|

করোনা সচেতনতায় শারীরিক দূরত্ব, মাস্ক এবং ভ্যাকসিন

Published: Sat, 24 Apr 2021 | Updated: Sat, 24 Apr 2021

মো. আশরাফুল আলম

করোনার দ্বিতীয় ঢেউ আগের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী রূপ নিয়ে বিস্তারলাভ করছে। এই পরিস্থিতিতে মানুষের মাঝে হঠাৎ করেই আবার সংক্রমণ ভীতি দেখা যাচ্ছে। দুশ্চিন্তায় ফেলছে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থাকা নীতি নির্ধারকদের। প্রতিদিন হু হু করে বাড়ছে আক্রান্ত এবং মৃতের সংখ্যা। 

বিশ্বে আজ পর্যন্ত কোভিড-১৯ আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা প্রায় ১৪ কোটি ৬২ লাখ। আর মারা গেছেন প্রায় ৩১ লাখ মানুষ। বাংলাদেশে করোনা সনাক্ত হয়েছে প্রায় ৭ লাখ ৪২ হাজার ৪ শত মানুষ। মারা গেছে এপর্যন্ত ১০ হাজার ৯৫২ জন রোগী। জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী গাইবান্ধা জেলায় সর্বমোট সনাক্ত রোগীর সংখ্যা ১ হাজার ৬৯৩ জন। যার মধ্যে সুস্থ হয়েছেন ১ হাজার ৫৬১ জন। আর মারা গেছেন ২০ রোগী। বর্তমানে বাড়িতে চিকিৎসা নিচ্ছেন ১০২ জন করোনা রোগী।

সম্প্রতি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষনায় কোভিড-১৯ বিষয়ে তথ্য উঠে এসেছে যে, এই ভাইরাসটি বাতাসে ছড়াচ্ছে বলে জানা গেছে। সেক্ষেত্রে নানা রকম কথা আলোচিত  হচ্ছে যে, বাতাসে ছড়ালে তবে শারীরিক দুরত্ব ৩ ফিট যথেষ্ট কিনা, আবার যদি বাতাসে ছড়ায় তবে লকডাউন প্রয়োজন আছে কি না ইত্যাদি। এখানে কথা হচ্ছে যে বাতাসে ভাসতে পারে এমন ভাইরাস খুব সহজেই অন্যের অজান্তে দ্রুতই সংক্রমণ করতে পারে। কারণ আমরা এখনও ধারনা করতে পারি না যে করোনা ভাইরাস কার মধ্যে আছে অথবা কার মধ্যে নেই। বর্তমানে এমনও পাওয়া গেছে যে কোন ধরনের উপসর্গ নেই কিন্তু পরীক্ষার ফলাফলে করোনা পজিটিভ। তাই হয়তো যার মধ্যে সামান্য উপসর্গ রয়েছে তিনি বিষয়টিকে গুরুত্ব না দিয়ে সামান্য স্বর্দি অথবা ঋতু পরিবর্তন  জ¦র ভেবে ঘুরে বেড়াচ্ছেন আর হাঁচি-কাশি অথবা কথা বলার মাধ্যমে বাতাসে ছড়িয়ে অন্যকে সংক্রমিত করছেন। বিভিন্ন দেশে দেখাগেছে, যে অনেক আবাসিক হোটেলে কোয়ারেন্টাইন ব্যবস্থার আয়োজন করে হোটেলে থাকা বয় এবং বর্ডারদের জন্য আলাদা আলাদা রুম থাকলেও একাধিক ব্যক্তি সংক্রমিত হয়েছেন।

অহরহ দেখছি যে একজন অসুস্থ করেনা রোগীকে হাসপাতালে নেওয়ার ক্ষেত্রে একই এম্বুলেন্সের মধ্যে একাধিক ব্যক্তি উঠে বসেন। ফলে সুস্থ ব্যক্তিও নিজেকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছেন। এখানে সর্তকতা হলো যতো বেশি কম সংখ্যক মানুষ রোগির সংস্পর্শে থাকা যায় ততই মঙ্গল। 

আবার কোথাও কোথাও দেখা গেছে যার এন্টি বডি ভালো তার ক্ষেত্রে রোগটি তেমন সুবিধা করতে না পারায় শরীরের স্বাভাবিকতা বজায় থাকে। কিন্তু সেই ব্যক্তির উচ্চ স্বরে খোলা মুখে কথা বলায় অথবা হাঁচিতে বাতাসের মাধ্যমে অন্য তুলনামূলক দুর্বল শরীরের ব্যক্তির মাঝে অধিক শক্তি অর্জন করে সংক্রমিত করতে সক্ষম হচ্ছে। তাই আমাদের আমলে নিতে হবে, সত্যিই যদি বাতাসে এই ভাইরাস ভাসে তবে বড় জনসমাগম স্থলে নিশ্চিতভাবে এর ব্যাপকতা ছড়াবে খুব দ্রুতই। এই পর্যবেক্ষণ থেকে বলা যায় শারীরিক দূরত্ব ৩ ফিট যথেষ্ট কি না এটি বলার সময় এখনও আসে নাই। যদি বাতাসে ছাড়ানোর মতো কোন তথ্য পাওয়া যায় তবে নিশ্চয়ই ৩ ফুটের কথা আর খাটবে না। আর ৩ফিট দুত্বের বিষয়ে একজন চিকিৎসক কে প্রশ্ন করা হলে তিনি বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় কোন মতামত দিতে অস্বীকৃতি জানান। 

অনেক সংখ্যক দৃশ্যমান যে, আক্রান্ত ব্যক্তির চিকিৎসায় নিয়োজিত ডাঃ এবং নার্সগণ পিপিই মাস্ক গ্লাভস পরার পরেও সংক্রমিত হয়েছেন। তবে প্রশ্ন কিভাবে তারা সংক্রমিত হলো? এখানে অনুমান করা যায় যে ভাইরাসটি বাতাসবাহী হওয়ায় কিছু সময় ভেসে থাকে এবং যখনই সুযোগ পাচ্ছে ঠিক তখনই নিঃশ্বাসের সাথে শরীরে প্রবেশ করে আক্রান্ত করেছে। ধারনা করা হচ্ছে পরিস্থিতি বিবেচনায় এবং আরও পরীক্ষা নিরীক্ষার পর অথবা সময় সাপেক্ষে এটি ৩ ফিট দূরত্বের কথাও থাকবে না। কারণ বাতাস বাহি হাম এবং যক্ষা রোগ ছাড়ানোর ক্ষেত্রেও দুরত্বের কোন পয়েন্ট নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি।

তবে যারা  উচ্চ মাত্রার ঝুঁকির পরিস্থিতির সামনে থাকেন যেমন কেউ একজন বক্তৃতা দিচ্ছেন তার সামনে, বিভিন্ন জনসমাগমে উচ্চস্বরে আলোচনা করেন, মসজিদে খুতবা দেন, কোন উপাসনালয়ে বক্তৃতা দেন, রাজনৈতিক বক্তৃতার সামনে থাকেন, বিভিন্ন সভা সেমিনারের সাথে সংশ্লিষ্ট কাছাকাছি থাকেন তাদের বেশি সতর্ক থাকতে হবে। তাদেরকে অবশ্যই মুখে মাস্ক  ব্যবহার করতে হবে। মাস্কের উপর গুরুত্ব দিয়ে গুনগত মানসম্পন্ন মাস্ক ব্যবহার খুবই জরুরী। আমাদের অজান্তে অথবা কম গুরুত্বনুভাবে অন্যকে মাস্ক ব্যবহারের কথা বলি না অথচ তার সংস্পর্শে আমাদেরকে থাকতেই হয়। এই যেমন আমরা রিকসায় চড়ে রিকসাওয়ালা সামনে থেকে কথা বলে পিছনে আমরা বসে থাকি, অটো থ্রি হুইলারে একসাথে একাধিক ব্যক্তি মুখোমুখি বা পাশাপাশি বসা, বাজারে মাছ, মাংস, মুরগী অথবা কাঁচা বাজার বিক্রেতার মুখে মাস্ক থাকে না অথবা কথা বলার সময় মাস্ক খুলে কথা বলা ইত্যাদি। অথচ আমরা খুব সামনে থেকেই দর কষাকষি করি বেশ উচ্চস্বরে আওয়াজ দিয়ে। এবিষয়ে আমাদের প্রত্যেককেই সতর্কতার সাথে আচরণ পরিবর্তন করতে হবে। কারণ করোনা নির্মুল দীর্ঘ সময়ের ব্যাপার কারণ এখনও কেউ জানেনা এর ভবিষ্যৎ সম্পর্কে। তবে বিনামুল্যে মাস্ক বিতরনকালে এর গুনগত মান যাচাই প্রয়োজন। সতর্ক থাকতে হবে বিনামুল্যের মাস্ক গ্রহনে কেউ যেন বিড়ম্বনার শিকার না হই। দুই একটি স্থানে বিনামুল্যের মাস্ক লাগিয়ে অচেতন হয়ে টাকা পয়সাও হারিয়েছেন অনেকেই।   

করোনা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রনে ভ্যাকসিন নিতেই হবে। আমরা দেখছি যে পশ্চিমা দেশসমূহ এবং বিভিন্ন উন্নত রাষ্ট্রের নাগরিকরা অতি আগ্রহের সাথেই টিকা নিচ্ছেন। আমাদের দেশের কমিউনিটিতে এখনও টিকা গ্রহনের প্রতি অনিহা কাটেনি। বাঁচার জন্য ভরসা করতে হলে টিকা গ্রহণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপুর্ণ। বিভিন্ন দেশ মনে করছে তারা এই টিকা গ্রহনের মাধ্যমে করোনা ভাইরাস রোগটি নিয়ন্ত্রনের চেষ্টা করছে। কারণ এখন পর্যন্ত টিকাই হলো বৈজ্ঞানিক স্বীকৃত সংক্রমণ নিয়ন্ত্রনের একমাত্র উপায়। তাই দেশের মানুষের অতি আগ্রহের সাথে এই সরকারী ভাবে সরবরাহকৃত টিকা নেওয়া উচিৎ। সাথে স্বাস্থ্য বিধির চর্চা ভুলে গেলে চলবে না কারণ কোভিড-১৯ ভাইরাস কখন কোন রুপ ধারণ করে কার মধ্যে সংক্রমিত হচ্ছে সেটিও সঠিক ভাবে বলার সময় আসে নাই। প্রতিনিয়তই এই ভাইরাস এর রুপ পরিবর্তনে চিকিৎসক এবং বিজ্ঞানীরা চিন্তিত এবং উদ্বিগ্ন। 

আমরা দেখছি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে করোনার ভ্যাকসিন দেওয়া চলমান রয়েছে। আমাদের দেশেও গত ফ্রেরুয়ারি মাস থেকে টিকা প্রদান কার্যক্রম চলমান রয়েছে। কিন্তু টিকা নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম সাড়া মিলছে বলে টিকা প্রদান কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন। প্রথমে স্বাস্থ্যকর্মী, বয়স্ক, অসুস্থ এবং চল্লিশর্ধো ব্যক্তিরা প্রাধান্য পাওয়ার কথা নীতিমালায় থাকলেও তা যেন বাস্তবায়ন করা কষ্টসাধ্য হয়েছে শুধুমাত্র মানুষের অসচেতনতা এবং ভ্রান্ত ধারনার কারনে । অনেকেই ১ম ডোজ নিয়ে আবার ২য় ডোজ সম্পন্ন করলেও এখন পর্যন্ত জনসংখ্যার একটি বড় অংশ টিকা গ্রহনের বাইরেই থেকে যাচ্ছেন। সুতরাং ভবিষ্যতে যে তারা সংক্রমণ আবার ছড়াবেন না তার কিন্তু কোন নিশ্চয়তা নেই। এখানে একটি বিষয় নজরদারী প্রয়োজন যে শহর এলকাগুলোতে খুব সহজেই হাতের নিকটে টিকাদান কেন্দ্র থাকায় অথবা মানুষ একটু বেশি সচেতন হওয়ায় টিকা গ্রহনের পরিমানও বেশি। কিন্তু গ্রাম পর্যায়ে এর পরিমান খুবই নগণ্য। তাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের গুরু দায়িত্ব এখন এই গ্রামের ঝুঁকিপূর্ণ মানুষকে টিকা প্রদান নিশ্চিত করা। এক্ষেত্রে স্থানীয় কমিউনিটি ক্লিনিকসমূহকে সংশ্লিষ্ট বিভাগ কাজে লাগাতে পারে।  গাইবান্ধা স্বাস্থ্য বিভাগ হতে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গাইবান্ধা জেলার ৭ উপজেলাতে এখন পর্যন্ত গত র্ফেরæয়ারি মাসে শুরু হওয়া টিকা কেন্দ্রে ১ম ডোজ টিকা গ্রহণ করেছেন ৬২ হাজার ৬৫২জন। ২য় ডোজ টিকা গ্রহণ সম্পন্ন করেছেন ১৭ হাজার ৯৬২ জন। সারা জেলায় টিকার জন্য রেজিষ্ট্রেশন করেছেন ৭৮ হাজার ১২জন। ফলে জনসংখ্যার একটি বড় অংশই এখনও ভ্যাকসিনের বাহিরেই রয়েছেন। 

অনেকের মনে প্রশ্ন করোনা সংক্রমণ হয়ে সেড়ে গেলেও কি টিকা নিতে হবে  অথবা সংক্রমণ হওয়ার কতদিন পর টিকা নেওয়া যাবে। এখানে বিভিন্ন চিকিৎসকগণ বলে থাকেন যে, কোভিড রোগী সংক্রমিত হয়ে সেড়ে গেলে ২৮দিন অথবা ৪ সপ্তাহ পরে টিকা গ্রহণ করতে পারবেন। আরও বলা যায় যে, মানুষের শরীরে যেকোন রোগ একবার হলেও যে আবারও হবে না তার কোন নিশ্চয়তাও নেই। একবার আক্রান্ত হয়ে কোভিডমুক্ত হলে দেহে প্রয়োজনীয় প্রতিরোধ ব্যবস্থা কার্যকর ভূমিকা পালন করে ঠিকই কিন্তু তা যথেষ্ট নয়। তাই বেশিরভাগ অ্যান্টিবডি তৈরির জন্য টিকা গ্রহণ করা উচিৎ। কারণ আমরা পরিমাপ করতে পারি না যে, সংক্রমিত ব্যক্তি কী মাত্রায় আক্রান্ত হয়েছিলেন এবং তারপর কত দ্রæত সুস্থ হয়েছেন, আর কোন ঔষধটি তাঁর সহায়ক ভুমিকায় ছিলো। এসব বিষয় নিয়ে সম্মিলিত বিবেচনায়  তাঁর দেহে প্রতিরোধী ক্ষমতা কার্যকর হয়। তাই যেহেতু ভ্যাকসিন একটি পরীক্ষিত উপাদান তাই বর্তমানে এটিই একমাত্র সর্বোচ্চ বিশ্বাসের বস্তু। তাই এই বিশ্বাসের উপাদানকে গ্রহণ করতে যে যার জায়গা থেকে কাজ করাটা খুবই জরুরী। সকলের মাঝে সচেতনতা গড়ে তুলে প্রত্যেকটি সুস্থ্য মানুষকে টিকা প্রদান নিশ্চিত করা সকলের দায়িত্ব ভেবে আমাদের এগিয়ে আসা বাঞ্চনীয়।

লেখক- উন্নয়ন কর্মী।

/এসিএন