|

নান্দাইলে উজার হয়ে যাচ্ছে বাঁশঝাড়

Published: Thu, 18 Nov 2021 | Updated: Thu, 18 Nov 2021

আমিনুল হক বুুলবুল, নান্দাইল (ময়মনসিংহ): কবি যতীন্দ্রমোহন বাগচী 'কাজলা দিদি'  কবিতায় বাঁশঝাড় নিয়ে এক কবিতা লিখেছেন-

‘‘বাঁশ-বাগানের মাথার উপর চাঁদ উঠেছে ওই,
মাগো আমার শোলক্-বলা কাজলা দিদি কই?’’

গ্রামীণ জনপদ মানেই ঝোপঝাড়, জঙ্গল আর  বাঁশঝাড়। প্রকৃতির অপরুপ সৌন্দর্য যেন গ্রামীণ প্রতিটি জনপদে। বাঁশঝাড়কে ঘিরে গড়ে উঠেছিল গ্রামের প্রতিটি বাড়ি। বক, শালিক আর ডাহুকসহ অন্যান্য পাখির কিচিরমিচির শব্দে মুখরিত ছিল গ্রামের প্রতিটি বাড়ির বাঁশঝাড়। প্রতিটি বাড়ির পিছনে ছিল বাঁশঝাড়। বাঁশঝাড় ছাড়া বাড়ি ছিল এমনটা কল্পনাও করা যেতো না। বাঁশঝাড়কে বাড়ির পর্দা মনে করা হতো। যেখানে গ্রাম সেখানে বাঁশঝাড় এমনটিই ছিল স্বাভাবিক। বাড়ির পাশে বাঁশঝাড়ের ঐতিহ্য গ্রাম বাংলার চিরায়ত রূপ। কিন্তু বর্তমানে নির্বিচারে বাঁশ কাটা ও পরিচর্যার অভাবে বাঁশঝাড় ক্রমশই কমে যাচ্ছে। হারিয়ে যাচ্ছে প্রকৃতির দুর্যোগ প্রতিরোধক ও পরিবেশের পরমবন্ধু সেই বাঁশঝাড়। কালের বিবর্তনে ও নগরায়ণের ফলে বাঁশঝাড় কমে যাওয়ায় হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী বাঁশ শিল্প।

প্রকৃতিতে বাঁশঝাড় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। বাঁশ জাতীয় উদ্ভিদ মাটি এবং জল থেকে ধাতু এবং অন্যান্য বিষাক্ত পদার্থ নিজের শিকড়রের মধ্যে শোষণের মাধ্যমে বিশুদ্ধায়নের বিষয়ে খুব কার্যকরী ভূমিকা পালন করে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা এবং জীববৈচিত্র ধ্বংস হওয়া রোধে সহায়ক এই বাঁশঝাড় এখন প্রায় বিলুপ্তির পথে। বাঁশের অভাবে হারিয়ে যাচ্ছে গ্রাম- বাংলার ঐতিহ্য কুটির শিল্পও।

নির্বিচারে বাঁশ কাটার ফলে উজার হচ্ছে একের পর এক বাঁশের ঝাড়। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় এই বাঁশঝাড় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বাঁশ গাছ অন্য যেকোন গাছের তুলনায় দ্রুত গতিতে ক্ষতিকর কার্বন গ্যাস শুষে নিতে সক্ষম এবং এর শিকড় মাটি ক্ষয়ে যাওয়া রোধ করতে পারে। তাই বাঁশঝাড় টিকিয়ে রাখার তাগিদ দিচ্ছেন পরিবেশবিদ ও প্রকৃতি প্রেমিরা।

দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত বাঁশের প্রয়োজনীয়তা থাকলেও আধুনিকতার ছোঁয়ায় বাঁশ চাষে আগ্রহ হারাচ্ছে কৃষকরা। সম্মিলিত প্রচেষ্টার অভাবে হারিয়ে যাচ্ছে বাঁশের ব্যবহার। একসময় চারপাশে পর্যাপ্ত বাঁশের ঝাড় দেখা গেলেও বর্তমানে ময়মনসিংহের নান্দাইলে তা বিলুপ্তির পথে। 

গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর নিকট বাঁশের গুরুত্ব অপরিসীম। ধানের গোলা, বেড় গৃহ নির্মাণ, মঞ্চ নির্মাণ, মই, জোয়াল, মাদুর, ঝুড়ি, ঝাকা, চালুন, খাঁচা, পাটি, খাড়ি, ঝাড়ু, কুলা, হাতপাখা, মাদুর, বাঁশের দোচালা ও চারচালা ঘর; বাড়ি-ঘরের বেড়া, ঘরের খুঁটি, ঘরের ঝাপ, বেলকি, কার, ঘরের মাচা, ঘরের খাট, ঘরের আসবাব হিসেবে মোড়া, চাঁটাই, সোফা, বুকসেলফ, ছাইদানি, ফুলদানি, প্রসাধনী বাক্স, ছবির ফ্রেম, আয়নার ফ্রেম, সিগারেট রাখার ছাইদানি, নুনদানি, পানদানি, চুনদানি, ইত্যাদি সহ নিত্যদিনের ব্যবহার্য বিবিধ জিনিসপত্র তৈরির কাজে বাঁশের রয়েছে বহুল ব্যবহার। গ্রামের প্রতিটি কৃষক তার ফসলের ক্ষেতে বাঁশ দিয়ে বেড়া দিয়ে ফসল রক্ষা করতো। আদিকাল থেকেই বাঁশের ব্যপক ব্যবহার চলে আসছে। 

বাঁশ দিয়ে বিভিন্নরকম পণ্য যেমন, প্লাইবোর্ড, পার্টিকেল বোর্ডসহ গৃহস্থালির আসবাবপত্র তৈরি করা হচ্ছে। বাঁশ দিয়ে রকমারি আসবাবপত্র যেমন সোফা, চেয়ার, টেবিল, খাট, ওয়ারড্রব তৈরি করে কাঠের চাহিদা পূরণ করা হয়। বাঁশের তৈরি এসব আসবাবপত্র ও শৌখিন গৃহসামগ্রী বিদেশেও রফতানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা হচ্ছে। তাছাড়া মুলি বাঁশ দিয়ে গ্রামীণ জনপদে বাড়িঘর নির্মাণ, বাড়ির বেড়া, সিলিং তৈরি ও বাঁশের বেত দিয়ে চাটাই তৈরি করে ঘরের পার্টিশন দেয়া হয়। বাজালি বাঁশ দিয়ে বাঁশি তৈরি হয়। বাদ্যযন্ত্র হিসেবে বাঁশের বাঁশির কদর যুগ যুগ ধরেই শিল্পী সমাজে সমাদৃত হয়ে আসছে। শক্ত প্রকৃতির বরাগ বাঁশ দিয়ে বাড়িঘরের খুঁটি, সেতু নির্মাণসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাজ করা হয়। 

নান্দাইল তথা সারা বাংলাদেশের গ্রামীণ জনপদে তৈরি হতো হাজারো বাঁশের পণ্য সামগ্রী। ঘরের কাছের ঝাড় থেকে তরতাজা বাঁশ কেটে গৃহিণীরা তৈরি করতেন হরেক রকম জিনিস। অনেকে এ দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন। কিন্তু বাঁশঝাড় নির্বিচারে কেটে ফেলার কারণে প্রকৃতির সৌন্দর্য আর গ্রামগঞ্জের ঐতিহ্য কুটির শিল্প আজ হারিয়ে যাচ্ছে। আগের মত পর্যাপ্ত বাঁশ না থাকায় দিনদিন তারা বেকার হয়ে পড়ছেন কুটিরশিল্পের সাথে জড়িত পরিবারগুলো বাঁশের দরদাম অধিক হওয়ায় তারা কুটিরশিল্প সামগ্রী বানাতে পারছে না।

সরেজমিন দেখা গেছে, নান্দাইলের প্রতিটি জনপদে আগের মতো আর বাঁশঝাড় নেই। কারণে-অকারণে কাটা হচ্ছে বাঁশ। পানের বরজ, শশা, সীম, করলা, লাউ, ঝিঙে ক্ষেতে মাচা দিতে কাটা হচ্ছে বাঁশ। পাইকারদের কাছে করা হচ্ছে বিক্রি। বীরকামট খালী গ্রামের মোসলেম উদ্দিনের একটি বাঁশঝাড় কেটে ফেলা হচ্ছে। কেন বাঁশঝাড় কাটছেন জানতে চাইলে বাঁশের ব্যাপারি আজিম উদ্দিন জানান, তিনি আট হাজার টাকা দিয়ে বাঁশঝাড় কিনেছেন। বাঁশঝাড়ের মালিক মোসলেম উদ্দিন বলেন, বিদ্যুতের লাইন বাঁশঝাড়ের পাশ দিয়ে যাওয়ার কারণে বিক্রি করে দিয়েছি।

লক্ষিপুর গ্রামের মুর্শিদ বলেন, বাপদাদার আমল থেকে আমাদের বাঁশঝাড় থাকলেও নতুন বাড়ি তৈরি করার কারণে একটি বাঁশঝাড় কেটে ফেলেছি, অন্যগুলোও পরিচর্যা ও দেখভালের অভাবে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। 

বীরকামটখালী গ্রামের কামাল উদ্দিন নতুন ঘর নির্মাণ ও বাঁশের ভালো দাম পাওয়ায় বাঁশঝাড় বিক্রির কথা জানান।  

অবসরপ্রাপ্ত কলেজ শিক্ষক শিক্ষাবিদ আলী আফজাল খান বলেন, গ্রামীণ জীবনে বাঁশের প্রয়োজন সর্বত্র। মানুষের মৃত্যুর পরে কবরে যেমন বাঁশের প্রয়োজন, ঠিক বেঁচে থাকা অবস্থায় গৃহস্থালির প্রতিটি কাজে বাঁশের প্রয়োজন আছে। বাঁশের তৈরি হস্তশিল্প দেখতে যেমন সুন্দর, ঠিক তেমনি তা একদম জীবাণুমুক্ত। তাই নির্বিচারে বাঁশ না কেটে বেশি করে বাঁশ লাগানো এবং বাঁশঝাড় সংরক্ষণের উপর তিনি গুরুত্ব আরোপ করেন।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মোহাম্মদ আনিসুজ্জামান বলেন, ‘শীতল ছাঁয়া ও পরিবেশের ভারসম্য রক্ষায় বাঁশের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।’ তাই বাঁশঝাড় না কেটে বেশি করে বাঁশ লাগানোর উপর জোর দেন তিনি। 

 

ডব্লিউইউ