|

প্রাকৃতিক বৈচিত্রময় সুন্দরবণ ভ্রমণ

Published: Wed, 09 Dec 2020 | Updated: Wed, 09 Dec 2020

মোঃ আশরাফুল আলম : যেকোন কর্মময় জীবন আমাদের শরীর ও মনকে করে ক্লান্ত আর অস্থির। একঘেয়েমি পরিবেশে মনে সৃষ্টি করে নানা ধরণের বিষন্নতা। তখন নিত্যদিনের সেই চেনা পরিবেশ থেকে মন ছটফট করে আনন্দ উপভোগের জন্য। ঠিক সেই সময় মনকে কিছুদিনের জন্য বিশ্রাম দিতে এবং নিজের ক্লান্তি ও একঘেয়েমি দূর করে পরবর্তী ব্যস্ত সময়গুলোর জন্য মনকে প্রস্তুত করতে ভ্রমণের প্রয়োজন। তাছাড়া যেকোন ভ্রমণ মানুষকে চিন্তাশীল হতে শেখায়। আর সেই শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা অনুভবেই এসকেএস ফাউন্ডেশনের নির্বাহী প্রধান রাসেল আহম্মেদ লিটনের নেতৃত্বে আমাদের ভ্রমণের গন্তব্য ছিল মোহময়ী সুন্দরবন। ৪০ সদস্য দলের লার্নিং ভিজিট হিসেবে সুন্দরবনের কিছু স্মৃতি আজকের লেখায় উপস্থাপিত হলো। 

বিশ্ব ঐতিহ্যের সর্ববৃহৎ একক মনোগ্রাফ বনাঞ্চল হলো সুন্দরবন। ইউনেসকো ঘোষিত বিশ্ব ঐহিয্যের অংশ এই সুন্দরবন। এই সুন্দরবন বাংলাদেশের মোট সংরক্ষিত বনাঞ্চলের মোট ৫১% ভাগ। এর আয়তন ৬,০১৭ বর্গ কিঃ মিঃ। এখানে ৩৩৪ প্রজাতির উদ্ভিদ, ৪২ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ৩৬ প্রজাতির সরীসৃপ, ২৯১ প্রাজাতির মাছ এবং ৩৫১ প্রজাতির পাখি রয়েছে। সুন্দরবনে সুন্দরী, কেওড়া, বাইন, গেওয়া, কাঁকড়, গরান, গোলপাতা খলিশা উল্লেখযোগ্য বৃক্ষ। আর প্রাণীকুলের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো বাঘ, চিত্রা হরিণ, বন্য শুকর, বানর, কুমির, অজগর, কচ্ছপ, ডলফিন, ভোঁদর, বন বিড়াল, মেছো বিড়াল এবং বিভিন্ন ধরণের পাখি রয়েছে। সুন্দরবন সংরক্ষণ বিভাগের তথ্য মতে এখানে বর্তমানে প্রায় ১১৪ টি বাঘ, ১ লক্ষ ৫০ হাজার হরিণ, ৫০ হাজার বানর, ২৫ হাজার বন্য শুকর এবং ২০০ টি কুমির রয়েছে। সুন্দরবন বিভিন্ন সময়ে সামুদ্রিক জলোচ্ছাস এবং ঝড়ের সময় উপকূলীয় নিরাপত্তা বেষ্টনী হিসেবে কাজ করে। 

এই বনে পর্যটকদের জন্য উল্লেখযোগ্য দর্শনীয় স্থান হলো করমজল ইকোট্যুরিজম ও বন্য প্রাণী প্রজনন কেন্দ্র(চাঁদপাই), হাড়বাড়িয়া ইকোট্যুরিজম কেন্দ্র (চাঁদপাই),কটকা ও কচিখালী টুরিজম স্পট(শরণখোলা), নীলকমল ট্যুরিষ্ট স্পট (খুলনা) কলাগাছিয়া ইকোট্যুরিজম কেন্দ্র (সাতক্ষীরা)। এইসব ভ্রমণ স্পট সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগ বাগেরহাট নিয়ন্ত্রণ করে। তাদের বিনা অনুমতিতে সংরক্ষিত বনাঞ্চলে প্রবেশ আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। 

পূর্ব অনুমতি সাপেক্ষেই আমরা ৪০ জন বিভিন্ন বয়সের ভ্রমণ পিপাষু চলতি বছরের ২৯ নভেম্বর রাতে গাইবান্ধা থেকে মাইক্রোবাস যোগে বিরামপুর এসকেএস অফিসে পৌঁছি রাত ৮টায়। সেখানে প্রয়োজনীয় কাজ সেরে (ফ্রেশ হয়ে) যাই বিরামপুর রেল স্টেশনে।  প্রায় ১ ঘন্টা বিলম্বে আগত সীমান্ত এক্সপ্রেস ট্রেনে উঠে প্রায় ৭ ঘন্টা পাড়ি দিয়ে পৌঁছলাম খুলনা রেল স্টেশনে ভোর ৫ টায়। এরপর ১০ মিনিটের পথে ব্যাটারী চলিত অটো রিক্সা যোগে উপস্থিত হলাম লঞ্চ ঘাটে। লঞ্চ ঘাট থেকে ৩০০ মিটার দূরে নদীর মাঝে অবস্থানরত লঞ্চে সকল স্বাস্থ্য বিধি মেনে একে একে সবাই নির্ধারিত কেবিনে উঠলাম। ‘উৎসব গ্রান্ড হলিডেস’ নামের লঞ্চে উঠতেই পাঁকা এবং মিষ্টি পেঁপের জুস দিয়ে অতিথি অভ্যর্থনায় সবাই ছিলো মুগ্ধ।  আনন্দের বাঁধ ভেঙ্গে মনের মধ্যে সুন্দরবন ভ্রমণের খুশির দুয়ার তখন কড়া নাড়তে শুরু করলো। 

প্রকৃতির সাথে লঞ্চের সৌন্দর্য ক্যামেরা বন্দী করতে প্রত্যেকেই ব্যস্ত হয়ে উঠলো। সকলের মনের মাঝে তখন সুন্দরবন ভ্রমণের আনন্দের উত্থান পূর্ণরুপে দৃশ্যমান। নাস্তা খেতে খেতে লঞ্চ খুলনা ঘাট থেকে ছেড়ে রুপসা নদী বয়ে যাত্রা শুরু করলো সুন্দরবনের পথে। রুপসা নদীর দুই ধারে নোঙ্গর করা হাজারো ছোট বড় লঞ্চ দেখে মনে হচ্ছিল যেন কাগজ দিয়ে বানানো এসব লঞ্চ শিশুরা পানিতে ভাসিয়ে দিয়েছে। নদীর ধারে সারি সারি নারিকেল গাছের অপরুপ সৌন্দর্য মনের মাঝে আনন্দের মাত্রা বাড়িয়ে দিতে লাগলো। 

কিছু দূর যেতেই চোখে পড়লো বিশাল উচুঁতে দাড়িয়ে থাকা রুপসা সেতু। সেতুকে নিয়ে সেলফি তুলতে কেউ বাদ গেল না। তখন জোয়ারের সময় থাকায়  স্রোতের বিপরীতে থাকায় লঞ্চ ধীর গতিতেই চলছিল। প্রায় ৪ ঘন্টা সময় পেরিয়ে লঞ্চ মোংলা বন্দর গিয়ে দাঁড়ালো। সেখানে থেকে জোসেপ দা লঞ্চে তুলে উঠলেন। জোসেপ দা সাথে নিয়ে আসলেন তার মায়ের হাতের তৈরী করা নারিকেল আর তেল পিঠা এবং সাথে প্রত্যেকের জন্য পাকা সফেদা ফল। সত্যিই পিঠা আর ছবেদা ফল লঞ্চের মধ্যে পারিবারিক আনন্দকেও ভাগাভাগি করার সুযোগ সৃষ্টি করেছিল।  

প্রায় ১ ঘন্টা যাত্রা বিরতীতে লঞ্চে ৩ দিনের খাবারের প্রয়োজনীয় সদাই করলো লঞ্চ পরিচালনা কর্তৃপক্ষ।  আমাদের সহকর্মীগণও প্রয়োজনীয় ছোটখাটো কেনাকাটা করে লঞ্চে উঠার পর লঞ্চ পুনরায় যাত্রা শুরু করলো। আরও প্রায় ২ ঘন্টা নদী বয়ে বাগেরহাটের পুর্বাংশ সুন্দরবনের নিকটে পৌঁছালো। দুপুরের খাওয়া সেরে সকলে প্রস্তুত সুন্দরবনের মাটিতে পা রাখতে। গাইডের নির্দেশনা আর ফরেস্ট পুলিশের দুই গ্যানম্যানের পরামর্শ মোতাবেক ৩০ নভেম্বর সোমবার দুপুর ২টার সময় ট্রলার যোগে পা রাখলাম বিশ্ব ঐতিয্যের বৃক্ষভুমি সুন্দরবনের হাড়বাড়িয়া ইকো ট্যুারিজম কেন্দ্রে। 

লঞ্চ কর্তৃপক্ষ পূর্বেই সকল ধরণের অনুমতি নেওয়ায় কাজ সম্পন্ন করে রাখায় আমাদের আর কোন অনুমতির প্রয়োজন হয়নি। শুরুতেই গাইড বানরের প্রতি দুষ্টুমি করতে নিষেধ করলেন এবং প্রয়োজনীয় কথা সেরে নিলেন। এবার শুরু হলো গহীন বনে প্রবেশের পালা। চারিদিকের বড় বড় গাছ আর নিস্তব্ধতায় অনেকের শরীরের লোম খাড়া হতে শুরু করলো। অনেকে ছোট বেলায় সুন্দরবনের ইতিহাস আর গল্প পড়েছেন, বিভিন্ন জীব জন্তু আর হিংস্র প্রাণীর গল্প শুনেছেন বা ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের আক্রমনাত্মক লড়াই দেখেছেন। সেসব গল্প আর দৃশ্যগুলো মনে পড়তে লাগলো আর মনে পড়লো রাখাল বালকের গল্পের কথা।

সবাই লাইন ধরে সারিবদ্ধভাবে যেতে লাগলাম। সামনে পিছনে গ্যানম্যান আর মাঝে দুইজন গাইড বনের প্রাকৃতিক পরিবেশ, গাছ, প্রাণী আর ঘটে যাওয়া নানা ঘটনার বর্ননা দিতে লাগলেন। আমরা উচুঁ ট্রেইল ধরে সারিবদ্ধভাবে হাটতে থাকলাম আর বনের সেই অজানা বৃক্ষরাজির সাথে পরিচিতি হতে থাকলাম। প্রায় ১ ঘন্ট অভিযান শেষে আবার ফিরে এলাম লঞ্চে। এবার সন্ধা ঘনিয়ে আসায় সুর্যাস্ত দেখার পালা। সুর্য তখন অনেক বড় আর লাল বর্ণ ধারণ নিভে যাওয়ার পথে। ইতিমধ্যেই লঞ্চ পশুর নদী বয়ে চলছে। দুই পাশে সারি সারি সবুজ বৃক্ষরাজি দুলছে আর সুর্যের মৃদু আলোয় কেমন যেন মায়বী পরিবেশ। সুর্য মামা আর নিজের ছবিকে এক ফ্রেমে বাঁধতে প্রায় সকলেই উৎফুল্ল। ক্যামেরার ফ্ল্যাসে জ্বলে উঠতে থাকলো জোসেপ দা আর কৌশিক আহম্মেদ গর্বের ক্যামেরা। আবার কেউ কেউ চোখের পলক না নামিয়ে সূর্যাস্তের দৃশ্য দেখে মুগ্ধ। একটু পরেই সন্ধা নেমে আসায় চারিদিকে নিস্তব্ধ পরিবেশ। মাঝ নদীতে শুধু দুই একটি লঞ্চের বং বেরংয়ের আলোর ঝলকানি। পরের দিনের ভ্রমণ সিডিউল করে রাতের খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম সকলেই। অনেকেই পরিবারের সাথে কথা বলার প্রস্তুতি নিতেই কিছুটা সাময়িক আফসোস। কারণ এখানে একমাত্র টেলিটক ছাড়া আর কোন মোবাইল নেটওয়ার্ক নেই। তাই উপায়ন্তর না দেখে ছুটির আমেজে কার্ড খেলে মজার সময় পার করতে বসে গেল অনেকেই। 

পরের দিন ১ ডিসেম্বর মঙ্গলবার সূর্য উদয়ের পূর্বেই নেমে পড়লাম বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য অভয়ারণ্য শরণখোলার রোমাঞ্চকর স্পট কটকা অভিযানে। শরণখোলা রেঞ্জের কটকা অভয়ারণ্য কেন্দ্র ফরেস্ট অফিসের পাশেই সকালের নিস্তব্ধ প্রাকৃতিক দৃশ্য, সুর্য উদয় আর চিত্রা হরিনের পাল দেখা ছিল ভ্রমণের মধ্যে সবচেয়ে সুখকর মহুর্ত। চারি দিকে চোখে পড়লো আম্ফান,আইলা আর সিডরের মতো তান্ডবকে রুখে দিতে বৃক্ষের অবদানের চিত্র। অনেক বড় বড় গাছ উপড়ে পরে আছে শুকিয়ে গেছে প্রাণহীন দেহের মতো। মনে পড়ে গেল যে এত বড় বড় ঘুর্ণিঝড় কে রুখে দিয়ে ক্ষয়ক্ষতির পরিমানকে বহুগুনে কমাতে সুন্দরবনের যে অবদান তা চোখে না দেখলে অনুমান করা যায়না। হাটতে হাটতে দেখা মিল্লো হরিণের পালের। নিঃশব্দ বিচরনে হরিণের পালের নিকটে গিয়ে কেউ কেউ ছবি তুল্লেন হরিণের সাথে। কেওড়া গাছের পাতা খাওয়াতে খাওয়াতে ছবি তোলা শেষে আবার রওনা দিলাম অন্য স্পট ঘুরতে।

ট্রলার যোগে সকাল ৯টায় রওনা হলাম জামতলা সী বীচের উদ্দেশ্যে। ডাঙ্গায় নেমে প্রায় ৪৫ মিনিটের পায়ে হাটা পথ পেরিয়ে জামতলা সী বীচ। যেতে আগ্রহী ছিলেন অনেকেই  আমরা প্রায় ৩৫ জন রওনা দিলাম। মাঝ পথে কমলা আর বিস্কুট হাতে নিয়ে খেতে খেতে হাটতে শুরু করলাম। অনেক বড় দলে হাটতে হাটতে হঠাৎ জোরে আওয়াজ শুনে থমকে দাড়ালাম। আবারও শব্দ হয় কি না তার অপেক্ষায় রইলাম। গাইড বল্লেন এখানে হরিণ থাকে আর হরিণের মাংস বাঘের খুব পছন্দের খাবার। বাঘ তার খাবারের ৮০ ভাগ খেয়ে থাকে হরিণ থেকে। তাই এখানে বাঘ থাকার অনেক বেশি সম্ভাবনা আছে। সবাই চুপচাপ, অজানা আতংক মনে, কখন আবার বাঘ মামার শিকার হতে হয়। আবারও শুনলাম সেই শব্দ তবে সেটা বাঘের  কি না তা বোঝা গেল না। তবে বোঝা গেল শব্দটা বাঘের না হলেও অন্য কোন হিংস্র প্রাণীর ছিলো। শিশুদেরকে সবাই সতর্কতার সাথে নিয়ে আবারও  হাঁটতে চললাম। হাঁটতে হাঁটতে গাইডার ইতিপূর্বে ঘটে যাওয়া অনেক দুর্ঘটনার কথা স্মরণ করিয়ে দিতে লাগলেন। হঠাৎ শোঁ শোঁ শব্দ আবার থমকে দাড়ালাম। এবার গাইডার জানালেন স্যার সমস্যা নেই এবার এটা সাগরের ঢেউয়ের শব্দ । বুঝলাম যে আমরা সী বীচে এসে পৌছে গেছি। সাগরের ঢেউয়ের শব্দে সুন্দরবন তার রুপ যেন বদলে ফেললো নিমেষেই। সাগরের বিশাল জলরাশির ঢেউ আছড়ে পড়ছে সুন্দরবনের উপর। সে এক অন্যরকম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য। ভাষায় প্রকাশ করার নয়। এতক্ষনের একতাবদ্ধ দলটি মহুর্তেই ভেঙ্গে সবাই ছোটছুটি শুরু  করলো। কেউ গেল পানিতে, কেউ শামুক কুড়াতে,কেউ গলা ছেড়ে গান ধরলো আবার কেউ ছবি তোলা নিয়ে ব্যস্ত সময় পাড়ি দিলো। বীচের আনন্দটা কেউ নিতে মিস করলেন না যে যার মতো আনন্দ করে আবার ফেরার পালা। এবার হাঁটতে গিয়ে বেশির ভাগই  ক্লান্ত তাই ধীরে ধীরে হাঁটার পথ শেষ করে আবারও লঞ্চে ফিরে বেশ দেড়িতেই সকালের নাস্তা খাওয়া হলো। নাস্তা খেতেই লঞ্চ রওনা দিলো গভীর সমুদ্রের দিকে, যেখানে সমুদ্রের পাড়ে ডাঙ্গায় কুমিরের দর্শন মিলে। বনের মাঝে আঁকা বাঁকা খাল দিয়ে লঞ্চ চলছে আর বেশির ভাগই প্রকৃতির অপরুপ সুন্দর পরিবেশে দাড়িয়ে থাকা সুন্দরী, গর্জন, শাল, গেওয়া, কেওড়া, কাঁকড়, বাইন, গোল পাতাসহ অসংখ্য নাম না জানা বৃক্ষ রাজি দাড়িয়ে একের পর এক স্বাগতম জানাচ্ছে। 

যেতে যেতে হঠাৎ ছোট বড় সকলের চিৎকারে অনেকই চমকে উঠলাম। পরে বুঝলাম সকলেই ডাঙ্গায় কুমির দেখে এমন শব্দ করেছে। সাথে সাথে গাইডের অনুরোধ কেউ চিৎকার করবেন না। কুমির দেখা থেকে বঞ্চিত হবেন না। তাই আবার সকলে চুপটি মেরে নিঃশব্দ ভাবে এগুতেই চোখে পড়লো আরও দু একটি কুমির রোদ পোহাচ্ছে। ভাবতেই অবাক লাগে যে খোলা জলে এমন দুর্গম অঞ্চলে অনিরাপদ জলরাশিতে কুমির দেখতে আসা। ট্রলারের শব্দে একটু খানি দেখা দিয়েই ডাঙ্গা থেকে পানিতে নেমে গেল কুমির গুলো। তাই খুব বেশি সময় ধরে দেখার সুযোগ হলো না । বিষয় টা অন্য রকম অভিজ্ঞতা ছিল। কারণ যারা দলে ছিলাম তাদের কেউ এরকম খোলা পরিবেশে বনের মধ্যে কুমির দেখার সুযোগ পায়নি। যা দেখেছি তা শুধু চিড়িয়াখানা অথবা টেলিভিশনে। 

আরও ৩০ মিনিট পাড়ি দিয়ে এবার পৌছে গেলাম আন্ডার চরের মূল অংশে। চরটি সাধারণ মনে হলেও এর মুল বৈশিষ্ঠ্য হলো এটির চারিদিকে বঙ্গোপসাগর ঘেরা মাঝে বৃক্ষ রাজি এবং এটি পানিদে তলিয়ে যায় না। বিভিন্ন প্রাণী স্বাধীনভাবে ঘুরে বেড়ায় এখানে বিশাল আকৃতির বুনো শুকর বিচরণ করে। এর চারিদিকে সামুদ্রিক মাছ ও শিকারের পরিবেশ রয়েছে। আমাদের মধ্যে অনেকেই সাধারণ চর ভেবে আর সুর্যের তাপমাত্রা বেশি থাকায় ট্রলার থেকে না নেমে আবার ফিরে গেলেন লঞ্চে। আমরা প্রায় ১৫/২০ জন চরের মধ্যেই একটি অংশে ফুটবল খেলা করলাম। অনেক দিন পর ফুটবল খেলতে গিয়ে শুরুতে অনেক বার বালির মধ্যে গড়াগড়ি ভাবে পড়ে যাওয়ায় অনেকে মজাও নিচ্ছিল তাই বিষয়টা আমার কাছেও ছিল বেশ মজার। খেলা শেষে লঞ্চে ফিরে গোসল করে দুপুরের খাবার খেয়ে একটু ক্লান্তি দুর করতে কেবিনে শুয়ে লঞ্চের জানালা দিয়ে বিশাল জলরাশি সাথে বনবৃক্ষ আর প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য  উপভোগ করতে ছিলাম।

দেখতে দেখতে সন্ধা ঘনিয়ে আসলো। সুর্যাস্তের পর চলমান লঞ্চে শুরু হলো আনন্দ মেলা সঙ্গীত সন্ধা আর লটারী। পূর্ব প্রস্তুতি অনুযায়ী ৪ পাউন্ডের ২টি কেক কেটে স্বল্প পরিসরে এসকেএস ফাউন্ডেশনের ৩৩তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীর স্মৃতি আলোচিত হলো। এরপর বিভিন্ন ধরনের গানের মেলায় অমায়িক শিল্পীদের অমায়িক গান, নাচ, কৌতক, গল্প, কবিতা, লটারি খেলা ইত্যাদিতে রাত গভীর হতে লাগলো। সুন্দরবন ভ্রমণের সাথে যুক্ত হয়ে ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে রইলো ৩৩তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীর সীমিত স্মৃতি কথা।


৩য় দিন ২/১২/২০২০ বুধবার সকালে ওঠার তাড়া নেই তাই একটু দেড়িতেই ঘুম থেকে উঠে নাস্তা সেরে প্রস্তুতি নিলাম গভীর বনের কিনারে গড়ে ওঠা কুমির আর হরিনের কৃত্রিম প্রজনন কেন্দ্র দেখার জন্য। করমজলে হরিণ, কুমিরসহ বিভিন্ন প্রাণীর কৃত্রিম প্রজনন কেন্দ্র দেখে মনটা বেশ আনন্দে ভরে উঠলো। এমন করে সবাই দেখার সুযোগ না পেলেও আমাদের সেই সৌভাগ্য হলো। ঘুরতে ঘুরতে পানির পিপাসা জুরাতে  ডাবের পানি খাওয়া হলো সবাই মিলে। ডাবের শাস নিয়ে ব্যস্ত হওয়ায় কারো কারো হাত থেকে বানর ডাবের মজাদার শাস কেড়ে নিয়ে দৌড় পালানো বেশ মজার ব্যাপার ছিল। দুপুর গড়িয়ে যাওয়ায় ফিরে যাবার তাড়ায় আবার লঞ্চে উঠে দুপুরের খাবার খেতে খেতে গন্তব্যের দিকে রওনা করলাম। এখন মনে হচ্ছে আমাদের সুন্দরবন দেখার পালা শেষ এবার ফিরতে হবে কর্মস্থলে। ফিরে যাবার কথা মনে পড়তেই শুরু হলো কাজের পরিকল্পনা ততখনে মোবাইল নেটওয়ার্ক চলে আসায় ফোনের হিরিক শুরু হলো। তাই ফিরতে ফিরতে পরবর্তী কাজের খোজ খবর মতবিনিময় ইত্যাদি। লঞ্চ সন্ধার মধ্যেই ফিরে আসায় রাতের খাবার লঞ্চেই সেরে রেল স্টেশনে আবারও সেই সীমান্ত এক্সপ্রেস ট্রেনে করে বিরামপুর হয়ে আগের মতই ফিরে আসা হলো আপন শহর গাইবান্ধায়।

এইভাবে কয়েকটি দিন সুন্দরবনের প্রকৃতির কোলে বেড়িয়ে আমরা পুনরায় কর্মস্থল এবং পারিবারিক জীবনে ফিরতে হলো। তবে একটি কথা না বল্লেই নয়। কয়েকদিন আগেও কাজের চাপে মন যে অবচেতন ও অস্থির ছিল তা বিলুপ্তি প্রায়। কাজের জন্য মনের মধ্যে যেন একটা নতুন উদ্দ্যেম সৃষ্টি হয়েছে। প্রকৃতির পরম আশ্রয়ে থেকে কয়েকটি দিন আমাদের পরবর্তী সারা বছরের জন্য বাঁচার রসদ উপহার দিয়েছিল। আর সেই কারনে ভ্রমণ দলের কেউ কেউ এখনও রাতে নিজ বিছানায় ঘুমের ঘোরে লঞ্চের দোলনা অনুভব করে তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়। রাতের সেই জেসনাময় জঙ্গলের দৃশ্য, লঞ্চের সামনে বসে পূর্ণিমার চাঁদ আর জোনাকি পোকার আলোর ঝলকানি মনের মনি কোঠায় স্মৃতির এ্যালবাম হয়ে জমা থাকলো। এখানেই সুন্দরবন ভ্রমণের প্রকৃত সার্থকতা।