|

বিলুপ্তির পথে সাতক্ষীরার টালী শিল্প

Published: Sun, 23 Feb 2020 | Updated: Sun, 23 Feb 2020

ফারুক রাজ, সাতক্ষীরা : অসাধু ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট ও মধ্যসত্বভোগীদের দৌরাত্মে প্রায় বিলুপ্তির পথে সাতক্ষীরার সম্ভাবনাময়ী টালী শিল্প। এক সময়ের সাতক্ষীরার অর্থনীতির এক নম্বর এই খাত আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। পেশা হারিয়ে বিপাকে এ শিল্পের সাথে সংশ্লিষ্ট মালিক ও শ্রমিকরা।

দেশের প্রায় সব ক্ষেত্রেই আধুনিকতার ছোঁয়া লাগলেও টালী কারখানা আধুনিক না হওয়া, উৎপাদন খরচ বাড়লেও দাম না বাড়া, সরকারের সুদৃষ্টির অভাব ও সহজ শর্তে ঋণ না পাওয়া এই শিল্প ধ্বংসের অন্যতম কারণ। তবে এখনো হাতে গোনা কয়েকজন কারখানা মালিক এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলার মুরারীকাটি ও শ্রীপতিপুর এলাকায় প্রথমে টালী উৎপাদন শুরু হয়। পরে আশেপাশের আরো কয়েকটি গ্রামে পর্যায়ক্রমে ৩৫-৪০টি কারখানা গড়ে উঠলেও এখন তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৮-১০টিতে।

Image removed.

স্থানীয় এসব টালী কারখানার মালিক ও শ্রমিকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, ২০০০ সালের দিকে কলারোয়ায় টালী নির্মাণ শুরু হয়। সেসময় রাফাইলো আলদোঁ নামের এক ইতালির ব্যবসায়ী অসেন বাংলাদেশে। দেশের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে তিনি নারায়ণগঞ্জে টালী তৈরীর কাজ শুরু করেন। কিন্তু সেখানকার মাটি টালী তৈরির উপযুক্ত না হওয়ায় তিনি দেশে ফিরে যান।

রাফাইলো আলদোঁ ফিরে গেলেও তার বাংলাদেশি প্রতিনিধি রুহুল আমিন দেশের বিভিন্ন স্থানে পোড়া মাটির টালী তৈরির জন্য মাটি খুঁজতে থাকেন। একপর্যায়ে তিনি সাতক্ষীরার কলারোয়ায় এসে পেয়ে যান টালী তৈরির উপযোগী মাটির সন্ধান। তখন কলারোয়ায় শুধুমাত্র ছাউনির কাজে ব্যবহৃত টালী (স্থানীয় নাম ‘খোলা’) তৈরি করা হতো। মূলত তিনি এই টালী দেখেই বুঝতে পারেন এখানকার মাটি দিয়েই রপ্তানিযোগ্য টালী তৈরি সম্ভব।

তাই ‘কারার এক্সপোর্ট ইমপোর্ট প্রাইভেট লিমিটেড’র মালিক রুহুল আমিন কলারোয়ার পালদের পোড়া মাটি দিয়ে তৈরি রপ্তানিযোগ্য টালীর সম্ভাবনার গল্প শোনান। সেই থেকে শুরু হয় বিভিন্ন নকশার টালী তৈরি। প্রথম দিকে এখানকার টালী ইতালিতে রপ্তানি হতো। এ কারণে কলারোয়ার এ এলাকা ধীরে-ধীরে ‘ইতালিনগর’ এবং পোড়া মাটির টালী ‘ই-টালী’ নামে পরিচিত হতে থাকে।

প্রথমদিকে বাংলাদেশে এই টালী শুধুমাত্র ঘরের ছাউনিতে ব্যবহার করা হলেও ইতালিতে এই টালী ঘরের সৌন্দর্য্য বৃদ্ধির জন্য ছাদের উপর ছাড়াও ঘরের মেঝে ও দেয়ালেও ব্যাবহার করা হতো। বাড়ির সৌন্দর্য বর্ধণে ব্যবহৃত এই ‘ই-টালী’ অল্পদিনেই নজর কাড়ে জার্মান, দুবাই, মালয়েশিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, ইংল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশে। জাহাজে করে রপ্তানি শুরু হয় এসব দেশে। মেংলা বন্দর দিয়ে কলারোয়ার মাটির তৈরি টালী রপ্তানী হতে থাকে ইউরোপ-আমেরিকার বিভিন্ন দেশে।

তবে টালী রপ্তানির সেই যুগ এখন শুধুই ইতিহাস। আগে যেখানে বছরে চারশ কন্টেইনার টালী বিদেশে রপ্তানি করা হতো এখন তা দুইশ’ কন্টেনারেরও নিচে নেমে এসেছে। কমে এসেছে টালীর দামও। মধ্যসত্বভোগীদের দৌরাত্মের কারণে ছোট টালী প্রতি পিস সাড়ে পাঁচ টাকা থেকে ছয় টাকায় বিক্রি হচ্ছে যার উৎপাদন খরচও প্রতি পিস সাড়ে পাঁচ টাকা। অন্যদিকে বড় টালী প্রতি পিস বিক্রি হচ্ছে ৩৫টাকা দরে যা প্রতি পিস উৎপাদনে প্রায় ৩৫টাকা খরচ। আর অসাধু ব্যবসায়ীদের শক্তিশালী সিন্ডিকেটের কারণে ক্ষদ্র-ক্ষুদ্র কারখানা মালিকরা এই টালী ব্যবসা থেকে ঝরে পড়তে শুরু করে।

টালী রপ্তানীর দুই মাস পর টাকা হাতে পান কারখানা মালিকরা। যথা সময়ে টাকা না পাওয়ায় এই শিল্প ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌছানোর আরো একটি বড় কারণ। তার ওপর আবার মধ্যসত্বভোগীদের কারণে অনেকে মাসের পর মাস কেটে গেলেও টাকা পান না।

এসব ব্যাপারে কলারোয়ার মুরারীকাটি এলাকার একটি টালী কারকাখানার মালিক শ্রীকান্তপাল বলেন, আগে যেভাবে ব্যবসা চলতো এখন সেভাবে চলে না। আগে চারশ কন্টেইনার মাল যেত এখন দুই থেকে আড়াইশ কন্টেইনার যায়। আগে আমার কারখানায় ৪০ জনের বেশি শ্রমিক কাজ করতো এখন মাত্র ১০জন কাজ করে। কোন রকমে ডাল-ভাত খেয়ে আমরা বেঁচে আছি।

কাজ হারিয়ে নতুন কাজের সন্ধানে থাকা টালী শ্রমিক বদরউদ্দিন বলেন, আগে আমরা ৩০-৩৫ জন এই কারখানায় কাজ করতাম। এখন কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। কাজ নেই নতুন কাজ খুঁজছি। পরিবার পরিজন নিয়ে খুব ভালো নেই।

কারখানা মালিক মনিরুল ইসলাম বলেন, আগে ব্যবসা ভালোই চলতো। এখন আধুনিকতার ছোয়ায় মানুষ ঘরের ছাউনিতে টিন ও সিমেন্ট শিট ব্যবহার করছে। কিন্তু টিনের চেয়ে টালী কিন্তু অনেক ভালো। ঘরের ছাউনিতে টালী ব্যবহার করলে গরমের সময় ঘর ঠান্ডা আর শীতের সময় গরম থাকে তবুও মানুষ এখন টালীর ব্যবহার বন্ধ করে দিয়েছে। তিনি আরো বলেন, টালী শ্রমিকরা সহজে অন্য কোথাও কাজ খুঁজে নিতে পারছে কিন্তু আমরা তাও পারছিনা। দিনটা কষ্টেই যাচ্ছে।

সম্ভাবনাময়ী টালী শিল্পের এই দুর্দিনে খুব হতাশ কলারোয়া টালী কারখানা মালিক ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সভাপতি ও কলারোয়া ক্লে টাইলস-এর মালিক গোষ্ট চন্দ্র পাল। প্রথমে তিনি এ বিষয়ে সংবাদকর্মীদের সাথে কথা বলতেই রাজি হননি। পরে অনেকটা ক্ষোভের সাথেই জানালেন ব্যবসার এমন দুঃসময়েও স্থানীয় একজন পৌর কাউন্সিলর সিন্ডিকেট গড়ে তুলে ব্যবসার পরিবেশ আরো নষ্ট করছেন।

কলারোয়ার টালী শিল্প এ উপজেলার ঐতিহ্য ও পরিচিতির একটা বিরাট অংশ। কিন্তু এটি এখন বিলুপ্তির পথে। এই শিল্পকে রক্ষা করা দরকার। সরকারের কাছে আমাদের আকুল আবেদন এই শিল্পকে রক্ষ করতে যে সমস্ত পদক্ষেপ নেওয়া দরকার অতিদ্রুত সেসব পদক্ষেপ নেওয়া হোক।

Image removed.

টালী শিল্পের এই দুর্দিনের পেছনে এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ীরা দায়ী উল্লেখ করে কলারোয়া উপজেলা চেয়ারম্যান আমিনুল ইসলাম লাল্টু বলেন, এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট গড়ে তুলে সম্ভাবনাময়ী এই শিল্পকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছে। আর মধ্যসত্বভোগীরা তৃণমূলের কারখানা মালিকদের কাছ থেকে টালী নিয়ে রপ্তানি করলেও তাদেরকে ঠিকমতো টাকা পরিশোধ করে না, ফলে তারা এ ব্যবসা থেকে ছিটকে পড়েছে। যারা এই শিল্পকে এক সময় সম্ভাবনার চুড়ান্ত শিখরে নিয়ে গিয়েছিলো তাদের অনেকেই আজ ঠিকমতো খাওয়া পায়না। আর মধ্যসত্বভোগীদের আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ।

তিনি আরো বলেন, বর্তমানে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায়। এই সরকারের প্রধান গরিবের বন্ধু, কৃষকের বন্ধু এবং প্রান্তিক কুটির শিল্পের সাথে জড়িতদের বন্ধু। আমরা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন জানাই কলারোয়ার সম্ভামনাময়ী এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে স্বল্প সুদে অথবা বিনা সুদে কারখানা মালিকদের ঋণের ব্যবস্থা করা হোক। আর যারা সিন্ডিকেট গড়ে তুলে এই শিল্পকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌছে দিয়েছে তাদেরকে সরকারিভাবে প্রতিহত করা হোক।

ও/ডব্লিউইউ