|

নান্দাইলে হারিকেন আজ বিলুপ্তির পথে

Published: Mon, 08 Nov 2021 | Updated: Mon, 08 Nov 2021

আমিনুল হক বুলবুল, নান্দাইল (ময়মনসিংহ): `কত গ্রাম, কত পথ যায় সরে সরে – শহরে রানার যাবেই পৌঁছে ভোরে; হাতে লণ্ঠন করে ঠন্‌ঠন্, জোনাকিরা দেয় আলো, মাভৈঃ রানার! এখনো রাতের কালো। -কবি সুকান্ত ভট্রাচার্জ তার 'রানার' কবিতায় লণ্ঠন বা হারিকেনের কথা উল্লেখ করেছেন। একসময় ডাক পিয়নরা চিঠির বোঝা পিঠে করে হাতে হারিকেন নিয়ে গ্রামের পর গ্রাম ছুটে চলতো।

বাঙালির জীবনে রাতের অন্ধকার দূর করতে এক সময় গ্রামের মানুষের অন্যতম ভরসা ছিল সেই লণ্ঠন, হারিকেন ও কুপিবাতি। হারিকেনের আলো গৃহস্থালির পাশাপাশি ব্যবহার হত বিভিন্ন যানবাহনে। কিন্তু আধুনিকতার ছোঁয়ায় বিভিন্ন বৈদ্যুতিক বাতিতে বাজার ভরপুর। যার কারণে হারিয়ে যাচ্ছে রাতের আলোর একমাত্র উৎস ঐতিহ্যবাহী হারিকেন।

ময়মনসিংহের নান্দাইলেও হারিকেন বা কুপিবাতি আজ বিলুপ্তির পথে। চোখে পড়ে না মৃদু আলোর প্রতীক হারিকেন। জোনাকির মিটমিট আলো দেখলেই এখনো মনে পড়ে হারিয়ে যাওয়া সেই  হারিকেনের কথা।

হারিকেন গ্রামীণ ঐতিহ্যের প্রতীকগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি। শৈশব জীবনে বিদ্যুৎবিহীন গ্রামের আলোর চাহিদা মিটানো বা অন্ধকার দূর করার একমাত্র অবলম্বন ছিল হারিকেন বা কুপিবাতির আলো।

হারিকেন হলো টিনের তৈরি দুটো খুঁটি, কাচের চিমনি বিশিষ্ট প্রদীপ। আনারসের মত দেখতে কাচের চিমনির নীচের অংশ টিনের তৈরি তেলের ট্যাংক থাকত। যেখানে কেরোসিন তেল ঢালা হতো। মাঝখানে থাকতো ফিতে, গ্রাম বাংলায় বলা হতো পলতে বা শৈলতে। যার এক চতুর্থাংশ ট্যাংকের তেলে মধ্যে চুবানো থাকতো। আর বাকি অংশ থাকতো উপরে কাচের মধ্যে। দিয়াশলাই কিংবা আগুন দিয়ে জ্বালালেই জ্বলে উঠতো। মিটমিট আলো ছড়াত। ট্যাংকারের পাশে থাকা রেগুলেটর দিয়ে আলো বাড়ানো কমানো হতো।

হারিকেনের অন্যতম জ্বালানি উপাদান ছিল কেরোসিন। তখনকার সময় হারিকেন জ্বালিয়ে গ্রামাঞ্চলে রাতে বিয়ে-সাদি যাত্রাগান, মঞ্চ নাটক, ওয়াজ মাহফিল কিংবা বাড়িতে দোয়ার অনুষ্ঠান করা হতো। হারিকেন জ্বালিয়ে বাড়ির উঠানে কিংবা ঘরের বারান্দায় ভাই-বোন একসাথে পড়াশোনা করতো। সন্ধ্যার আগেই হারিকেনের আলো জ্বলে উঠতো প্রতিটি ঘরে।

গ্রামের ইতিহাসে অন্ধকার রাতে হারিকেনের মিটিমিটি আলো জ্বালিয়ে পথ চলার স্মৃতি কার না মনে পড়ে। মায়ের বকুনি খেয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়া ডানপিটে ছেলেকে খুঁজতে এপাড়া থেকে ওপাড়া যেতে. হাটে বাজারে, পথ চলায় কিংবা প্রাণের স্বামী হাট-বাজার থেকে ফিরতে রাত হলে স্ত্রী হারিকেন হাতে পথ পানে চেয়ে দাঁড়িয়ে থাকত। গৃহবধূরা ঢেঁকিতে রাতে ধান ভনতো, পিঠার গুড়ি ভানতো হারিকেন জ্বালিয়ে।

হারিকেন জ্বালিয়ে রাতে হাট-বাজারে যেত গ্রামের লোকজন, দোকানিরা বেচাকেনাও করত হারিকেনের আলোতে। কিন্তু আধুনিকতার ছোঁয়ায় বিভিন্ন বৈদ্যুতিক বাতিতে বাজার ভরপুর। যার কারণে হারিয়ে যাচ্ছে রাতের আলোর একমাত্র উৎস ঐতিহ্যবাহী হারিকেন।
অমাবস্যার রাতে ঘোর অন্ধকারে হারিকেনের আলো জ্বালিয়ে পথ চলার স্মৃতি এখনো বহু মানুষ মনে করে।

চলচ্চিত্রের প্রথম আমলের ছবিগুলোর দিকে এক নজর তাকালে বোঝা যায় যেখানে সিনেমার নায়িকা তার ভালোবাসার মানুষটিকে খুঁজতে অন্ধকার রাতে হারিকেন নিয়ে বের হতো।

সমাজ পরিবর্তন, বিজ্ঞান প্রযুক্তি ও আধুনিকতার ছোঁয়ায় গ্রামবাংলার সেই ঐতিহ্যবাহী হারিকেন এখন বিলুপ্তির পথে। বৈদ্যুতিক বাতি, চার্জার ও সৌর বিদ্যুতের নানা ব্যবহারের ফলে হারিকেনের ব্যবহার আজ আর দেখা যায় না। প্রত্যন্ত গ্রামগঞ্জে এখন বিদ্যুৎ পৌঁছে গেছে, শহরেও কমেছে লোডশেডিং। স্বভাবতই কমে গিয়েছে হারিকেনের কদর। 

উপজেলার গ্রামাঞ্চলে এখন হারিকেন যেমন খুঁজে পাওয়া দুষ্কর তেমনি বিদ্যুৎ নেই এমন গ্রামও হয়তো খুঁজে পাওয়া যাবে না। তবে যেখানে বিদ্যুৎ নেই, সেখানে হারিকেনের জায়গা দখল করে নিয়েছে সৌর বিদ্যুতের আলো বা চার্জার লাইট। এখনো গ্রামের দু-একটি বাড়িতে হারিকেন পাওয়া যেতে পারে, সেগুলো হয়তো ময়লা ও মরিচা পড়ে ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে পড়েছে।

তখনকার সময়ে উপজেলার বিভিন্ন হাটবাজারে হারিকেন মেরামতের জন্য  মিস্ত্রী বসত। এছাড়া প্রতিটি বাজারে ছিল হারিকেন মেরামতের ভাসমান দোকান। তারা বিভিন্ন হাট বাজারে ঘুরে-ঘুরে হারিকেন মেরামতের কাজ করত।

এছাড়া অনেকে গ্রামের বিভিন্ন বাড়িতে গিয়ে হারিকেন মেরামত করত। কিন্তু এখন আর হারিকেন ব্যবহার না করায় মিস্ত্রীদের আর দেখা যায় না।

স্থানীয় দেওয়ানগঞ্জ বাজারের এক হারিকেন মিস্ত্রি রমজান বলেন, এখন মানুষ আর হারিকেন ব্যবহার করেন না। তার প্রয়োজনও নেই মানুষের কাছে। তাই তিনি তার ব্যবসা পরিবর্তন করে সিজনাল ব্যবসা করছেন।

বীরকামট খালী গ্রামের ৮৫ বছরের বৃদ্ধা জাহিরুন নেছা বলেন, হারিকেনের মৃদু আলোয় লেখাপড়া করেছি। তখন গ্রামের প্রত্যেক ঘরে হারিকেন ছিল।

গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী হারিকেন এখন শুধুই স্মৃতি। নতুন প্রজন্ম হয়তো হারিকেন সম্পর্কে জানবে না, পড়তে হবে ইতিহাসে। হয়তো এক সময় হারিকেনেরে দেখা মিলবে বাংলার জাদুঘরে।

 

ডব্লিউইউ