|

সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়া এবং জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা

Published: Mon, 04 Jan 2021 | Updated: Mon, 04 Jan 2021

মো.আশরাফুল আলম, গাইবান্ধা : মানুষ সামাজিক জীব। পৃথিবীর আদিকাল থেকেই যখন সমাজের সৃষ্টি তখন থেকেই মানবজাতি বিভিন্ন উপায়ে সমাজিকীকরণ প্রক্রিয়ার মধ্যদিয়ে বেড়ে উঠেছে এবং জীবন জীবিকা পরিচালনা করছে। আরও বলা যায় জন্মের পর থেকে সমাজের যে প্রক্রিয়া এবং রীতিনীতি প্রথার মধ্য দিয়ে মানুষ বেড়ে ওঠে এবং জীবন যাপন করে তাকে সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়া বলে। এটি চলমান প্রক্রিয়া।

তবে কথা হলো সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টির প্রকৃতিগত বিষয়গুলোরে অজুহাতে আমরা একে অপরের বসবাসের অথবা চলাফেরা এবং জীবন যাপনের কিছু ক্ষেত্রে পার্থক্য তৈরির মাধ্যমে সামাজিক ভাবে বৈশিষ্ট্যগত বিভেদ সৃষ্টি করেছি।

যেমন সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে আমরাই আমাদের সন্তানদের জম্মের পর থেকেই শিশুর আচরনের বাইরে গিয়ে ছেলে এবং মেয়ে সন্তানকে কাজ, শিক্ষা, বিনোদনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে আলাদা করে অধিকার বঞ্চিত করেই যাচ্ছি। একটি শিশু শুধুমাত্র বিধাতার দেয়া প্রকৃতিগত পরিবর্তন নিয়ে পৃথিবীতে আগমন করে। আগমনের পর প্রকৃতিগত পার্থক্য ছাড়া কর্মপদ্ধতি, চলাফেরা, খেলাধুলা, পেশাক পরিচ্ছদ, কর্মপন্থা ইত্যাদির ক্ষেত্রে আমাদের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে আমরা অভ্যস্ত। যেমন একটি শিশুর জম্মের পর পরই অনেক পরিবারের  সদস্যরা ছেলে সন্তানকে মনে করে সম্পদ আর মেয়ে সন্তানদের মনে করে বোঝা। মনে করে ছেলে সন্তান বংশের প্রদীপ জ্বালাতে পারবে। বেশির ভাগ পিতা মাতাই প্রথম সন্তানটিকে ছেলে সন্তান হওয়ার প্রত্যাশা করে।  

জম্মের পর যখন শিশু বড় হতে থাকে সামাজিক বিভিন্ন প্র্যাকটিস তাকে সমাজের বিভিন্ন নিয়মনীতি খাপ খাওয়াতে সহায়তা করে। সমাজে বিভিন্ন খেলাধুলার ক্ষেত্রে মেয়েদেরকে শারীরিকভাবে দুর্বল মনে করে সেই ধরনের খোলা ধুলা করতে উৎসাহিত করা হয়।  পাশাপাশি ছেলে সন্তানকে শারীরিকভাবে মজবুত ও সামর্থ্যবান মনে করে অধিক সাহসী ভেবে সেই ধরনের খেলায় তাদেরকে উৎসাহিত করা হয়। ফলে মেয়ে সন্তানরা সমস্যা মোকাবেলায় তাদের অভিজ্ঞতা এবং দক্ষতার প্রকাশ ঘটাতে বাধাপ্রাপ্ত হয়। অন্যদিকে সুযোগ সুবিধা বেশি থাকার কারনে ছেলে সন্তানদের আতœবিশ্বাস বেড়ে যায় এবং সামাজিক কার্যক্রমে তাদের সুযোগ বেশি প্রতিষ্ঠিত হয়। 

কর্মক্ষেত্রে কাজের ভিন্নতাও নারী ও পুরুষদের মধ্যে সামাজিক বৈষম্যও কম নয়। এক্ষেত্রে দেখা যায় পুরুষের জন্য বাইরের কাজ এবং নারীর জন্য ঘরের কাজকেই নিদ্দিষ্ট করে দেয়া হয় এবং উৎসাহিত করা হয় সেভাবেই। পুরুষ ভাবনার জায়গা থেকে মনে করা হয় নারীরা আয়-রোজগার কম পারে, পরনির্ভরশীল হয়, মতামত পালনকারী এবং বিচরণ গন্ডি সীমাবদ্ধ। পক্ষান্তরে পুরুষদের ভাবা হয় বেশি আয়-রোজগার করতে সক্ষম, আতœনির্ভরশীল, চলাচলের ক্ষেত্রে প্রসারিত এবং মতামত প্রদানকারী। ফলে সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়ার জালে পরে নারী এবং পুরুষের সুযোগ সৃষ্টির ক্ষেত্রগুলিতে পুরুষের তুলনায় নারীদেরকে সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হয়। এরফলে নারীরা উচ্চ শিক্ষা লাভ করতে পারেনা তাই অভিজ্ঞতা অর্জনে ঘাটতি দেখা দেয় আর সেকারনেই নিজেদের গুনের দক্ষতার বিকাশ ঘটাতে পারে না ফলে দেশ বঞ্চিত হয় দক্ষ ও মেধাসম্পন্ন মানব সম্পদ তৈরী থেকে।  

সুযোগের জায়গাটিতে পুরুষ উচ্চ শিক্ষা লাভ করতে পারে ফলে অভিজ্ঞতা অর্জনের মাত্রা বেশি হয় যার কারনে নিজের বিকাশটা অধিক পরিমানে ঘটাতে সামর্থ্য হয়। সিদ্ধান্ত গ্রহনের ক্ষেত্রে সমাজে আমরা দেখি বেশির ভাগ পরিবারে নারী শুধু মতামত পালনকারী হিসেবে তৈরী হতে থাকে ফলে নারীর পছন্দ অপছন্দ মুল্যহীন হয়ে পরে। অন্যদিকে পুরুষরা বেড়ে ওঠে মতামত প্রদানকারী অথবা সিদ্ধান্তদাতা হিসেবে তাই তার পছন্দ অপছন্দ নিজের কাছে মুল্যবান হয়ে ওঠে। মানবসমাজ দীর্ঘদিন থেকে সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়ার মধ্যদিয়ে বিচরণ করে চলেছে। কিন্তু সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়ায় যে বৈশিষ্ট্য রয়েছে তা কতটা সঠিক পাঠকের নিকট সেই প্রশ্ন রেখে ভাবনার জায়গাটিকে প্রসারিত করবার জন্য অনুরোধ করবো।

সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়ার বৃহৎ গন্ডির মধ্যে নারী পুরুষ বেড়ে ওঠায় মিশ্র নির্দেশক দ্বারা দুটি ধারাকে আলাদা করা হয়েছে যুগ যুগ ধরে। আর তাই লিঙ্গ ভিত্তিক বৈষম্য যেন শেষ হচ্ছে না এবং সহিংসতাও কমছে না। ভ্রান্ত সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়ার ফলে লিঙ্গ ভিত্তিক সহিংসতার শিকার হচ্ছে নারী। যদিও সহিংসতাকারী খুব বেশি নয় আবার সময় এবং বিশ্বায়নের তুলনায় কমও নয়। বিশ্বের অন্যান্য দেশ যখন নারীদের অধিকার বাস্তবায়নে এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামো ব্যবহার করে কাজ করে যাচ্ছে আমরা তখন তৃনমুল পর্যায়ের মানুষদের সচেতনতা কাজও শেষ করতে পারছি না। 

সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়ার সাথে জেন্ডার ভিত্তিক সহিংসতার বড় একটি সংযোগ রয়েছে যা আমাদেরকে উৎকন্ঠিত করে। সহিংসতার তথ্য চিত্র থেকে জানা যায় শুধুমাত্র নারী হওয়ার কারনে সমাজের জনসংখ্যার বড় একটি অংশ সহিংসতার শিকার হয়। 

জেন্ডারভিতিক সহিংসতা একটি অমার্জনীয় অপরাধ এবং সমাজের সকল মানুষের জীবনের জন্য হুমকিস্বরুপ একই সাথে মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। আমাদের দেশে জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা নারীর প্রতি বৈষম্যের একটি বহিঃপ্রকাশ। লিঙ্গভিত্তিক ভাবনার পার্থক্যের কারনে নারী ধর্ষণ,নারী নির্যাতন,  যৌন হয়রানী, ইভটিজিং, প্রতারণা, মজুরী বৈষম্যসহ বিভিন্ন ধরনের সহিংসতার বেড়াজালে নারীর ক্ষমতায়নের পথ বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে। কোন অবস্থাতেই যেকোনো ধরনের সহিংসতার শিকার নারীকে তার আচরণ, পোশাক, কথা বলা বা হাটা চলার ধরন নিয়ে দোষারোপ করা সমুচীন হবে না। যদি কোন ধরনের বিরুপ মন্তব্য করা হয় তবে সে দায় শুধু মন্তব্যকারীর। আমাদের দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পত্র পত্রিকার মাধ্যমে জানা যায়, শুধুমাত্র আমাদের ধারনাগত অভিজ্ঞতার অভাবে বিভিন্ন ধরনের কথা আর আচরনের মাধ্যমেও জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতার ব্যাপক ছোট-খাটো ঘটনা ঘটে। 

আমাদের মনে রাখতে হবে যেসব আচরণ ও মনোভাব জেন্ডারবৈষম্য এবং নারী ও কন্যা শিশুর প্রতি সহিংসতাকে উৎসাহিত করে তা আমাদের পরিহার করা জরুরী। পাশাপাশি সহিংসতার শিকার নারী ও শিশুকে আমাদের মনোসামাজিক সহায়তার মাধ্যমে এমনভাবে প্রাথমিক সেবা দিতে হবে, যাতে সে সমন্বিতভাবে একসঙ্গে মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের চিকিৎসা, কাউন্সেলিং এবং আইনি সেবা পায়। সামাজিকভাবে আমাদের সকলকে এগিয়ে আসা জরুরী। লিঙ্গ ভিত্তিক সহিংসতা প্রতিরোধে পুরুষালি আচরণ সম্পর্কে যে ভুল ধারনাগুলো পুরুষের মধ্যে রয়েছে, নারী-পুরুষ বৈষম্য এবং নারীদের খাটো করে দেখার যে মনোভাব লক্ষ্য করা যায় তা ভাঙ্গতে হবে। একই সাথে সহিংসতা বন্ধে সরকারের যে সকল আইন বিদ্যমান তা বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে সরকারের যথাযথ প্রতিষ্ঠানের প্রতি তাগিদ রাখতে হবে।

সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়ার সাথে সংযুক্ত জেন্ডার ভিত্তিক সহিংসতার বিষবৃক্ষ আমাদের পরিবারের জমিতেই অংকুরিত। তাই জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা প্রতিরোধে আমাদের সবার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা ও জরুরি পদক্ষেপ নেওয়াটা জরুরি। মনে রাখতে হবে জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা প্রতিরোধে ও বন্ধের ক্ষেত্রে সহজ কোন সমাধান নেই। তাই ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা কমানো এবং নারীকে আর্থিক ও স্বচ্ছলভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা প্রতিরোধে সর্বপোারি ব্যক্তি, পরিবার ও সকল সরকারি বেসরকারি উন্নয়ন সহযোগি সংগঠনসমূহকে সম্মিলিত প্রচেস্টায় সম্বন্নিত পরিকল্পনা বাস্তবায়নে এগিয়ে আশা আবশ্যক। 

ও/এসএ/