|

রিকশার চাকা ঘুরলেও ঘুরছে না খোকন শেখের সংসারের চাকা

Published: Mon, 09 Aug 2021 | Updated: Mon, 23 Aug 2021

ইমরান হোসাইন, সিরাজগঞ্জ : করোনার ভয়াল থাবায় সারাদেশ বিপর্যস্ত। মৃত্যুর মিছিল বাড়ছেই। প্রতিদিনই মৃত ও আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে আশঙ্কাজনকহারে। সব মিলিয়ে মৃত্যু আতঙ্ক চারদিকে। এযেন এক মৃত্যুপুরীর অশনি সংকেত। তাঁর উপর চলছে লকডাউন। রিকশার চাকা বন্ধ। 

সব মিলিয়ে কষ্টের শেষ নেই নিম্ন আয়ের মানুষের। কষ্টের সীমা নেই খোকনদের মতো রিকশা চালকদের। লকডাউন পরিস্থিতিতে বিপাকে পড়ে তাঁদের অবস্থা এখন শোচনীয়।

এদিকে বাজারে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য বাড়ছে তো বড়ছেই।  লাগামহীন হয়ে পড়েছে মাছ, মাংস, খাবার তেল, চাল, ডাল ও সবজি বাজার। সব কিছুই কম আয়ের মানুষের ক্রয় ক্ষমতার নাগালের বাইরে চলে গেছে। যার ফলে সীমাহীন কষ্টে, ক্ষুধার জ্বালায় দিনরাত পার করছেন কর্মহীনরা। খোকন তো এদের মতোই একজন। 

আইনে নেই তবুও জীবন আগে না জীবিকা আগে। খোকনদের জীবনের জন্যই জীবিকা। কোনটাই আগেও নয়। পেছনেও নয়। দুই সমান্তরাল। কাজ নেই তো ভাত নেই। 

তাই তো নিষেধ জেনেও খোকনরা বের হই রাস্তায়। কেউ চালায় রিকশা, কেউবা দৈনিক মজুরের কাজ কের।  কাজ করেই সংসারের পেটের ভাতের সংস্থান খোঁজে। কিন্ত এই করোনা আতংকে মানুষ রাস্তায় কম। দোকান বন্ধ। অফিস বন্ধ। 

প্রয়োজনে কেউবা বাইরে বের হলেও রিকশায় ওঠে আরও কম।  ফলে খোকনদের আয় কমে গেছে। খোকনেরও আয় কমে গেছে। যা আয় হয় তা দিয়েও হচ্ছে না শরীরের জন্য প্রয়োজনের খাবার। ফলে অভাব আর অনটন। অনাহার আর অর্ধাহারই খোকনের জীবনসঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কথা বলছিলাম এরকমই এক কম আয়ের মানুষ খোকন শেখের সাথে। খোকন ১০ থেকে ১২  বছর ধরেই রিকশা চালায়। বাড়িতে  তাঁর এক ছেলে, দুই মেয়ে।   ৫  জনের সংসার।  বাড়ি সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার শিয়ালকোল দিয়ারবৈদ্যনাথ গ্রামে। খোকন রিকশা চালায়। করোনার আগে রিকশার চাকা ঘুড়িয়েই দিনে আসতো ৫০০-৬০০ টাকা। 

২০০ টাকা রিকশা জমা দিয়ে ৩০০-৪০০ শত টাকা নিয়ে চাল-ডাল-পিয়াজ-লবন আর যা যা দরকার তা কিনে বাড়ি ফিরতো। চলতো পাঁচ জনের সংসার। 

করোনার ভয়াল থাবায় থমকে গেছে খোকনদের জীবন। থেমে গেছে খোকনের জীবন। এমহুর্তে করোনা মহামারিতে তাঁর পরিবারের খাওয়ার-পরার খরচ যোগার করাই  কষ্ট হয়ে গেছে। নিজের নেই  বিকল্প আয়ের পথ। নেই কোন স্থাবর সম্পত্তি। বসবাস করেন ভাড়া বাড়িতে। 

একমাত্র সংসারে একমাত্র আয়ের লোক খোকন। রিকশার চাকা কখনো ঘোরে আবার কখনো থেমে যায়। কিন্ত  করোনার আঘাতে ঘোরে না খোকনের সংসারের চাকা। এখনও খোকন পায় নি কোন মানবিক সহায়তা। সহায়তাহীন খোকন দুরাবস্তার মধ্যে পার করছেন দিনরাত। 

রিকশা চালক খোকন শেখ জানান পরিবার সন্তান নিয়ে খুব কষ্টে আছি। কষ্টের কথা কাউকে বলতেও পারছি না। ঘর ভাড়ায় থাকতে হয়। তাও দিতে পারছি না। বাড়ির মালিক তাগাদা দিচ্ছেন টাকার জন্য। হাতে নেই টাকা-পয়সাও। 

এত বেকায়দায় আগে কখনও পড়েনি। সংসারের খাওয়া-পরা, ঘর ভাড়া, ছেলে-মেয়ে লেখাপড়ার খরচসহ সবই জোটে আমার এই কাজের উপরে। তবে লকডাউন ঘোষণার পর থেকে আয় বন্ধ। হিমশিম খেতে হচ্ছে সংসার চালাতে। 

এখন পর্যন্ত কোন সহায়তা পাইনি, বর্তমান অবস্থায় কেউ খোঁজও নিচ্ছে না। আগামী দিনগুলোতে পরিবার নিয়ে কীভাবে চলবো? 

তিনি আরও বলেন, আমি ভূমিহীন, আমার ঘর নেই। ভাড়া বাড়িতে ছেলে মেয়ে নিয়ে কষ্টে দিন কাঁটাই। যাদের জায়গা নেই, ঘর নেই   তাদের অনেকে তো ঘর পেয়েছে। আমি  দরখাস্ত করেছি। আমাকে যদি কেউ একটা ঘর দিত, তাহলে বাড়ি ভাড়া থেকে রেহাই পেতাম। এতে পরিবারকে নিয়ে রিকশা চালিয়ে কোন মত জীবনটা চালিয়ে নিতে পারতাম। 
 
১নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য ছানোয়ার হোসেন বলেন, খোকন  ভূমিহীন-গৃহহীন। সে তার পরিবার নিয়ে একটা বাড়িতে ভাড়া থাকেন।  ঘরের জন্য দরখাস্ত করা হয়েছে। 

শিয়ালকোল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান শেখ বলেন, ঈদের আগেও  ভিজিএফ চাল, নগদ অর্থ দেয়া হয়েছে। সে এখন পেয়েছে কি না, এটা বলতে পারব না। তাঁর  ওয়ার্ডের মেম্বার বলতে পারবে।  আমার কাছে আসলে আমি বিষয়টি দেখতাম। সে যদি  ঘরের জন্য দরখাস্ত করে থাকে, তাহলে তালিকায় নাম আছে। পরিষদ থেকে শুধূ একটা ভূমিহীনের প্রত্যয়ন পত্র দেয়া হয়। ঘরের জন্য ভুমি অফিস বরাবর দরখাস্ত করতে হয়। সেখান থেকে  যাচাই-বাছাই করা পরে দেবে।

খোকন শেখ এর কথাগুলো শুনছিলাম আর ভাবছিলাম-শুধু খোকন কি শুধুই এক খোকন শেখ।  সিরাজগঞ্জে এই কঠোর লকডাউনে আরও অনেক কম আয়ের খোকন শেখদের আয় বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে চরম বেকায়দায় পড়েছেন তাঁরা। কেউবা দুএকবার পেয়েছে সহায়তা। তাতে কি ঘুরবে ওদের সংসারের চাকা?

আইআর /