|

অষ্টগ্রামে আধিপত্য নিয়ে সংঘর্ষে হত্যা, লুটপাট ও ভাংচুর

Published: Sun, 06 Sep 2020 | Updated: Mon, 07 Sep 2020

অজিত দত্ত, অষ্টগ্রাম (কিশোরগঞ্জ) : কিশোরগঞ্জের হাওড়াঞ্চালীয় উপজেলা অষ্টগ্রামে তুচ্ছ ঘটনার জেরে রেনু মিয়া (৪২) নামে একজনকে ডেকে নিয়ে হত্যা হত্যার ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় লুটপাট, ভাংচুরের ঘটনাও ঘটে। নিহত রেনু মিয়া (৪২) ঢালারকান্দি গ্রামের মৃত ফজর আলীর পুত্র। উপজেলার কলমা ইউনিয়নের ঢালারকান্দি ও পূর্ব অষ্টগ্রাম ইউনিয়নের ইসলামপুর গ্রামে গত মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) রাতে এ হত্যাকাণ্ড ও ভাংচুর-লুটপাট হয়। এ ঘটনায় ৪২ জনকে আসামি করে শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে বলে জানান অষ্টগ্রাম মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কামরুল ইসলাম মোল্ল্যা। 

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ঢালারকান্দি গ্রামের গাজী মিয়া ও আব্দুল্লাহ মেম্বরের মধ্যে এলাকায় আধিপত্য বিস্তার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলে আসছিলো। তারই জেরে মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) বিকেলে কলমা ইউনিয়নের ঢালারকান্দি গ্রামের গাজী গ্রুপের কালু মিয়ার পুুত্র শফিকুল ইসলামকে (১৪) পূর্ব শত্রুতার জের ও এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের লক্ষ্যে আবদুল্লাহ গ্রুপের আব্দুল্লাহ, নাজু মিয়া, কুতুব মিয়া, ওয়াদুদ, লিটন ও নূর মিয়া প্রথমে আক্রমণ করে গুরুতর আহত করায় ঘটনার সূত্রপাত হয় বলে অনুসন্ধান ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়। পরে শফিকুলকে চিকিৎসার জন্য প্রথমে অষ্টগ্রাম ৫০ শয্যার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক উন্নত চিকিৎসার জন্য কিশোরগঞ্জ ২৫০ শয্যার আধুনিক সদর হাসপাতালে প্রেরণ করেন। 

পরে হামলার খবর পেয়ে গাজী গ্রুপের লোকজন আব্দুল্লাহ গ্রুপের লোকজনকে ধাওয়া দিলে তা সংঘর্ষে রূপ নেয়। মুঠোফোনে আব্দুলাহ গ্রুপের লোকজন নদীর পশ্চিমপাশে পূর্ব অষ্টগ্রাম ইউনিয়নের ইসলামপুর গ্রামে বসবাসকারী আব্দুল্লাহ মেম্বরের চাচাতো ভাই কাশেম মিয়াকে সংঘর্ষের কথা জানায়। পরে কাশেম মিয়া উত্তেজিত হয়ে একই গ্রামে বসবাসকারী গাজী গ্রুপের গাজী মিয়ার চাচাতো ভাই সোলেমান মিয়া মসজিদ থেকে নামাজ পড়ে বের হলে তাকে আক্রমণ করার লক্ষ্যে সোলেমান মিয়ার গলায় থাকা গামছা ধরে টানাটানি করে। পরে মসজিদে থাকা মুসল্লিগণ ঘটনাস্থলে এসে বিষয়টি মীমাংসা করে কাশেম মিয়া ও সোলেমান মিয়াকে স্ব স্ব বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়। 

কিন্তু বিষয়টি মেনে নিতে পারেনি ইসলামপুর গ্রামের সোলেমান গ্রুপের লোকজন। পরে ঘটনার দিন মঙ্গলবার দিবাগত রাত সোয়া বারোটার দিকে গাজী গ্রুপের গাজী মিয়ার চাচা সোলেমান মিয়ার লোকজন আরজু মিয়া, মিস্টার মিয়া, আবুল, ফজল, বাছির মিয়া, বরজু মিয়া, কাইয়ুম মিয়া, আব্দুল হালিম, নাছির মিয়া, সিজল মিয়াসহ প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ জনের একটি দল কাশেম মিয়ার বাড়িতে হামলা চালায়। 

এসময় সোলেমান মিয়ার লোকজন কাশেম মিয়ার বাড়িতে ও তার চাচাতো ভাইয়ের দোকানে ব্যাপক ভাংচুর ও লুটপাট চালিয়ে একটি নৌকা, নগদ টাকা ও মালামালসহ প্রায় ২৫ লক্ষ টাকার জিনিসপত্র নিয়ে যায় বলে দাবি করা হয়। হামলায় কাশেম মিয়ার চাচাতো ভাই হাফিজ মিয়া, হুমায়ুন মিয়া, মোখলেছ মিয়া ও আবু তালেব গুরুতর আহত হয়। আহতদেরকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও কিশোরগঞ্জ জেলার বাজিতপুর উপজেলার জহুরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে উন্নত চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয়। এদের মধ্যে হুমায়ুন ও মোখলেছের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানা যায়।   
 
সংঘর্ষের বিষয়টি একটা সময় দুই গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে। নিহত রেনু মিয়ার স্ত্রী জুরুন নেছা অষ্টগ্রাম উপজেলা প্রেসক্লাবের সাংবাদিকদের জানান ঘটনার দিন রাতভর দফায় দফায় চলা সংঘর্ষের কথা। পরে মঙ্গলবার রাতে ঢালারকান্দি গ্রামের রেনু মিয়াকে গাজী গ্রুপের গাজী মিয়া (৫৫) দোকান থেকে ডেকে নিয়ে গেলে সাহেদ আলী, ফারুক মিয়া, আরজু মিয়াসহ অন্যান্যরা টেনে-হিচরে গোপন স্থানে নিয়ে যায়। পরে তাকে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে ও জবাই করে মৃত্যু নিশ্চিত করে পূর্ব ঢালারকান্দি গ্রামের দক্ষিণ দিকে গাজী মিয়ার বাড়ির সামনে বর্ষার ভাসমান পানিতে তার লাশ ফেলে দেয়। 

পরে নিহত রেনু মিয়ার পরিবারের লোকজন রাতভর খোঁজাখুঁজির পর বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) সকালে গাজী মিয়ার বাড়ির পাশ থেকে রেনুর লাশ উদ্ধার করে। অষ্টগ্রাম মডেল থানা-পুলিশ খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে লাশ উদ্ধার করে কিশোরগঞ্জ ২৫০ শয্যার আধুনিক সদর হাসপাতালে ময়নাতদন্তের জন্য প্রেরণ করে। এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করলে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা হয়। এ ঘটনায় শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) রাতে নিহত রেনু মিয়ার স্ত্রী জহুরুন্নেছা বাদী হয়ে অষ্টগ্রাম মডেল থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।    

রেনু হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মো. আরিফুর রহমান জানান, নিহত রেনু মিয়ার স্ত্রী বাদী হয়ে ৩৬ জনকে আসামি করে মামলা দায়ের করেছেন। ঘটনায় জড়িত আসামিরা হত্যাকাণ্ডের পরই এলাকা ছেড়ে পালিয়েছে। তাদের গ্রেপ্তারের জন্য পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। 

অষ্টগ্রাম মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কামরুল ইসলাম মোল্ল্যা জানান, ঢালারকান্দির রেনু মিয়া হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তার স্ত্রী বাদী হয়ে মামলা দায়ের করেছেন। ইসলামপুরের হামলা, লুটপাট ও ভাংচুরের ঘটনায় ৪২ জনকে আসামি করে শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) মামলা সম্পন্নের প্রস্তুতি চলছে। আসামিরা পলাতক রয়েছে। তবে আসামিদের ধরতে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

ও/ডব্লিউইউ