|

দর্শনার্থীদের এক প্রিয় গন্তব্য দিল্লির আখড়া ও বিথঙ্গল আখড়া

Published: Thu, 28 Apr 2022 | Updated: Thu, 28 Apr 2022

কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলার কাটখাল ইউনিয়নে হিজল বনে ঘেরা এক মনোরম স্থান ‘দিল্লির আখড়া’। বর্ষায় দর্শনার্থীদের এক প্রিয় গন্তব্য এই ‘দিল্লির আখড়া’। বর্ষার সময় হাওরের পানিতে জেগে থাকা শত শত হিজল গাছ এখানকার অন্যতম আকর্ষণ। চারশো বছরের পুরনো এই আখড়া সম্পর্কে সুন্দর একটি গল্প রয়েছে। 

এক সাধক নাকি এখানে এসেছিলেন ধ্যান করতে। তার ধ্যান ভাঙার জন্য কিছু দৈত্য তাকে নানাভাবে বিরক্ত করতো। একদিন এই সাধক মহাবিরক্ত হয়ে তার দিক্ষাগুরুর মন্ত্রবলে এই দৈত্যগুলোকে হিজল গাছ বানিয়ে রাখেন। সাধুর বানিয়ে রাখা সেই হিজল গাছগুলো 

এখনও দাঁড়িয়ে আছে। হিজল গাছের সারি তিনশো একরের পুরো আখড়া এলাকা জুড়েই! শত শত হিজলগাছ! দেখলে ধারণা হতেই পারে, একসময় এগুলো সত্যি সত্যিই দৈত্য ছিলো, বর্ষায় এগুলো মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকে।

মিঠামইন 

জায়গাটির নাম দিল্লির আখড়া কিভাবে হলো? সে আরেক গল্প। দিল্লির সম্রাট জাহাঙ্গীরের লোকজন নাকি একদিন ওই ধ্যানমগ্ন সাধকের পাশ দিয়ে নৌকার বহর নিয়ে নদীপথে যাচ্ছিলেন। এ সময় সোনার মোহর ভর্তি একটি নৌকা পানিতে ডুবে যায়। নৌকার যাত্রীরা মোহর তোলার জন্য নদীপাড়ে আসে। 

ডুব দিয়ে তারা দু-একটি মোহর তুলেও আনে। কিন্তু সেই মোহরগুলোও চোখের ইশারায় পানিতে ফেলে দেন ওই সাধক। পরে নৌকার যাত্রীদের অনুরোধে তিনি সোনার মোহরগুলো মাছের ঝাঁকের মতো পানির উপর ভাসাতে থাকেন। মোহরগুলো তুলে নেন যাত্রীরা। 

এই ঘটনা শুনে সম্রাট জাহাঙ্গীর অভিভূত হন। পরে তিনশ’ একর জমি তাম্রলিপির মাধ্যমে সেই সাধুর আখড়ার নামে দান করে দেন। সেই থেকে এটি দিল্লির আখড়া। হিজলের বন ভেদ করে একবার আখড়ায় পৌঁছতে পারলেই দেখা যাবে সেই সাধুর স্মৃতি। 

আখড়ার নির্জনতায় আপনারও মনে হবে, সত্যি এটি ধ্যান করার মতো চমৎকার একটি স্থান বটে। আখড়ায় রয়েছে ধর্মশালা, নাটমন্দির, অতিথিশালা, পাকশালা ও বৈষ্ণবদেব থাকার ঘর। বর্তমানে আখড়ায় মোহন্ত নারায়ণ দাসসহ তিনজন বৈষ্ণব আছেন। 

এখানে আশ্রিত হয়ে আছে ৪০-৫০ জন শ্রমজীবী মানুষ। সবাই নিরামিষভোজি। থাকে একটি যৌথ পরিবারের মতো। রাতে এখানে দর্শনার্থীদের থাকারও ব্যবস্থা আছে। আখড়ার পাশে রয়েছে ঘের দেয়া দুটি পুকুর। ইচ্ছে করলে পুকুরের ঘাটলায় বসে কাটিয়ে দেয়া যাবে চমৎকার একটা বিকেল।

বিথঙ্গল আখড়া: কিশোরগঞ্জ জেলার সিমান্তবর্তী গ্রাম ও হবিগঞ্জ জেলার বানিয়াচং উপজেলার বিথঙ্গল আখড়া। লোক মুখে শোনা যায় বিথঙ্গলের বড় আখড়া। এই আখড়াটি বাংলাদেশে রামকৃষ্ণ গোসাইর অনুসারী ৩৬০টি আখড়ার মধ্যে প্রধান। আখড়ায় প্রবেশ করতেই চোখে পড়ে ছোট ছোট ১২০ টি কক্ষ। এক সময় ১২০ টি কক্ষে ১২০ জন বৈষ্ণব থাকতেন। তবে বর্তমানে একজন বৈষ্ণব আছেন। 

আখড়ার ভেতরে প্রবেশ করতেই বুঝা যায় পুরো আখড়ায় পরিচর্যার ছোঁয়া। আখড়ার ভেতরে অনেক মানুষের জটলা দেখে সামনে যেতেই বুঝা গেল আখড়ার মোহন্ত শ্রী সুভাষ গোস্বামীর কাছ থেকে অনেকেই আবার নানান রোগের সেবা নিচ্ছেন। 

তখন ছোট একটি ফটক দিয়ে সামনে এগোতেই দেখা গেল বিশাল এক দীঘি। শান বাঁধানো ঘাট। দীঘির চারপাশে বিভিন্ন প্রজাতির গাছ। এক মনোমুগ্ধকর পরিবেশ। বর্ষার প্রতিটা দিন বিথঙ্গল আখড়ায় হাজারো পর্যটকের সমাগম ঘটে। 

জানা যায়, উপমহাদেশের বিভিন্ন তীর্থ ঘোরার পর ষোলো শতকে এখানে ঘাঁটি গাড়েন রামকৃষ্ণ গোস্বামী। তার শিষ্যত্ব গ্রহণ করে ত্রিপুরার রাজা উচ্চবানন্দ মাণিক্য বাহাদুর প্রাচীন নির্মাণ কৌশল সমৃদ্ধ দু’টি ভবন নির্মাণ করে দেন। এ আখড়ায় সস্ত্রীক এসে প্রায়ই অবস্থান করতেন তিনি। 

পরে রামকৃষ্ণ গোম্বামীর সমাধিস্থলে আধুনিক নির্মাণ কৌশল সমৃদ্ধ ভবন তৈরি করা হয়। চালা আকৃতির ছাদের সেই ভবনের একপাশে রাখা শ্বেত পাথরের চৌকিটির ওজন ২৫ মণ। আরো আছে পিতলের সিংহাসন, নকশাখচিত প্রাচীন রথ এবং রুপার পাখি ও সোনার মুকুট। আখড়ার নিজস্ব ৪০ একর জমির  উৎপাদিত জমির ফসল ও ভক্তদের দানে যাবতীয় ব্যয় নির্বাহ হয়।

লেখক: বিজয়কর রতন, উপজেলা প্রতিনিধি, অভিযাত্রা ডটকম, মিঠামইন, কিশোরগঞ্জ।

আইআর /