়াদা বই দেখে বড্ড বেশি খুশি হলো। বইয়ের উপরে ছবি দেখে অনেককেই চিনতে পারল। কেউ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কেউ কাজী নজরুল ইসলাম কেউবা আবার শরৎচন্দ্র। কী লেখা আছে সেগুলো কিছুই বুঝলো না এবং পড়তেও পারলো না। দাদু সোয়াদার ভাবসাব দেখে বলল, কী দাদুভাই পড়তে পারছো না? এটা রবীন্দ্রনাথের বই। পড়ে দেখা ভালো লাগবে। সোয়াদা দাদুর দিকে তাকিয়ে থাকলো, এরপর বলল, আমি এসব পড়তে পারিনা। আমাদের স্কুলে এগুলো পড়ানো শেখায় না।

দাদুর চোখ কপালে উঠলো। তিনি বললেন, তুমি বাংলা জানো না! নিজের মাতৃভাষা জানো না? অর্থাৎ বাংলা ভাষার কিছুই তুমি জানো না? সোয়াদা বলল, না। তবে ইংরেজিতে খুব ভালো পড়তে ও
লিখতে পারি।

দাদু বলল, আজকাল ইংরেজিটা খুব দরকারি বুঝলাম। এসব ভালো না জানলে সমস্যায় পড়তে হয়। তবে বাংলাটা হচ্ছে আমাদের রক্তের বীজে বোনা ভাষা। এটা না শিখলে আরো কত সমস্যা, কত যে মিস করবে তা শুধু তুমিই বুঝবে। আচ্ছা দাদুভাই তুমি জানো, আমাদের এই মাতৃভাষা বাংলার জন্য কতজন শহীদ হয়েছে? যদি নিজের মাতৃভাষাটা না জানো তাহলে বাংলা খবরের কাগজ, বাংলা ভাষার ছোট বড় সাহিত্যিকদের গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ কীভাবে পড়বে? বাংলা ভাষার অমূল্য রত্ম থেকে তুমি চিরদিন বঞ্চিত থাকবে। তুমি আমার দাদুভাই আর তোমার বিষয়ে এসব কথা কী কখনো ভাবা যায় সোয়াদা?

তোমাকে তোমার নিজের মাতৃভাষা শিখতে হবে। নিজের ভাষার বই পড়তে হবে। সোয়াদা বলল, এতোদিন তো ছুটি শেষ হয়েই গেল দাদুভাই, বাবাকে বলে আমি এখানে থাকবো পুরো ফেব্রুয়ারি মাস আর এর মধ্যেই আমি এখানেই বাংলা ভাষা শিখতে আরম্ভ করবো। নইলে আমি কোনোদিনই বাংলা বই পড়তে পারবো না। আর আমাদের স্কুলে যেহেতু বাংলা বই নেই সবাই মিলে সেহেতু দাবি রাখব এখন থেকে যেন অন্তত একটা বাংলা বই থাকে। যাতে আমরা কেউ যেন আমাদের মাতৃভাষা থেকে বঞ্চিত না হই।

দাদু তখন সোয়াদার পিঠে হাত বুলিয়ে বলল, এই তো চাই লক্ষী দাদু ভাই...।


লেখক: আরিফ আনজুম

অআই /এসিএন