|

পারিবারিক ও সামাজিক প্রচেষ্টায় মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি সম্ভব

Published: Fri, 14 Aug 2020 | Updated: Fri, 14 Aug 2020

মো. আশরাফুল আলম, গাইবান্ধা (বিশেষ সংবাদদাতা) : স্বাস্থ্য প্রত্যাহিক জীবনের একটি অমূল্য সম্পদ। এটি সামাজিক ও ব্যক্তিগত সম্পদের পাশাপাশি শারীরিক সক্ষমতাকে একীভূত করার একটি ইতিবাচক ধারনা। অন্যদিকে মানসিক স্বাস্থ্য সংকট মানুষের বেঁচে থাকার ক্ষেত্রে একটি অন্যতম চ্যালেঞ্জ। মানসিক স্বাস্থ্য ঘাটতির কারনে মানুষ আত্মহত্যার চেষ্টা, অনিয়ন্ত্রিত মাদক গ্রহণ, নিজেকে কষ্ট দেয়া, অনিয়ন্ত্রিত জীবন যাপন, অসামাজিক কর্মকান্ড এমনকি বিষক্রিয়ায় মাধ্যমে নিজেকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিতেও কোন বাধাই কাজ করে না। 

সুন্দর ও সাবলীল জীবন যাপনের জন্য মানসিক স্বাস্থ্যের সুস্থতা জরুরী। আমাদের সমাজে আমরা দেখা যায় দারিদ্রতা, ব্যবসায়ীক দায়-দেনা ও ক্ষয়ক্ষতি, পারিবারিক দ্বন্দ, অপরিনত বয়সে প্রেমের সম্পর্কসহ বিভিন্ন কারনে মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটে থাকে। 

এই বিষয়টি সকলের নিকট গুরুত্বপূর্ণ না মনে হলেও যে ব্যক্তি এই পরিস্থিতির শিকার তিনি অথবা তার পরিবারে এর ভোগান্তী মারাত্বক প্রভাবিত করে। মানসিক অসুস্থতা এমন একটি অবস্থা, যাতে একজন ব্যক্তির চিন্তাভাবনা, আবেগ ও ব্যবহার প্রভাবিত হয়ে থাকে।

ইনোভেশন ফর ওয়েলবিইং ফাউন্ডেশন ও এমএইচএফও বাংলাদেশ নামে ২টি প্রতিষ্ঠান কর্তৃক অনুবাদকৃত একটি বই থেকে মানসিক অসুস্থতার ব্যাপকতা সম্পর্কে জানা গেছে, সেখানে বলা হয়েছে-মানসিক সমস্যার উপস্থিতি সারা বিশ্বেজুড়ে সর্বময়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য মতে ২০৩০ সাল নাগাদ, পৃথিবীতে রোগের বোঝা হিসেবে বিষণ্ণতা থাকবে সবার আগে। 

বিশ্বে ৩০০ মিলিয়নেরও বেশি মানুষ (সব বয়সের) বিষণ্ণতা রোগে ভুগছে, যা কিনা বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ৪.৪ শতাংশের সমতুল্য। পুরুষদের তুলনায় নারীরা বিষণ্ণতা রোগে বেশি ভুগে থাকে (পুরুষ ৩.৬ শতাংশ এবং নারী ৫.১ শতাংশ)। প্রতি বছর প্রায় ৮ লক্ষ লোক আত্ম হত্যা করে থাকে। 

যেখানে বলা হয়েছে ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সের মানুষের মৃত্যুর দ্বিতীয় বৃহত্তম কারণ আত্ম হত্যা।  আরও বলা হয়েছে, সাধরণ জনগোষ্ঠীর তুলনায় গুরুতর মানসিক রোগে ভুগছে এমন মানুষ সাধারণত ১০ থেকে ২০ বছর আগে মারা যায়। এই অকালমৃত্যুর কারণ মূলত তাদের শারীরিক স্বাস্থ্যের অবনতি ও সময়মতো মানসিক স্বাস্থ্যের চিকিৎসা হাতের নাগালে না পাওয়া।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে ‘‘ স্বাস্থ্য হচ্ছে শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক মঙ্গলের একটি পরিপূর্ণ সহাবস্থান। এটি শুধু রোগ বা জরাব্যাধির অনুপস্থিত নয়’’  আর মানসিক স্বাস্থ্য হচ্ছে ‘‘ মানসিক স্বাস্থ্য সার্বিকভাবে ভালো থাকার একটি প্রতিরুপ, যার মাধ্যমে প্রতিটি ব্যক্তি তার নিজস্ব সক্ষমতা অনুধাবন করেন, দৈনন্দিন জীবনের স্বাভাবিক চাপ মোকাবেলা করতে পারেন এবং ফলপ্রসূ ও সফলভাবে কাজ করে সমাজে অবদান রাখেন’’।

আমাদের সমাজে পারিবারিকভাবে কোন ব্যক্তি মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি হলে অথবা মানসিক কষ্ট হচ্ছে তা বুঝতে পারলে প্রাথমিকভাবে তার চিকিৎসায় পরিবারের লোকজনেই সহায়তা করতে পারে। কারণ শারীরিক অসুস্থতার জন্য যেমন প্রাথমিক চিকিৎসা রয়েছে ঠিক তেমনি মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রেও পেশাদার চিকিৎসকের নিকট যাবার আগেই এই প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবা দেওয়া প্রয়োজন। 

মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে প্রাথমিক সেবা প্রদানের লক্ষ্য হচ্ছে: 
১। যে পরিস্থিতিতে ব্যক্তি তার মানসিক অবস্থার জন্য নিজের বা অন্যের বিপদের কারণ হতে পারে, সে পরিস্থিতিতে তাদের জীবন রক্ষা করা;
২) মানসিক সমস্যা যাতে আরো গুরুতর বা ক্ষতিকর পর্যায়ে না পৌছাতে পারে, সেজন্যে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণে তাদের যাহায্য করা;
৩) মানসিক স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধারের পথ সুগম করা;
৪) মানসিক সমস্যায় জর্জরিত ব্যক্তিকে স্বাস্তি প্রদান করা;
৫) সমাজে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করা;
৬) মানসিক রোগ নিয়ে প্রচলিত বৈষম্য ও অন্ধবিশ্বাস দূর করা।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন কারনে মানসিক চাপের ব্যাপকতা অনেক বেশি। বর্তমানে বিশ্বের মতো বাংলাদেশও করোনা ভাইরাসের কারনে মানুষের মনে তীব্র উদ্বেগ আর মানসিক চাপকে বাড়িয়ে দিয়েছে। তাই সামাজিক ও পারিবারিকভাবে  সকলকে সতর্ক থেকে এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেবা গ্রহণ ও প্রদানের ক্ষেত্রে আন্তরিকতার ও উদারতার ব্যাপ্তি ঘাটাতে হবে। 

বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আমরা দেখি যে, পরিবারের কোন না কোন কারনে অথবা নিকটবর্তী মানুষের দ্বারাই মানসিক চাপ অনুভব করে মানসিক সমস্যায় ভূগে থাকেন তাই পরিবারের সচতনতা, সহায়তা এবং সামাজিক উপেক্ষার অবসানের মাধ্যমেই এই পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব হতে পারে বলে অনেকের বিশ্বাস।

আইআর /