|

ইটনার যে সুইস গেইটের কোনো ‘মা-বাপ’ নেই

Published: Sat, 14 May 2022 | Updated: Sat, 14 May 2022

বিজয়কর রতন, মিঠামইন (কিশোরগঞ্জ) প্রতিনিধি: কিশোরগঞ্জের ইটনা সদর ইউনিয়নের বলদা ফেরিঘাট পার হয়ে বলদা হাওরে পা রাখতেই হাতের ডান দিকে চোখে পড়বে একটি সুইস গেইট। তিন-চার বছর আগে নির্মাণ করা এই সুইস গেইটের এখন কোনো গেটও নেই। পাশ থেকে মাটিও ক্ষয়ে গেছে। তাই সুইস গেইটের ভেতর কিংবা এর আশপাশ দিয়ে পানির আসা-যাওয়ায় কোনো বাধা নেই। 

সুইস গেইটটিতে পানি আটকানোর যে গেট থাকার কথা তা ক্ষয়ে গেছে অনেক আগেই। তাই পানি আটকানোর জন্য গেটের মুখেই কেউ মাটি ভরাট করে রেখেছে। এ অবস্থায় যে খালের পানির প্রবাহ নিয়ন্ত্রণের জন্য এটি নির্মাণ করা হয়েছিল, সেই খালটি বর্তমানে গেইটের ভেতর দিয়ে না গিয়ে গতিপথ বদল করে এর পাশ দিয়েই বয়ে গেছে। 

স্থানীয় কৃষকরা জানিয়েছেন, এই সুইস গেইটটি নির্মাণ করার পর তাদের কোনো কাজে আসেনি। এ ছাড়া এই সুইস গেইটকে নির্মাণ করেছে কিংবা এর দেখভালের দায়িত্ব কার সেটাও জানেন না তারা। 

সুইস গেইটের পাশেই দেখা হয় কৃষক কামরুল ইসলামের সঙ্গে। বলদা হাওরে সাত একর জমি করেছেন তিনি। তিনি জানান, তিন-চার বছর আগে নির্মাণের পর এটিকে কেউ দেখতেও আসেননি। তাই এর কোনো সংস্কারও হয়নি। পাশের খালটিও ভরাট করতে কেউ আসেননি। কৃষকরা অবশ্য নিজ উদ্যোগে জমির ফসল রক্ষার্থে সুইস গেইটের ৩০ গজ সামনে একটি বাঁধ তৈরি করেন প্রতি বছর। 

কামরুল ইসলাম বলেন, ‘এটা নামে সুইস গেইট, কোনো কামের না।’ একই হাওরের হালুয়া খালের পাড়ে তিন একর জমি চাষ করেছেন বানিয়াহাটির কৃষক বোরহান উদ্দিন। তিনি বলেন, ‘এই সুইস গেইট নির্মাণের সময় আমরা ভেবেছিলাম এদিক দিয়ে হাওরে পানি ঢোকার আর সুযোগ নেই। কিন্তু এখন দেখছি তার উল্টোটা। এর গেট নষ্ট হয়ে পড়ে আছে কেউ কোনো খোঁজখবরও নেয় না। সংস্কারও করে না। আবার এর পাশ দিয়ে যে খালটি চলে গেছে সেটি ভরাট করারও কেউ নেই।’

এই হাওরের জিরাতি কৃষক আব্দুল কাদির সুইস গেইটটিকে বেওয়ারিশ আখ্যা দিয়ে বলেন, ‘এই সুইস গেইটের কোনো মা-বাপ নেই।’ যে সুইস গেইটের কোনো ‘মা-বাপ’ নেই খালের পানি এখন সুইস গেইটের পাশ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, উজান থেকে নেমে আসা পানি সুইস গেইটের পাশ দিয়েই ধীরে ধীরে প্রবেশ করছে। তবে সেই পানিকে আটকে দিয়েছে ৩০ গজ সামনে কৃষকদের নিজ উদ্যোগে নির্মাণ করা নতুন বাঁধটি। এই সুইস গেইটের বিষয়ে খোঁজ নিতে ইটনা এলজিইডি অফিসে গেলে সেখানকার উপজেলা সহকারী প্রকৌশলী মিজানুর রহমান জানান, এটি তারা নির্মাণ করেননি। কারা নির্মাণ করেছেন সেটাও তিনি জানেন না। 

তবে এই অফিসের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা দাবি করেছেন, সুইস গেইটটি বিএডিসি নির্মাণ করেছে। কিন্তু এখন তারা সেটি স্বীকার করবে না। বিএডিসি অফিসে গিয়েও এমন নজির দেখা গেছে। সেখানকার উপজেলা সাব-অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার মো. রনি মিয়া বলেন,  সুইস গেইটটি বিএডিসি নির্মাণ করেনি। বিএডিসি নির্মাণ করলে আমার কাছে তথ্য থাকতো।’ 

এরপর মোবাইল ফোনে যোগাযোগর চেষ্টা করা হয় পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মতিউর রহমানের সঙ্গে। তবে তিনি কোনো সাড়া দেননি। পরে যোগাযোগ করা হয় পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-সহকারী প্রকৌশলী রিয়াজুল ইসলামের সঙ্গে। তিনিও এই সুইস গেইটটি করা নির্মাণ করেছে তার কিছুই জানেন না। রিয়াজুল ইসলাম বলেন, ‘এর পাশ পানি ঢুকছে শুনে আমি কিছু জিও ব্যাগ পাঠিয়েছিলাম। পরে শুনেছি কৃষকেরা নিজ উদ্যোগে একটি বাঁধ তৈরি করে নিয়েছেন।’ 

যে সুইস গেইটের কোনো ‘মা-বাপ’ নেই, খালে পানি ঠেকাতে সুইস গেইট থেকে ৩০ গজ দূরে কৃষকেরাই একটি বাঁধ নির্মাণ করেছেন। কেউই যখন স্বীকার করেছে না সুইস গেইটটি কে বা কারা নির্মাণ করেছে, এ অবস্থায় স্থানীয় কৃষকদের প্রশ্ন বেওয়ারিশ এই সুইস গেইটটি তবে নির্মাণ করল কে? আর এর তদারকির দায়িত্বই বা কার হাতে। 

ইটনা উপজেলার সংশ্লিষ্ট দপ্তরের খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, সুইস গেইট নির্মাণের বিষয়ে কেহই অবগত নয়। অবশেষে বিএডিসির একজন স্টোর কিপার নাম প্রকাশ না করা শর্তে বলেন, তত্বাবধায়ক সরকারের আমলে এ সুইস গেইট নির্মাণ করা হয়। সম্ভবত ২০০৬-০৭ অর্থ বছরে কাজটি বাস্তবায়ন করা হয়। ময়মনসিংহের মনির এন্টারপ্রাইজ নামে একটি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান সুইসগেইট নির্মাণ করেছেন। 

ইটনা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাফিসা আক্তারের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, অকাল বন্যার সময় সুইসগেইটখানি নজরে আসে। সংশ্লিষ্ট দপ্তরের খোঁজ নিয়ে পরবর্তী ব্যবস্থা নিবেন।

 

ডব্লিউইউ