|

গ্রামীণ নারী দিবস এবং নারীর অজানা আখ্যান

Published: Mon, 19 Oct 2020 | Updated: Mon, 19 Oct 2020

মো. আশরাফুল আলম

গত ১৫ অক্টোবর ছিলো আন্তর্জাতিক গ্রামীণ নারী দিবস। গ্রাম, ইউনিয়ন, উপজেলা এবং জেলা পর্যায়ে বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে পালিত হয় দিবসটি। এবারের প্রতিপাদ্য ছিল ‘খাদ্য সুরক্ষা ও দারিদ্রতা নির্মূলে আদিবাসী ও গ্রামীণ নারীর অবদানই মুখ্য’। নারী উন্নয়নে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি স্বরুপ জেলা এবং উপজেলা পর্যায়ে গ্রামীণ নারীদেরকে বিভিন্ন অবদানের জন্য (নারী মুক্তিযোদ্ধা, জয়িতা, ধাত্রীমাতা, রত্নগর্ভা মা, বীজ সংরক্ষণকারী কৃষাণী, সফল উদ্দ্যোক্তা, অন্যায়ের প্রতিবাদকারী সাহসী নারী, সফল স্থানীয় সরকার প্রতিনিধি ইত্যাদি) পুরস্কৃত এবং সম্মানিত করা হয়। 

১৯৯৫ সালে বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের ৪র্থ নারী সম্মেলনে ১৫ অক্টোবরকে আন্তর্জাতিক গ্রামীণ নারী দিবস হিসেবে পালনের প্রস্তুাব গৃহীত হয়। ১৯৯৭ সাল থেকে জেনেভা ভিত্তিক একটি আন্তর্জাতিক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ডড়সবহ’ং ডড়ৎষফ ঝঁসসরঃ ঋড়ঁহফধঃরড়হ (ডডঝঋ) দিবসটি পালনের জন্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশে উদ্বুদ্ধ করণ কর্মসূচি পালন করে। ২০০৭ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভায় ৬২/১৩৬ নম্বর রেজুলেশনের মাধ্যমে ১৫ অক্টোবরকে আন্তর্জাতিকভাবে গ্রামীণ নারী দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত গৃহিত হয়। বিশ্বের প্রায় ৪০টিরও বেশি দেশ গ্রামীণ নারী দিবস পালন করে থাকে। কৃষি ও গ্রামীণ উন্নয়ন এবং খাদ্য নিরাপত্তা ও দারিদ্রতা দূরীকরণের ক্ষেত্রে গ্রামীণ নারীদের ভুমিকার স্বীকৃতি স্বরুপ দিবসটি পালনের সিদ্ধান্ত যথাযথ।  

এবছর গ্রামীণ নারী দিবসের প্রতিপাদ্যের বিষয়ে নারীদের অবদান কে মুখ্য হিসেবে দেখানো হয়েছে। সেটাও আবার মানুষের বেঁচে থাকার অন্যতম মৌলিক অধিকার খাদ্য সুরক্ষা এবং দারিদ্রতা নির্মূলের অঙ্গীকারে। তবে এটি রক্ষা করবার দায়িত্ব যে শুধু নারীর সেটা ভাবা সমুচীন হবে না। কবি লিখেছেন ‘এই পৃথিবীর যা কিছু চির কল্যাণ কর, অর্ধেক তার গড়িয়াছেন নারী অর্ধেক তার নর’। এই বাক্য নিরিখে বিবেচনা করলেই যথেষ্ট।

সভা-সেমিনারে, রেডিও-টেলিভিশনে নারীর কাজের স্বীকৃতির কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু বর্তমানে নারীর প্রতি সহিংসতা এবং ধর্ষণের যে তান্ডব চলছে গা শিউরে ওঠার মতো। পথে-ঘাটে, স্কুল-কলেজে, মাদ্রাসায়, গ্রামেগঞ্জে, যানবাহন ইত্যাদিতে নারীর প্রতি যে আচরণ করা হচ্ছে একটি স্বাধীন দেশের নাগরিকের পক্ষে এটা মেনে নেয়া বেদনা দায়ক। অবস্থার ভয়াবহতা দেখে পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা আজ কঠোরতার পাশা-পাশি মানুষের মৌলিক মূল্যবোধকে জাগ্রত করতে সভা সেমিনারসহ বিভিন্ন সচেতনতার কাজে নেমেছে। নিশ্চয়ই এটি প্রশংসার দাবীদার। তবে মানুষ নামের যে জানোয়ার গুটি কয়েক রয়েছে তাদের চামড়ায় কোন বাতাস যেন লাগছেই না। সারা দেশে আন্দোলন চলাকালীন সময়েও একের পর এক ঘটনা জেনে মনে হচ্ছে যেন আমরা একটা যুদ্ধ ক্ষেত্রে অবস্থান করছি। একদিকে যুদ্ধ চলছে অন্যদিকে ধর্ষণ এবং সহিংসতাও চলছে।

মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের এক জরিপ থেকে জানা গেছে, গত মে মাসের ৩১ দিনে সারা দেশে ৫৩টি জেলায় বিভিন্ন ধরনের সহিংসতার শিকার হয়েছে ১৩ হাজার ৪৯৪ জন নারী ও শিশু। এমজেএফ এর কর্মএলাকার ৫৩ হাজার ৩৪০ জন নারী ও শিশুর সাথে ফোনালাপে এই তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। একমাসের এই অবস্থা হলে সারা বছরে কত হবে তার হিসাব সকলের জানা। 

প্রায় প্রতিদিনই পত্রিকার পাতায়, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে, টিভি স্ক্রীনে ধর্ষণ, সহিংসতা আর খুনের মতো ঘটনার প্রতিবেদন দৃশ্যমান। আইন ও শালিস কেন্দ্রের প্রতিবেদনে জানা গেছে, চলতি বছরের ৮ মাসে (জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর) দেশে ৮৮৯টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে আর ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৪১ জনকে আর আত্বহত্যা করেছে ১২ জন নারী। বছরের আরও বাকি কয়টি মাসের ঘটনা যোগ করলে বছর শেষে এই সংখ্যা কোথায় গিয়ে দাড়াবে কারো জানা নেই।

এই যদি হয় জানা চিত্র তবে অজানা ঘটনা যে কত তার হিসাব করা বেশ কঠিন। উদাহরণ হিসেবে কয়েকটি ঘটনা শুনলেই নারীর অজানা আখ্যান রেড়িয়ে আসবে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ছদ্দ নামে জানা গেল কয়েক নারীর অজানা গল্প- মমিনা বেগম, (বয়স ৩৫), গাইবান্ধা জেলার সদর উপজেলার বোয়ালী ইউনিয়নের বাসিন্দা। প্রায় ১৫ বছর পূর্বে বিয়ে হয়। স্বামী সরকারি চাকুরে। মমিনা’র গর্ভে ১৫ বছরেও কোন সন্তান না আসায় স্বামী শশুর-শ্বাশুড়ী আর ননদের কাছে সইতে মানসিক যন্ত্রনা। আর কোন দিন মা হতে পারবেন কিনা তার জানা নেই। মমিনা’র কথা মতে, বিয়ের কয়েক মাস পরেই গর্ভে সন্তান আসলে স্বামীর আপত্তির কারনে গর্ভপাত করতে হয়। ডা. বলেছে, প্রথম সন্তান নষ্ট করায় আর সন্তান হবার সম্ভাবনাও কম। 

ফাতেমা (বয়স-৪৫) একটি বেসরকারি সংস্থায় চাকরি করেন। নিজের চাকরির পয়সায় ২টি সন্তানকে লেখা পড়া করান প্রায় ১৭ বছর ধরে। সারা বছর বাড়ী ভাড়া দিয়ে থেকেও সংসারের খরচের পাশা-পাশি মাঝে মধ্যে স্বামীকেও হাত খরচ দিতেন। প্রকল্প সময়কাল শেষ হওয়ায় চাকরি হারায় ফাতেমা। কষ্টের মধ্যে পরে যায় সে। প্রায় ১০ দিন যাবত মারাত্বক অসুস্থাতায় ভুগলেও স্বামী নামের কর্তা ব্যক্তি ১ বারের জন্যও দেখতে আসেনি অথবা ফোন করে খোঁজটুকুও নেয়নি। কান্না জড়িত কন্ঠে বলছিলেন তার অজানা আখ্যান। 

মুরশিদা (বয়স-৪০), প্রায় বিশ বছর চাকরি করে স্বামীকে বিশ্বাস করে একটি বাড়ী তৈররী জন্য টাকার যোগান দিলেও অংশীদার হিসেবে বাড়ীর দলিলে নিজের নামটি লিখতে চাওয়ায় শুনতে হলো গালি গালাজ আর ভয়ভীতি। এভাবে যদি একের পর এক ঘটনা বর্ণনা করা যায় তবে পত্রিকার পাতার সংখ্যা বেড়েই চলবে। 

শহরের নারীরা কিছুটা আত্বনির্ভরশীল হয়ে উঠলেও গ্রামীণ নারী এখন পর্যন্ত প্রত্যাশার জায়গায় আসতে পরেনি। এক্ষেত্রে তারা প্রায়শই বাধার সম্মুখীন। করোনা মহামারীর আতংকের ভয় কিছুটা কমতেই সারা দেশ নারী ও শিশু ধর্ষণের আতংকে কেপে উঠলো। সহিংসতার চিত্র সকলকে থমকে দিয়েছে যা নারীর অগ্রগতির পথে বাঁধা। বর্তমানে নারী যে কর্মস্পৃহা নিয়ে এগুতো চায় গ্রাম পর্যায়ে সেই রকম কর্মসংস্থানের সুযোগ অথবা মুলধন কম। ফলে তারা অনিচ্ছা হলেও কর্মের জন্য দেশ বিদেশে পা বাড়ায়। তবে সেখানেও নারী হেনস্তার শিকার কম নয়। 

সমাজের নানান ক্ষেত্রে মানুষের নৈতিক মূল্যবোধের ব্যাপক অবক্ষয় পরিলক্ষিত। তাই আজ ১৫ বছর সংসার করার পরও সন্তান না হওয়ার অপমান সইতে হচ্ছে, সেটাও আবার পুরুষের ভুমিকার কারনেই। ২০ বছর সংসার করার পরও নিজের টাকায় তৈরী বাড়িতে যেন ঠাই মিলছে নারীর, আর প্রায় ১৫ বছর স্বামীর হাত খরচের যোগান দিয়েও আজ অসুস্থতার সময় ১ বারের জন্যও কাছে না পাওয়ার বেদনার কথা যেন এই সমাজে অজানা আখ্যান হয়ে থাকবে। 

গ্রামীণ ও আদিবাসী নারীর গ্রামীণ জনপদে কাজের মাধ্যমে আয় রোজগারের পথ কিছুটা সৃস্টি হলেও তার ন্যায্যতা নিয়ে প্রায়ই বাক বিতন্ডা দেখা যায়। এখনও রয়েছে মজুির বৈষম্য, নারীর কাজের পরিবেশের ক্ষেত্রে রয়েছে মিশ্রতা, সময় আর কাজের ধরনের মধ্যেও রয়েছে একক সিদ্ধান্ত এবং অসমতা। আবার পরিবারের কাজের ক্ষেত্রে অর্থমূল্য বিবেচনায় রয়েছে পুরুষের উদাসীনতা। তার পরেও গ্রামীণ অর্থনীতিতে পুরুষের চেয়ে নারীর অবদানই বেশি। গ্রামীণ অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে গ্রামীণ নারীর ভুমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি দৈনিক পত্রিকার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কৃষিতে নারীর অবদান শতকরা ৫৭ ভাগ আর পুরুষের ৪৭ ভাগ। নারীর সংখ্যার সিংহভাগই গ্রামীণ ও আদিবাসী নারী।

জমিতে ধান লাগানো থেকে শুরু করে পরিবারের সদস্যদের মুখে খাবার তুলে দেয়া পর্যন্ত নারীর পরিশ্রম আর অবদান সীমাহীন। অন্যান্য ফসল তোলার ক্ষেত্রেও গ্রামীণ এবং আদিবাসী নারীর অনবদ্য ভূমিকা চোখে পড়ার মতো। নারীর পরিশ্রম দারিদ্রতা নির্মূল করার ক্ষেত্রে যে অপরিহার্য্য তা এবার আন্তর্জাতিক গ্রামীণ নারী দিবসের প্রতিপাদ্যের মধ্যেই ফুটে উঠেছে। ধৈর্য্য আর ত্যাগের বিনিময়ে যদি নারী তার সুখের সময় টুকু হারিয়ে ফেলে অথবা কেউ কেড়ে নেয়, তবে সমাজ বলে কোন কিছু থাকার দরকার আদৌ আছে কি না প্রশ্ন পাঠকের কাছে? 
 
আমাদের গ্রাম পর্যায়ে বিভিন্ন ধরণের দক্ষতা সম্পন্ন নারীর অনেকেই কর্ম পরিবেশ আর সংস্থানের সুযোগ না থাকায় তাদের ভূমিকা মেলে ধরতে পারছেন না। ফলে দেশও হারাচ্ছে উন্নয়নের অংশীজন। স্থানীয় পর্যায়ে সরকারি বেসরকারি ভাবে যুগপোযুগী জলবায়ু সহিষ্ণু কৃষি অকৃষি ব্যবস্থাপনার প্রসার ঘটাতে পারলে নারীর শ্রমের বাজার মূল্যবান হয়ে উঠতে পারে। ন্যায্য মজুরী, মর্যাদা রক্ষা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করনের মধ্যদিয়েই গ্রামীণ এবং আদিবাসী নারীর অশ্রুত আখ্যানের অবসান হবে এটাই হোক সকলের প্রত্যাশা। 

লেখক-  
উন্নয়ন কর্মী ও কলাম লেখক