|

পথশিশুদের কারিগরি ও তত্ত্বীয় শিক্ষায় জনসম্পদে রূপান্তর সম্ভব

Published: Mon, 28 Sep 2020 | Updated: Mon, 28 Sep 2020

জিসান তাসফিক: জন্মের পর একটি শিশুর প্রধান আশ্রয়স্থল মায়ের কোল। একটা দুটো শব্দ করে ভাষা শেখা শুরু এখানেই। হাঁটিহাঁটি পাপা করেই একদিন দেশের ও দশের হাল ধরে। এজন্যই বলা হয় ‘আজকের শিশু আগামী দিনের ভবিষ্যৎ’। প্রতিটি মানুষের জীবনে নানা স্মৃতিবিজরিত থাকে শিশুকালে। ঘটে স্মৃতিপটে ধরে থাকার মত নানা মজার ঘটনা। কিন্তু সবার জীবনের গল্প এক নয়। কারো কারো জীবনে ঘটে অন্যরকম গল্প। সোনালি শৈশবের বদলে কারোর শৈশব কাটে জরাজীর্ণভাবে। হ্যাঁ, পথশিশুদের কথা বলছি।

একটি শিশু জন্মানোর সময় পথশিশু হয়ে জন্মায় না। পরিস্থিতি শিশুদের পথশিশু হিসেবে গড়ে তোলে। পথশিশু বলতে সহজ ভাষায় ঐসকল শিশুদের বোঝানো হয় যাদের বাসস্থান নেই, পিতামাতাহীন, দরিদ্র শিশু, পথে ঘাটে ঘুরে বেড়ানো ভবঘুরে।পথশিশুরা এমন শিশু যাদের থাকে না আশ্রয়, পায় না মমতা, ভালো আহার। আছে শুধু কেবলই অশ্রু আর হাহাকার। অনেকেই ভিন্ন ভিন্নভাবে পথশিশুদের সংজ্ঞায়িত করেছেন।

২০১৫ সালের ইউনিসেফের এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বাংলাদেশে পথশিশুর সংখ্যা ১০ লাখ। যার মধ্যে রাজধানী ঢাকায় আড়াই লাখের বেশি। যদিও বর্তমান সময়ে এ সংখ্যা ২০ থেকে ২৫ লাখ বলে দাবি করছে অনেক সংগঠন। বাংলাদেশের শিশু আইন-২০১৩’র ৪ ধারা অনুযায়ী ১৮ বছরের কম বয়সের সবাই শিশু। আইনত জন্মের পর থেকে ১৮ বছর পর্যন্ত অভিভাবকহীন, দরিদ্র সকলেই পথশিশু। পথশিশুরা অভিভাবকহীন ও দায়িত্বশীল কেউ না থাকায় সরকারের বিভিন্ন সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়।

শ্রম আইন অনুযায়ী ১৪ বছরের নিচে শিশুশ্রম নিষিদ্ধ ও দণ্ডনীয় অপরাধ এবং ১৪-১৮ বছরের মধ্যে শিশুরা হালকা কাজ করার অনুমতি পেয়েছে। একদিকে শারীরিকভাবে দুর্বল, অন্যদিকে আইনগত নিষিদ্ধ, আবার অভিভাবকহীনতার ফলে পথশিশুদের জীবন হয়ে ওঠে দুর্বিষহ। পথশিশুরা স্বাভাবিক জীবনযাপন থেকে বঞ্চিত থাকে। ফলে দ্রুতই পথভ্রষ্ট হয়ে নানা অপকর্মে জড়িয়ে পড়ে। একটা সময় রাষ্ট্রের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। দেশের কিছু কুখ্যাত আসামিরা একসময় পথশিশু ছিল, এমন তথ্যও পাওয়া যায়। 

বাংলাদেশের সংবিধানের ১৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিমালায় উল্লেখ রয়েছে, রাষ্ট্রের অন্যতম যে সকল মৌলিক দায়িত্ব হবে, তার মধ্যে মাতাপিতাহীন অথবা অনুরূপদের ক্ষেত্রে সরকারি সাহায্য লাভের অধিকার থাকবে। পরিকল্পিত অর্থনীতি বিকাশের জন্য দেশের সকল জনগণকে দক্ষ ও যোগ্য করে তোলা রাষ্ট্রের দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত। সেই ধারাবাহিকতা বজায় রেখে সংবিধানের ১৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রের সকলকে আইন দ্বারা নির্ধারিত মাধ্যমিক পর্যন্ত শিক্ষা অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

শিশু সদন ও শিশু পরিবার ব্যবস্থাপনা নীতিমালা-২০০২ ও শিশু আইন-২০১৩ অনুযায়ী পথশিশু কিংবা এতিম শিশুদের জন্য রয়েছে সরকারিভাবে সরকারি শিশু পরিবার যা সমাজসেবা অধিদপ্তর কর্তৃক পরিচালিত। যেখানে ১৮ বছর পর্যন্ত এতিম শিশুদের লালন-পালন ও পড়াশোনার ব্যবস্থা করা হয়। তাছাড়া বেসরকারিভাবে রয়েছে মাদ্রাসা, আশ্রম। আইন অনুযায়ী ১৮ বছরে সাবালক ধরা হলেও বাস্তবিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়া কঠিন হয়ে যায়, তাই প্রয়োজন আরো দীর্ঘ সময়ের সহযোগিতা।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যমতে, বাংলাদেশের মাথাপিছু বাৎসরিক আয় ২ হাজার ডলারের বেশি। সরকারি তত্ত্বাবধানে পথশিশুদের কারিগরি কিংবা তত্ত্বীয় শিক্ষার মাধ্যমে দেশের উপযুক্ত নাগরিক গড়ে তোলা সম্ভব। সংখ্যা দশ বিশ লাখ যাই থাকুক না কেন, জ্ঞানে-গুণে দক্ষ করা হলে পথশিশুদের মধ্যে বিজ্ঞানী, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার বেড়িয়ে আসতে পারে। 

অভিভাবকহীন পথশিশুদের অভিভাবক হতে পারে সরকার এবং অর্থনৈতিকভাবে হিসেব করলে দেখা যায়, ‍যদি দশ লাখের অধিক পথশিশুকে দক্ষ জনগোষ্ঠী করে কাজে লাগানো যায়, তবে হাজার কোটি টাকার উপরে সরকার অর্থনৈতিক আয় বৃদ্ধি করতে পারবে। পথশিশুরাও বাংলাদেশের নাগরিক, তাই তাদের সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা আমাদের দায়িত্ব।

লেখক :
শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ,
বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়

ও/ডব্লিউইউ