|

দূষণ বন্ধ করে বুড়িগঙ্গাকে বাঁচাতে হবে

Published: Fri, 04 Jun 2021 | Updated: Fri, 04 Jun 2021

পৃথিবীর ইতিহাসে আর মানুষের জীবনে নদী এমন একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যার ভেতরে প্রবেশ না করতে পারলে খালি চোখে বোঝা যায় না। যুগে যুগে নদীর পাড়েই গড়ে উঠেছে মানব সভ্যতা। নীল নদের তীরে মিশরীয় সভ্যতা, টাইগ্রিস ও ইউফ্রেতিস নদীর তীরে মেসোপটেমিয় সভ্যতা, সিন্ধু নদের অববাহিকায় সিন্ধু সভ্যতা।

পূর্ণবর্ধিত সময়কালে এই সভ্যতা হরপ্পা সভ্যতা নামে পরিচিত। আর মহেঞ্জোদারো ছিল এই সিন্ধু সভ্যতারই একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। সিন্ধু সভ্যতার এক হাজার বছর পর খ্রিষ্টপূর্ব ৭০০ অব্দে গঙ্গা নদীর অববাহিকায় আবার একটি নগর সভ্যতা বিকাশ লাভ করে। এই সভ্যতাকে দ্বিতীয় নগর সভ্যতা হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়।

এই পর্যন্ত উপমহাদেশের প্রায় ৪১টি প্রত্নস্থানে দ্বিতীয় নগর সভ্যতার চিহ্ন আবিষ্কার হয়েছে। তন্মধ্যে বাংলাদেশের পুণ্ড্রনগর ওরফে মহাস্থানগড় এবং উয়ারী বটেশ্বর দ্বিতীয় নগর সভ্যতার নিদর্শন।

এরকমভাবে পৃথিবীতে যত সভ্যতা গড়ে উঠেছে তার সবই ছিল নদীভিত্তিক কিংবা নদীকেন্দ্রিক। নদীই ঠিক করে দেয় তার অববাহিকার মানুষের চরিত্র, সংস্কৃতি, অর্থনীতি আর রাজনীতি। 

ছোটবেলা থেকেই বই-পুস্তকে পড়েছি, জেনেছি যে, বাংলাদেশ একটি নদীমাতৃক দেশ। ক্লাসে স্যারকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, স্যার নদীমাতৃক অর্থ কি? স্যার বলেছিলেন, নদী মাতা যার। বুঝেছিলাম নদী এই দেশের মা। দেশ আমাদের মা আর নদী দেশের মা।

ছেলেবেলায় নদীতে সাঁতার কেটে, নদীতে গোসল করে নদীর ধারে খেলে বড় হয়েছি। বাড়ির পাশের যে নদীর সাথে আমরা হেসে-খেলে বড় হয়েছি, সে নদী আজ নদীগ্রাসীদের পেটের ভেতরে চলে গেছে প্রায়। যতটুকু আছে তা দিয়ে তাকে বাঁচিয়ে রাখা কঠিন। কারণ নদীখাদকেরা প্রতিদিন একটু একটু করে গ্রাস করছে তাকে। 

শিক্ষা আর কাজের জন্য রাজধানীতে আসি। ইতিহাস পড়তে গিয়ে জেনেছি, ঢাকা বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিত। মধ্যযুগের শুরুর দিকেই সুলতানি আমলে গড়ে উঠে এই ঢাকা নগরী।

সপ্তদশ শতাব্দীর সূচনালগ্নে যখন ইসলাম খান ঢাকায় তার স্থায়ী নিবাস স্থাপন করেন এবং ঢাকায় একটি রাজধানী শহরের মর্যাদা লাভ করে।

বুড়িগঙ্গা নদীকে কেন্দ্র করেই এই শহরটি মূলতঃ গড়ে উঠেছিল এই এলাকার বাণিজ্যের কেন্দ্র হিসাবে। বুড়িগঙ্গা তার বুক পেতে দিয়ে গড়ে তুলেছে শহর। কিন্তু সেই শহর তাকে কি দিয়েছে বিনিময়ে? 

ইতিহাসের বহু ঘটনা, ট্র্যাজেডি আর পরিবর্তনের সাক্ষী এই বুড়িগঙ্গা। আজ যে ঢাকা রাজধানী হিসেবে গৌরবান্বিত তার অন্যতম অংশীদার বুড়িগঙ্গা। এর দৈর্ঘ্য নিয়ে মতভেদ আছে।

কারো মতে ২৭ কি মি, কারো মতে ২৬, আবার কারো মতে ৩০ কি মি.। গড় গভীরতা ১০ মিটার এবং প্রস্থে ৪০০ মিটার। ১৯৮৪ সনে এর পানি প্রবাহের পরিমাপ গ্রহণ করা হয়। তাতে সর্বোচ্চ ২৯০২ ঘণমেক পানির প্রবাহ লক্ষ্য করা গেছে।

বুড়িগঙ্গার দু'তীরে গড়ে উঠেছে গুরুত্বপূর্ণ ভবনাদি, স্থাপনা ও স্থান । উত্তর পাড়ে নির্মিত হয়েছে পোস্তা প্রাসাদ ( এখন বিলীন ), লালবাগ কেল্লা, রূপলাল হাউস, নর্থ ব্রুক হল, আহসান মঞ্জিল, বাকল্যান্ড বাঁধ, মিলব্যারাক, সদরঘাট নৌবন্দর, জীবন বাবুর বাড়ি, পুরান কেল্লা ( জেলখানা), চক বাজার, সাত মসজিদসহ নানাবিধ সরকারি বেসরকারি ভবন ও স্থাপনা আর ওপারে জিঞ্জিরা প্রাসাদ, যার আরেক নাম নওঘরা। 

একসময় মানুষ বুড়িগঙ্গায় নিয়মিত গোসল করতো এবং পানির সাথে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কাজও সম্পন্ন করতো। এখনকার মতো এখানকার মতো এতো অপরিষ্কার ছিল না পানি।

যে বুড়িগঙ্গা একদিন স্বচ্ছ আর মাছের বিচরণ ক্ষেত্র ছিল, সে বুড়িগঙ্গার এখন করুন হাল। ক্রমাগত দূষণে এর পানি এখন কালচে আকার ধারণ করে পানের অযোগ্য হয়ে পড়েছে আর মাছের বিচরণের জন্যেও অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।

যে কারণে বুড়িগঙ্গায় এখন আর আগের মতো মাছের সন্ধান মেলে না। তার উপর যুক্ত হয়েছে অবৈধ দখলদারিত্ব। সব মিলিয়ে বুড়িগঙ্গার অবস্থা এখন নাজুক।

ষাটের দশকের শুরুর দিকে হাজারিবাগে ট্যানারি কারখানাগুলো স্থাপিত হয়। তখন থেকেই শুরু হয়েছে বুড়িগঙ্গা নদীর দূষণের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের কাজ। কারখানার নিষ্কাশিত  ২০০৩ সালে সরকার ১৫৪টি ট্যানারি হাজারিবাগ থেকে একটি পরিকল্পিত শিল্পনগরীতে সরিয়ে নেওয়ার জন্য পরিকল্পনা গ্রহণ করে।

কিন্তু বিগত ১৮ বছরেও সেখানে সবগুলো ট্যানারি সরিয়ে নেয়া হয়নি। ট্যানারির বর্জ্য সরাসরি বুড়িগঙ্গায় যায়। বিভিন্ন গবেষণা থেকে জানা যায় যে, ট্যানারিতে কমপক্ষে দুই শত রকমের রাসায়সিক ব্যবহার হয়।

এছাড়া বেশ কিছু শিল্প-কারখানার বর্জ্য, ড্রেন ও সুয়ারেজের বর্জ্য, গৃহস্থলী ও মেডিকেল বর্জ্য এমনকি প্লাস্টিকের বর্জ্যও যোগ হচ্ছে সেখানে। 

আইন অনুযায়ী, ট্যানারি ছাড়াও আশেপাশে ছোটবড় যেসব কারখানা আছে সেগুলোর বর্জ্য ইটিপি প্লান্টের মাধ্যমে শোধন করে তা বের করে দেয়া নিয়ম। বুড়িগঙ্গার দূষণ যেমন পানিতে হচ্ছে, তেমনি তা আশেপাশেও ছড়িয়ে পড়ছে।

বুড়িগঙ্গার আশেপাশের আবাদি জমিগুলোতে বুড়িগঙ্গার পানি ব্যবহার হয় বলে এসব খাবারও সমান ক্ষতিকর। বিভিন্ন গবেষণা থেকে জানা যায়, এসব দূষিত পানিতে হেভি মেটাল থাকায় তা খাবারের সাথে মিশে গিয়ে কিডনি ও

ফুসফুসের নানা রোগব্যধি হচ্ছে। অনেকের চামড়া ও নখের সমস্যা হতে পারে। ওসব খাবার পাকস্থলী ও লিভারের সমস্যা করতে পারে। অনেক সময় ফুড পয়জনিং এবং ডায়রিয়াও হতে পারে।

দূষিত পানিতে কোনো জলজ জীবন বৃদ্ধি পায় না। দূষিত পানিতে থাকতে থাকতে তারা বিষাক্ত হয়ে উঠতে শুরু করে এবং একসময় মরে যায়। দূষণে বুড়িগঙ্গার আশেপাশের ফসল, মাছ, মাটি, পানি সব কিছুই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। তাই হলফ করেই বলা যায়, বুড়িগঙ্গা তথা ঢাকা শহরের পুরো পরিবেশগত ভারসাম্য আজ ধ্বংসের পথে ধাবিত।

বুড়িগঙ্গাকে বাঁচানোর জন্য উচ্চ আদালতের নির্দেশনা রয়েছে। ২০১৯ নদী নিধনকে “যুথবন্ধ আত্মহত্যা” হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন উচ্চ আদালত।

আমরা জানি, ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে পরিবেশগত ছাড়পত্রবিহীন যে সব কারখানা ও স্থাপনা বুড়িগঙ্গার পাড়ে রয়েছে সেগুলো বন্ধ করে দেওয়ার জন্য পরিবেশ অধিদপ্তরকে নির্দেশ দিয়েছিলো উচ্চ আদালত। 

এতসব করার পরও উন্নতি কতটুকু হয়েছে তা বুড়িগঙ্গার ধারে গেলেই বোঝা যায়। পানিতে যেমন দুর্গন্ধ তেমনই ময়লা কালো আর বিষাক্ত। এ থেকে উত্তরণের জন্য কর্তৃপক্ষকে এগিয়ে আসতে হবে।

অবৈধভাবে নদী দখল করে দুই ধারে গড়ে ওঠা বাজার দোকানপাট উৎখাতের ব্যবস্থা করাটা জরুরি। সেই সাথে নদীর ধারে গড়ে উঠা সকল শিল্প প্রতিষ্ঠানকে আইন মেনে বর্জ্য পরিশোধনের মাধ্যমে বর্জ্য নিষ্কাশনের দিকে যেতে হবে।

আইন না মানলে তার জন্য শাস্তির বন্দোবস্ত নিশ্চিত করতে হবে। ঢাকা শহরকে বাঁচাতে হলে, ঢাকার মানুষকে সুস্থ রাখতে হলে সকলের সম্মিলিত উদ্যোগে দূষণ বন্ধ করতে হবে। রক্ষা করতে হবে ঢাকার প্রাণ আমাদের বুড়িগঙ্গাকে। 

লেখক: মামুন কবীর, পরিবেশ কর্মী

আইআর /