|

করোনাকালীন বাজেট হতে হবে কর্মসংস্থান নির্ভর

Published: Sat, 22 May 2021 | Updated: Sat, 22 May 2021

মামুন কবীর : করোনাভাইরাস বিশ্বব্যাপী তার থাবার অংশ হিসাবে ছোবল হেনেছে বাংলাদেশেও। ২০২০ সালের মার্চ মাসে বাংলাদেশে প্রথম শনাক্ত হয় করোনাভাইরাস। সারা বিশ্বের মানুষকে ঘরবন্দী করে দিয়ে বিশ্ব অর্থনীতির উপর যে প্রভাব বিস্তার করেছে এই কভিড-১৯ ভাইরাসটি তার প্রভাব থেকে বাংলাদেশও বাদ যায়নি।

২০২০ সালের মার্চ মাসের ২৪ তারিখে সরকার সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে দেশে। করোনাভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে লকডাউনের মতো করে একটু ঢিলেঢালা এই ছুটি মানুষকে একরকম ঘরবন্দী করে ফেলে। চারিদিকে মৃত্যুর থাবা আর আতঙ্কিত মানুষ ঘরবন্দী আর বন্ধ হয়ে যায় সকল অফিস-আদালত, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান আর অধিকাংশ শিল্প প্রতিষ্ঠানও। উৎপাদন ব্যবস্থার সাথে জড়িত মানুষেররা মাথার উপর অনিশ্চয়তার বোঝা নিয়ে ফিরতে থাকে গ্রামে। বন্ধ হয়ে যায় উৎপাদন, কর্মহীন হতে থাকে কর্মজীবী মানুষেরা আর থমকে যায় দেশের অর্থনীতি।

২০২০ সালের করোনার প্রথম ঢেউয়ের পর ২০২১ সালের শুরুতেই করোনার দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হয়েছে বাংলাদেশে। এবারের লকডাউনে আবারো বিপর্যস্ত জনজীবন। এবারের সংগ্রাম হলো যারা এতদিন কোনমতে টিকে ছিল তাদের টিকে থাকবার। কারণ করোনার দ্বিতীয় ঢেউ আরো বিপর্যস্ত করে ফেলছে শহর আর গ্রামের মানুষের অর্থনৈতিক কার্যক্রমকে।

পিপিআরসি ও ব্র্যাকের সাম্প্রতিক গবেষণা জরিপ থেকে জানা যায়, করোনার এক বছরে দেশের প্রায় ১৫ শতাংশ মানুষের জীবনমান নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে, সংখ্যায় তা প্রায় ২ কোটি ৪৫ লাখ। গবেষণায় আরো দেখা গেছে, স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় শহুরে বস্তবাসী শ্রমজীবী মানুষের আয় প্রায় ১৪ শতাংশ কমে গেছে। বস্তিবাসীর ৮ শতাংশ এখনো বেকার। এ কারণে তাদের জীবনমান যেকোন সময়ের তুলনায় ক্ষতিগ্রস্ত। এছাড়াও গত এক বছরে করোনার সময়ে ৪ শতাংশ অতিদরিদ্রের সংখ্যা বেড়েছে। দেশে নতুন করে দরিদ্র হয়েছে প্রায় আড়াই কোটি মানুষ।

জরিপে আরো বলা হয়েছে, দারিদ্রের ঝুঁকিতে থাকা মানুষের ৭২ শতাংশ গত বছরের জুনে দারিদ্র্যসীমার নিচে অবস্থান করছিল। তাদের আখ্যায়িত করা হয়েছিল ‘নতুন দরিদ্র’ হিসেবে। সেই ‘নতুন দরিদ্র’দের ৫০ শতাংশ এখনো দারিদ্র্যঝুঁকিতে রয়েছে; শতাংশ হারে যার পরিমাণ শহরে ৫৯ শতাংশ এবং গ্রামে ৪৪ শতাংশ। তবে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে জুন মাস থেকে উন্নতি লক্ষ করা যাচ্ছে। এর পরও কভিডের আগে কাজ ছিল কিন্তু এখন বেকার, এমন মানুষ রয়েছে ৮ শতাংশ।

করোনাভাইরাসের অভিঘাতে কর্মহীনতার ক্ষেত্রে নারীদের অবস্থা আরো বেশি আশঙ্কাজনক। কভিডের আগে কর্মজীবী ছিলেন, এমন নারীদের এক-তৃতীয়াংশ গত বছরের জুন মাস থেকে এখনো বেকার। পুরুষদের ক্ষেত্রে এই হার নেমে এসেছে ১৬ থেকে ৬ শতাংশে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) এর ২০১৭ সালের সর্বশেষ শ্রমশক্তি জরিপের হিসাব অনুসারে, দেশে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী ৬ কোটি ৩৫ লাখ, যার মধ্যে কাজ করেন ৬ কোটি ৮ লাখ নারী-পুরুষ। সুতরাং দেশে বেকারত্বের হার ৪ দশমিক ২ শতাংশ, এবং মোট বেকারের সংখ্যা ২৭ লাখ। তবে, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা আইএলও বলছে, দেশে তরুণদের ২৫ শতাংশই বেকার।

কর্মসংস্থান নিয়ে আইএলও-র আরেক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের তরুণরা যত বেশি পড়ালেখা করছেন, তাদের তত বেশি বেকার থাকার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। এ অঞ্চলের উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে বেকারত্বের হার সবচেয়ে বেশি পাকিস্তানে ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ। অপরদিকে ২৮টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১০ দশমিক ৭ শতাংশ।

২০২১ সাল অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার প্রথম বছর। এই পরিকল্পনায় বেকারত্বের হার ৩ দশমিক ১ শতাংশে নামিয়ে আনার কথা বলা হয়েছে। সরকারের পরিকল্পনা হচ্ছে, ২০২৫ সাল নাগাদ দেশে শ্রমশক্তি বাড়বে ২ দশমিক ৩ শতাংশ হারে, আর কর্মসংস্থানও বাড়বে একই হারে। অর্থাৎ শ্রমশক্তির যত প্রবৃদ্ধি, ততই কর্মসংস্থান। আর এই সময়ে বিদেশে চাকরির সুযোগ হবে দশমিক ৫ শতাংশ হারে, আর অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে ১ দশমিক ৫ শতাংশ।

২০২০ সালের ১৯ নভেম্বর জাতীয় সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. ফরহাদ হোসেন জানান, সরকারি চাকরিতে তিন লাখ ৬৯ হাজার ৪৫১টি শূন্য পদ রয়েছে। তিনি আরও জানান, বর্তমানে দেশের মন্ত্রণালয়, অধিদফতরসহ সরকারি প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন পদে শূন্য পদের মধ্যে প্রথম শ্রেণিতে (৯ম গ্রেড ও তদুর্ধ) শূন্য ৫৫হাজার ৩৮৯টি, দ্বিতীয় শ্রেণিতে (১০ম গ্রেড) শূন্য ৪৯ হাজার ১৪২টি, তৃতীয় শ্রেণিতে (১১ থেকে ১৬ তম গ্রেড) শূন্য ১ লাখ ৭৭ হাজার ৭৭৯টি চতুর্থ শ্রেণিতে (শূন্য ১৭ থেকে ২০ তম গ্রেড) ৮৭ হাজার ১৪১টি পদ শূন্য রয়েছে।

সরকারের পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনাকে সামনে রেখেই প্রতিবছর বাজেট পরিকল্পনার ঘোষণা করা হয়। এবারও সময় এসে গেছে বাজেটের। জানা গেছে জুনের প্রথম সপ্তাহেই ঘোষণা করা হবে আগামী ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেট। 
কর্মসংস্থানের বিষয়টি মাথায় রেখে করোনাকালীন এই বাজেটে দারিদ্র বিমোচনের জন্য কর্মসংস্থানকে মাথায় রেখে বিশেষ পরিকল্পনা নিতে হবে। সরকারি শূণ্যপদগুলোতে কোনরকম দুর্নীতি, দলীয় আর স্বজনপ্রীতির উর্ধ্বে উঠে নিয়োগ সম্পন্ন করার পরিকল্পনা হাতে নিতে হবে।

আমাদের দেশে সরকারগুলো মানুষের মাথায় এই বিষটি সুন্দরভাবে গেঁথে দিতে পেরেছেন যে, অবকাঠামোগত উন্নয়নই দেশের আসল উন্নয়ন। আমরাও তাই বুঝে নিয়ে হাততালি দিয়ে শান্তি পাই। মানুষের যদি কাজ না থাকে। অধিকাংশ মানুষ যদি দারিদ্রসীমার নিচেই বাস করে। আর সাথে থাকে কাজ হারানোর শঙ্কা তবে অবকাঠামোর উন্নয়ন মানুষের জীবনে কোন ফারাক তৈরি করে না।

এবছর বাজেট পরিকল্পনাকে সাজাতে হবে করোনার অভিঘাতে নতুন আড়াই কোটি দরিদ্রকে অন্তর্ভুক্ত করে দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচি সাজাতে হবে। কুটির, ক্ষুদ্র ও এসএমই খাতে প্রণোদনা বাস্তবায়নের পন্থায় পরিবর্তন আনতে হবে। ভাবতে হবে করোনা-পরবর্তী শ্রমবাজার পুনরুদ্ধারের কথাও। কর্মসৃজন এবং অর্থনীতিতে প্রণোদনা প্রদানের বিষয়টিকে মাথায় রেখেই পরিকল্পনা অব্যাহত রাখতে হবে। পরিকল্পনা গ্রহণ আর এর সঠিক বাস্তবায়নের মাধ্যমে মোকাবেলা করতে হবে অর্থনীতিতে করোনার নেতিবাচক প্রভাবকে। আর এই লক্ষ্য পূরণের জন্য প্রয়োজন কর্মসংস্থান নির্ভর বাজেট।

লেখক: সমাজকর্মী, কবি ও কলামিস্ট

/এসিএন