|

বালাসী-বাহাদুরাবাদ ঘাটে চলবে না ফেরি, দায় কার?

Published: Sun, 22 Aug 2021 | Updated: Sun, 22 Aug 2021

মো. আশরাফুল আলম: দেশের উন্নয়নে যোগাযোগ ব্যবস্থার অবকাঠামোগত উন্নয়ন কত গুরুত্বপূর্ণ এটি কারোর অজানা নয়। কিন্তু কোন প্রকল্পের বাস্তবিক অবস্থা বিবেচনা বা পরীক্ষা নিরীক্ষা ছাড়াই কাজ শুরু করা যে কতটা ক্ষতিকর তা মনে হয় কিছু মানুষের অজানা। তাতো হবেই, কারণ এর সাথে সংশ্লিষ্ট কিছু মানুষের অসততার কর্ম যজ্ঞে খরচ বাড়িয়ে পকেট ভারী করতে অভ্যস্ত।

আমি দুষ্ট অসাধু দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা কর্তাদের কথা বলছি। কারণ তাদের অবহেলায় জনগণের কোটি কোটি টাকার সরকারি সম্পদ এবং অর্থ অপচয় হয়। তবে উপযুক্ত তথ্য প্রমাণের অভাবে তাদের যথাযথ শাস্তি নিশ্চিত করা বেশ চ্যালেঞ্জ। 

উত্তরাঞ্চলীয় জেলা গাইবান্ধা। এই  অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘ সময়ের দাবী ছিলো জেলা শহর হতে প্রায় ৮ কি. মি. পূর্ব দিকে ফুলছড়ি উপজেলার কঞ্চিপাড়া ইউনিয়নের বালাসীঘাট থেকে জামালপুরের বাহাদুরাবাদ ঘাট পর্য়ন্ত টানেল অথবা ব্রম্মপুত্র সেতু নির্মাণ। নদীর ব্যাপক ব্যসার্ধ এবং অনেক বেশি ব্যয় বহুলতার কারণে এখুনি সেতু নির্মাণ সম্ভব নয় বলেই ফেরি চালুর কথা শোনা যায়। 

বঙ্গবন্ধু সেতুর ওপর সৃষ্ট অতিরিক্ত চাপ কমাতে এবং পণ্য ও যাত্রী পরিবহণে রংপুর ও রাজশাহী বিভাগের জেলাগুলোর সঙ্গে জামালপুর, ময়মনসিংহ ও সিলেট অঞ্চলের দূরত্ব ১০০ থেকে ১৭০ কিলোমিটার কমিয়ে আনার যুক্তি দেখিয়ে নদীতে ফেরি সার্ভিস চালু করতে একটি প্রকল্প প্রস্তাবনা করা হয়। গত ২০১৭ সালে একনেকে প্রকল্পটি পাস হলে নদীর দুই ধারে ফেরি চলাচলের জন্য ঘাট এবং টার্মিনাল নির্মাণ প্রায় শেষ। কোথাও কোথাও নদীর পাড় বাঁধাই এবং নদী ড্রেজিং এ খরচ হয়েছে অনেক বড় অংকে টাকা। 

উল্লেখ্য, ২০১৭ সালের অক্টোবরে অনেক সম্ভাবনাময় উক্তির প্রেক্ষিতে একনেক সভায় অনুমোদন পায় প্রকল্পটি। কিন্ত  ওই সময়ে প্রকল্প ব্যয় ধরা হয় ১২৪ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। পরবর্তী সময়ে দুইদফা সংশোধন করে ব্যয় বাড়িয়ে প্রকল্প ব্যয় দাঁড়ায়  ১৪৫ কোটি ২ লাখ টাকা। কিন্তু আশ্চার্যের বিষয় প্রায় সাড়ে তিন বছর কাজ করার পর শেষ পর্যায়ে নদীর সম্ভব্যতা পরীক্ষা করে তুলে ধরে বলা হলো এই নদীতে ফেরি সার্ভিস চালু করা সম্ভব নয়। হায়রে বিআইডাব্লউটিএ’র গুণী কর্মকর্তা! আপনারা এতোদিন কোথায় ছিলেন? এই অঞ্চলে তিন বছরের মধ্যে দুইটি বন্যা বয়ে গেলেও আপনাদের কাছে মনেই হয়নি যে নদীর বাস্তবতা কী তা দেখা দরকার। শুধু প্রকল্প খালাস দিয়েই আপনারা বিরতি নিলেন। অবশ্য যদি আপনাদের নিয়মে সেটা না থাকে তবে আপনাদের কী আর দোষ। দোষ সাধারণ মানুষের, যারা আপনাদের মতো যোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি। আপনাদের যুক্তিতেই প্রকল্প পাস, আবার আপনাদের প্রতিবেদনেই প্রকল্প ফাঁস। আমরা যাবো কোথায়? আমরা সাধারণ নাগরিক কম শিক্ষিত মানুষ আমাদের কী করা উচিৎ আপনারাই বলেন। 

সকলের জানা বর্তমান সরকারের সময়ে দেশের অনেক বড় বড় প্রকল্প সফলতার সাথে সম্পন্ন হচ্ছে। পদ্মা সেতু তার মধ্যে অন্যতম। অবকাঠামোগত উন্নয়নের অগ্রগতি অব্যাহ থাকলেও কোন কোন ক্ষেত্রে জনগণের টাকা অযথাই লোকসানের মুখে পড়তেও দেখা যাচ্ছে। বালাসী- বাহাদুরাবাদ ফেরি সার্ভিস চালুর প্রকল্প তার মধ্যে একটি। গাইবান্ধার বালসী ঘাটে ১৩৬ কোটি টাকা খরচ তবুও চলবে না ফেরি এমন খবরে কয়েকটি জেলার মানুষের মাঝে হতাশার অন্ধকার নেমে এসেছে। 

কয়েকদিন আগেই দিনাজপুর ৬ আসনের এমপি মো. শিবলী সাদিক পরিদর্শন করেন ফুলছড়ি উপজেলার আওতায় বিভিন্ন চর এলাকা। তিনি জানান, ব্রম্মপুত্র নদীর উপর বালাসী হতে বাহাদুরাবাদ পর্যন্ত টানেল নির্মাণের প্রস্তাব মহান জাতীয় সংসদে তুলে ধরতেই তার এই পরিদর্শন এবং সম্ভব্যতা দেখা। বিষয়টি শোনার পর বেশ আশ্বস্তের জায়গা তৈরি হতে শুরু করে। এবার বুঝি উন্নয়নের মহাসড়কে আরও একধাপ এগিয়ে যাবে পিছিয়ে পড়া গাইবান্ধা।  কিন্তু আজ যখন শুনি যে জনগণের করের একটি বিশাল অংকের টাকা খরচ করেও সেবা প্রাপ্তী থেকে বঞ্চিত হতে হচ্ছে।  তার মানে দাঁড়ায় পিছিয়ে থাকা গাইবান্ধাবাসী এই প্রকল্পের সেবায় প্রতারণার শিকার। পুরো টাকাই গচ্চা। তখন কারো মন ভালো থাকার কথা নয়। তাই আজ সকল শ্রেণী-পেশার সাধারণ মানুষের মধ্যে দাবি উঠেছে এই সকল পরিকল্পনাবিদদের অপরিকল্পিত বাস্তবায়নের হিসেব জানতে। বালাসী-বাহাদুরাবাদ ফেরি সার্ভিস চালুর নামে রাষ্ট্রীয় অর্থ অপচয় ও লুটপাটের সাথে জড়িত থাকলে তাদের বিচারের আওতায় আনতে সেচ্চার গাইবান্ধার মানুষ।

প্রকল্পের সম্ভব্যতা যাচাই ছাড়াই তড়িঘড়ি করে প্রকল্প বাস্তবায়ন অবশ্যই দায়িত্বের অবহেলা। যথাযথ কতৃপক্ষের নিকট সকলের দাবি বিষয়টি ক্ষতিয়ে দেখবার। অবশ্যই দায়িত্বে অবহেলাকারীদের যথাযথ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। কোন প্রকার অনিয়ম দুর্নীতি হলে তার উৎস খুজে বের করে যথাযথ শাস্তি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। প্রকল্প বাস্তবায়নের শুরুতে গাইবান্ধাবাসীর দেখা স্বপ্ন আজ ঘুমের ঘোরেই ভেঙে যেতে বসেছে। এর জন্য দায় কার? জানতে চায় গাইবান্ধার মানুষ। 

গত জুনে ১৪৫ কোটি টাকার এ প্রকল্প শেষ হয়েছে। এমন সময়ে বালাসী-বাহাদুরাবাদ রুটটি ফেরি চলাচলের উপযোগী নয় বলে প্রতিবেদন দিয়েছে বিআইডব্লিউটিএ গঠিত একটি কারিগরি কমিটি। এছাড়া দুই দফায় ট্রায়াল রান করতে গিয়ে নাব্যতা সংকটে দুবারই আটকে যায় বিআইডব্লিউটিসির খালি ফেরি। কারিগরি কমিটির প্রতিবেদনে প্রকল্পের বিভিন্ন দুর্বল দিকও তুলে ধরা হয়েছে। সঠিক পরিকল্পনার অভাবে এবং স্টেকহোল্ডার অ্যানালাইসিস ও পূর্ণাঙ্গ সম্ভাব্যতা সমীক্ষা না করায় নদীর মরফোলজিক্যাল অবস্থা না জেনেই দুই পাড়ে ঘাট নির্মাণ করা হয়েছে। ফলে ভুল স্থানে ফেরিঘাট নির্মাণ করা, প্রকল্পের আওতায় জমি অধিগ্রহণ, পার্কিং ইয়ার্ড তৈরি, ফেরিঘাট, ইন্টারনাল রোড ও বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণ এবং ড্রেজিংয়ে ব্যয় হওয়া ১৩৬কোটি টাকাই গচ্চা।

বিষয়টির উপর একটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় ছাপানো খবরে নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরীর একটি বক্তব্যে জানা গেল, অন্তত একটি ফেরি এই রুটে চালু করার চেষ্টা করছেন। তবে সেটিও স্থায়ী না হলে সেখানে বিকল্প হিসাবে লঞ্চ ও স্পিডবোট চালু করার কথা তিনি জানিয়েছেন তিনি। কিন্তু কথা হলো, পরীক্ষা নিরীক্ষার সময় কম পানি থাকতেই যেখানে ফেরি আটকে যাচ্ছে তখন একটি কী আর ১০টি কী, অবস্থাতো একই। তবে স্পীড বোট চলতে পারে কিন্তু মনে রাখতে হবে স্পীড বোটে যাত্রী পারাপার ঝুঁকিপূর্ণ। 

কয়েকদিন পূর্বে বগুড়ার একটি দৈনিক পত্রিকা থেকে জানা গেছে, বগুড়া জেলার সারিয়াকান্দী থেকে জামালপুর ফেরি সার্ভিস চালু করা হয়েছে। তবে কি বিআইডাব্লিউটি এর দক্ষ কর্মকর্তাদের অভিজ্ঞতার কারণে খরচ হয়েও পড়ে থাকবে এসকল স্থাপনা, না কি কোন যথাযথ সমাধান বের করা সম্ভব, প্রশ্ন তাদের কাছে? 

এঅবস্থা নিরিখে বলা যায় এই অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘ দিনের দাবি ব্রম্মপুত্র নদীর তলদেশে একটি টানেল নির্মাণের। বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় এবং নদীর ব্যাপক বিস্তৃতি ও স্বল্প গভীরতা বিবেচনায় এই নদীতে টানেলই উপযুক্ত বলে মনে করে এই অঞ্চলের সচেতন নাগরিক। টানেল নির্মাণের উদ্যোগ দেশের উন্নয়নে প্রভাব ফেলবে এবং এই অঞ্চলের মানুষের জীবন জীবিকায়নে ব্যাপক পরির্বতন সাধিত হবে বলে সচেতন মহল বিশ্বাস করে। এখানে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের আন্তরিকতা ও সদইচ্ছা অনেক বেশি প্রয়োজন।  

দেশের টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে সব ধরনের প্রকল্পের সঠিক বাস্তবায়ন ও কাঙ্খিত গতি এবং গুণগত মানও নিশ্চিত করা জরুরি। প্রেক্ষাপট বিবেচনায় যোগাযোগ ব্যবস্থার অবকাঠামোগত প্রকল্পসহ সব প্রকল্প যাতে যথাসময়ে শেষ করা যায় তার জন্য দায়িত্বশীলদের যথাযথ ভূমিকা পালনে মনোযোগ দেওয়াটা গুরুত্বপূর্ণ। সঠিক মনিটরিং এবং সম্ভব্যতা যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সময়পযোগী পদক্ষেপ নিতে হবে। তবে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের অর্থ খরচ করে দায়িত্বহীনতার পরিচয়দানকারীদের চিহ্নিত করে জনগণের সামনে নিয়ে এসে যথাযথ শাস্তি নিশ্চিত করতে পারলে কিছুটা সান্তনা পেলেও পেতে পারে সাধারণ মানুষ।

 

ডব্লিউইউ