|

মুক্তিযুদ্ধ

Published: Sun, 26 Dec 2021 | Updated: Sun, 26 Dec 2021

মুক্তাঞ্চল প্রতিষ্ঠায় আবেদ আহমেদের গল্প

আশিকুজ্জামান, ঢাকা

একাত্তরের মার্চে পাকিস্তানি সৈন্যরা নিরস্ত্র বাঙালিদের ওপর হত্যাযজ্ঞ শুরু করলে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ প্রতিবেশী দেশ ভারতে আশ্রয় নেওয়া শুরু করে। ভারতে যেতে যে প্রধান রুটগুলো ব্যবহার করা হয়েছিল, তার মধ্যে অন্যতম একটি ছিল আড়িয়াল খাঁ ও ব্রহ্মপুত্র নদ বিধৌত নরসিংদী জেলার বেলাব-মনোহরদী অঞ্চল ব্যবহার করে ভারতের আগরতলায় পৌঁছানো।

রাজধানী ঢাকার অদূরে অবস্থিত নরসিংদী জেলার বেলাব-মনোহরদী অঞ্চল নদী-খাল-জলা এবং ঝোপ-জঙ্গল-গাছপালা ঘেরা হওয়ায় ভৌগোলিকভাবে বেশ দুর্গম ছিল। ঢাকা ও এর আশপাশের অঞ্চলের মানুষ যখন চরম অনিরাপত্তা ও জীবন শঙ্কায় ছিল তখন নিরাপদে ভারতের আগরতলায় যাওয়ার রাস্তা হিসেবে এই এলাকা ব্যবহার করত। ত্রিপুরার আগরতলায় ২ নম্বর ও ৩ নম্বর সেক্টর সদর দপ্তর অবস্থিত হওয়ায় এবং এর নিকটবর্তী অঞ্চল হিসেবে এই এলাকা শত্রুমুক্ত রাখা ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি অন্যতম দায়িত্ব ও নির্দেশনা। বাংলাদেশের অভ্যন্তরে এই সেক্টর দুটির আওতাভুক্ত এলাকার লোকজন অস্ত্র-গোলাবারুদ ও যুদ্ধের রসদ আনা-নেওয়ার জন্য এবং শরণার্থীরা এই এলাকাকে নিরাপদ রুট হিসেবে ব্যবহার করত।

একাত্তরে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে বেলাবো-মনোহরদী অঞ্চল দিয়ে ভারতের আগরতলায় চলাচলের পথকে শত্রুমুক্ত রাখাতে ভূমিকা রাখে এফএফ গেরিলা বাহিনী এবং নিয়মিত বাহিনীর একটি দল। এফএফ গেরিলা এবং নিয়মিত— এই দুই বাহিনীর সমন্বয়ে এই এলাকা মুক্তাঞ্চল হিসেবে প্রতিষ্ঠা হয়। নিয়মিত বাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন ইপিআরের কাজী আকমল ও কাজী ওসমান ভ্রাতৃদ্বয়। আর এফএফ গেরিলা বাহিনীর কমান্ডার ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা আবেদ আহমেদ।

ইনকা সাম্রাজ্যের বার্তা প্রেরণ পদ্ধতির মতো তাঁরা পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে এই এলাকায় নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলয় তৈরি করেছিলেন। বেলাব থানার বিন্নাবাইদ ইউনিয়নে জন্ম আবেদ আহমেদ রাজনীতিরসূত্রে এই এলাকার ভৌগোলিক অবস্থা সম্পর্কে আগে থেকেই নখদর্পণে ছিলেন। ফলে গেরিলা যুদ্ধে তিনি ও তাঁর সঙ্গীরা একের পর এক সাফল্য অর্জন করেন।

#যুদ্ধদিনের মনোহরদী-বেলাবো কেন গুরুত্বপূর্ণ?

সে সময় বলা হতো এটি “বাংলাদেশের আগরতলা”। মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতের আগরতলায় বাংলাদেশিরা যেমন নিরাপদ অনুভব করত, যুদ্ধে তাড়া খাওয়া বিপন্ন ব্যক্তিরা ঠিক তেমনটিই বোধ করত এই বেলাব-মনোহরদী এলাকায় পৌঁছে। ঢাকা-গাজীপুর-টাঙ্গাইল-ময়মনসিংহ-কিশোরগঞ্জ ইত্যাদি জেলার লোকজন কখনো নৌকায়-কখনো পায়ে হেঁটে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্চারামপুর, নবীনগর, কসবার মনতলা-মনিহন্দ ও ভারতের চারিপাড়া এবং সরাইলের আজবপুর, নাসিরনগর, হরিণবেড় এবং মাধবপুরের তেলিয়াপাড়া-কাতলামারা ইত্যাদি সীমান্ত পথে পাড়ি দিত। এই রুটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল, আগরতলায় অবস্থিত বিভিন্ন ক্যাম্পে যুদ্ধের ট্রেনিং নিতে যাওয়া তরুণ-যুবা ও শরণার্থীদের নিরাপদে পৌঁছার রাস্তা নির্বিঘ্ন রাখা, অস্ত্র-গোলাবারুদ ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্যাদি আদান-প্রদান।

 এফএফ গেরিলা বাহিনীর কমান্ডার আবেদ আহমেদ এবং নিয়মিত বাহিনীর কাজী আকমল ও কাজী ওসমান ভ্রাতৃদ্বয়ের পরিকল্পনা ও পরিচালনায় এই এলাকায় বেশ কয়েকটি যুদ্ধ সংগঠিত হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো রামপুর, মাধুপুর কাচারী, মনোহরদী সদর পাকবাহিনীর ঘাঁটি, দশদোনা, বিলাগী এবং পোড়াদিয়া থেকে চরসিন্দুর পর্যন্ত পলায়ন পর শত্রুসেনাদের মোকাবেলা ও পিছু ধাওয়া। মুক্তিযুদ্ধের সময় অত্রাঞ্চলের নিরাপত্তা বিবেচনায় মানুষের মুখে মুখে এই এলাকা বাংলাদেশের “আগরতলা” নামে খ্যাত ছিল।

যুদ্ধের সময় তরুণ আবেদ আহমেদ প্রথমে ভারতের আগরতলার জয়নগর স্কুল ইয়ুথ ক্যাম্প থেকে প্রশিক্ষণের জন্য অম্পিনগর ট্রেনিং সেন্টারে প্রেরিত হন। সেখানে নিয়মিত যুদ্ধের জেনারেল ট্রেনিং নেন। এখানে অবস্থানকালীন ৫টি কোম্পানি থেকে বাছাই করা শিক্ষিত-মেধাবী তরুণ নিয়ে আলাদা করে গেরিলা প্রশিক্ষণ দিতেন মেজর আব্রাহাম। অম্পিনগরে প্রশিক্ষণ শেষে তিনি চূড়ান্ত গেরিলা প্রশিক্ষণ সমাপ্ত করেন মেলাঘরে মেজর এটিএম হায়দারের নেতৃত্বে।

 প্রশিক্ষণে যাতে প্রশিক্ষক বাড়তি সুবিধা না দেয়, সে জন্য নিজের রাজনৈতিক পরিচয় গোপন রেখে প্রশিক্ষণ শেষ করেন। অসামান্য দক্ষতা ও গেরিলা যুদ্ধের কলা-কৌশল নিপুণভাবে আয়ত্ত করায় ২ নম্বর সেক্টরের প্রধান কমান্ডো মেজর এটিএম হায়দারের নজরে আসেন তিনি। দায়িত্ব পান এফএফ গেরিলা অধিনায়ক হিসেবে বেলাবো-মনোহরদী ও সংলগ্ন গেরিলা অঞ্চলকে শত্রু মুক্ত রাখার।

 
#রাজনীতিতে আসা যেভাবে
ছাত্রজীবনে অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন তিনি। মানিকগঞ্জ সরকারি হাই স্কুল থেকে মাধ্যমিক পরীক্ষায় ডিস্টিংশনসহ প্রথম বিভাগে পাশ করেন। ১৯৬২ সালে কিশোরগঞ্জের গুরুদয়াল কলেজে ভর্তি হন। এখানে তখন দেশব্যাপী চলা ৬২ ’র হামুদুর রহমান কমিশনের শিক্ষা সংকোচন নীতি বাতিলের দাবিতে আন্দোলন চলছিল। সে সময়ে তিনি বর্তমান মহামান্য রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদের সান্নিধ্যে আসেন এবং তাঁর হাত ধরে ছাত্ররাজনীতির হাতেখড়ি নেন।

তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তানের গভর্নর মোনায়েম খাঁ’র বাড়ি ছিল কিশোরগঞ্জে। তিনি মোনায়েম-বিরোধী ছাত্রআন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা রাখেন। ৬৬ ’র ছয় দফা আন্দোলনে মহামান্য রাষ্ট্রপতি ও তিনি একসঙ্গে নেতৃত্ব দেন। এই কলেজের ১৯৬৫-৬৬ সালে ছাত্র সংসদের ভিপি ছিলেন বর্তমান মহামান্য রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ এবং পরবর্তী ৬৬-৬৭ সালের ছাত্র সংসদের ভিপি নির্বাচিত হয়ে তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন আবেদ আহমেদ।

 বিএসসি পড়াকালীন ৬৮ ’র আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনে জড়িত থাকার কারণে পুলিশ তাঁর বিরুদ্ধে হুলিয়া জারি করে।

 ১৯৬৯ সালের গণ অভ্যুত্থানে আইয়ুব-সমর্থক বিডি মেম্বারদের জোর পূর্বক পদত্যাগ করতে বাধ্য করেন। এ আন্দোলন করতে গিয়ে তিনি মামলার আসামি হন। আর এই মামলার জামিন বিষয়ে কথা বলতে গিয়েই প্রথম তিনি বঙ্গবন্ধুর সাক্ষাৎ এবং স্নেহস্পর্শ লাভ করেন।

 ১৯৭০ সালে তরুণ এই ছাত্রনেতা মনোহরদী থানা আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।

#যুদ্ধে আসা;
১৯৬৯-৭০ এ চলে আসেন তৎকালীন নারায়ণগঞ্জ মহকুমার বেলাব-মনোহরদী অঞ্চলে নিজ এলাকায়। ৭০ ’র জাতীয় নির্বাচনে তিনি মনোহরদী থানা আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক হিসেবে অত্র অঞ্চলে মূল সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করেন। বঙ্গবন্ধুর ডাকে মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়ার জন্য ভারতে মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ নেন। যুদ্ধের সময় নিজের রাজনৈতিক পরিচয় লুকিয়ে রেখেছিলেন। চাইলেই তিনি এমপিএ-এমএনএ’দের সঙ্গে থেকে দাপ্তরিক কোনো কাজে যুক্ত হতে পারতেন। কিন্তু তাঁর মনে ছিল সরাসরি রণাঙ্গনে যুদ্ধ করার অটল প্রত্যয়। এমপিএ ফকির সাহাব্বুদ্দিন (প্রথম অ্যাটর্নি জেনারেল), অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান ভূইয়া এমএনএ প্রমুখ কংগ্রেস ভবনে থাকার জন্য চাপাচাপি করা সত্ত্বেও তিনি পার্শ্ববর্তী জয়নগর স্কুল ইয়ুথ ক্যাম্পে যোগ দেন।

চূড়ান্ত গেরিলা প্রশিক্ষণ নিয়েছেন সেক্টর কমান্ডার মেজর এটিএম হায়দারের কাছ থেকে। নিজের যোগ্যতায় নজর কেড়েছেন সেক্টর প্রধানের। তার সঙ্গে স্মৃতির গল্পও রয়েছে অনেক।

 ভারতে প্রশিক্ষণকালীন সময়ের কথা বলতে গিয়ে এই মুক্তিযোদ্ধা বলেন, মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে ছাত্ররাজনীতি করার সময়ই আমার পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সংগঠিত স্বাধীনতা-বিপ্লবের ইতিহাস পাঠ করা ছিল। মাত্র নয় মাসে দেশ স্বাধীন হবে, সেটা ছিল অচিন্তনীয়। তাই দীর্ঘ মেয়াদি যুদ্ধের কৌশল হিসেবে গেরিলা প্রশিক্ষণ আমাকে আকৃষ্ট করেছিল।

প্রশিক্ষণ শেষে বেলাবো-মনোহরদী অঞ্চলের এফএফ গেরিলাবাহিনীর দায়িত্ব পান তিনি। ভারতের আনুষ্ঠানিকভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের প্রাককালে, এখানে অবস্থিত নিয়মিত বাহিনীর প্লাটুন সরাসরি ‘এস’ ফোর্সে দপ্তরে যুক্ত হয়। এ সময় এই এলাকার সার্বিক দায়িত্ব পালনের জন্য তাঁকে কমান্ডার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। মনোহরদী ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে অবস্থানরত সকল মিলিটারি ফোর্স (এমএফ) ও ফ্রিডম ফাইটার (এফএফ) কে তাঁর অধীনে ন্যস্ত করা হয়। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা প্রশাসনিক কার্যভার নেওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি এফএফ গেরিলা বাহিনী ও নিয়মিত বাহিনীর কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

 মোট আটটি গ্রুপে প্রায় পাঁচ শতাধিক বীর মুক্তিযোদ্ধা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছে তাঁর নেতৃত্বে। তাঁর দুটি গ্রুপের সম্মুখ যুদ্ধ “বিলাগী” ও “দশদোনা”র খবর সে সময় আকাশবাণী রেডিওতে গুরুত্ব দিয়ে প্রচার করা হয়েছিল। বিলাগী যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের এম্বুশে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ৩টি সৈন্য ভর্তি গাড়ির ২টি উল্টে যায় এবং ১৯ জন নিহত হয়।

#উল্লেখযোগ্য যুদ্ধ বর্ণনা;

মনোহরদী থানায় অবস্থিত পাকিস্তানি বাহিনীর ক্যাম্প মুক্ত করা ছিল তাঁর উল্লেখযোগ্য একটি সম্মুখ যুদ্ধ। একাত্তরের অক্টোবরের ২১ তারিখে তিনি ও কাজী আকমল ও কাজী ওসমান ভ্রাতৃদ্বয়ের যৌথ পরিকল্পনা ও দক্ষ পরিচালনায় এই ক্যাম্পে চূড়ান্ত আক্রমণ করা হয়। এই যুদ্ধের অন্যতম সফলতা ছিল চারজন পাকিস্তানি সৈন্যকে কমান্ডার সুবেদার জুলফিকারকে জীবিত আটক করা এবং সহযোদ্ধাদের কোনো ক্ষয়ক্ষতি না হওয়া।

এ ছাড়া ১১ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনীর ভৈরব থানা ঘাঁটির পতন হলে বেলাব-মনোহরদী অঞ্চল দিয়ে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টগামী পলায়নরত পাক সেনাদের প্রতিরোধে তিনি সরাসরি মুখোমুখি যুদ্ধে একজন আহত সৈন্যকে আটক করতে সমর্থ হন। পাশাপাশি তাদের চরসিন্দুর পর্যন্ত ধাওয়া করে মুক্তিযোদ্ধাদের আরেকটি গ্রুপের মাধ্যমে ১৭ জনকে আটকে ভূমিকা রাখেন।

১৪ ডিসেম্বর ভারতীয় বাহিনীর মেজর ভর্মা হেলিকপ্টারে নরসিংদী সদরে অবতরণ করলে তিনি জ্বালানিসহ গাড়ির ব্যবস্থা করে মুক্তাঞ্চল পরিদর্শনে সহায়তা করেন।

 তাঁর জ্যেষ্ঠ ছেলে বর্তমানে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শাহ মো. আরিফুল আবেদ। তিনি বলেন, স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরে এসেও আমরা মুক্তিযুদ্ধের আঞ্চলিক ইতিহাস চর্চা ও সংরক্ষণের তাগিদ বিদ্যায়তনিক বা সাধারণ পরিসরে তেমন হচ্ছে না। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সঠিক জাতীয় ইতিহাস যেমন দরকার তেমনি মুক্তিযুদ্ধের প্রান্তিক পর্যায়ের ঘটনা ও ব্যক্তিবর্গের অবদানও লিপিবদ্ধ হওয়া অত্যন্ত জরুরি। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের “আগরতলা” খ্যাত আড়িয়াল খাঁ-ব্রহ্মপুত্র বিধৌত বেলাবো-মনোহরদী অঞ্চলকে যেকোনো মূল্যে শত্রুমুক্ত রাখার বিশেষ নির্দেশনা ছিল সেক্টর থেকে। এই মুক্তাঞ্চল প্রতিষ্ঠায় যাঁরা অবদান রেখেছেন, তাঁদের কৃতিত্বের স্বীকৃতি রাষ্ট্রীয়ভাবে দেওয়া প্রয়োজন।

যুদ্ধের পরেও এলাকা রেখেছেন নিরাপদ;

১৬ই ডিসেম্বর দেশ স্বাধীনতা লাভ করে, সবাই বাড়ি ফিরলেও তাঁর বাড়ি ফেরা হয় না। কারণ, স্বাধীন হওয়ার পরও প্রায় দেড় মাস পর্যন্ত তাঁকে এলাকার আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত থাকতে হয়েছে। সদ্য স্বাধীন দেশে এই এলাকার প্রথম সিও (ডেভ) সিও (রেভ), ওসিসহ অন্যান্য অফিসের কর্মকর্তা ও কর্মচারীগণ তাঁর হাতে যোগদানপত্র দিয়ে কার্যভার গ্রহণ করে। পরে তিনি বঙ্গবন্ধুর ডাকে অস্ত্র জমা দেন এবং তাঁর নেতৃত্বাধীন মুক্তিযোদ্ধাদের ৩ নম্বর সেক্টর সদর দপ্তর থেকে সরবরাহকৃত ওসমানী স্বাক্ষরিত সনদপত্র বিতরণ করেন। সিও (ডেভ) সিও (রেভ), ওসিসহ অন্যান্য অফিসের কর্মকর্তা ও কর্মচারীগণ যোগদানের আগ পর্যন্ত তিনি অত্যন্ত সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে অত্র অঞ্চলের শান্তি, শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা বজায় রাখেন।

 যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলের আইন শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করা সহজ ছিল না। চুরি-ডাকাতি-রাহাজানি ও জনগণের জানমাল রক্ষার পাশাপাশি সরকারি সম্পদের নিরাপত্তার ব্যবস্থাও করেছেন তিনি। প্রশাসন ও পুলিশ দায়িত্ব গ্রহণের আগ পর্যন্ত কোটি কোটি টাকা মূল্যের সার, পাটের গোদাম এবং শতাধিক শ্যালো ইঞ্জিনের ওয়্যারহাউস সুরক্ষিত রাখার ব্যবস্থা করেন। যুদ্ধের সময় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের লুট করা লক্ষাধিক টাকা লুটেরাদের কাছ থেকে উদ্ধার করে তা বাংলাদেশ ব্যাংকে ফেরত দিয়ে সততার অনন্য নজির গড়েছেন।

এই বীর মুক্তিযুদ্ধের বক্তব্য, যুদ্ধের সময় প্রায় প্রতি মাসেই আমাকে ওপারে সেক্টর দপ্তরে অস্ত্র-গোলাবারুদ ও প্রশিক্ষণ শেষে নতুন রিক্রুট হওয়া মুক্তিযোদ্ধাদের গ্রুপে গ্রুপে ভাগ করে আনতে হতো। এময় আমার এলাকার সর্বশেষ যুদ্ধ-পরিস্থিতি রিপোর্ট আকারে পেশ করে নতুন কোনো নির্দেশনা থাকলে নিয়ে আসতাম। আমার অধীনস্থ এলাকায় আশ্রয় নেওয়া এবং সীমান্তে পাড় হওয়া লোকজন সেক্টর দপ্তর ও আগরতলায় গিয়ে এই এলাকাকে বাংলাদেশের “আগরতলা” বলে নামকরণ করে। মায়ের কোলে একজন শিশু যেমন নিরাপদ থাকে, আমারও মনে মনে প্রতিজ্ঞা ছিল বেলাব-মনোহরদী অঞ্চলকে তেমন রাখা।
 
তাঁর অভিমান মুক্তিযোদ্ধার বর্তমান সংজ্ঞা ও তালিকাভুক্তি নিয়ে। তিনি বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু মাত্র ১৯ শব্দে “মুক্তিযোদ্ধা”কাদের বলা হবে, এর সুস্পষ্ট নির্দেশনা দিয়ে গেছেন। অথচ তাঁর সংজ্ঞাকে উপেক্ষা করে এখন বিভিন্ন ফর্মুলায় মুক্তিযোদ্ধার তালিকা করা হচ্ছে। বঙ্গবন্ধুর নিষ্পত্তি করা বিষয়ের এমন অবমাননা জাতির জন্য দুর্ভাগ্যজনক।

উল্লেখ্য যে বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালে ৯৪ নম্বর অধ্যাদেশে, ৭ আগস্ট প্রকাশিত গেজেটে “মুক্তিযোদ্ধা”র সংজ্ঞা নির্ধারণ করেছিলেন এভাবে, “Freedom Fighter means any person who had served as a member any force engaged in the war of liberation but shall not include members of the Defence Services or the police or the Civil Armed Forces. ”

তিনি বঙ্গবন্ধুর প্রদত্ত মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞা বাস্তবায়নে জাতির পিতার যোগ্য উত্তরসূরি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হস্তক্ষেপ কামনা করেন।


লেখক: শিক্ষার্থী,
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ,
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।

 

ডব্লিউইউ

Published: Thu, 26 Aug 2021 | Updated: Thu, 26 Aug 2021

‘ক্যাপ্টেন দুলাভাই মুক্তিযুদ্ধে, তাই আমাদের বাড়ি জ্বালিয়ে দেয়’

অধ্যাপক ড. কামালউদ্দীন আহমদ বর্তমানে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ। জন্ম কুমিল্লার দাউদকান্দির খানেবাড়ি গ্রামে। বাবা দাউদকান্দির বিশিষ্ট সমাজসেবক, শিক্ষানুরাগী এবং আহমদ পাবলিশিং হাউজের প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত মহিউদ্দীন আহমদ। মা রহিমা খাতুন।

এরআগে অধ্যাপক ড. কামালউদ্দীন আহমদ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে দীর্ঘদিন শিক্ষকতা করেন, সবশেষ বিভাগের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্বপালন করেন। পরে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর, গ্রন্থাগারিক (ভারপ্রাপ্ত) এবং আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন এই শিক্ষাবিদ।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় কামালউদ্দীন আহমদ ছিলেন ১২/১৩ বছরের কিশোর। ঢাকায় বাংলাবাজারে বাবার ব্যবসা ও জিন্দাবাহারের পৈত্রিক বাড়ি থাকলেও মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে জীবনের নিরাপত্তায় তিনি পরিবারের সঙ্গে গ্রামে অবস্থান করেন। ২৫ মার্চ রাতে দখলদার পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বাঙালিদের ওপর নৃসংশ হামলা ও গণহত্যা চালায়। কামালউদ্দীনের সদ্য বিবাহিত বড় বোন মাহমুদা আক্তারের স্বামী তৎকালীন ক্যাপ্টেন সুবিদ আলী ভূঁইয়া (বর্তমানে কুমিল্লা-১ আসনের সংসদ সদস্য এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি) তখন সস্ত্রীক ছিলেন চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্টে নিযুক্ত। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অযৌক্তিক ও অতর্কিত বর্বর আক্রমণে সুবিদ আলী ভূঁইয়া বিদ্রোহ করে পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন।

বড় বোনের স্বামী ক্যাপ্টেন ভূঁইয়া বাংলাদেশকে শত্রুমুক্ত করার জন্য পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে লড়াই করছেন এই আক্রোশে একাত্তরের জুলাই মাসে কামালউদ্দীনদের গ্রামের বাড়িতে হামলা করে দাউদকান্দি থানা ও ডাক বাংলোতে অবস্থানরত পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। 
একাত্তরের দুঃসহ স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে ড. কামালউদ্দীন আহমদ লেখককে জানান,  দুলা ভাই মুক্তিযুদ্ধে লড়াই করছেন। ততদিনে এই খবর সবার জানা হয়ে যায়। এ অঞ্চলের দখলে থাকা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এবং তাদের দোসর-রাজাকাররাও এ ব্যাপারে অবগত। তাই প্রতিটি দিন-রাত আমাদের আতংকে কেটেছে। এদিকে ক্যাপ্টেন ভূঁইয়ার স্ত্রী আমার বড় বোন মাহমুদা আক্তার তখন আমাদের গ্রামের বাড়িতেই ছিলেন। বাড়িতে আমার বিবাহের উপযুক্ত আরও ১ বোনসহ মোট ৫ বোন। আমরা শিশুকিশোর। তাই বাবা আমাদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রতিনিয়ত শংকিত ছিলেন।

জুলাই মাসের দিকে এক রাতে আমরা দুই ভাই বাবার সঙ্গে কাচারিঘরে ঘুমাই। রাত ১টার দিকে দাউদকান্দি থেকে আমাদের এক চাচা এসে বাবাকে ঘুম থেকে ডেকে তোলেন। আমাদেরও ঘুম ভেঙে যায়। চাচা হাঁপাচ্ছেন। বাবার চোখেমুখে চিন্তার ভাঁজ। চাচা দাউদকান্দি থানার একটি সোর্স থেকে জানতে পারেন যে, কিছুক্ষণ পরেই অথবা সকালে ক্যাপ্টেন শহীদুল্লাহর নেতৃত্বে পাকিস্তানি সেনার একটি দল আমাদের বাড়ি আক্রমণ করবে (ক্যাপ্টের শহীদুল্লাহ যুদ্ধাপরাধের মামলায় বর্তমানে জেলে)। বাবা তখন গভীর রাতে তাৎক্ষণিকভাবে পরিবারের সবাইকে ডেকে তুলেন। হাতের কাছের দরকারি কিছু জিনিস নিয়েই আমরা দ্রুত বাড়ি ছাড়ি। গভীর রাতে বোনদের দিয়ে চলাফেরা সহজ ছিল না; আমার বড় বোন মাহমুদা আক্তার ছিলেন গর্ভবতী। সবার চোখেমুখে ভয়-উৎকণ্ঠা। আমরা ভাঙ্গা ও কর্দময় পথে হাঁটতে হাঁটতে চক্রতলা গ্রাম হয়ে মারুকার একটি বাড়িতে গিয়ে উঠি।’

মারুকায় আশ্রয় নিয়েও নিরাপদবোধ করতে পারেননি কিশোর কামালউদ্দীনের পরিবার। কারণ লোকজন বলাবলি করে যে, মারুকাতেও পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এসে আক্রমণ করতে পারে। এরপর আবার নিরাপদ আশ্রয়ে বেরিয়ে পড়েন তারা। কামালউদ্দীন বলেন, ’তখন বর্ষাকাল ছিল। দিনের বেলায় সড়ক পথে আশ্রয়ে যাওয়া নিরাপদ ছিল না। তাছাড়া বড় বোনের পেটে সন্তান। তাই দুটি নৌকার ব্যবস্থা করা হয়। আমরা মারুকা থেকে চান্দিনা থানার দক্ষিণাঞ্চলে আমার বড় বোনের স্বামীর বাড়ির দিকে যাই।’

চান্দিনা থানায়ও তো পাকিস্তানি আর্মির ঘাঁটি ছিল। সে এলাকায় নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার কারণ জানতে চাইলে অধ্যাপক কামালউদ্দীন বলেন, বড় দুলা ভাইয়ের বাড়ি ছিল চান্দিনার কৈলান গ্রামে। এটি চান্দিনা এবং চাঁদপুরের কুচুয়া সীমান্তে অবস্থিত। একেবারে ভেতরের দিকে। সেখানে তখন পর্যন্ত পাকিস্তানি আর্মির তৎপরতা ও হামলার খবর পাওয়া যায়নি। আবার বর্ষাকাল হওয়ার ওই জায়গাটি নিরাপদ ভেবে বাবা সেখানে যাওয়ার সিদ্বান্ত নেন। সেদিন আমার কৈলান গ্রামের পৌঁছাতে সন্ধ্যা হয়ে যায়।

ঐদিন সকালেই কী বাড়িতে আক্রমণ করা হয়েছিল? জবাবে কামালউদ্দীন জানান, 'না'। লোক মারফত জানতে পারি, সকালে পাকিস্তানি আর্মি আমাদের বাড়িতে আসেনি। হামলা করা হয় তার পরের দিন। এসেই পুরো বাড়িতে গানপাউডার ছিটিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। আমাদের বাড়ির সব ঘর পুড়ে ছাঁই হয়ে যায়। শুধু চাচার একটি ঘর কিছুটা রক্ষা পায়। কারণ, ঘরটিতে টিনের বেড়া ছিল। টিনের ঘরে সাধারণ আগুনে ধরতে সময় লাগে। বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেওয়ার খবর শুনে আমরা দুই ভাই পরদিন দেখতে যাই। এসে দেখি তখনো কোথাও কোথাও ধোঁয়া উড়ছে। পোড়া গন্ধে বাতাস ভারী হয়ে আছে। বাড়িটি যেন শ্মশানে পরিণত হয়েছে। আমরা তো ছোট, এই দৃশ্য দেখে আবেগ ধরে রাখতে পারিনি। হাউমাউ করে কেঁদেছি।

নিরাপদবোধ না করায় আমরা দুই ভাই আবার ফেরৎ যাই চান্দিনার কৈলান গ্রামে। সেখানে কয়েকদিন থাকার পর শুনি এখানেও পাকিস্তানি আর্মি আসতে পারে। বাবা তখন বিচলিত হয়ে পড়েন। এদিকে ভারতের আগরতলা থেকে সোর্সের মাধ্যমে দুলা ভাই বীর মুক্তিযোদ্ধা সুবিদ আলী ভূঁইয়া খবর পান যে, আমাদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দিয়েছে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। দুলা ভাই তখন আমার বড় বোন মাহমুদা আক্তারের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন। তাঁর গর্ভে তখন ৭ মাসের সন্তান। দুলা ভাই আগরতলা থেকে তাঁর বিশ্বস্ত একজনকে পাঠান আমার বোনকে নিয়ে যাওয়ার জন্য। বাবা বোনকে দিতে রাজি ছিলেন না। তারপরও বোন বড় ঝুঁকি নিয়ে কৈলান গ্রাম থেকে প্রথমে নৌকায় করে, পরে রিকশা ও হেঁটে আগরতলার উদ্দেশে বের হন। সঙ্গে তাঁর দেবরকেও নিয়ে যান। একদিকে মুক্তিযোদ্ধার যুবতী স্ত্রী হওয়ায় বাংলাদেশে থাকা নিরাপত্তার ঝুঁকি, অপরদিকে ক্যাপ্টেন ভূঁইয়ার দুঃশ্চিন্তা কমানো, যাতে তিনি মুক্তিযুদ্ধে মনোযোগী থাকতে পারেন। এ কারণে আমার বোন আগরতলা যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

আমার বোন যাওয়ার পর আমরা নৌকায় করে চাঁদপুরে এক আত্মীয়র বাড়ির উদ্দেশে বের হই। পথে পথে কত দুঃশ্চিন্তা। এক অনিশ্চিত জীবনের দিকে যাযাবরের মত ছুটে চলেছি আমরা। চাঁদপুরের কাছাকাছি গিয়ে নদীতে থাকতেই শুনি, সামনে পাকিস্তানি আর্মির অবস্থান। মাঝিরা জানায়, আর সামনে আগালে বিপদ। বাবা তখন মানসিকভাবে খুবই ভেঙে পড়েন। উনার চোখমুখ অন্ধকার হয়ে আসে। নৌকাতেই অসুস্থ হয়ে পড়েন সে। নৌকায় ডাক্তার পাবো কোথায়? নদীর পানি মাথায় দিয়ে দিয়ে বাবাকে সেবা করি। ছোটভাইবোনেরাও কান্না শুরু করে।

পরে অন্যত্র আমাদের এক আত্মীয়র বাড়িতে গিয়ে উঠি। সেখান কিছু দিন থেকে স্টিমারে করে আবার ঢাকায় আসি। ঢাকায় আসার পথে নৌঘাটে পাকিস্তানি আর্মির চেকপোস্টের মুখোমুখি হই। ভাগ্য ভালো যে, আমাদেরকে তল্লাশি করে ছেড়ে দেয়। এরপর জিন্দাবাহারের বাড়িতে উঠি। ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণ ও বিজয়ের আগপর্যন্ত এখানেই ছিলাম।’

একাত্তরে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আক্রমণ থেকে প্রাণ বাঁচাতে এবং নারীদের সম্ভ্রম রক্ষায় লাখ লাখ মানুষ নিজের বাড়িঘর ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে ছুটেছে। অনেকে ভারতে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নিয়েছে। কত মানুষ পথেও মারা গেছে। যুদ্ধে নিরীহ মানুষকে নিজ বাড়িঘর ছেড়ে পালাতে বাধ্য করা একধরণের নির্যাতন। পাকিস্তানি আর্মির হত্যা, গণহত্যা, নারী ধর্ষণের পাশাপাশি, বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়ে বাঙালিদেরকে অনিশ্চিত জীবনের দিকে ঠেলে দেওয়ার নির্যাতনের শিকার হয়েছেন অসংখ্য মানুষ। মুক্তিযুদ্ধে এই নির্যাতনের শিকার হয়েছেন অধ্যাপক কামালউদ্দীনের পরিবার ।

পাকিস্তান আর্মি বাড়ি আক্রমণের কারণ সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে অধ্যাপক কামালউদ্দীন বলেন, কারণ একটাই। আমার বড় বোনের স্বামী পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর চাকরিকে লাথি মেরে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন। ২৬ মার্চ, ১৯৭১, চট্টগ্রামের উপকণ্ঠে কুমিরায় তীব্র প্রতিরোধ যুদ্ধে নেতৃত্ব দেন তিনি। যুদ্ধে পাকিস্তানি আর্মির কমান্ডিং অফিসারসহ তাদের অনেক সেনা নিহত হয়। এরপর ৩ নম্বর সেক্টরে বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধ করতে থাকেন তিনি। যেহেতু দুলা ভাই পরিচিত ও আলোচিত মুক্তিযোদ্ধা, তাই আমাদের বাড়িতেও মুক্তিবাহিনীর আনাগোনা ও গোপন ঘাঁটি থাকতে পারে। একারণে বাড়িতে আক্রমণ করা হয়। আক্রমণে নেতৃত্বে দেয় ক্যাপ্টেন শহীদল্লাহ। সে এখন জেলে। আমি এই যুদ্ধাপরাধীর উপযুক্ত শাস্তি চাই।’


সাংবাদিক এবং মুক্তিযুদ্ধ গবেষক। 

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন : বাশার খান

 

ডব্লিউইউ

Published: Wed, 12 May 2021 | Updated: Wed, 12 May 2021

রহমান পাগলার-মুক্তিযোদ্ধা হবার গল্প

বয়স ৬৬ ছুই ছুই করছে। মাথায় টুপি। মুখে পাকা দাড়ি। কথা বলেন অনর্গল। বয়সের ভারে দেহ অনেকটাই দুর্বল। কথা কিছুটা জড়িয়ে যায়। তবু কথা বলেন সাধু-চলিত-আঞ্চলিক ভাষা মিশিয়ে অনর্গল। বাড়ী সিরাজগঞ্জ পৌর প্রান্ত সীমানার সন্নিকটে খোকশাবাড়ী ইউনিয়নের তেলকুপী গ্রামে।  নাম আব্দুল রহমান খান। কাছের লোকেরা তার দুরন্তপনায় আদর করে ডাকেন রহমান পাগলা । যৌবনে ছিলেন ৭১ এর যোদ্ধা। 

আব্দুল রহমান বেড়ে উঠেছিলেন তেলকুপীর এক অবস্থা সম্পন্ন গৃহস্থ পরিবারে। বাপ-চাচাদের মিলিয়ে এক সারিতে ১১টি চৌচালা টিনের ঘর। বাবার স্মৃতি ঝাপসা। মারা গেছেন সেই শৈশবে। বড় ভাইয়ের কর্তৃত্বে একান্নবর্তী সংসার।  পৈত্রিক কৃষি জমিতে যা উৎপাদন হতো তাতেই চলতো বার মাসের বছর। বাড়ীর উত্তর আর পূব পার্শ্বে পুকুর, পশ্চিম পার্শ্বে বাঁশঝাড়। সামনে ডানে বামে সারি বেঁধে ছিল আম, কাঁঠাল আর নারিকেল গাছ। বাড়ী থেকে প্রায় হাজার গজ মাটির পথ পেরুলেই পাকা কনক্রিটের রাস্তা। সেই রাস্তা ধরে পঞ্চাশ পয়সা দিলে রিকশায় একটানে পৌঁছে যেতেন শহরের ভিক্টোরিয়া স্কুলে। সব সময় রিকশায় যাওয়া হতো না। কখনো পায়ে হেঁটে, কখনো সাইকেলের প্যাডেল ঘুরিয়ে আসতেন ঐতিহ্যবাহী এই বিদ্যালয়ে। গ্রাম থেকে আসতেন শহরের বিদ্যালয়ে পড়তে কিন্ত পড়াশোনায় মন টিকতো না। পড়াশোনার চাইতে আগ্রহ ছিল নেতৃত্বে। সহপাঠীরা এগিয়ে দিতেন সকল কাজে মাতব্বরীতে। সখ ছিল ভাটিয়ালী আর পল্লীগীতি গানের। মন উৎফুল্ল হতো বাঁশের বাঁশিতে ঠোট লাগিয়ে সুর তুলতে। স্কুল ছুটিতে সেই বাঁশি হাতে নিয়ে ভরদুপুরে ছুটতেন গ্রামের পশ্চিমের নদীর ধারে। সুর তুলতেন- ‘মাঝি বায়া যাও রে অকুল দরিয়ার মাঝে’ কিংবা ‘ভাটিজানে ভাটিয়াল সুরে বাঁশিতে বাজাইয়া যাওরে মাঝি একবার চাও ফিরে’- এরকম পল্লী গানে। অথবা গভীর রাতে বেরিয়ে পড়তেন গ্রামের পাশের মাঠে। রাতের আলো-আঁধারিতে সুর তুলতেন বাঁশের বাঁশিতে। সেই বাঁশির সুর বাতাসে ভেসে যেত আশে পাশের গ্রামে। এর জন্য অনেক সময় তেড়ে আসতেন গ্রামের বয়স্করা। কিন্ত কোন কিছুতেই তাকে তার সুরের জগত থেকে সরাতে পারতো না। এমনিভাবেই বেড়ে উঠছিলেন পাগলা রহমান। 

উনসত্তরে ছিলেন তারুন্য পেরিয়ে যৌবনের প্রারম্ভে। সেই বয়সে অযুত যুবকের মতো তাকেও আন্দোলিত করতো তেজোদীপ্ত আসাদের রক্তমাখা শার্ট। কিশোর মতিয়ুরের আত্মাহুতি। উজ্জীবিত করতো বৃটিশ বিরোধী সংগ্রামে প্রীতিলতা, সুর্যসেনের জীবন। ভাটিয়ালি আর পল্লীগীতির সুর ছেড়ে গুনগুন করে গাইতেন প্রীতিলতার গান- ‘অন্ন হাতে ডাকছো মাগো ফিরে দেখার সময় নাই, ডাক দিয়েছে বঙ্গজননী সেথায় ছুটে যাই, বিজয় বেশে আসতে যদি পারি ফিরে, চরণধুলি নেবো বুকে তুলে, সেদিন মাগো আর্শীবাদ করো দু’ হাত তুলে।’ বাঁশের বাশিতে তুলতেন সেই গানের সুর। বাঁশির সুর বাতাসে তরঙ্গায়িত হয়ে চলে যেত পাশের গাঁয়ে। 

এলো ১৯৭১ সাল। সারা দেশ টালমাটাল। রাজনৈতিক জীবনে প্রচণ্ড উন্মাদনা। পাকিস্তানী শোষণ আর বঞ্চনার বিরুদ্ধে সোচ্চার বাঙালীরা। বাঙালীর সেই ঝড়ে হাওয়ার ঢেউ তরাঙ্গায়িত হয়ে পড়ে তৃণমূলের সমাজ জীবনে। সেই ঢেউয়ের উন্মাদনায় কৈশর যৌবনের সন্ধিক্ষণের এই মানুষটিও আন্দোলিত হলেন। লণ্ডভণ্ড হয়ে গেল বাঁশের বাঁশিতে সুর তোলা আর নদীর তীরে বসে ভাটিয়ালি গানের ছন্দ। বাঙালী জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সমুদ্রসমান ঢেউয়ে আন্দোলিত হয়ে জীবনবাজী রেখে হাতে নিলেন হাতিয়ার। লড়লেন পাকিস্তানীদের বিরুদ্ধে। লড়াই করলেন দেশের স্বাধীনতার জন্য।  রহমানদের মতো লক্ষ যুবকের জীবন বাজি রেখে লড়াইয়ের ফলেই আমরা পেলাম স্বাধীনতা। কথা বলছিলাম এরকম একজন শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ সন্তান মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রহমানের সাথে। 

এর মধ্যে আসে ২৫ মার্চ। ২৫ মার্চের পৃথিবীর ইতিহাসের অন্যতম নিকৃষ্ট গণহত্যার রাতে জ্বলছে ঢাকা শহর। ২৮ এপ্রিল সেই আগুনের লেলিহান শিখায় প্রজ্জলিত হলো সিরাজগঞ্জ। সেদিন পাক আর্মি বগুড়া থেকে তেলকুপি গ্রামের পাশ দিয়ে পাকা রাস্তা ধরে শহরে ঢুকেই গ্রামটি পুড়িয়ে ছারখার করে দিল। পুড়ে গেল আব্দুর রহমানের নিজের বাবা- চাচা আর দাদার স্মৃতি বিজড়িত উত্তর দুয়ারী আর দক্ষিণমুখী এগারটি টিনের ঘর। পাকিস্তানীরা পুড়িয়ে দিল পাশের নওদা তেলকুপি গ্রামের চলচ্চিত্র অভিনেতা সুভাষ দত্তের নানার গ্রাম। গ্রামের জনৈক লুৎফর মেম্বারের আত্মীয়কে পাকি আর্মি ধর্ষণ করে গুলি করে হত্যা করে। দেখলেন নিজ চোখে সেই মৃত মেয়েটির বাম গালে কামড়ের চিহ্ন। আরও দেখলেন নলিছাপাড়া গ্রামের অসুস্থ কালা শুক্কুরের বাড়ী আগুনে জ্বলছে। সেই বাড়ীতে ঢুকে দেখলেন আগুনে পুরে আংগার হয়ে যাওয়া শুক্কর আলীর জীবন্ত দগ্ধ দেহটাকে। এই দু’টি ঘটনা তাকে আগৃনের মতো প্রজ্জলিত করে। 

বাড়ীতে অবসরে ফসলের ক্ষেতে কাজ করতেন আব্দুর রহমান। কিন্ত কাজ করলেও মানসচোখে ভেসে উঠে ওই ধর্ষিত মেয়ে কিংবা শুক্কুর আলীর অঙ্গার হয়ে যাওয়া দেহটাকে।  মনে হলেই চোয়াল শক্ত পাথরের মতো হয়ে ওঠে। মন ছুটে যায় যুদ্ধের জন্য।  ফসলের মাঠে কাজ করতে করতেই একদিন সিদ্ধান্ত নিলেন যুদ্ধে অংশগ্রহনের।  কিন্ত কীভাবে যাবেন? কোথায় যাবেন? বাড়ীর কর্মচারী সমবয়সী জেল হোসেনের সাথে পরামর্শ করলেন। দু’জনই সিদ্ধান্ত নিলেন যুদ্ধে যাবেন। খুঁজতে থাকেন কোথায় গেলে পাওয়া যাবে যুদ্ধের প্রশিক্ষণ। খোঁজও পেয়ে গেলেন। সিদ্ধান্ত নিলেন রৌমারী হয়ে মানকারচর যাবেন। সেখানে যুদ্ধের জন্য ছাত্র-যুবারা সংগঠিত হচ্ছেন। প্রয়োজন হলো পথখরচার অর্থের। তখন তার ছাত্র জীবন, বড় ভাইয়ের ওপর নির্ভরশীল। হাতে টাকাও নেই। জেল হোসেনও কাজ করে তাদের বাড়িতে। তার কাছেও কোন অর্থ নেই। শেষ অব্দি সুযোগ এলো। বড় ভাই পাঠালেন পাওনা টাকা আদায়ের জন্য। সেই টাকা নিয়েই ছুটলেন যুদ্ধের পথে।

বাড়ি থেকে বের হতেই মা টের পেলেন। পিছে পিছে মা কাঁদতে কাঁদতে ছুটলেন। মার চোখ ফাঁকি দিতে পাট ক্ষেতে লুকালেন। পাট ক্ষেতে লুকিয়ে থেকেই দেখলেন মা কাঁদছেন। পরনের শাড়ির আঁচলে চোখের পানি মুছছেন। তা দেখে নিজের চোখেও পানি এলো। শক্ত হলেন। ভাবলেন তিনি তো যুদ্ধে যাবেন। জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করবেন। মায়ের জন্য, দেশের জন্য, দেশের স্বাধীনতার জন্য। এসময় চোখের পানির কাছে পরাজিত হওয়া যাবে না। শেষ পর্যন্ত যুদ্ধে যাবার প্রেরণার কাছে মায়ের চোখের পানি পরাজিত হলো। মায়ের চোখ ফাঁকি দিয়ে ছুটলেন। আগের পরামর্শ মতো গ্রামের এক জায়গায় মিলিত হলেন জেল হোসেন, আনোয়ার, জহুরুল, লুৎফরদের সাথে। পাঁচজনে একসাথে রওনা হলেন যুদ্ধের জন্য। স্বাধীনতার শপথে বলীয়ান হয়ে।
খোঁজ নিয়ে জানলেন সিরাজগঞ্জের কাজিপুর উপজেলার শুভগাছা থেকে নৌকায় শরনার্থীরা যমুনা নদী পথে ভারত যায়। সেই অনুযায়ী ওরা ৬ জনে ওসমানের বাড়ি গেলেন। দু’দিন অপেক্ষা করলেন নৌকার জন্য। দু’দিন পর যখন নৌকায় উঠবেন সেই সময় ওসমানের কাছে শুনলেন অশিক্ষিত লোক যাওয়া যাবে না। অশিক্ষিত লোকদের ওখানে গিয়ে কোন কাজ হবে না। সেই কথায় বিশ্বাস করে জেল হোসেন থেকে গেলেন (পরে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন)।

ওসমান আর ইসমাইলের সাথে সমন্বয় করে শরনার্থী পাঠাতো। রাতে এলেন ইসমাইল। ইসমাইলের নির্দেশে রহমানসহ চারজনকে চার নৌকায় দিলেন। এবং ইসমাইলের গ্রুপের ১১ জনকে এগার নৌকায় দিলেন। ইসমাইলের নির্দেশিত ব্যক্তিরা ওদের সাথে গেলেন নৌকার যাত্রীদের নিরাপত্তা দেয়ার জন্য।  রাতের আধারে ১১ নৌকায়  রওনা হলো ভারত। পাল তুলে নৌকা ভাসিয়ে দিলো যমুনায়। গন্তব্য রৌমারী হয়ে ভারতের মানকার চরে।

রওয়া হয়ে জানলেন মানকার চর যেতে সময় লাগবে সাত দিন সাত রাত। নদীতে দুদিন পার হবার পর তৃতীয় দিন। তারা তখন বাহাদুরবাদ পার হয়ে তিস্তার-সোনাখালী-জিঞ্জিরার মোহনায়। তখন সূর্য ডুবছে। ১১ নৌকা পড়লো ঝড়ের কবলে।  ঝড়ের ঝাপটায় ১১ নৌকার মধ্যে রহমানদের নৌকা ডুবে গেল। নৌকার আরোহী শরনার্থীদের সব মালামাল ভেসে গেল নদীর পানিতে। নৌকার মাঝি অদ্ভুত দক্ষতায় ডুবন্ত নৌকা আবার পানির ওপরে তুলে ফেললেন। আবার যাত্রা হলো শুরু। নৌকাগুলো যমুনায় পানিতে ছলাৎ ছলাৎ করে ঢেউয়ের তালে তালে বেদের বহরের মতো চলতে লাগলো সামনের দিকে। 

রাতে থামলো একটি চরে। স্মৃতি হাতড়ে মনে করে বললেন, গল্লামাড়ী চর কিংবা চেয়ারমানের চর। সেই চরের কাশবনের ভিতর নৌকা আশ্রয় নিল। নৌকার বাদাম, মাস্তুল খুলে লুকিয়ে রাখলেন সবাই। রাত আনুমানিক এগারটার সময় পাকিস্তানী সেনারা তাদের গানবোটের সার্চ লাইটের আলো ছড়িয়ে চারিদিকে দেখতে লাগলো। কাশবনে লুকিয়ে রাখা নৌকাগুলি তাদের চোখ এড়িয়ে যেতে সক্ষম হলো। রাত শেষে ভোর হলো। নৌকা আবার রওনা হলো। এমনি ভাবে ৬/৭ দিনে পৌঁছলেন রৌমারী। গিয়ে পরিচিত নূর, সোহরাব, সাজাহান এর সহযোগিতায় ট্রেনিং নিলেন ১৫ দিনের। ৪০০ শত মুক্তিযোদ্ধা। একটি মাত্র রাইফেল। মন টিকলো না। প্রশিক্ষণ অসমাপ্ত রেখে চলে আসলেন সিরাজগঞ্জ। এসে যোগ দিলেন স্থানীয়ভাবে গড়ে উঠা ইসমাইলের দলে। 

স্মৃতি হাতড়ে মুক্তিযোদ্ধা রহমান বললেন-স্বাধীনতা বিরোধীদের বিরুদ্ধে অপারেশন শুরু করলাম। দালাল চেয়ারম্যান ও সাধারণ মানুষদের ধন সম্পদলুন্ঠনকারী ডাকাতদের অপারেশন করি। বর্ষার সময়ে রহমতগঞ্জ কবরস্থানে রাজাকারের একটি দলে হামলা করি। সন্ধ্যা নাগাদ যুদ্ধ চলে। গোলাবারুদ ফুরিয়ে গেলে কৌশলগত কারণেই যুদ্ধে ক্ষ্যান্ত দেই। লতিফ মির্জার দলে হয়ে ব্রম্মগাছা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করি। সেটা ছিল আগষ্টের মাসে দিকে। সেসময় ইসমাইল একই সাথে ছিল। গুরুদাসপুর থানার ছাইখোলা কাছে কাছিকাটা রাজাকার ক্যাম্পে হানা দেই। ১১/১২ জন রাজাকার জীবন্ত গ্রেফতার করি। ইতোমধ্যে ইসমাইলের দলে সাথে ভালো না লাগার কারনে ছুটি নিয়ে বাড়ি আসি। পরে যোগ দেই আলাউদ্দিনের দলে।  অক্টোবর কিংবা নভেম্বররে রায়গঞ্জ থানা হামলা করি। নভেম্বর রায়গঞ্জ সিও অফিসে পাক আর্মির ক্যাম্পেস হামলা করি। সে যুদ্ধে ৪/৫ জন পাক আর্মিকে হত্যা করি।

তিনি বলেন, ১১ ডিসেম্বর শৈলাবাড়ী যুদ্ধে অংশ নেই। ৯ তারিখে যুদ্ধ শুরু হয়। এ যুদ্ধের মধ্যদিয়েই পাকিস্তানিদের পরাজিত করে সিরাজগঞ্জ মুক্ত করি। ১৪ ডিসেম্বর আমার প্রিয় শহর সিরাজগঞ্জ মুক্ত হয়। স্বাধীন সিরাজগঞ্জে লাল সূর্য শোভিত স্বাধীনতার পতাকা পতপত করে উড়তে শুরু করে। এসময় পলায়নপর পাকিস্তানী সেনাবাহিনীদের ওপর কালিয়াহরিপুরে হামলা করি এবং একশ পাকি সৈনিকদের গাড়ি কবজা করি। ২ জন পাক আর্মি হত্যা করি। দুইজন পাকি আর্মি গ্রেফতার করি। ঐ দুজন পরে পাকিস্তান ফেরত যায়।

রহমান বলেন, এভাবেই মুক্তিযোদ্ধাদের ক্রমাগত হামলায় দিশেহারা হয়ে অবশেষে বাংলাদেশ-ভারতীয় যৌথ বাহিনীর কাছে পাকিস্তানী বর্বর বাহিনীর পতন হয়। ১৪ ডিসেম্বর মুক্ত হয় সিরাজগঞ্জ। ১৬ ডিসেম্বর ওই ঘৃণ্য পাকিস্তানী বাহিনী আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে সূচিত হয় আমাদের বিজয়। আকাশে উড়তে শুরু করে লাল সবুজের স্বাধীন বাংলার পতাকা। বিশ্বের বুকে প্রতিষ্ঠা লাভ করে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। আমার প্রিয় মাতৃভূমি।

অনুলেখক : ইসমাইল হোসেন, গণমাধ্যম কর্মী

/এসিএন

Published: Sun, 21 Mar 2021 | Updated: Sun, 21 Mar 2021

বীর মুক্তিযোদ্ধা কফিল উদ্দিনের যুদ্ধস্মৃতি

সেপ্টেম্বরের প্রথম দিকে সম্ভবত, আমরা প্রথম অ্যাফেক্টেট হই। সেটা হলো, আমরা ঐ আশপাশে, মেঘনা নদীর পাড়ে দরিয়াহালমাইরা বলে একটা গ্রাম আছে, আমাদের ক্যাম্প। ওইখানে আসার পর... আমরা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন গ্রাম চেঞ্জ করি। করে আসার পর গ্রামে খবর আসলো, দুইটা রাজাকার আসছে ওই বাড়িতে।

Published: Thu, 18 Mar 2021 | Updated: Thu, 18 Mar 2021

বীর মুক্তিযোদ্ধা এম এইচ আল আজাদ চৌধুরী’র যুদ্ধস্মৃতি

আমি একজন ফ্রিডম ফাইটার। মূলত আমার রাজনীতির হাতেখড়ি হয় ১৯৬২ সালে, আইয়ূববিরোধী আন্দোলনের সময়। শিক্ষা কমিশনের বিরুদ্ধে আমরা আন্দোলন করি। তখন আমি ক্লাস সিক্সের ছাত্র। ১৯৬৬ এবং ১৯৬৯, এই আন্দোলনের সময় আমি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করি।

Published: Sun, 07 Mar 2021 | Updated: Sun, 07 Mar 2021

ভ্রাম্যমাণ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের পথচলা শুরু

অভিযাত্রা ডেস্ক : মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানার বিষয়ে নতুন প্রজন্মকে উদ্বুদ্ধ করতে ‘ভ্রাম্যমাণ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর’ চালু করছে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের ‘নতুন প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধকরণ’ প্রকল্পের অধীনে এই ভ্রাম্যমাণ জাদুঘর চালু করা হয়ে।

রোববার (৭ মার্চ) সকালে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের শিখা চিরন্তনে জাদুঘর সম্বলিত ২টি বাস উদ্বোধন করেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক এমপি।

মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী েএসময় বলেন, ভ্রাম্যমাণ এ জাদুঘরের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের মাঝে মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস তুলে ধরা হবে। এর মাধ্যমে নতুন প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিসংগ্রামের সঠিক তথ্য জানতে পারবে।

তিনি বলেন, ভ্রাম্যমাণ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর বাসের এই উদ্যোগ আমরা এবারই প্রথম নিয়েছি। এই বাসে মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কিত যাবতীয় তথ্য থাকবে। জাদুঘর বাস শুধু ঢাকায় নয়, সারাদেশেই চলবে।

এসময় মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক সচিব তপন কান্তি ঘোষসহ মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

ও/এসএ/

Published: Sun, 07 Mar 2021 | Updated: Sun, 07 Mar 2021

বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ বাবুল ইসলাম’র যুদ্ধের স্মৃতিগুলো

সাভার থাইক্যা গুলি করতে করতে আর্মিরা আইছে। আর্মিরা আইতে আইতে লুটেরচর আর ওয়াসপুরের মাঝামাঝি গুলি করতেছিল। পাঁচজনে গুলি করতে আইতে আইতে, সব মানুষ দৌড়ায়া যাইতেছিল। ওইখানে বজলুর ভাই আছিল, তারপরে মহিউদ্দিন ভাই আছিল, আমরা ৪-৫ জন। ৭ জনের মধ্যে ৬ জন গ্রেনেড-ট্রেনেড মাইরাহালাইছে। একজন জ্যাতা আছিল। ঐ একজনরে ধরছিল। ধইরা পরে গুলি কইরা মাইরাহালাইছে।

 

Published: Wed, 17 Feb 2021 | Updated: Wed, 17 Feb 2021

বীর মুক্তিযোদ্ধা আমির হোসেন মিয়া’র যুদ্ধস্মৃতি

একদিন বিকালবেলা জিগাতলা থেকে আমি টিউশনি করে আসতেছি। আসার সময় দেখা গেলো যে, মানুষ রাস্তার পাশে আড়ালে আড়ালে দাঁড়ায়া আছে। ‘কি ব্যাপার?’ বলে যে, ‘ওই বাড়ির থেকে একটা মেয়ে ধরে নিয়ে যাচ্ছে, পাক আর্মিতে।’তো  পাক আর্মিতো না, তখন মিলিশিয়া না কি বাহিনী ছিল, তারা। তো আমি একটু পাশে, আমার কাছে সাইকেল, একটু পাশে দাঁড়াইলাম। ওরা বললো, ‘ওইদিকে যাইয়েন না, গেলেই কিন্তু আপনাকে গুলি করবো। ওরা গুলি করে কিন্তু।’ আমি পাশেই দাঁড়াইলাম, দেখলাম আসলেই একটা মেয়েকে তারা ধরে নিয়ে যাচ্ছে। কেউ আগায় না।

Published: Thu, 11 Feb 2021 | Updated: Thu, 11 Feb 2021

বীর মুক্তিযোদ্ধা গোলাম নাজির হোসেন’র যুদ্ধস্মৃতি

ঢাকাতে বিভিন্ন জায়গায় আমাকে দায়িত্ব দেয়া হয় অবজার্ভেশন করার জন্য। কোথায় কি আছে, না আছে। পাকবাহিনী কোনজায়গাতে ঘাঁটি গাঁড়ছে—এবং আমাদের জায়গাটা কোন কোন জায়গাতে সুযোগ-সুবিধা, ইনফরমেশন সব আমাদের দেওয়ার নির্দেশ ছিল। মেজর হায়দার বলে দিয়েছিলেন। সেক্টর কমান্ডার খালেদ মোশাররফ ২১ জুলাই রাত্রে এসে বললেন, ‘আমাদের কিছু ছেলের দরকার, আর্টিলারির জন্য।’সেখান থেকে আমি আর আমার এক সহযোদ্ধা আব্দুল মতিন (সে রিসেন্টলি মারা গিয়েছে) এই দুজনকে সিলেক্ট করা হয়।

Published: Tue, 09 Feb 2021 | Updated: Tue, 09 Feb 2021

যুদ্ধের স্মৃতিচারণে যা যা বললেন বীর মুক্তিযোদ্ধা আমিনুর রহমান আবু

“পরবর্তীতে চিন্তা করলাম যে, এখানে আর থাকা যাবে না। আমার বাড়িতে, আমার দোকানের কর্মচারীও বিহারী। আমার পাশেও বিহারীদের দোকান। তখন চিন্তা করলাম যে, মুক্তিযুদ্ধেই যাবো। কিন্তু কীভাবে যাবো? ওই মুরুব্বি যে বলছিলেন, উনার কাছে গেলাম। উনি বললো, আমাদের একটা কাগজে লিখে দিলেন, তুমি এমনে এমনে যাবা। উনার বাড়ি আবার কুমিল্লার বুড়িচংয়ে। উনারা খুব সম্ভ্রান্ত পরিবারের। বুড়িচংয়ের ভুইঁয়াবাড়ি।”