|

ঝকঝকে সনদপত্র অর্জন সব সময় প্রকৃত জ্ঞানের প্রমাণ নয়

Published: Tue, 16 Mar 2021 | Updated: Tue, 16 Mar 2021

মো. আশরাফুল আলম : শিক্ষা অর্জন নাগরিকের মৌলিক অধিকার। এটি ব্যক্তির মানবিক বহিঃপ্রকাশ এবং সামাজিক জীবন ও জীবিকায়নের ক্ষেত্রে একটি অন্যতম মাধ্যম। তবে প্রকৃত জ্ঞানকে পিছনে ফেলে সনদপত্র অর্জন ঝুঁকিপূর্ণ।

প্রকৃত জ্ঞান আহরণ না কি সনদপত্র অর্জন? সাধারণ শিক্ষা নাকি কর্মমুখী শিক্ষা? কোনটি বেশি প্রয়োজন এ নিয়ে রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন প্রতিক্রিয়া। এসব প্রতিক্রিয়ায় নিজেকে প্রশ্ন করে কিছুটা উত্তর খোঁজার চেষ্টা করছি মাত্র।

মূলতঃ স্কুল-কলেজে পাঠদানের উদ্দেশ্য শিশু-কিশোর প্রজন্মের মাঝে জ্ঞানের প্রসার ঘটানো। যদিও নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষে প্রতিষ্ঠিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে সফলভাবে কৃতকার্য প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে সনদপত্র দেয়ার বিধান রয়েছে। তবে প্রথমে যখন শিক্ষার্থী তাঁর শিক্ষাপাঠ শুরু করে তখন কিন্তু সনদপত্র অর্জন মূল উদ্দেশ্য থাকে না। মূল উদ্দেশ্য থাকে প্রকৃত জ্ঞানের প্রসার ও ব্যক্তিত্বের বিকাশ বৃদ্ধি। কিন্তু দিন দিন পরিবেশ আর পারিপার্শ্বিকতা এবং জীবিকায়নের তাগিদে সনদপত্র অর্জনই মূল লক্ষ্য হয়ে ওঠে। শিক্ষাদানের উদ্দেশ্যে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে অধিকহারে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠা একটি ভলো দিক। কিন্তু স্কুল-কলেজ তৈরী হওয়ার সাথে সাথে এটি কোনো কোনো ক্ষেত্রে ঝুঁকিও সৃষ্টি করেছে। তা হলো প্রকৃত জ্ঞানকে পিছনে ফেলে সনদপত্র পাওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠা।

লক্ষ করা যায়, শিক্ষপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকের একমাত্র লক্ষ্য হয়ে ওঠে ঝকঝকে ও চকচকে সনদপত্র অর্জন। তবে আমরা অনেকেই জানি এবং মানি যে সনদপত্র অর্জন সবসময় প্রকৃত জ্ঞানের প্রমাণ নয়। দুর্বল এবং ক্ষণস্থায়ী জ্ঞানের জন্য সনদপত্র লাভ করে প্রকৃত জ্ঞানকে সরিয়ে সমাজে আধিপত্য বিস্তার করা যায় কিন্তু প্রকৃত জ্ঞানী হওয়া যায় না। প্রকৃত শিক্ষায় মানুষ হতে হলে সত্যিকারের জ্ঞান অর্জনে মনোনিবেশ করা শিক্ষার্থী, শিক্ষক, শিক্ষা সংশ্লিষ্ট গুরুজন এবং অভিভাবক সকলকেই অগ্রাধিকার বিবেচনায় নেওয়া খুবই জরুরি। 

আমাদের কোমল মতি শিক্ষার্থীরা আজ পাগলা ঘোড়ার মতো ছুটছে একটি সনদ অর্জনের দিকে। কোথাও দেখা যায় অভিভাবকের তাড়নায়, কোথাও সহপাঠীর সাথে প্রতিযোগিতায় কোথাও, শিক্ষকের চ্যালেঞ্জ অর্জনের খেলোয়ার হয়ে তোতা পাখির মতো পড়া মুখস্ত করে জ্ঞানের পরিধিকেই সীমিত করছেন অনবরত যা কোনভাবেই কাঙ্ক্ষিত নয়। পরীক্ষার সময়ে কোনো কারনে প্রশ্ন ফাঁস হলে অথবা কোন গুঞ্জন শোনা গেলে সবার আগে একশ্রেণীর অভিভাবক পাগলের মতো খুঁজে বেড়ায় এমনকি টাকা দিয়ে কেনার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। এটা বুঝতে অসুবিধা হয় না যে শিক্ষার্থীর চেয়ে অভিভাবকেরই জিপিএ-৫ বেশি প্রয়োজন। সেটা ন্যায় ভাবে অথবা অন্যায়ভাবে হোক। কোনো কোনো অভিভাবকের তাড়নায় শিক্ষার্থীরা মানসিকভাবে চাপে থাকেন এটা বলার অপেক্ষা রাখেনা। অনেক পরিবারেই আমরা দেখি যে শিশু ভলো স্কুলে দিয়ে ভালো ফলাফলের আশায় শিশুর পিতা-মাতার স্নেহ-ভালবাসার তোয়াক্কা না করেই দীর্ঘ সময় শিশুকে রাখা হয় পরিবারের বাইরে। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী শিক্ষা থেকে কোন শিশুই বাদ যাবেনা তবে কেন এতো কঠোরতা। এতো কঠোর হবার দরকার আছে কি?  পারিবারিক জাতি, ধর্ম-বর্ণ পেশার পরিচয়, শারীরিক প্রতিবন্ধীত্ব ও সর্বোপরি দারিদ্রের কারণে বহু শিশুকে রাষ্ট্র এখনো শিক্ষার আওতায় নিয়ে আসতে পারেনি সেটি নিশ্চই ত্রুটিপূর্ণ দায়িত্ব। আমি মনে করি এই দায়িত্বটি সঠিকভাবে পালন করতে হলে এমন শিক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করা আরও বেশী জরুরি যেখানে কোনো শিশুই যেকোনো অজুহাতেই বাদ যাবে না। তবেই সকল শিশু আগামী প্রজম্মের জন্য সম্পদ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে। 

তবে শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে যারা সংশ্লিষ্ট তাদের আরও বেশি আন্তরিকতা দরকার এই জন্য যে, একজন শিশুকে যখন একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দেয়া হয় তখন সকল অভিভাবকেই প্রত্যাশা করে যে তার সন্তানটি প্রকৃত জ্ঞান অর্জন করেই আগামী দিনে পিতা-মাতার স্বপ্ন পুরনে সক্ষম হবে। পণ্যের ক্ষেত্রে মানসম্মত কথাটা যতো ভালভাবে প্রযোজ্য, শিক্ষার ক্ষেত্রে ততটা নয়। কারণ শিক্ষা তো সবসময় মানসম্মতই হতে হবে এটিকে লেভেল দিয়ে প্রমাণ করার কি আছে। আর গুনমান বাদ দিলে শিক্ষালাভ কথার মানে কতটুকু থাকে তা প্রশ্নই থেকে যাবে। শিক্ষা জ্ঞান সবসময়ই প্রকৃতই হয়। কিন্তু বর্তমানে প্রকৃত শিক্ষা অর্জনের চেয়ে সনদপত্র অর্জনের জন্য শিক্ষার্থীদের উপর অত্যাধিক মানসিক চাপ সৃষ্টি করা হয়ে থাকে। ছোট বেলা থেকেই তার মুখের উপর বলা হয় তোমাকে ভালো মানুষ হতে হলে ভাল ফলাফল করতে হবে। ভাল ফলাফল করতে হলে দিন-রাত পড়তে হবে। আর দিন-রাত পড়তে হলে কোন বন্ধুর সাথে মেশা যাবেনা, বেশি ঘরের বাইরে যাওয়া যাবে না, টেলিভিশন বেশি দেখা যাবে না ইত্যাদি। তবে এরকম উপদেশ শিক্ষার্থীর জ্ঞান এবং মানসিক শরীর ভেঙ্গে দেয়ার পক্ষে অনেক বেশি কাজ করে থাকে। প্রশ্ন সেই সব অভিভাবকের উপর যারা এমন আচরণের মধ্যে হরহামেশাই ডুবে যান। বর্তমান সময়ে জ্ঞনার্জনের জন্য অনেক রকম ইলেক্ট্রনিকস ডিজিটাল ডিভাইসের ব্যবহার বেড়েছে। সেসব বিষয়ে সুনিদ্দিষ্টভাবে দেখেশুনে-বুঝে যোগান দিতে হবে শিক্ষার্থীকে কারণ বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে গেলেও এসবের ব্যবহার জানা আবশ্যক। তোতা পাখির মতো মুখস্থ করে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রি নিয়ে এসে বেসরকারি অথবা সরকারি চাকুরির জন্য পরীক্ষা দিতে আসা অনেককেই দেখা যায় ছোট ছোট কিছু বিষয় সম্পর্কে উত্তর করতে পারেন না কারণ কিছু ছোট ছোট বিষয়ও রয়েছে যা জানতে হলে মুখস্ত বিদ্যায় সম্ভব নয়। 

সাধারণ শিক্ষা অর্জন সকল শিক্ষার্থীর জন্যই অপরিহায্য। এই শিক্ষা শিক্ষার্থীদের সামাজিক এবং ব্যক্তি জীবনকে সুন্দর এবং গুণগত মানুষ হিসেবে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করে। কিন্তু কর্মময় জীবন প্রতিষ্ঠা করতে হলে অবশ্যই কর্মমুখী শিক্ষার বিকল্প নেই। আমাদের দেশের রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় সকল নাগরিকের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক চাকরি নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। কারণ ১৭ কোটি মানুষের দেশে আয় রোজগারের জন্য বিভিন্ন উপায়ে মানুষকে আয় করতে হবে এটাই সত্যি। তবে সঠিক সাবলিলভাবে কর্ম সম্পাদনের জন্য কর্মমুখী শিক্ষা নিশ্চিত করতে পারলে রাষ্ট্রের উপর চাপ কমবে। নাগরিকগণ স্ব স্ব আত্মনির্ভরশীলতায় প্রতিষ্ঠিত হবে। সরকারি বেসরকারি ভাবে কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার প্রতি আরও বেশি জোর দেয়া অত্যন্ত জরুরি। এক্ষেত্রে চীনের একটি গল্পের কথা আমরা শুনেছি। কতটুকু সত্য তা না জানলেও গল্পটি যে যথেষ্ট কার্যকর তা আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি। গল্পটি হলো এরকম যে, চীন কোনো একসময়  তাদের দেশে সরকারি নির্দেশে সকল ধরনের সাধারণ শিক্ষাকে ১০ বছরের জন্য নিষিদ্ধ করে সকল শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের কো-কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত করার উদ্যোগ গ্রহণ করে। সেই সময় যথেষ্টসংখ্যক দক্ষ জনগোষ্ঠি তৈরী হয়। তারপর থেকেই তাদেরকে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। বিশ্বের অনেক দেশেই কারিগরি সেবা পৌঁছে দিয়ে তারা বিশ্বের মধ্যে অন্যতম উন্নত দেশে পরিণত। সুতরাং দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো কর্মমুখী শিক্ষা। কর্মমুখী শিক্ষায় শিক্ষিত হলে নাগরিক নিজের পরিবার, সমাজ ও দেশের জন্য নগদে কিছু অবদান রেখে যেতে পারে। 

গেল বছরে করোনার নেতিবাচক প্রভাবে পরীক্ষা ছাড়াই লাখ লাখ শিক্ষার্থী সনদপত্র লাভ করলেন। কিন্তু তাদের অভিভাবকগণ আজ অনেকেই উদ্বিগ্ন যে আগামী দিনে তার সন্তানটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষার প্রতিযোগিতায় কতটুকু অর্জন করতে পারবে। তবে যারা প্রকৃত জ্ঞান অর্জন করতে ইতিমধ্যেই সামর্থ হয়েছেন তাদের নিয়ে কোন দুর্বল ভাবনার অবকাশ নেই। নিশ্চয়ই তার ভালো করবে। চাকুরীর ক্ষেত্রেও দেখা যায়, যে শিক্ষার্থীটি জ্ঞান অর্জনের গুরুত্ব বিবেচনায় পড়া লেখা করে সে একাধিক চাকুরীর চুড়ান্ত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়। তাই আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মেধা বিকাশের যে বিষয়টি অবশ্যই শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের এবং অভিভাবকদের সুচিন্তায় রাখতে হবে। যাতে করে তার সন্তানটির উপর মানসিক কোন চাপের বিস্তার না হয়। আর কঠোরতা এড়িয়ে আনন্দঘন পরিবেশে শিক্ষা লাভের পথ সুগম করা অত্যন্ত জরুরি। মানসিক প্রশান্তির আড়ালে যে শিক্ষা লাভ করা যায় সেই শিক্ষা নিশ্চয়ই শিক্ষার্থীর মনন বিকাশে সহায়তা করবে। তাই ঝকঝকে সনদপত্র অর্জনের গুরুত্বেও চেয়ে প্রকৃত জ্ঞান অর্জনের দিকে মনোনিবেশ জরুরি। প্রকৃত জ্ঞান মানুষকে দীর্ঘ সময় ধরে মানসিক প্রশান্তির খোরাক দিয়ে জীবনকে করে তোলে সার্থক ও মহামূল্যবান।

লেখক : উন্নয়ন কর্মী। 

ও/এসএ/