|

গ্রাম বাংলা থেকে বিলুপ্তির পথে ধানের গোলা

Published: Sun, 26 Sep 2021 | Updated: Sun, 26 Sep 2021

উত্তম চক্রবর্তী, মনিরামপুর (যশোর): বাঙালির সচ্ছল জীবনের প্রবাদ ‘পুকুর ভরা মাছ, গোয়াল ভরা গরু ও গোলা ভরা ধান’ এখন অতীত। আগেকার দিনের গৃহস্থদের সংসারে আভিজাত্যের প্রতীক ছিল এ তিনটিই।

সারা দেশের মতো যশোর থেকেও অনেকটা হারিয়ে যাচ্ছে গোলা। জেলার প্রতিটি উপজেলার মতো মনিরামপুরের রাজগঞ্জ অঞ্চলের গ্রামগুলো থেকেও বাংলার সমৃদ্ধির প্রতীক ধানের গোলা এখন বিলুপ্তপ্রায়। 

এখন মাঠের পর মাঠ ধানখেত থাকলেও অধিকাংশ কৃষকের বাড়িতে নেই ধান মজুদ করে রাখার বাঁশ বেত ও কাদা-মাটি দিয়ে তৈরি গোলাঘর। অথচ একসময় গোলার সংখ্যার ওপর সমাজের নেতৃত্ব নির্ভর করত। এমনকি একই রকম হিসেব কষে কন্যা পাত্রস্থ করতেও বরের বাড়ির ধানের গোলার খবর নিতেন ঘটকেরা! যা এখন শুধু কল্পকাহিনী মাত্র। 
গ্রাম অঞ্চলে বাড়িতে বাড়িতে বাঁশ, বাঁশের কিংবা সুপারি গাছের বাতা ও কঞ্চি দিয়ে প্রথমে গোল আকৃতির কাঠামো তৈরি করা হতো। কিছু কিছু ক্ষেত্রে বর্গাকার অথবা আয়তাকারে গোলাঘর তৈরি করা হতো। এর পর ভেতরে ও বাইরে বেশ পুরু মাটির আস্তরণ দেওয়া হতো। 

চোর-ডাকাতের হাত থেকে রক্ষার জন্য এর মুখ বা প্রবেশপথ রাখা হতো বেশ ওপরে। ধান বের করার জন্য অনেকে নিচে বিশেষ দরজা রাখতেন। গোলা বসানো হতো উঁচুতে। গোলার মাথায় থাকত বাঁশ ও খড়ের তৈরি বা টিনের তৈরি ছাউনি। যা দেখা যেত অনেক দূর থেকে। 

গোলাঘর নির্মাণ করার জন্য বিভিন্ন এলাকায় আগে দক্ষ শ্রমিক ছিল। এখন আর দেশের বিভিন্ন জেলা শহর থেকে আসা গোলাঘর নির্মাণ শ্রমিকদের দেখা মেলে না। পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় চলে গেছেন তাঁরা। গোলা ঘর নির্মাণের জন্য তাঁদের সংবাদ দিয়ে আনতে হত। তাঁরা এসে নানা পরামর্শ করে (মাটি পর্যবেক্ষণ, জায়গা নির্ধারণ) করে নির্মাণ কাজে হাত দিতেন। আকার ও শ্রমিকের সংখ্যার ওপর নির্ভর করে একেকটা গোলা ঘরের নির্মাণ খরচ পড়ত সেই সময়কার ১২-১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত। বর্ষার পানি আর ইঁদুর তা স্পর্শ করতে পারত না। মই বেয়ে গোলায় উঠে তাতে ফসল রাখতে হতো। 

এই সুদৃশ্য গোলা ঘর ছিল সম্ভ্রান্ত কৃষক পরিবারের ঐতিহ্য। সে সময় ভাদ্র মাসে কাদা পানিতে ধান শুকাতে না পেরে কৃষকেরা ভেজা আউশ ধান রেখে দিতো গোলাভর্তি করে। গোলায় শুকানো ভেজা ধানের চাল হত শক্ত। কিন্তু সম্প্রতি রাসায়নিক সার, কীটনাশক ও আধুনিক কলের লাঙল বদলে দিয়েছে গ্রামাঞ্চলের চালচিত্র। গোলায় তোলার মত ধান আর তাঁদের থাকে না। গোলার পরিবর্তে কৃষকেরা ধান রাখা শুরু করে বাঁশের তৈরির ক্ষুদ্রাকৃতি ডোলায়। ধান আবাদের উপকরণ কিনতেই কৃষকের বিস্তর টাকা ফুরায়। কৃষকের ধানের গোলা ও ডোলা এখন শহরের বিত্তশালীদের গুদাম ঘরে পরিণত হয়েছে। ইট বালু সিমেন্ট দিয়ে পাকা ইমারত গুদাম ঘরে মজুদ করে রাখা হচ্ছে হাজার হাজার টন ধান চাল। অনেক ক্ষুদ্র কৃষক বস্তায় ভর্তি করে রাখছেন আউশ, আমন ও বোরো মৌসুমে উৎপাদিত ধান চাল। 

ও/এসএ