|

১৪২৭ এর চৈত্র সংক্রান্তি এবং পহেলা বৈশাখ ১৪২৮

Published: Tue, 13 Apr 2021 | Updated: Tue, 13 Apr 2021

মাজেদুল ইসলাম আকাশ : "যত বিঘ্ন দূর করো/যত ভগ্ন সরিয়ে দাও/ যা কিছু ক্ষয় হবার দিকে যাচ্ছে সব লয় করে দাও-  হে পরিপূর্ণ আনন্দ, পরিপূর্ণ নূতনের জন্যে আমাকে প্রস্তুত করো।"
১৩১৭ সনে আজ থেকে ১১০ বছর পূর্বে চৈত্র সংক্রান্তি তে কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর উপরোক্ত পংক্তিমালায় স্বীয় ভাব প্রকাশে প্রার্থনা করেছিলেন। 

আজ ১৪২৭ সনের ৩০ চৈত্র, চৈত্র মানেই শেষ বেলাকার শেষ খেলা। মানুষের জীবন এবং প্রকৃতি ভিতরে বাইরে একাকার হয়ে যায়, চৈত্রের তাপদাহ আর প্রচন্ডতাকে সঙ্গে নিয়ে আসে বৈশাখ। চৈত্র মানেই গুমোট গরম, অস্বস্তি ভাব প্রকৃতিতে। রবীন্দ্রনাথের মতো ই ১১০ বছর পরেও বাঙালিমাত্রই অনুরুপ প্রার্থনা ছাড়া উপায় কি!

সারা বিশ্বেরই বর্ষ গণনার নিজস্বতা রয়েছে। রয়েছে পালনপর্বের ও নানান সংস্কৃতি। তদুপরি বাঙালী সংস্কৃতির রয়েছে বৃত্তিমান ধারাবাহিকতা। বঙদেশে প্রাচীনকাল থেকেই প্রচলিত ছিল শতাব্দ। ফসলি সন হিসেবে বঙাব্দ বা বাংলা সন চালু হয় সম্রাট আকবরের শাসনামলে। মূলত ভূমি রাজস্ব সংগ্রহের জন্য বৈশাখ কে রাজস্ব সনের প্রথম মাস হিসেবে চালু করা হয়। রাজস্ব সংগ্রহের জন্য চৈত্রের চেয়ে বেশি উপযোগী ছিল বৈশাখ। সরকারকে খাজনা দেয়া হলো পুণ্যের কাজ, এই পুণ্যের জন্য পুণ্যাহ পদ্ধতির চালু হয়। মোঘল যুগে রাজস্ব আদায়ের জন্য এই অভিনব ব্যবস্থার প্রচলন। পুণ্যাহ উপলক্ষে রাজদর্শন বা জমিদার দর্শন হতো। প্রসঙ্গত ভূস্বামীরা এ পুণ্যাহ প্রথার চালু করেন। যা আজও উপমহাদেশের অনেক স্থানে দেখা যায়। বাংলাদেশে ছোট থেকে বড় প্রায় সকল পর্যায়েই ব্যবসায়ীরা পুরাতন হিসেব নিকেশ চুকিয়ে আনুষ্ঠানিক সংস্কৃতির মধ্য দিয়ে নতুন খাতার উদ্ভোদন করেন, যা  হাল খাতা হিসেবে সমধিক বিবেচিত। 

বাঙালিদের মধ্যে বর্ষের শেষ অর্থাৎ চৈত্র সংক্রান্তি এবং নতুন বর্ষের আগমন অর্থাৎ পহেলা বৈশাখ উদযাপনের সংস্কৃতি কে ভীষণ গুরুত্বের সাথে পালন করা হয়। সরল প্রাণ বাঙালি মাত্রই মনে প্রাণে বিশ্বাস করেন যে 'শেষ ভালো যার সব ভালো তার।' তাইতো খাওয়া দাওয়া পোষাক পরিচ্ছদ ও জীবনাচরণে খুব সাবধানতা অবলম্বন করা হয় এই সময়ে। মহিলারা ঘর দোর পরিস্কার পরিচ্ছন্ন করে বিভিন্ন লতাপাতার শাক বিশেষত তেতো প্রকৃতির, (কেননা তেতো খেয়ে বর্ষ বিদায় এবং বরণ করলে আগামী  মঙ্গলময় হবে বিশ্বাস থেকে) নানার ধরনের কলাই এবং  চাল ভেজে খাবারের ব্যবস্থা করেন। পুরুষেরা বেরিয়ে পরেন মৎস্য, পাখি ও জঙুলে প্রানী শিকার করতে। মাছ সহ বিভিন্ন প্রাণী শিকার প্রাচীনকাল থেকেই আবহমান বাঙালি সংস্কৃতিতে গুরুত্বের সাথে পালন হয়ে আসছে। 

বাংলা নববর্ষ উদযাপনের ক্ষেত্রে কিছু সাংস্কৃতিক পরিবর্তন দেখা দিলেও এটি আবহমান বাংলার প্রাণের উৎসবে পরিনত হয়েছে। আর তাইতো এই দিনটিকে বরণ করতে রাস্তাঘাট বাজার রেস্তোরাঁ সহ বিভিন্ন বিনোদন কেন্দ্রে উৎসবে মেতে উঠে ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সব শ্রেণীর মানুষ।

বাঙালির এই প্রাণের উৎসব পালনের ধারাবাহিকতায় ১৪২৭ সন টি আমাদের কাছে বিশেষ স্মরণীয় হয়ে রইবে। বিশ্বব্যাপী কোভিড ১৯ এর গ্রাস সকল উৎসব সহ মানুষের জীবন কেই করে তুলেছে বিষাদ বিষময়। ১৪২৭ সন কে আমরা প্রাণের উচ্ছ্বাসে বরণ করে নিতে পারিনি বিদায় বেলাতেও আমরা করোনার থাবায় ব্যতিব্যস্ত। ইতিমধ্যেই আমরা বহু স্বজন কে হারিয়ে ফেলেছি এই বাংলা সনেই।  ফলে ১৪২৭ বঙ্গাব্দ বাঙালি মানব মনে বিশেষ ক্রান্তস্মৃতির আবেশে চিরস্মরণীয় বটেই।

এখন চৈত্র সংক্রান্তির শেষ প্রহর গোধুলীর কাছে দাড়িয়ে  মহান সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা, হে প্রভু নববর্ষের আগমনের সাথে সাথে পৃথিবী থেকে সকল জরা-জীর্ণতা, রোগ-শোক, কণ্টকাকীর্ণতা দূর করে দাও। নতুনের কেতন উড়িয়ে বদ্ধ উন্মাদনা থেকে মানব সভ্যতাকে মুক্তি মিলিয়ে দাও। ধ্বংস করে দাও সকল অশুভ শক্তি। চারিদিকে ছড়িয়ে দাও শান্তি সমৃদ্ধির বারতা! 

maju.dream@gmail.com

/এসিএন