|

আমাদের শিক্ষক সমাজ ও বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা

Published: Tue, 19 Jan 2021 | Updated: Tue, 19 Jan 2021

মেহেরাবুল ইসলাম সৌদিপ : বছর জুড়ে নানা দিবসের মতো ঘুরে ফিরে আসে ‘জাতীয় শিক্ষক দিবস’। আর বর্তমানে এ “দিবস” সংস্কৃতিতে অভ্যস্থ হওয়া যেনো জাতির বিশ্বসভ্যতার গ্লোবালাইজেশন। বিশ্বায়নের এ যুগে ২০০৩ সালে ১৯ জানুয়ারি বাংলাদেশের শিক্ষক সমাজকে যথাযোগ্য মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করার অঙ্গীকার নিয়ে তৎকালীন সরকার ‘জাতীয় শিক্ষক দিবস’ চালু করে। 

এরপর থেকে প্রতিবছর বাংলাদেশের শিক্ষক ও ছাত্র সমাজ ১৯ জানুয়ারি ‘জাতীয় শিক্ষক দিবস’ হিসেবে পালন করে আসছে। বাংলাদেশে গত ১২ আশ্বিনে প্রকাশিত পরিপত্র অনুসারে জাতীয় পর্যায়ে ১৮ টি দিবসসহ ৩ ধরনের মোট ৮৫ টি দিবসের উল্লেখ রয়েছে। 

তবে ‘জাতীয় শিক্ষক দিবস’ এর তারিখটি এ পরিপত্রে নির্দিষ্ট হয়নি। অথচ সামাজিক সচেতনতার জন্য এমন অনেক দিবসই আমরা পালন করে থাকি কিন্তু শিক্ষকদের সম্মান প্রদর্শন সরূপ শিক্ষক দিবস পালনেই আমাদের অনীহা!

শিক্ষকরা হচ্ছেন মানুষ গড়ার কারিগর। শিক্ষক ছাড়া যোগ্য সমাজ ও উজ্জ্বল জীবন কল্পনাতীত। শিক্ষক-শিক্ষিকা শিক্ষার্থীদের কাছে বাবা-মায়ের মতো। বাবা-মা যেমন তাদের ভালোবাসা-স্নেহ-মমতা দিয়ে সন্তানদের বড় করেন, ঠিক তেমনি শিক্ষকেরা শিক্ষার আলো দিয়ে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করে যান। এর সাথে থাকে স্নেহ, মমতা, ভালোবাসা। 

তাঁদের শিক্ষার আলো যেমনি শিক্ষার্থীদের সামনের পথ চলাকে সুদৃঢ় করে, তেমনি তাদের স্নেহ, মমতা, ভালোবাসা শিক্ষার্থীদের অনুপ্রাণিত করে। অনেক ক্ষেত্রে পিতামাতা কেবল সন্তান জন্ম দিয়েই ক্ষান্ত হন। কিন্তু শিক্ষকেরা শত কষ্টে আমাদের মানুষ করে গড়ে তুলেন। তাই, তাদের প্রতি আমাদের দেনার কোনো শেষ নেই। বর্তমানে শিক্ষকদের জীবনে আর্থিক নিরাপত্তাহীনতা। 

আজকাল সামর্থ্যবানদের ডাকে সবাই সাড়া দেয়। শিক্ষকেরা সামর্থ্যহীন শ্রেণির মানুষ। বিশেষ করে বেসরকারি শিক্ষকগণ এক রকম 'নুন আনতে পান্তা ফুরায়' অবস্থায় দিনযাপন  করেন। আজকাল যার আর্থিক স্বচ্ছলতা যত বেশি, তাঁর মর্যাদা তত বেশি। অশিক্ষিত ও নিরক্ষর সামর্থ্যবানদের ঠেলায় সমাজে আজ সামর্থ্যহীন শিক্ষকেরা এক রকম কোনঠাসা হয়ে আছেন। 

আর্থিক স্বচ্ছলতা না থাকায় আজ আমাদের দেশে শিক্ষকের সামাজিক মর্যাদা একদম নিম্ন পর্যায়ে চলে গেছে। শিক্ষকতার মত সৃজনশীল পেশা খুব কমই আছে পৃথিবীতে। শিক্ষকদের পেশাজীবন কেবল একটি চাকরির ক্ষেত্রে সীমিত হলেও, একজন মানুষের জীবনে আদর্শবান শিক্ষকদের গুরুত্ব অপরিসীম। এই পেশায় নিয়োজিত হওয়ার পুর্বে মানুষ সাধারনত দুটি দিক থেকে অনুপ্রাণিত হয়। 

একটি চাকরি অথবা অর্থনৈতিক প্রবণতা, অন্যটি আদর্শিক বা ভাবপ্রবণতার দিক। প্রথমটির মাধ্যমে তিনি চান অর্থ সম্পদ যার দ্বারা সাংসারিক জীবনে একদিকে যেমন সুখ ও সমৃদ্ধি লাভ করা যায় অন্যদিকে তেমনি তার সৎ ব্যবহারের দ্বারা জীবনে সম্মান ও গৌরবের সর্বোচ্চ স্থানে নিজেকে প্রতিষ্ঠা অর্জন করা যায়। দ্বিতীয়টি দ্বারা তিনি চান সেবা ও আত্মনিয়োগ। 

যারা দ্বিতীয়টি দ্বারা অনুপ্রাণিত হন তারা পার্থিব সুখ-সমৃদ্ধির দিকে আর্থিক মনোযোগী নন। ফলে উৎসর্গীকৃত জীবন যাপনে তারা আত্মপ্রসাদ লাভ করেন। প্রকৃত আদর্শ শিক্ষক হতে হলে চাই আত্মউৎসর্গ করার প্রেরণা।

করোনা মহামারির কারণে লন্ডভন্ড বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা। চরম চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন শিক্ষকরাও। লাখ লাখ শিক্ষার্থী আজ শিক্ষাঙ্গনের বাইরে। তাদের একটি বড় অংশ পরিবারসহ রয়েছে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। 

এ সংকটের ও নানান প্রতিকূলতার মাঝেও আমাদের শিক্ষক সমাজ আগামী প্রজন্মকে একবিংশ শতকের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় দক্ষ হাতে ডিজিটাল কন্টেন্ট বেইসড, জুম এ্যাপস্, গুগুলমিট, ফেসবুক লাইভ, মেসেঞ্জার, ইউটিউব চ্যানেল সহ বিভিন্ন মাধ্যমে শ্রেণি কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। 

ছাত্রছাত্রীদের মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে উদ্দীপনা ও সচেতনতা সৃষ্টি করেছেন তা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। তাঁরা ব্যক্তিগত প্রয়াস, সংশ্লিষ্টজনের সহযোগিতা আর প্রযুক্তির প্রয়োগ ও সুযোগের সমন্বয়ে শিক্ষার অবিরত ধারা অব্যাহত রেখেছেন। 

ঠিক তেমনিভাবে অনাগত দিনে অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের মাঝে আস্থার পরিবেশ তৈরি করে, শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষে ফিরিয়ে আনতে দিতে হবে সামাজিক নেতৃত্ব ও রাখতে হবে বলিষ্ঠ ভূমিকা। বুঝিয়ে দিতে হবে জাতিগঠনে তাঁদের অনিস্বীকার্য গুরুত্ব ও অবদান।

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার সবচেয়ে নিকৃষ্ট দিক হচ্ছে শিক্ষাকে বাণিজ্যিকভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। দেশে প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত শিক্ষকের সংখ্যা প্রায় ১০ লক্ষ। বিশাল এই জনগোষ্ঠী দেশের সম্পদ। তবে বর্তমানে বেসরকারি স্কুল-কলেজের ভীড়ে সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে মানসম্পন্ন শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হয় না। 

সাম্প্রতিক আমাদের দেশে বিভিন্ন অনৈতিক, অনিয়ম, দুর্নীতি, প্রশ্নফাঁস, ঘুষ, জালিয়াতি এমনকি ধর্ষনের মতো স্পর্শকাতর কর্মকান্ডেও শিক্ষকদের সম্পৃক্ততা বরাবরই লক্ষ্যনীয়। 

এছাড়া মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষাপর্যায়ে বেসরকারি ক্ষেত্রে পূর্বে যে শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হয়েছে তা স্বজনপ্রীতি, রাজনৈতিক এবং উৎকোচ গ্রহণের মাধ্যমে হয়েছে বলে শিক্ষা প্রদানের ক্ষেত্রে এদের মধ্যে বিভক্তি রয়েছে।

শিক্ষকতা পেশায় বাণিজ্যের ছাপ শিক্ষাব্যবস্থাকে করুণ করে তুলেছে। একটা সময় ছিলো যখন শিক্ষকদের কাছে পড়তে টাকা লাগতো না। তাঁরা নিজ গুণে পড়াতেন। আস্তে আস্তে সেই সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এরপর সেখান থেকে শিক্ষাকে ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে ব্যবহারের জন্য বেসরকারি স্কুল কলেজ আর কোচিং সেন্টার খুলা হয়েছে। 

একজন শিক্ষক সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যত না টাকা পায় তার থেকে বহু গুণে বেশি টাকা মেলে বাহিরে কোচিং সেন্টার এ ক্লাস নিলে, এমনকি অনেক শিক্ষক আজ কাল নিজস্ব কোচিং সেন্টার খুলে বসে আছেন। এসব ব্যাক্তি মালিকানাধীন বা নিজস্ব কোচিং সেন্টারগুলোতে ভালো সেবা দেয়ার নামে দিনের পর দিন চলছে ব্যবসা। প্রাইভেট আর টিউশনই বা কোনো দিক থেকে থেকে কম নয়। 

ঐ শিক্ষকের কাছে টিউশন না করলে পরীক্ষায় নাম্বার কম দেবে এমনটাও শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মনে বাসা বেধে রয়েছে। ফলে বাধ্য হয়েই অভিভাবকগণ তার ছেলে-মেয়েদের কোচিং টিউশন এ পাঠায়। 

এতে করে দরিদ্র অসহায় শিক্ষার্থীরা শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হন। কোচিংবাজ শিক্ষকরা এতটাই ভয়াবহ যে তারা দরিদ্র শিক্ষার্থীদের বিবেচনায় নেন না। শিক্ষকরা শিক্ষাকে বাণিজ্যিকভাবে নিয়ে কখনো গুরু হতে পারবে না। তাদের কেউ সম্মান করবে না।

শিক্ষকদের এই বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যের একাধিক কারণ রয়েছে। প্রথমত বেতন-ভাতা ও সুযোগ সুবিধা কম, দ্বিতীয়ত সরকারের তৃণমূলের শিক্ষকদের প্রতি অনিহা, দক্ষ ও যোগ্যতা সম্পন্ন শিক্ষক নিয়োগে ব্যর্থতা ও শিক্ষাক্ষেত্রে অসদুপায় অবলম্বন করা। এসব কারণের দরুন আজ বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার এই হাল। 

এর থেকে পরিত্রাণ পেতে শিক্ষকদের শিক্ষাক্ষেত্রে নীতিমালা প্রণয়ন করে দেয়া জরুরি। শিক্ষকেরা হচ্ছেন যে কোনো শিক্ষাব্যবস্থার প্রাণকেন্দ্র এবং শিক্ষার মান, শিক্ষকের মান ও প্রচেষ্টার উপর নির্ভরশীল। শিক্ষকদের যথাযথ মর্যাদা ও সম্মান যদি দিতে না পারি তাহলে তাদের কাছ থেকে বেশি কিছু প্রত্যাশা করা যুক্তি সংগত নয়। 

সম্মানিত শিক্ষকদের মনে রাখা দরকার শিক্ষকতার পেশা শুধু চাকরি নয়, শিক্ষকতা মহান ব্রত। শিক্ষকের আচার- আচরণ, ব্যাক্তিত্ব , আর্দশ, দৃষ্টিভঙ্গি অবশ্যই সকলের নিকট অনুকরণীয়-অনুসরণীয় ও শিক্ষকসুলভ হতে হবে। তাই শিক্ষার সকল স্তরে উচ্চতর যোগ্যতা সম্পন্ন ব্যাক্তিকে বাছাই করে নিতে না পারলে, তাদের মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত না করলে কোনো কিছুই সফল হবে না।

আমরা খুবই আশাবাদী মুক্তিযুদ্ধের চেতনার শিক্ষাবান্ধব সরকার বর্তমানে ক্ষমতাসীন এবং আগামীতে সে ধারা অব্যাহত থাকবে। জাতির পিতার সুযোগ্যকন্যা বাঙালি জাতির হাল ধরবেন অচিরেই এবং সকল সমস্যার সমাধান হবে। শিক্ষকদের অধিকার-মর্যাদা মুজিববর্ষে নিরসন হবে ইনশাল্লাহ্। তবেই লাল-সবুজের পতাকা খচিত মুক্তিযুদ্ধে অর্জিত বাংলাদেশ কাঙ্খিত লক্ষ্যে উপনীত হবে। 

আজ এই দিবসে শিশু কিশোর দের স্বপ্নবোনার কারিগরদের সকল কে জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা। আসুন আপনাদের হৃদয়ের মনিকোঠায় ঠাঁই করে নেওয়া শিক্ষকদের এই বিশেষ দিনে একটি সুন্দর শুভেচ্ছা কার্ড পাঠাই, দেখা করে আর্শীবাদ নিয়ে এক গুচ্ছ ফুল দিয়ে আসি কৃতজ্ঞচিত্তে। ভালোবাসা অম্লান থাকুক প্রিয় শিক্ষকের আশ্রয় স্থল।

লেখক : শিক্ষার্থী ও ক্যাম্পাস সাংবাদিক, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা। উপ দপ্তর সম্পাদক, বাংলাদেশ তরুণ কলাম লেখক ফোরাম, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা।

আইআর /