|

নিম্ন আয়ের মানুষের টিকা নিবন্ধনে জটিলতা

Published: Thu, 15 Jul 2021 | Updated: Thu, 15 Jul 2021

 

মো. আশরাফুল আলম, গাইবান্ধা প্রতিনিধি:

করোনা ভাইরাসের প্রভাবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ আজ টালমাটাল। বাংলাদেশও বর্তমানে এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। রাজধানী,  বিভিন্ন বিভাগ, সিটি কর্পোরেশন, জেলা এবং উপজেলার হাসপাতালগুলিতে প্রায় সবখানেই কম বেশি কোভিড পজিটিভ রোগীর দেখা মিলছে। 

কোথাও কোথাও হাসপাতাল অব্যবস্থাপনার কারণে অথবা প্রয়োজনীয় অক্সিজেন না থাকায় রোগীদের বাঁচানো বড়ই চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। মানুষ সর্দি কাশি এবং জ্বরকে সাধারণ অসুস্থতা ভেবে অথবা লজ্জায় পরীক্ষা না করে বাড়িতেই সময় অতিক্রম করে সংক্রমণের শেষ পর্যায়ে গিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে। ততক্ষণে যে ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে তা আর ফেরানো সম্ভব হয়ে উঠছে না। ফলে মৃত্যুর হার বেড়েই চলেছে। অন্যদিকে সাধারণ সর্দি কাশি ভেবে পরিবার বা অন্যান্যদের সংস্পর্শে  গিয়ে সংক্রমণ বাড়িয়েই চলেছেন, যা অত্যন্ত ভয়াবহ। 

পরিস্থিতি যাই হোক এর নিয়ন্ত্রণ এবং প্রতিরোধে আমাদেরকেই পরিকল্পিতভাবে দাঁড়াতে হবে। করোনা নিয়ন্ত্রণে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি। ইতিমধ্যেই সরকারিভাবে টিকা দান কর্মসূচি আবারও শুরু হয়েছে। টিকা না পাওয়ার খরা কেটে গিয়ে মানুষের মধ্যে আশার সঞ্চার হয়েছে। বর্তমানে টিকা দান কেন্দ্রগুলোতে মানুষের উপস্থিতি বেড়েছে। মানুষ নিবন্ধন করছে। কিন্তু যা লক্ষনীয় তা হলো বয়স ৩৫ হলেও নিম্ন আয়ের মানুষ অথবা মাঠে ময়দানে পরিশ্রমী কৃষক, দিনমজুর, শ্রমিকদের মাঝে টিকা গ্রহণের আগ্রহ একেবারেই কম। 

জেলা ও উপজেলা টিকাদান কেন্দ্র ঘুরে দেখা যায়, শহরের তুলনামূলক বেশি শিক্ষিত নারী পুরুষ, চাকরিজীবী এবং ব্যবসায়ীরা টিকা গ্রহণ করছেন। কিন্তু শহর কিংবা গ্রামের তুলনামূলক কম শিক্ষিত, দরিদ্র অথবা নিম্ন আয়ের মানুষের মাঝে টিকা গ্রহণকারীর সংখ্যা কম। প্রতিদিন মৃত্যুর মিছিল দেখার পরও যেন তাদের কোন মাথা ব্যাথা নেই। জিজ্ঞেস করলে উত্তর মেলে, ‘‘আমরা মাঠে ময়দানে পরিশ্রমী মানুষ, গা ঘামা মানুষ আমাদের করোনা হবে না। আমাদের টিকা নেওয়া জরুরি নয়’’। অথচ এই দরিদ্র কিংবা নিম্ন আয়ের মানুষগুলো শহর কিংবা গ্রামের ব্যবসায়ী ও ধনী পরিবারের সংস্পর্শে যাওয়ার ফলে সংক্রমণ একাধিক স্থানে ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা থাকে। 

প্রথম ধাপে সংক্রমণের সময় আমরা দেখছি যে তুলনামূলক যারা কম পরিশ্রমি অথবা আরামদায়ক কাজের সাথে জরিত তাড়াই বেশি সংক্রমিত হয়েছেন। কিন্তু এর কোন বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই যে, এই অবস্থা সব সময় একই রকম থাকবে। করোনার বিভিন্ন ধরনের ভেরিয়েন্টের সাথে মানুষের যুদ্ধ করবার সক্ষমতা সব সময় নাও তৈরি হতে পারে। তাই সরকারি ঘোষণা অনুযায়ী টিকা গ্রহণের বিকল্প কিছু নেই। 

কিন্তু সমস্যার কালো মেঘ যেন কাটছেই না। শহরাঞ্চলের বস্তি, দরিদ্র শ্রেণীর মানুষ এবং গ্রামাঞ্চলের চর এলাকার নিম্ন আয়ের মানুষের টিকার জন্য নিবন্ধনের ক্ষেত্রে কিছু ভ্রান্ত ধারণা অথবা অজ্ঞতার কারণ উল্লেখযোগ্য। যেমন- শহরের বস্তিসহ অলিতে গলিতে নিম্ন আয়ের মানুষ তেমন সচেতন নয়। কেউ কেউ আবার একটু সময় করে টিকাদান কেন্দ্রে যাওয়ার অলসতায় উদাসীন। কোথায় কীভাবে টিকার জন্য নিবন্ধন করতে হবে তা জানার কোন আগ্রহ নেই। অনেকের মধ্যে ওয়েব সাইট এবং মোবাইল ফোনে ক্ষুদে বার্তার বিষয়ে অজ্ঞতা। আবার বাড়ি থেকে টিকাদান কেন্দ্র দুরে হওয়ায় এবং পরিবহন খরচ না থাকায় অনেকে টিকা গ্রহণে অনীহায় সময় ক্ষেপণ করছেন। কারো কারও মধ্যে টিকাভীতি এখনও কাটেনি। আবার এর আগে এসট্রাজেনেকার টিকা প্রথম ডোজ নেওয়ার পর ভারত তাদের করোনা আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা উচ্চমুখি হওয়ার ফলে সে টিকার দ্বিতীয় ডোজ নেওয়া স্থগিত হয়ে যায়। এতে করে দ্বিতীয় ডোজের টিকার অনিশ্চয়তা দেখা যাওয়ায় টিকা নিতে অনেকের মধ্যে অনীহা দেখা যায়।

সমীক্ষায় দেখা গেছে, জেনে হোক আর না জেনে হোক কোথাও কোথাও টিকা নিবন্ধন জটিলতা তারা নিজেরাই তৈরি করছেন। বিগত দিনে বিভিন্ন টিকা প্রদানের সরকারি উদ্যোগের মতো ভাবনা কাজ করায় অনেকের মধ্যে পরনির্ভরশীলতা মনোভাব বিদ্যমান। এটি অত্যন্ত দুঃখ এবং হতাশাজনক।

সকলের টিকা নিশ্চিত করবার মধ্য দিয়েই কিন্ত আমরা এই মহামারি নিয়ন্ত্রণ করতে পারি। কিন্তু এই বিশাল জনগোষ্ঠির এক অংশ যদি টিকা গ্রহণের বাহিরে থেকে যায় তবে এ দায় কিন্তু আমাদের সকলের। করোনা দিনে দিনে হয়তো বিদায় নিবে, কিন্তু একটি অংশ যদি টিকা গ্রহণ করতে না পারে তাতে  মৃর্ত্যুর সংখ্যা যেমন বাড়তে থাকবে তেমনি এই সংক্রমণ বিদায় নিতেও সময় লেগে যাবে। 

ইউনিয়ন পর্যায়ে বিভিন্ন গ্রাম ও চর ঘুরে স্থানীয় মানুষের সাথে কথা বলে জানা যায়, গ্রাম এলাকায় অনেক মানুষ এখনও জানেই না যে কোথায় কীভাবে টিকা নিবন্ধন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়। অথবা মনে করে, অন্যান্য জায়গায় টিকা দেয়া শেষ হলে গ্রাম পর্যায়ে দেয়া হবে। 

একজন নারী জানালেন, আমাদের ছেলে মেয়েদের যেভাবে টিকা দেয়া হয়েছে, সরকার ব্যবস্থা নিয়ে করোনার জন্য আমাদেরকেও একইভাবে গ্রামে এসে টিকা দিবে। কথা শুনে মনে হলো এই দায় সরকারের। সরকারের কিছুটা দায় রয়েছে কিন্তু তা নিজের নিরাপত্তার ভার অন্য কারো উপর চাপিয়ে দেয়া কতখানি যুক্তিযুক্ত তা বিচারের ভার পাঠকের উপরই থাকলো। 

টিকাদান কেন্দ্রে উচ্চ শিক্ষিত মানুষের উপস্থিতি লক্ষ্যনীয়। কিন্তু গ্রামের অথবা শহরের অলি গলি বস্তি এলাকার মানুষের উপস্থিতি একেবারেই কম। প্রায় ৫০ জন রিক্সা ও সিএনজি শ্রমিকের উপর এক জরিপে জানা গেছে, ৫০ জনের মধ্যে ৪৫ জনই টিকার জন্য কোন নিবন্ধন করেননি। এখান থেকেই অনুমান করা যায় তাদেও টিকা গ্রহণে তারা কতটুকু সচেতন। 

এবিষয়ে গাইবান্ধা পৌর  কাউন্সিলর আব্দুস সামাদ রোকনের কাছে জানতে চাইলে তিনি জানান, তৃণমূল পর্য়ায়ের মানুষ বিশেষ করে শ্রমিক, দিনমজুর, রিক্সা ও সিএনজি চালকসহ বিভিন্ন পেশার মানুষের হাতের নিকটে  সরকারি বেসরকারিভাবে নিবন্ধনের ব্যবস্থা করলে সহজেই মানুষ নিবন্ধন ভুক্ত হয়ে টিকা গ্রহণ করতে পারবে।  

তবে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগের পুরো দায় না থাকলেও একেবারে যে দায়মুক্ত তাও কিন্তু নয়। কারণ দেশের সকল নাগরিকেরই স্বাস্থ্য সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে সমান অধিকার রয়েছে। আমরা দেখতে অভ্যস্ত তুলনামূলক বেশি শিক্ষিত মানুষ সহজেই সচেতন এবং সহজেই সবক্ষেত্রে প্রবেশের সুযোগ নিয়ে থাকে। কিন্তু যারা দরিদ্র, নিম্ন আয়ের অথবা গ্রামের চরে বাস করে তাদের সংখ্যাও অনেক যারা এধরনের সুযোগ পায় না। শহরের শিক্ষিত এবং শহরের অলি গলি বস্তি এলাকার ও  গ্রামের সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতার পার্থক্য চিরন্তন। তাই তাদের প্রতি একটু বেশিই দৃষ্টি দেয়া প্রয়োজন। সর্বসাধারনের টিকা নিশ্চিত করতে এবং করোনা ভাইরাসকে সম্পুর্ণরূপে নির্মূল করাবার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ধনী, দরিদ্র, কম শিক্ষিত, পিছিয়ে পরা জনগোষ্টি সকলের টিকার অধিকার নিশ্চিত করা অতীব জরুরি। প্রয়োজনে স্বাস্থ্য সেবা অধিকার নিশ্চিত করতে তাদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থায় নিবন্ধন করতে হবে।

শহর এবং গ্রাম পর্যায়ে ভ্রাম্যমাণ কেন্দ্র স্থাপন করে বিভিন্ন ডিভাইস দিয়ে টিকার জন্য নিবন্ধন করার ব্যবস্থা করা হয়। সকল সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী, জনপ্রতিনিধি, বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আইসিটি শিক্ষকসহ সকল শিক্ষকদের সম্পৃক্ত করে নিম্ন আয়ের দরিদ্র মানুষের টিকার জন্য নিবন্ধনের উদ্যোগ গ্রহণ করা যেতে পারে।  

প্রধানমন্ত্রী নিম্ন আয়ের মানুষের সহায়তায় ৩ হাজার ২০০ কোটি টাকার পাঁচটি নতুন প্রণোদনা প্যাকেজের ঘোষণা দিয়েছেন। যেখানে ১৪ লাখ ৩৭ হাজার ৩৮৯ দিনমজুর, ২ লাখ ৩৫ হাজার ৩৩ পরিবহন শ্রমিক, ৫০ হাজার ৪৪৬ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং ১ হাজার ৬০৩ জন নৌপরিবহন শ্রমিককে জনপ্রতি নগদ ২ হাজার ৫০০ টাকা করে আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হবে। মোট ১৭ লাখ ২৪ হাজার ৪৭০ জন উপকারভোগীর জন্য বরাদ্দ ৪৫৯ কোটি টাকা, যদিও এর আগে দেখা গেছে, প্রণোদনার টাকা আত্মসাৎ করতে অনেক টিকা কার্যক্রম কাজে জরিতদের আত্মীয়বর্গের নাম ও আরও অনেক ধনাট্য ব্যক্তিদের নাম দেখা গেছে।

এই প্যাকেজ বাস্তবায়নের আগে টিকা নিবন্ধন বাধ্যতামূলক একটি উদ্যোগ হতে পারে। একটা বিষয় মাথায় রাখতে হবে। শহরে কিংবা গ্রামে নিম্ন আয়ের মানুষ যেমন- রিক্সা শ্রমিক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, বাজারে দিনমজুর শ্রমিক, কৃষি শ্রমিক, ভ্রাম্যমাণ গৃহকর্মী ইত্যাদি পেশার মানুষগুলো শহরে অথবা গ্রামের ধনী শ্রেণীর মানুষের বাড়ির কাজের সাথে নানা ভাবে সম্পৃক্ত। তাই তাদের টিকা প্রদান করে সেই পরিবারগুলোর যেমন নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে ঠিক তেমনি যারা তাদের শ্রমিক হিসেবে ব্যবহার করেন তাদের সংস্পর্শে থাকলেও স্বাস্থ্য ঝুঁকি কম থাকবে। বর্তমানে ইনফরমেশন টেকনোলজির জ্ঞান সম্পন্ন নাগরিকদের এই সকল নিম্ন আয়ের মানুষকে রোগের গুরুত্ব বুঝিয়ে তাদের নিবন্ধনে সহযোগিতা করে টিকা প্রদানের মাধ্যমে আমাদের সকলের স্বাস্থ্য ঝুঁকিহ্রাস পাবে বলে মনে করি। 
  
লেখক- উন্নয়ন কর্মী।

 

ডব্লিউইউ