|

অধ্যাপক শিব প্রসাদের সুখ-দুঃখ

Published: Thu, 13 Aug 2020 | Updated: Thu, 13 Aug 2020

রোকন উদ্দীন আহমদ

শিব প্রসাদ অধ্যাপক, কবি, সম্পাদক, প্রকাশক ও গবেষক। আরও একটি পরিচিতি আছে তাঁর। তিনি একজন বাম রাজনীতিবিদ। এই বহুমুখী প্রতিভাধরের জীবনযাপন সাদাসিধে। সাদাসিধে জীবনযাপনেও সফলতার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিলেন তিনি। স্ত্রী ও দুই মেধাবী পুত্র সন্তান নিয়ে তাঁর ছিল সাজানো সংসার। ছোট সংসারটিতে বড় সাফল্য হাতছানি দিয়েছিল। তিনি চট্টগ্রাম জেলার চন্দনাইশ উপজেলার বরমা ডিগ্রি কলেজে দর্শন বিষয়ে অধ্যাপনায় নিয়োজিত। কবিতা লিখেন। সাপ্তাহিক পরিচয় পত্রিকা সম্পাদনা করেন। মনন প্রকাশন নামে একটি প্রকাশনা সংস্থা পরিচালনা করেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি গবেষণারত আছেন। ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ-মোজাফ্ফর)এর চট্টগ্রাম উত্তর জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন। ১ম সন্তান চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিষয়ে স্নাতক সম্মান শ্রেণিতে অধ্যয়নরত। ২য় সন্তান মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পড়ুয়া। ১ম সন্তান আইন বিষয়ে স্নাতকোত্তর করে অল্প কয়েক বছর পর পেশায় নিয়োজিত হলে সংসারে আসত অবারিত সুখের দিন। প্রিয়তমা স্ত্রী কণিকা রায়কে নিয়ে হয়তোবা এরকম আশার বীজ বুনেছিল দু’জনে, মনের বাগানে।

সুখময় জীবনের কামনা থাকে প্রত্যেক মানুষের। সুখের জীবন গড়তে অনেকেই অনৈতিক কাজে লিপ্ত। চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, প্রতারণা, কালোবাজারী, ঋণখেলাপী, মাদকব্যবসা, জুয়া ব্যবসা, আরো কত কী। এসব করেই অনেকেই রাতারাতি কোটিপতি হয়েছেন। বনে গেছেন সমাজপতি, গাড়ি-বাড়ির মালিক। অধ্যাপক শিব প্রসাদ সচেতনভাবেই অনৈতিক উপার্জনের লোভ সংবরণ করেছেন। আর্থিক লাভের জন্য বেছে নিয়েছেন মেধা ও শ্রম বিক্রির কাজ। অধ্যপনার পাশাপাশি তিনি দিনরাত পরিশ্রম করেন। লেখালেখি, পত্রিকা সম্পাদনা ও প্রকাশ, প্রকাশনা সংস্থার কাজ, পিএইচডি গবেষণা কর্ম। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডেও তিনি সক্রিয়। 

সাপ্তাহিক পরিচয় পত্রিকা প্রকাশ ও পাঠকের হাতে পৌঁছে দিতে শিব প্রসাদকে দেখা যায় দিনরাত পরিশ্রম করতে। জীবনকে সৎভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে শিব প্রসাদের শ্রম বিনিয়োগ সময়ের আদর্শ হতে পারে। দুর্নীতি, প্রতারণা, ভণ্ডমি ছাড়া মেধা, সততা ও শ্রম বিনিয়োগে জীবন প্রতিষ্ঠিত করা যায় এবং এটা একটা দর্শন- অধ্যাপক শিব প্রসাদ সেটা অনেকটাই প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছেন। এ পথে কয়েক বৎসর পরেই সুখের সংসার হতো তাঁর। একটা ভাবনা আসে, শিব প্রসাদ কোথায় পেলেন এ পথের প্রেরণা? এরকম কঠিন পথে জীবন চালানোর ব্রত ধারণ করলেন কীভাবে? আমার ধারণা, তাঁর এই পথের প্রেরণার উৎস তাঁর জীবনসঙ্গীনী কণিকা রায়।

শিব প্রসাদের সাথে আমার পরিচয় হয় এক যুগ আগে। ১০/১১ বছর আগের কথা। লালদিঘী মাঠে বই মেলার আসর বসেছিল। মেলায় মনন প্রকাশনের বইয়ের দোকান ছিল। দোকানটিতে আমি কয়েকদিন গিয়েছিলাম। সেটি পরিচালনা করছিলেন একজন মহিলা। একদিন বিকালবেলা ভদ্রমহিলার সাথে আমাকে পরিচয় করিয়ে দেন শিব প্রসাদ। এভাবে, “ও তোমার বদি। ও রোকন, ওর একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা আছে।” শিব প্রসাদের জীবনসঙ্গীর সাথে এভাবেই আমার পরিচয়। চট্টগ্রাম শহরের প্রায় সব বই মেলায় মনন প্রকাশনের দোকান থাকে। বই মেলায় মনন প্রকাশনের দোকান পরিচালনা করতেন শিব প্রসাদের সহধর্মিনী কণিকা রায়। তিনি মনন প্রকাশনের একজন কর্মকর্তাও ছিলেন। তাঁর সাথে শেষ দেখা হয়, ২০১৯ সালের এম. এ. আজিজ স্টেডিয়ামস্থ একুশের বই মেলায়। 

তথ্য অধিদপ্তরের সাবেক কর্মকমর্তা খ্যাতিমান সাহিত্যিক প্রয়াত আব্দুর রশীদ ওয়াসেকপুরীর পুত্র ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক হাফিজুর রশীদ হাসানের অনুরোধে আব্দুর রশীদ ওয়াসেকপুরীর কিছু বই বইমেলায় মনন প্রকাশনের দোকানে বিক্রি করতে দিয়েছিলাম। এই মেলায়ও মনন প্রকাশনের দোকান পরিচালনা করেছিলেন কণিকা রায়। কণিকা রায়কে প্রথমদিন যেমন দেখেছিলাম, ছিমছাম গড়নের কৃষ্ণবর্ণের এক মহিলা। স্বল্পভাষী মানুষ। সাদাসিধা। দেখে মনে হয়েছিল মানুষটি নিরীহ। সর্বোপরি একজন ভদ্র মহিলা। ২০১৯ সালের বইমেলায় তাঁকে শেষবার যখন দেখি, তখনও প্রথমবার দেখার সাথে তাঁর কোন পরিবর্তন বোঝা যায়নি। তাঁকে আমার মূল্যায়ন এরকম, “কণিকা রায় বিলাসী জীবন যাপনে অভ্যস্থ ছিলেন না। স্বামী-সন্তানের সেবাতে সন্তুষ্ট ছিলেন। সন্তানদের সুমানুষ গড়ার স্বপ্ন দেখতেন। বিলাসী জীবন এবং আয়েশের জন্য স্বামীকে মানসিক চাপ দিতেন না। চাইতেন স্বামী আদর্শ জীবনযাপন করুক। এটা চাইতেন বলেই স্বামীর সব কাজে সহযোগী হয়েছিলেন। তাঁর সহযোগিতাই শিব প্রসাদকে সফলতার দ্বারপ্রান্তে নিয়েগিয়েছিল। শিব প্রসাদকে হাতছানি দেওয়া সুখ-সফলতার বাতিঘর ছিল জীবন সঙ্গীনী কণিকা রায়। অনৈতিক কাজ নয়, মেধা আর শ্রম বিনিয়োগে জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার যে পথ শিব প্রসাদ বেছে নিয়েছিলেন তার উৎসও ছিল ‘কণিকা রায়’।

২০১৯ সালের ১৬ই মার্চ অধ্যাপক শিব প্রসাদের জীবনে আসে প্রচণ্ড এক ঝড়। উড়িয়ে নিয়ে যায় জীবনসঙ্গীনীকে। কণিকা রায় পূজোয় যোগ দিতে চট্টগ্রাম শহর থেকে নোয়াখালী যান। মন্দিরে পূজারত অবস্থায় আগুনে দগ্ধ হন তিনি। তাঁকে বাঁচাতে স্বামী শিব প্রসাদ প্রাণপণ চেষ্টা করেছেন। হাসপাতালে ৮ দিন যন্ত্রণা ভুগে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। 

শিব প্রসাদ সম্পাদিত ২৫ জুলাই ২০১৯ ইং প্রকাশিত সাপ্তাহিক পরিচয় পত্রিকার ৮ম পৃষ্ঠায় “চিরতরে চলে গেলেন বইয়ের জগতের হাস্যোজ্বল মানুষ কণিকা রায়” শিরোনামে একটি খবর ছাপানো হয়। খবরটিতে বলা হয়েছে, “শিশু মনন এর স্বত্ত্বাধিকারী সৃজনশীল প্রকাশক কণিকা রায় (৪৯) ৮ মার্চ, শুক্রবার, ২০১৯ নোয়াখালী জেলার সেনবাগ উপজেলার কাদারা গ্রামে একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠানে আকস্মিক, অস্বাভাবিক ও রহস্যজনকভাবে অগ্নিদদ্ধ হন। প্রথমে সেনবাগ হাপতালে, পরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং ১২ মার্চ রাতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করানো হয় তাঁকে। প্রায় ৮ দিন ৯ রাত মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে তিনি ১৬ মার্চ রাত ২টায় শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন।” অন্যদিকে স্ত্রীর অগ্নিদগ্ধ হয়ে মৃত্যুর বিষয়ে শিব প্রসাদ এই লেখককে বলেছেন, “এই ঘটনাটি একটি সুদূর প্রসারী ষড়যন্ত্র। অগ্নিকাণ্ডে  ইলেকট্রিক ডিভাইস ব্যবহার করা হয়ে থাকতে পারে।”

উল্লেখ্য, মোমবাতির আগুন থেকে কণিকা রায়ের শরীরে আগুন লেগেছে এরকম কথা প্রকাশ পায়। তবে মোমবাতির আগুন থেকে অগ্নিদগ্ধ হয়ে কণিকা রায়ের মৃত্যু হয়েছে -এই কথাটি শতভাগ সত্য বলে কণিকা রায়ের স্বামী শিব প্রসাদের মন্তব্য হচ্ছে, “এই ঘটনাটি একটি সুদূর প্রসারী ষড়যন্ত্র। অগ্নিকান্ডের ঘটনায় ইলেকট্রিক ডিভাইস ব্যবহার করা হয়ে থাকতে পারে।” কণিকা রায়ের শরীর অগ্নিদগ্ধ হওয়ার হার এত বেশি গভীর ছিল যে, তাঁকে বাঁচানোর যাবতীয় চিকিৎসার আয়োজন করেও বাঁচানো যায়নি। তাই এটি মোমবাতির আগুন কিনা সন্দেহ পরিবারের।

স্বামী শিব প্রসাদের সন্দেহ বা আশঙ্কা এক বাক্যে নাকচ করা যাবে না। তাঁর বক্তব্যও আমলে নিতে হবে। অর্থাৎ পেশাগত, সম্পত্তিগত, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক যে কোন কারণে শিব প্রসাদ বা তাঁর পরিবারের একটি শত্রুমহল সৃষ্টি হয়েছিল কি না? তারা শিব প্রসাদের জীবন বা তাঁর পরিবারকে ধ্বংস করার একটি ষড়যন্ত্র করেছিল কি না? সেই ষড়যন্ত্রে পা দিয়ে কণিকা রায় কোন সঙ্গী না নিয়ে চট্টগ্রাম থেকে একাকী নোয়াখালীর গ্রামে নিয়েছিলেন কিনা? অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাটি সেই ষড়যন্ত্রের অংশ কি না? এসব বিষয়ে গভীরভাবে ভাবায়। কারণ শিব প্রসাদ ঘটনাটিকে অস্বাভাবিক, রহস্যজনক এবং ষড়যন্ত্র বলে মন্তব্য করেছেন। অধ্যাপক শিব প্রসাদের মন্তব্য সত্য হলে, কীভাবে ষড়যন্ত্র হল? কেন ষড়যন্ত্র হল? কারা ষড়যন্ত্র করল? এসব বিষয় একদিন প্রকাশিত হবে এটা আমাদের বিশ্বাস। আমাদের বিশ্বাস, শিব প্রসাদের সুখের ঘরে অকস্মাৎ হানা দেওয়া দুঃখের দিনগুলো হবে ক্ষণস্থায়ী। 

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট, চট্টগ্রাম।

ও/ডব্লিউইউ