|

আইনের দৃষ্টিতে র‍্যাগিং শিক্ষা নয় বরং অপরাধ

Published: Wed, 23 Sep 2020 | Updated: Wed, 23 Sep 2020

জিসান তাসফিক : স্কুল, কলেজে বাঁধাধরা পড়াশোনার গণ্ডি পেরিয়ে পরিবার থেকে দূরে জ্ঞানের সাগরে অবগাহন করার প্রথম ধাপ বিশ্ববিদ্যালয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম দিন পা দিয়েই মনের মধ্যে জেগে ওঠে অজানা হাজারো আকাশছোঁয়া স্বপ্ন, হাজারো অনুভূতি। কিন্তু এই স্বপ্ন, আবেগ, অনুভুতির বাধা হয়ে দাঁড়ায় র‍্যাগিং আতঙ্ক।

র‍্যাগিং ইংরেজি শব্দ। যার বাংলা প্রতিশব্দ গোমমাল বা হট্টগোল। র‍্যাগ নিয়ে কথা বলার আগে আরেক শব্দের কথা বলি সেটি হল ‘ম্যানার’ যার বাংলা প্রতিশব্দ ভদ্র আচরণ। র‍্যাগ আমাদের শিক্ষা সমাজে এখন প্রচলিত একটি শব্দ। এটা বলতে আমরা বুঝি শিক্ষা প্রাঙ্গণে সিনিয়র কর্তৃক জুনিয়র শাসন করা বা নির্যাতন করা। একজন শিক্ষার্থী প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় আসে তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের কতিপয় কিছু সিনিয়রা ম্যানারের নামে শাসন, অপদস্ত এমনকি শারীরিক নির্যাতনও করে থাকে।

কেউ কেউ মনে করেন র‍্যাগিং সংস্কৃতির উদ্ভব হাল আমলে। কারণ সেই খ্রিস্টপূর্ব সপ্তম বা অষ্টম শতক থেকেই র‍্যাগিংয়ের অস্তিত্ব বিদ্যমান। তখন এটি অন্তর্ভুক্ত ছিল গ্রিক সংস্কৃতির। কোনো ক্রীড়া সম্প্রদায়ে নতুন খেলোয়াড় বা শিক্ষার্থীদের আগমন ঘটলে, তার ভেতর কতটুকু একতা রয়েছে তা ঝালাই করে নিতে এবং তার মধ্যে 'টিম স্পিরিট'-এর বীজ বপন করে দিতে প্রবীণরা মিলে তাকে নানাভাবে উপহাস, পরীক্ষা নেয়াসহ শারীরিক ও মানসিক শক্তি যাচাই করত। সময়ের সাথে সাথে এই প্রক্রিয়ায় অনেক পরিবর্তন আসে। একপর্যায়ে সৈন্যদলগুলো এই পদ্ধতিটি অনুসরণ শুরু করে। ধীরে ধীরে শিক্ষাক্ষেত্রে এটির প্রবেশ ঘটেছে।

এটি বর্তমানে আমাদের দেশে সকল বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথা হিসেবে চলে আসছে। কিন্তু কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের শৃংখলা আইনে বা রাষ্ট্রীয় আইনে এর অনুমোদন নেই বরং নিষিদ্ধ। এটা এক অপসংস্কৃতির ফল যা প্রতিবছর প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীরা পেয়ে থাকে। যখন প্রথম বর্ষের একজন শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করে তখন তার কাছে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ একদম নতুন হয়ে থাকে। কিছু সিনিয়র শিক্ষার্থীরা এই সুযোগের ব্যবহার করে বিভিন্নভাবে অপদস্ত করে। যেমন রাতের বেলায় মাঠে হাঁটানো, সবার সামনে কান ধরে উঠবস করানো ইত্যাদি। বলিউডে একটি জনপ্রিয় মুভি ‌‌‘টেবল নং ২১’এ চরম পর্যায়ের র‍্যাগিংয়ের বাস্তবতা তুলে ধরা হয়েছে।

সংবাদমাধ্যম থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালে সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং সাভারের জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এমন র‍্যাগিংয়ের ঘটনা গণমাধ্যমে প্রচারের ফলে আলোচনায় এসেছিল। শাবিপ্রবিতে ছয় নবীন শিক্ষার্থীকে র‌্যাগিংয়ের নামে অর্ধনগ্ন করে শৌচাগারে সেলফি তুলতে বাধ্য করার অভিযোগে সাময়িক বহিষ্কার করা হয় পাঁচ শিক্ষার্থীকে। আর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে এক নবীন শিক্ষার্থী 'বড় ভাইদের' হাতে এতটাই শারীরিক ও মানসিক নিগ্রহের শিকার হয়েছিল যে, মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছিল সে; এমনকি চিনতে পারছিল না  নিজের বাবা ও আত্মীয়-স্বজনদেরকেও।  এগুলো সব প্রকাশিত ঘটনা, কিন্তু এমন অনেক ঘটনা আছে যেগুলো আজীবন অপ্রকাশিতই থেকে যায়।

আইনের দৃষ্টিতে র‍্যাগিং একটি অপরাধ। র‍্যাগিংয়ের জন্য আলাদা কোনো আইন নেই, কিন্তু বাংলাদেশ দণ্ডবিধির ৩৭৪ ধারা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, কোনো ব্যক্তিকে বেআইনীভাবে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোনো শ্রম করাতে বাধ্য করলে সেই ব্যক্তি যেকোনো বর্ণনার কারাদণ্ড যার মেয়াদ এক বছরের কারাদণ্ড বা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে পারে। এছাড়াও দণ্ডবিধিতে আরো অনেক ধারার বর্ণনার সাথে র‍্যাগিংয়ের বাস্তবতা মিলে যায়।

র‍্যাগিংয়ে অভিযুক্ত একজন শিক্ষার্থীর অভিযোগ যখন প্রমাণিত হয়, তখন এসব দণ্ডের পাশাপাশি রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় হতে বহিস্কার হওয়া। যা একজন শিক্ষার্থীর কাল হয়ে দাঁড়ায়। র‍্যাগিংয়ের জন্য অনেক শিক্ষার্থীই শিক্ষাজীবন হারিয়েছে যার ফলে সে তার উজ্জল ভবিষ্যৎ হারিয়েছে। এমন অনেক নিদর্শন আছে যার জন্য অনেক ছাত্র স্থায়ী বহিষ্কার হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশে সিনিয়র-জুনিয়র সম্পর্ক র‍্যাগিংয়ের মাধ্যমে নয় বরং হতে পারে ভালোবাসা আর আদর্শের মাধ্যমে।

লেখক :
শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ,
বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়।

ও/ডব্লিউইউ