|

স্থানীয় পর্যায়ে টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট অর্জনে, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি 

Published: Thu, 14 Jan 2021 | Updated: Thu, 14 Jan 2021

মো. আশরাফুল আলম, গাইবান্ধা (বিশেষ সংবাদদাতা) : জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন ‘আমার জীবনের একমাত্র কামনা, বাংলাদেশের মানুষ যেন তাদের খাদ্য পায়, আশ্রয় পায় এবং উন্নত জীবনের অধিকারী হয়’। বঙ্গবন্ধুর চিন্তা এবং চেতনার প্রতিফলন দেখা যায়  ১৯৭২এর সংবিধানে। ১৯৭২ সালের সংবিধানের ১৫ (ঘ) অনুচ্ছেদে সামাজিক নিরাপত্তার অধিকারের কথা বলা হয়েছে। 

অর্থাৎ এই অনুচ্ছেদে বেকারত্ব, দুরারোগ্য ব্যাধি, পঙ্গুত্বজনিত (প্রতিবন্ধী) কিংবা বৈধব্য, মাতাপিতাহীনতা এতিম বা বার্ধক্যজনিত কারনে অথবা অনুরুপ বিভিন্ন পরিস্থিতিতে অভাবগ্রস্থতার ক্ষেত্রে সরকারি সাহায্য লাভের অধিকার নিশ্চিত করতে সামাজিক নিরাপত্তামুলক বিষয়াদিকে রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। সংবিধানের শর্ত পূরনে সরকার সমাজকল্যাণ মন্ত্রনালয়ের আওতায় সমাজসেবা অধিদপ্তরের মাধ্যমে অসহায় দুঃস্থ দরিদ্র জনগোষ্ঠির জন্য সেবা নিশ্চিত করতে কাজ করে।

অন্যান্য জেলার তুলনায় গাইবান্ধা জেলায় দুঃস্থ দরিদ্র অসহায় জনগোষ্ঠীর সংখ্যা তুলনামূলক বেশি। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির উপকারভোগীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বেশি। কারণ হিসেবে এ জেলার বন্যা নদী ভাঙ্গন আর বিস্তৃত চর এলাকার কথাই জানা যায়। নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় ভাতাভোগীর সংখ্যাও অনেক। তারপরও চাহিদার তুলনায় কম। 

স্বাধীনতার ৫০ বছরে পা রাখায় সিনিয়র নাগরিকের বয়স বৃদ্ধি, সামাজিক দৈন্যতা, নারীর প্রতি সহিংসতা, প্রয়োজনীয় দক্ষ জনগোষ্ঠী গড়ে না ওঠাসহ বিভিন্ন  কারনে বিধবা আর বয়স্ক মানুষের সংখ্যা দিন দিন বেড়ে যাওয়ায় ভাতা গ্রহণকারীর সংখ্যাও পরিবর্তিত হচ্ছে। দারিদ্রের অবিচার থেকে মুক্ত ভবিষ্যৎ এবং নিরাপদ জীবন গড়তে সরকারের নানা পদক্ষেপের মধ্যে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি অন্যতম ভুমিকায় অবর্তীর্ণ। 

স্বাধীনতার পর থেকেই বাংলাদেশ ন্যায়সঙ্গত সমাজ গড়ে তুলতে নানা পদক্ষেপে গ্রহণ করলেও রাজনৈতিক জটিলতায় তা বার বার বাধাগ্রস্থ হয়েছে। বর্তমান সরকার সেই বাধা অতিক্রম করে আমুল পরিবর্তনের পথেই হাটছে। সু-নিদ্দিষ্ট পরিকল্পনা অনুযায়ী রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় অন্তর্ভুক্ত করে নাগরিকের সক্ষমতা বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন ধরনের সামগ্রিক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে দারিদ্রতা নির্মূলের চেষ্টা করা হচ্ছে।

আমরা দেশের নাগরিক হিসেবে সবাইকে সাথে নিয়ে একসাথে এগিয়ে যাবার আমরা স্বপ্ন দেখি। কাউকে পিছনে ফেলে নয়। এই বক্তব্য নিরিখেই গ্রামীণ দরিদ্র অসহায় দুঃস্থ নারী পুরুষের শারীরিক, মানসিক, অর্থনৈতিক,সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত  করে আমাদেরকে এগিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার বাস্তবায়নে আন্তরিক হওয়া আবশ্যক। 

সরকারের নানামূখী ভালো কাজের মধ্যে সামান্য কিছু অসৎ মানুষের লোভ লালসার শিকার হয়ে অসহায় দরিদ্র দুঃস্থ মানুষ দিনের পর দিন বঞ্চিত হচ্ছে। উন্নয়নের ব্যাপক ইতিবাচক অগ্রগতি হলেও  এখনও একটু ভালো খাবারের সন্ধানে অতি দরিদ্র মানুষ ধনীদের নিকট হাত পাতে। এখনও অনেক সংখ্যক মানুষ যেকোন ধরনের নিরাপত্তা ভাতা প্রাপ্তীর বাহিরে রয়েছে। 

তবে সম্প্রতি সমাজসেবা অধিদপ্তর সুত্রে জানা গেছে এই অনগ্রসর পিছিয়ে থাকা মানুষ গুলিকে চিহ্নিত করে সরকারি বিশেষ সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে এই নিরাপত্তা কর্মসূচিকে ১০০ ভাগে উত্তীর্ণ করার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে এবং ইতিমধ্যে কিছু কাজও শুরু হয়েছে।

এসডিজি’র অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জনের জন্য দারিদ্রতাকে নির্মুল করতে হলে সঠিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সকলকে মনোনিবেশ করতে হবে এবং সেই বাস্তবায়নের সঠিক অগ্রগতির নিয়মিত মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করা জরুরী। যদি সেটা করা সম্ভব না হয় তবে  এসডিজি’র অভীষ্ট অর্জনে চ্যালেঞ্জিং পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হতে পারে। সেক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। 

আর তাই সকল ধরনের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুনিশ্চিত বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সকল স্তরে প্রয়োজন জনসম্পৃক্ততা বৃদ্ধি। আশার কথা হলো, সমাজকল্যাণ মন্ত্রনালয়ের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প বাস্তবায়ন ছাড়াও আরও প্রায় ২৫ মন্ত্রনালয় সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির কার্যক্রম বাস্তবায়নে কাজ করে চলেছে। 

এই অবস্থা থেকে অনুমেয় যে দেশের দারিদ্রতা নিরসনে এবং এসডিজি অর্জনের ক্ষেত্রে এই অভীষ্টকে অর্জনের জন্য সম্মিলিত উদ্যোগের কোন কমতি নেই। যার ফলে কোন কোন ভাতা প্রদানের ক্ষেত্রে উপকারভোগীর সংখ্যা ২ থেকে ৪ গুণ এবং বরাদ্দের পরিমান ১০ গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়েছে।

২০৩০ সালের মধ্যে এসডিজি’র অভীষ্ট অর্জনে সামগ্রিক চিন্তা চেতনায় রাষ্ট্রের ঝুঁকিপূর্ণ, অনগ্রসর, অবহেলিত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সামাজিক সুরক্ষা, জীবনমান উন্নয়নের বিষয়টি সর্বদাই সরকারিভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

তাই বর্তমানে সরকারের গৃহিত সমাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি হিসেবে দরিদ্র মা ও শিশু স্বাস্থ্যের উন্নয়নে মাতৃত্বকালীন ভাতা, বয়স্ক নারী পুরুষের সুরক্ষায় বয়স্ক ভাতা, অস্বচ্ছল প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য ভাতা, দরিদ্র ও অসহায় নিয়মিত শিক্ষার্থীর জন্য শিক্ষা উপবৃত্তি, বিধবা ও স্বামী পরিত্যাক্ত দুঃস্থ মহিলাদের জন্য ভাতা, হিজরা ও অনগ্রসর জনগোষ্ঠিদের জন্য বয়স্ক ও শিক্ষা উপবৃত্তিমূলক ভাতা, শিশুর নিরাপত্তার জন্য শিক্ষা উপবৃত্তি, দরিদ্র নারীর উন্নয়নে ভিজিডি, অতি দরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান ও টিআরসহ বিভিন্ন কর্মসূচি। 

জেলা সমাজ সেবা অধিদপ্তর সুত্রে জানাযায়,২০২০-২১ অর্থ বছরে জেলার সকল উপজেলায় ৮৪ হাজার ৬শ ৫১ জন বয়স্ক নারী পুরুষ নিয়মিত ভাতা গ্রহণ করছে। বিধবা ও স্বামী নিগৃহীতা দুঃস্থ নারী ভাতা গ্রহণ করছেন গোটা জেলায় নিয়মিত এবং অতিরিক্তসহ মোট ৬৭ হাজার ৯শ ২০ জন। একই অর্থ বছরে অসচ্ছল প্রতিবন্ধী ভাতার আওতায় ভাতা গ্রহণ করছেন ৩১ হাজার ৯শ ৭৭ জন। 

এছাড়াও অধিদপ্তরের মাধ্যমে হিজরা জনগোষ্ঠিদের মধ্যে শিক্ষা উপবৃত্তি পাচ্ছেন ৮৬ জন এবং বয়স্ক ভাতা পাচ্ছে ৩৩ জন হিজরা। প্রতিবন্ধী শিশুদের শিক্ষাবৃত্তি প্রদান করা হচ্ছে ১ হাজার ৯শ ৩৭ জন শিশুকে। অন্যদিকে অনগ্রসর গোষ্ঠি (দলিত,বেঁদে ও অন্যান্য জনগোষ্ঠি ) হিসেবে ভাতা গ্রহণ করেন  ৫২২ জন উপকারভোগী। 

এই সকল ভাতার পাশাপাশি বীর মুক্তিযোদ্ধাদের আত্ব ত্যাগের স্বীকৃতি ও সম্মান স্বরুপ সরকারি ভাবে জেলায় ২ হাজার ১শ ২৯ জন বীর মুক্তিযোদ্ধাকে নিয়মিত মাসিক ভাতা প্রদান করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রনালয়।   

জেলা মহিলা বিষয়ক কার্যালয় সুত্রে জানা যায়, গত জানুয়ারি ২০১৯ থেকে ডিসেম্বর ২০২০ পর্যন্ত জেলার ৭টি উপজেলার ৮২টি ইউনিয়নের ১৭ হাজার ৭৮৬ জন হত দরিদ্র অসহায় নারী উপকারভোগীকে নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় ৩০ কেজি হারে প্যাকেট চাল প্রদান করা হয়। 

চাল প্রদানের পাশাপাশি প্রকল্প বাস্তবায়নে দায়িত্ব প্রাপ্ত এনজিওর মাধ্যমে সহায়তা গ্রহণকারী নারীদের বিনামুল্যে সচেতনতা ও আয়বর্দ্ধকমূলক প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়। আর ১৪ হাজার ১শ ৮ জন হত দরিদ্র অসহায় গর্ভবতী মাতাকে মাতৃত্বকালীন ভাতা প্রদান করা হয়। গর্ভবতী মা হিসেবে ৭ উপজেলার ৮২টি ইউনিয়নে প্রতিজন প্রতিমাসে ৮০০/- টাকা হারে একটানা ৩৬ মাস মেয়াদে স্ব স্ব ব্যাংক হিসাব নম্বরের মাধ্যমে এই ভাতা গ্রহণ করেন। 

একই হারে জেলার ৪টি পৌরসভা (গাইবান্ধা সদর, গোবিন্দগঞ্জ, সুন্দরগঞ্জ এবং পলাশবাড়ী) এলাকায়  ২০২০-২১ অর্থ বছরে কর্মজীবি ল্যাকটেটিং মাদার সহায়তা তহবিল হতে জেলা মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের মাধ্যমে ২ হাজার ৫শ ৫০ জন ভাতা পেয়ে থাকেন। এছাড়াও সাঘাটা উপজেলায় শিশুদের সহায়তা তহবিলের মাধ্যমে ২২৫ জন শিশুকে নিরাপত্তা ভাতা প্রদান করা হয়। 

এবার দেখা দেখি জেলার স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের আওতায় সামাজিক নিরাপত্তামূলক কর্মসূচি কি আছে। এই বিভাগের আওতায় হত দরিদ্র নারীদের কর্মসংস্থানের মাধ্যমে সহায়তা প্রদান করা হয়। ভিন্ন ভিন্ন নামে এই প্রকল্প  গুলোতে শ্রমজীবি দরিদ্র অসহায় নারীদেরকে নিয়োগ প্রদান করে ভাতা প্রদান করা হয়। 

উক্ত বিভাগের দেয়া তথ্য মতে ২০২০-২১ অর্থ বছরে গত ৩১ ডিসেম্বর ২০২০ পর্যন্ত পুরো জেলায় কাজ করেন এলসিএস জিওবি প্রকল্পে ১৭৭ জন নারী, প্রভাতী প্রকল্পের আওতায় ৫৫ জন নারী পুরুষ, নবীদেব প্রকল্পের আওতায় ৩২ জন এবং আরইআরএমপি এর আওতায় কাজ করে ৬৬০জন নারী শ্রমিক। 

একটি দৈনিক পত্রিকার তথ্য মতে সরকারিভাবে সকল ধরনের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় ভাতাভোগীর সংখ্যা সারাদেশে প্রায় ১ কোটি ২০ লক্ষ দুঃস্থ মানুষ। আর গাইবান্ধায় ভাতাভোগীর সংখ্যা প্রায় ২ লক্ষ ২৭ হাজার। এখাতে সারাদেশের জন্য ২০২০-২১ অর্থবছরে বরাদ্দ ৯৫ হাজার ৫ শত ৭৪ কোটি টাকা। 

এই সকল ভাতার পাশাপাশি সরকার উল্লেখযোগ্য হারে অন্যান্য বিষয়ের ক্ষেত্রেও নজর দিয়ে তা বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। যেমন- প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্রের মাধ্যমে সেবা প্রদান, ক্যান্সার, কিডনি, লিভারসিরোসিস, জম্মগত হৃদরোগ, স্ট্রোক ও থ্যালাসেমিয়াসহ বিভিন্ন দুরারোগ্য আক্রান্তদের আর্থিক সহায়তা প্রদানের মাধ্যমে সামাজিক নিরাপত্তা সেবা প্রদান। 

সরকারি এবং বেসরকারিভাবে নানামুখী কর্মসূচির মাধ্যমে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর সঠিক পথ ধরে রাখা জরুরী। সেজন্য সেবা গ্রহীতা এবং কর্তব্য পালনকারি নাগরিক সমাজ উভয়কে সেবকের ভূমিকা নিয়ে দায়িত্ব পালন আবশ্যক। 

সকল ধরনের অনিয়ম ও লোভ লালসার উর্ধে থেকে দারিদ্রতার মুল শিকড় উৎপাটনে ভুমিকা পালন করতে হবে। তবেই আশার প্রদীপ জ্বালানো এবং এসডিজি’র নিদ্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জন সম্ভব বলে ধরে নেওয়া যায় । একই সাথে দেশ পৌছেতে পারে কল্যাণকর রাষ্ট্রের তালিকায়।

আইআর /