|

শ্রমজীবি নারীর শিশুর নিরাপত্তায় ‘শিশু দিবা যত্ন কেন্দ্র’

Published: Tue, 27 Oct 2020 | Updated: Tue, 27 Oct 2020

মো. আশরাফুল আলম : খুব সহজ কথা কিন্তু অত্যন্ত মূল্যবান আজকের শিশু আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। সকল পিতা মাতা ই স্বপ্ন দেখেন তাদের শিশুদের সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ার। শ্রমজীবি নারী পুরুষ  উভয়ই দিনরাত পরিশ্রম করেই শিশুদের স্বপ্ন পূরনে এগিয়ে চলেছেন অনবরত। তবে মা ও শিশু দুজনেই নিরাপদ এবং দুশ্চিন্তা মুক্ত থাকলে শ্রমজীবি নারীর পরিশ্রমে দেশের অর্থনীতির চাকায় গতি সঞ্চার হবে এবং পরিবারেও স্বচ্ছলতা আসবে তাতে কোন সন্দেহ নেই। আর সেজন্য শ্রমজীবি নারীর শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজন ‘শিশু দিবা যত্ন কেন্দ্র’। 

ধনী এবং মধ্যবিত্ত পরিবারের শিশুরা মোটামুটিভাবে কোন রকম নিঃসঙ্গতা ছাড়াই পরিবারের অন্যান্য সদস্যের নজরে থেকে আনন্দ মুখর পরিবেশেই বেড়ে ওঠে। কিন্তু গ্রামীণ এবং শহরের দরিদ্র শ্রমজীবি পরিবারের শিশুরা সেই ধরনের আনন্দঘন সুন্দর পরিবেশ থেকে অনেকটাই বঞ্চিত। নারী শ্রমিকের কাজের সাথে তার শিশুর সংশ্লিষ্টতা অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত। 

শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ছাড়া শ্রমজীবি মায়ের কাছ থেকে প্রত্যাশিত কাজ পাওয়া সম্ভব নয়। শ্রমজীবি নারীর দুশ্চিন্তামুক্ত কর্ম পরিবেশ গড়ার মধ্য দিয়েই দেশের অর্থনীতিতে নারীর অবদান বৃদ্ধি করা সম্ভব।  তাই শ্রমজীবি নারীর শিশুর নিরাপত্তার দিকটি সরকারি বেসরকারি ভাবে অমলে নিয়ে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরী।

আমাদের সমাজে প্রতিটি মায়ের মন তার শিশুকে নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকে। শিশুর স্বাস্থ্য, শিক্ষা, খাদ্য, নিরাপত্তা, বিনোদন ইত্যাদি মায়েদের মনে সব সময় নতুন নতুন ভাবনার সৃষ্টি করে। আর তখন মায়েদের দায়িত্বও বেড়ে যায়। একটি শিশু বেড়ে ওঠে তার পার্শ¦ চরিত্র গুলির অনুকরনে। 

দেশের অর্থনৈতিক ও সমাজিক অবস্থা বিবেচনায় মধ্য বিত্ত এবং ধনী পরিবারের শিশুদের নিরাপত্তা ও বেড়ে ওঠার প্রকৃতিটা তুলনামূলক ঝুঁকিমুক্ত। পক্ষান্তরে গ্রামীণ ও শহরের শ্রমজীবি নারীর শিশুরা সকল সময়েই কোন না কোন ঝুঁকির মধ্যে থাকে। অথচ দুজনেই অবুঝ নিরাপরাধ শিশু।

বিগত বছর গুলোর তুলনায় গ্রামীণ অর্থনীতিতে নারীদের অবদান বেড়েছে। পরিবারের আয়ের ক্ষেত্রেও নারী এখন অনেকটাই সচেতন, সক্ষম এবং আত্বনির্ভরশীল। তবে অনেক শ্রমজীবি নারী তাদের সদ্য বেড়ে ওঠা শিশুকে নিয়ে পরেন বিপাকে। কর্ম পরিবেশ অনুকুলে না থাকায় ছোট শিশুকে নিয়ে কর্মস্থলে যেতে পারেন না। 

আর সেই কারনে কাজের সুযোগ হারিয়ে হয়ে পরেন কর্মহীন। কমে যায় পরিবারের আয়। পরতে হয় অস্বচ্ছলতার মধ্যে। দেখা গেছে অনেক নারীর স্বামী আয় রোজগারের জন্য জেলার বাহিরে গমন করেন কাজের সন্ধানে। নারীটি তখন শ্রমজীবি হয়েও শুধু মাত্র শিশুটির নিরাপদ ব্যবস্থাপনার অভাবে কর্মে যোগদান করতে পারেন না। ফলে অধিক আয় করে আরও বেশি আত্বনির্ভরশীলতার পথ বাধাগ্রস্থ হয়। 

আমাদের চারপাশে দরিদ্র পরিবারে দেখা যায়, স্বামী স্ত্রী দুজনে মিলে আয় করে মোটামুটিভাবে সমাজে একটু মাথা তুলে চলতে পারে। দরিদ্র পরিবারের কোন জমি না থাকায় স্বামী কাজের সন্ধানে বাহিরে গেলে নারী সদস্যর আর তেমন কোন ব্যস্ততাও থাকে না। তখন গ্রামের বিভিন্ন স্তুরে শ্রম বিক্রির কাজে আগ্রহী হয়ে ওঠে। 

কেউ কাজ করে অন্যের জমিতে ও বাড়িতে, কেউ কারখানায়, কেউ আবার রাস্তায় মাটি ভরাট করার কাজে শ্রম দেয়, অনেকই আছে রাজমিস্ত্রির যোগালীতেও কাজ করে মজুরী পেয়ে থাকেন। কিন্তু যে পরিবারে ছোট শিশু থাকে সেই সকল পরিবারের নারীরা ইচ্ছা থাকলেও আয় রোজগার করা থেকে বঞ্চিত হন। 

কারণ তার সদ্য বেড়ে ওঠা শিশুটিকে কোথায় কার কাছে রেখে মাঠে অথবা কারখানায় কাজে যাবেন কি হবে তার নিরাপত্তা নানান বিষয়ে মনে প্রশ্ন ওঠায় সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। কারণ ছোট বয়সে শিশুরা বেশ চঞ্চল হয় তখন খালা, ফুপু নানী, দাদী যে কারো কাছে রেখে যাওয়াটা নিরাপদ মনে করেন না।
 
গ্রামীণ শ্রমজীবি নারীর শিশুদের নিরাপত্তা ও যত্ন সহকারে বেড়ে উঠতে অনন্য এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে এসকেএস ফাউন্ডেশন কর্তৃক বাস্তবায়িত পাওয়ার প্রকল্প। এ্যাকশন এইড বাংলাদেশের আর্থিক সহায়তায় প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হচ্ছে গাইবান্ধা জেলার ফুলছড়ি উপজেলার ৫টি ইউনিয়নে। 

উপজেলার কঞ্চিপাড়া, উড়িয়া, উদাখালী, গজারিয়া এবং ফজলুপুর ইউনিয়নের প্রত্যন্ত গ্রামঞ্চলের শ্রমজীবি নারীদের শিশুর শিক্ষা,স্বাস্থ্য, বিনোদন এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করনের দায়িত্ব নিয়ে গড়ে উঠেছে ‘শিশু দিবা যতœ কেন্দ্র’। ৫টি ইউনিয়নে ৮টি কেন্দ্রে শিশু রয়েছে ২৩৪ জন। যার মধ্যে বালক ৯৮ জন বালিকা ১৩৬ জন। 

এই সকল কেন্দ্রে প্রকল্প থেকে ২-৪ বছর বয়সের শিশুর জন্য রয়েছে বিভিন্ন খেলার সামগ্রী, ঘুমানোর জন্য বালিশ ও বিছানা, খাবারের জন্য বাটি মগ, জগ, গ্ল্যাস। পড়া শেখানোর জন্য শিক্ষনীয় উপকরণ, টিভি, কার্টুন সিডি, সিসিমপুরি সিডি, প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য রয়েছে ফাস্ট এইড বক্স, মাদুর ইত্যাদি। 

আর স্থানীয় সরকার বিভাগের মাধ্যমে কোথাও কোথাও নলকুপ ও পায়খানা স্থাপন, সোলার প্যানেল স্থাপন, বিদুৎ বিল প্রদান, ভিজিএফ এর চাল, শিশুর খেলার সামগ্রী, পেশাক ইত্যাদি সহায়তা করা হয়েছে। অন্যদিকে অভিভাবকগণ চাঁদা দিয়ে শিশুদের দুপুরের খাবার সরবরাহ করার দায়িত্ব নিয়ে থাকেন। 

কেন্দ্র গুলিতে একজন তত্বাবধায়ক রয়েছেন যিনি সামান্য সম্মানীর বিনিময়ে ২৫-৩০ জন শিশুর যতœ নিয়ে থাকেন। শিশুদের খাওয়ানো, আনন্দ দেয়া, ঘুমিয়ে দেয়া, গোসল করানোসহ বিভিন্ন ধরনের কাজের মাধ্যমে মায়ের স্নেহ দিয়ে  প্রায় ৮ ঘন্টা যত্ন করে চলেন। 

এর ফলে মা যেমন নিশ্চিন্তে কাজে মনোযোগ দিয়ে কাজ করতে পারেন অন্যদিকে শিশুটিও আনন্দ মুখর পরিবেশের মধ্যে বেড়ে উঠতে পারে। কাজ শেষে ফেরার পথে শিশুটিকে সাথে নিয়ে আবার বাড়িতে ফেরেন মা। এভাবেই চলছিল শ্রমজীবি নারীর জীবন।

উদাহরনটি বেশ চমৎকার কিন্তু বিদেশী অর্থের যোগান তো একদিন শেষ হবেই। প্রশ্ন হলো তখন কি হবে? এই ভেবে যেন মায়েদের মনে দুশ্চিন্তার শেষ নেই।  কারণ যে প্রকল্পের মাধ্যমে শিশু দিবা যত্ন কেন্দ্র গুলি চলছিল তা প্রায় শেষের দিকে। গত ২০১৬ সাল থেকে শুরু হওয়া কেন্দ্র গুলিতে প্রায় ১হাজার শিশু সময় কাটিয়েছেন। 

আর আগামী ডিসেম্বর ২০২০ মাসে প্রকল্পটি শেষ হবে বলে জানা যায়। সরেজমিনে কেন্দ্র গুলি দেখতে গিয়ে কথা হয় দক্ষিণ উদাখালী গ্রামের শ্রমজীবি নারী সালেহা বেগমের সাথে। 

তিনি বল্লেন- ‘‘আমি দিন মজুরী করি, আমার ৪ বছরের বাচ্চা কারো কাছে রাখতে পারিনা। সাথেও নিতে পারি না, সাথে নিলে কামের ক্ষতি হয়। দিবা যত্ন কেন্দ্রে রেখে নিশ্চিন্তে কামে যেতে পারতাম। শুনছি প্রকল্প শেষের দিকে, তাই দিবা যতœ কেন্দ্র আর চালানো সম্ভব হবে না। এখন যদি এই কেন্দ্র বন্ধ হয়ে যায় তবে আমার কামে যাওয়াই বন্ধ হয়ে যাবে।’’ 

কথা হয় প্রকল্প ব্যবস্থাপক আশরাফুল ইসলামের সাথে, তিনি জানান, এই শিশু দিবা যতœ কেন্দ্র গুলি করা হয়েছিল উদাহরণ হিসেবে যাতে করে এইগুলি থেকে অভিজ্ঞতা নিয়ে সরকারি বেসরকারি অথবা ব্যক্তি উদ্দ্যোগে অন্যান্য ইউনিয়নে গড়ে তুলতে মানুষ আগ্রহী হয়। এই কেন্দ্রে শ্রমজীবি নারীরা তাদের সন্তানকে রেখে কাজের গতিকে ধরে রাখতে পারে। 

তিনি আরও বলেন, এখানে শিশুদের মানসিক বিকাশ ঘটে। শিশুদের পড়া শেখানোর মাধ্যমে প্রাথমিক স্তরে ৩য় শ্রেণীতে ভর্তির উপযুক্ত করে শিক্ষা দেয়া হয়। প্রকল্প শেষ হলে যদি সরকারি ভাবে অথবা ব্যক্তি উদ্দ্যোগে এই কেন্দ্র গুলি চালু রাখা সম্ভব হয় তবে আগামী দিনেও অনেক শিশু এই কেন্দ্র থেকে শিক্ষা নিয়ে বেড়ে উঠবে।

সমাজ এবং রাষ্ট্রের আয় বৃদ্ধিমূলক কাজে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধির কথা শুধু মুখে বল্লেই শেষ হয় না। সরকারিভাবে নারীর অধিকার বাস্তবায়ন এবং উন্নয়নের জন্য দায়িত্ব প্রাপ্ত সংশ্লিষ্ট বিভাগ গুলির পক্ষে এমন উদ্দ্যোগ কঠিন কিছু নয়। নারীর আয়ের সাথে তার সন্তানের যত্ন অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত। 

সামান্য অর্থ ব্যায়ে শ্রমজীবি নারীর শিশুর জন্য শিশু দিবা যত্ন কেন্দ্র গড়ে তোলা সম্ভব। এলাকাবাসী এবং শ্রমজীবি নারীদের  প্রত্যাশা সরকারি বেসরকারি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান চলমান এই কেন্দ্র গুলি অব্যাহত রাখার পাশা-পাশি নতুন নতুন এলাকায় এমন শিশু দিবা যত্ন কেন্দ্র স্থাপনের মাধ্যমে পরিবার এবং দেশের অর্থনীতিতে নারীর অবদান বৃদ্ধির ক্ষেত্রে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিবে। 

লেখক- মো. আশরাফুল আলম, কলাম লেখক এবং উন্নয়ন কর্মী।

আইআর /