|

মুক্তিযুদ্ধ

Published: Wed, 15 Jul 2020 | Updated: Wed, 15 Jul 2020

যুদ্ধকথা : উল্লাপাড়ার বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আ. হামিদ

আমি মো. আব্দুল হামিদ, জন্ম ১৯৫২ সালের জুন মাসের ১ তারিখে। পিতার নাম: মৃত জেনাত আলী, মাতার নাম: টুলু বেগম, গ্রাম: চরমোহনপুর, ইউনিয়ন: মোহনপুর, উপজেলা: উল্লাপাড়া, জেলা: সিরাজগঞ্জ। আমার বাবা ছিলেন একজন কৃষক। দুই ভাই তিন বোনের মধ্যে আমি দ্বিতীয়। 

আমি এসএসসি পাশ করি মোহনপুর হাইস্কুল থেকে ১৯৬৯ সালে। সে বছরই ভর্তি হই সিরাজগঞ্জ সরকারি কলেজে ইন্টারমিডিয়েটে। আমি যে সময় সিরাজগঞ্জ কলেজে লেখাপড়া করি। সে সময় আমি ছাত্রলীগের সাথে সংযুক্ত ছিলাম। তখন  লতিফ মির্জা সে সময় সিরাজগঞ্জ কলেজে লেখাপড়া করতেন। তখন লতিফ মির্জা সাথে আমাদের যোগাযোগ হতেন। এর মধ্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একদিন সিরাজগঞ্জ আসেন এবং মিটিং করেন। মিটিং করার পরে আমরা সবাই  উদ্বুদ্ধ হলাম। সে সময় ভাবলাম যে আমাদের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ ছাড়া এই দেশকে স্বাধীন করা যাবে না। তখন আমাদের মধ্যে আলোচনা হয়। আলোচনার এক পর্যায়, তখন সে সময় নির্বাচন শুরু হয়ে যায়। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করার পরেও পাকিস্তানের সরকার নানা অছিলায় ক্ষমতা দেয় না। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ই মার্চের ভাষণে পড়ে আমরা সবাই আবার উদ্বুদ্ধ হই এবং আমরা মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেই। কিন্তু যুদ্ধের জন্য তো দরকার ভাল ট্রেনিং। তাই ভাবলাম আামাদের ভারতে যেতে হবে। ভারতে গিয়ে ট্রেনিং নিতে হবে।

লতিফ মির্জার নেতৃত্বে আমরা বারবার বৈঠক করি, বিমল কুমার দাস, সোহরাব আলী, আব্দুুল হাইসহ আর অনেকে সাথে। তাদের সাথে আলোচনা করার পরে। আমি বাড়িতে চলে আসি। বাড়িতে এসে আমি মোহনপুর ছাত্রলীগের নেতৃবৃন্দসহ সাধারণ মানুষদের নিয়ে একটি সংগঠন করি, যে কিভাবে আমাদের মুক্তিযুদ্ধে যেতে হবে। ভারতে যেতে হবে এবং কি ভাবে ট্রেনিং গ্রহণ করা যায়। অনেকে গেল আমাদের সাথে আবার অনেকে গেল না। আমার সাথে গেল যারা তারা হল- কামারখন্দের হামিদ, চাকসার লতিফ, আব্দুল রাজ্জাক, নান্নুসহ বেশ কয়জন। অনেকে আবার নানা কারণ দেখিয়ে গেল না। আমরা ভারতে যেতে বের হই, মোহনপুর থেকে প্রথমে আমরা চাটমোহর যাই। সেখানে গিয়ে আমরা অনেককেই পাই। প্রায় আমরা ৩৫ জনের মত হলাম। আমাদের ভারতে যাওয়ার গাইডার ছিল মোজ্জামল সমাজীর ভাই। তার পরে আমরা পায়ে হেটে পদ্মা নদী পার হয়ে আমরা ওপার চলে যাই। ওপার কেচুডাঙ্গা একটা জায়গা আছে। ওখানে ইয়ুথ ক্যাম্প ছিল। ইয়ুথ ক্যাম্পের দায়িত্ব ছিলেন  গোলাম হাসনায়েন নান্নু এমপি। পরিচালনা করতেন পাবনার লালু ভাই। এখান থেকে আমি যাই উচ্চতর ট্রেনিং নিতে পানিঘাটা-শিলিগুড়ি, দার্জিলিং যাই। সেখান থেকে ট্রেনিং নিলাম গেরিলার, কিন্তু আমাদের বর্ডারে দিলেন।্ সে সময় আমাদের উল্লাপাড়া উপজেলার ১৪ জন এক গ্রুপ হয়ে গেলাম। আমি সেই গ্রুপের সহকারী কমান্ডার ছিলাম। আর হামিদ ছিল কমান্ডার। আমাদের সাথে ছিলেন যারা, আব্দুল হামিদ, শফিকুল ইসলাম শফি, আব্দুল লতিফ বকুল, রুহুল আমিন খসরু, মোজাহার আলী, আব্দুল আজিজ, আব্দুল লতিফ, আব্দুল র্জ্জাাক নান্নু, আফছার আলম, আব্দুল মান্নান, মঞ্জুরে খোদা কুন্নু, নারায়ণ চন্দ্র।

ভোলাহাট থানা থেকে যুদ্ধ করতে আসতে থাকি আমরা। আমাদের আাসা দেখে রহমপুর চলে আসে মিলিটারি। আর আমরা চলে যাই গোমস্তাপুর থানা বাজারে আলীনগর হাইস্কুলে সেটা আমাদের ছিল শেষ ক্যাম্প, পুরা বর্ডার ছিল মুক্তিবাহিনী দিয়ে ঘেরা এবং প্রতিদিন যুদ্ধ হত, একদিন আমরা আরেক দিন ওরা। দেশে ভিতরে আসার আগে তিন মাস যুদ্ধ করি রংপুরের বর্ডারে। তার পরে আমাদের দেশে পাঠানো হয়। মানকাচর হয়ে হয়ে আসি। এই দিকে আরেক হামিদের সাথে দেখা যমুনা নদীতে সে সিরাজগঞ্জ কলেজে পড়ত সেই হিসাবে পরিচিতি। যমুনার নদীতে দুই- তিনদিন থাকি। তার পরে হামিদ ভাইকে বললাম ভাই আমরা আর থাকবো না। কারণ হলো আমি খোঁজ পেলাম যে, আমার পরিবার ও প্রতিবেশীদের মোট ঊনিশ জন তার মধ্যে একজন হিন্দু ছিলেন তাদেরকে মিলিটারি পাকশী ধরে নিয়ে গেছে, তাই আর থাকবো না। কিন্তু এই দিকে মোহনপুর দুই জন বিহারী ছিলেন তারা কিভাবে যেন তাদেরকে ছাড়িয়ে নিয়ে এসেছেন। তারপরে আমরা মোহনপুর এসেছে পৌঁছাই। তারপরে আমরা পলাশডাঙ্গা যুব শিবিরে যোগ দেয়ার জন্য উধুনিয়া গিয়ে লতিফ মির্জার নৌকা খুঁজতে থাকি ৭-৮ দিন যাবত।

লতিফ মির্জাকে পেলাম আমরা মাজার নওগাঁতে, পহেলা অক্টোবরে। পরে আমরা পলাশডাঙ্গা যুব শিবির যোগ দেই। আামাকে সেকশন কমান্ডার পদে নিযুক্ত করেন। ১১ নভেম্বর নওগাঁতে বিশাল একটা যুদ্ধ হয়। নওগাঁতে যখন যুদ্ধ শুরু হয় সে সময়ের আগে লতিফ মির্জা বলেন যে, যত সম্ভব মাজারে মিলিটারি ঢুকছে। মির্জা বললেন, ‘আমি একটু একটু সংবাদ পেয়েছি। মিলিটারি নাকি মাজারেই আছে। আপনারা কেউ যান একটু দেখে আসেন।’ তখন সেই সময় আমিসহ আব্দুল হামিদ, আজিজ, মাখন ভাই, আব্দুল আজিজ, আমরা ৪ জন চারদিকে দেখতে থাকি। দেখতে দেখতে দেখি মিলিটারি। তখন আমরা চিন্তা করতে থাকি- যদি আামরা ফায়ার না করি, ওরা যদি সামনে গিয়ে দেখে মুক্তিবাহিনী প্যারেড করতেছে- নৌকাতে গিয়ে যদি বলে ‘হ্যান্ডসআপ’, এদিকে চারদিকে পানি। এতে তো কোন উপায় থাকবে না। আর মির্জা সাহেব তো আগেই একটু শুনেছে। তখন আমরা আর কিছু না ভেবে  সরাসরি ফায়ার করি। ফায়ার ওপেন হওয়াতেই তুমুল আকারে যুদ্ধ শুরু হয়। যুদ্ধ শুরু হওয়ার সাথে সাথে  লতিফ মির্জার সাথে সকলে যুদ্ধতে যোগ দেয়। সেই যুদ্ধে মিলিটারিরা ২০০-২৫০ জন মারা যায়। কিন্তুু আমাদের সহযোদ্ধারা কেউ মারা যায় না, তবে আহত হয়ে ছলো অনেকে। আমরা স্টেনগান, এসএললার, এলএমজি, থ্রিনটথ্রি রাইফেল ব্যবহার করি যুদ্ধের সময়। নওগাঁতে যুদ্ধ শেষ করে নৌকার মাধ্যমে আমরা সবাই শীতলাই চলে যাই। 
লতিফ মির্জা বললো যে, ‘আমাদের তো চারদিক থেকে মিলিটারিরা তো ঘিরে ফেলতেছে। যুদ্ধ করে তো অস্ত্র, গোলাবারুদের সংখ্যা কমে গেছে। তাই যার যার মত কিছু দিন আত্মগোপন করেন তারপরে আবার অস্ত্র, গোলাবারুদ সংগ্রহ করে আবার একটা গ্রুপ সৃষ্টি করা হবে।’

তার পরে লতিফ মির্জা তার দল বল নিয়ে ভারতে চলে যান। যেহেতু আমাদের গ্রুপ ভারত থেকে ট্রেনিং প্রাপ্ত এই ক্ষেত্রে আমরা উধুনিয়া এসেছে ক্যাম্প করি। এদিকে আমাদের গ্রুপে লতিফ মির্জা দলের কিছু চলে আসে আবার আমাদের গ্রুপের কিছু লতিফ মির্জা সাথে চলে যায়। আমরা উধুনিয়া থেকে বিভিন্ন জায়গায় যুদ্ধ করতে থাকি, দেশ স¦াধীন হওয়ার আগ পর্যন্ত। আমরা ৭-১০ দিন পর পর দুই তিন জন গ্রামে গ্রামে গিয়ে আমাদের জন্য জমা রাখা মুষ্টি চাল তুলে নিয়ে আসতাম । এই ভাবে  চাউল তুলে আমরা খেতাম। 

আমাদের উধুনিয়া থেকে আমরা হান্ডিয়াল একটা অপারেশন করি। দিলপাশার ব্রিজ, বংকিরাট ব্রিজ, দহকুলার ব্রিজে রাজাকার পাহাড়া দিত। আর গ্রামে গ্রামে গিয়ে লুটপাটসহ অত্যাচার করতো। দিলপাশার ব্রিজ, বংকিরাট ব্রিজ রাজাকারদের রাতে অপারেশন চালিয়ে ধরে ফেলি। তারপরে বাদ থাকে দহকুলার ব্রিজ। আমাদের দেশকে তো স্বাধীন করতেই হবে। সব চেয়ে বড় শত্রু রাজাকার তাই তাদের আগে শেষ করতে হবে। তখন লতিফ মির্জা তো ভারতে চলে গেছে। সেই সময় সাধারণ মানুষেরা বলতো,  ‘মুক্তিযোদ্ধা ভাগ গিয়া।’ লতিফ মির্জা নাই তাই মুক্তিযোদ্ধা নাই- সাধারণ মানুষ এমন ভাবতো। এই রকম পরিবেশ দেখে শফি, হামিদ আমি মানে  গ্রুপের সবাই আলোচনা করি। সাধারণ মানুষদের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের প্রতি বিশ্বাস গড়ে তুলতে হবে। তাই দহকুলা ব্রিজের রাজাকারদের রাতে ধরা হবে না, তাদেরকে দিনে ধরতে হবে এবং হাটের দিন। যাতে মানুষ বুঝতে পারে মুক্তিযোদ্ধারা আছে। উধুনিয়া ক্যাম্পে বসে এই পরিকল্পনা করি। বুধবার বিকাল ২টায় আক্রমণ করবো। আজাদের নেতৃত্ব আমরা অপারেশন চালাই। 

এক গ্রুপ আসবে বংকিরাট হয়ে, আরেক গ্রুপ আসবে উত্তর দিক থেকে, আরেকটা গ্রুপ বুনাইনগর ফরিদপুর থেকে আসবে দহকুলা গ্রাম হয়ে, আর আমরা নেতৃত¦ দিবো মোহনপুর দিক থেকে। চারদিকে ঘিরে ফেলবো আর রেললাইনটা ফাঁকা রাখবো। ওরা যেন দৌড়াতে পারে। যেহেতু আমি মোহনপুর এলাকার ছেলে, আমি আগে থেকেই জনগণকে বলে রাখি- যেন রাজাকাদের তারা ধরে ফেলে। রাজাকারদের জনগণ ধরবে এবং কোন সমস্যা হবে না। আমরা তো আসি এ কথাও বলি। এই প্ল্যান মত আসলাম এবং তিন দিক থেকে আমরা আট্যাক করি রাজাকারদের। এই দিকে তো খোলা রাখলাম রেললাইন। দহকুলা ও মোহনপুরের সাধারণ মানুষদের সহযোগিতায় তারা ১৪ জন রাজাকাদের ধরে এবং মার দিয়ে আমাদের হাতে তুলে দেয়। সাধারণ মানুষ মনে করতো- দেশ স্বাধীন হয়ে গেছে। দহকুলার হাটের সাধারণ মানুষের আনন্দিত ও উৎফুল্ল  হলো । আসলে সব জায়গাতেই ভাল-মন্দ মানুষ আছে। কিন্তু সাধারণ মানুষ চেয়েছিলো দেশটা স্বাধীন হক। কিন্তু আমাদের এর মধ্যে যারা উচ্চবিলাসী তারা পাকিস্তানিদের পক্ষ নিত বা স্বার্থ দেখতো। আমরা রাজাকারদের ধরে নিয়ে আমরা উধুনিয়াতে যাই। তার দুই দিন পরেই দেশ স্বাধীন হয়ে যায়। তারপরে আমরা জেলা-মহকুমার কাছে অস্ত্র জমা দেই। অনেকে সিরাজগঞ্জ কলেজ মাঠে প্রবাসী সরকারের অর্থমন্ত্রী ক্যাপ্টেন এম. মনসুর আলীর কাছে আনুষ্ঠানিক ভাবে অস্ত্র সমর্পণ করে।
অনেকে আবার অস্ত্র ঢাকা জমা দেয়। কিন্তু সবাই অস্ত্র জমা দিলেও আমি অনেক পরে দেই। কারণ হলো আমার সুরক্ষার জন্য। পরে অবশ্য জেলা-মহকুমার কাছেই আমার অস্ত্র স্টেনগান জমা দেই।

[মুক্তিযুদ্ধ শেষে পড়াশোনায় ফিরে যান মো. আ. হামিদ। ১৯৭২ সালে ইন্টারমিডিয়েট পাস করেন। তারপরে সিরাজগঞ্জ সরকারি কলেজে ডিগ্রিতে ভর্তি হন। কিন্তু সংসারে অবস্থা ভাল না থাকায় তার আর পড়াশোনা করা হয়ে উঠেনি। ফরিদা চৌধুরীকে বিয়ে করেন ১৯৭২ সালে। প্রথম স্ত্রী মারা যাবার পরে দ্বিতীয় বিয়ে করেন মাসুদা খাতুনকে। চার সন্তানদের জনক এই বীর মুক্তিযোদ্ধা। সন্তানেরা হলেন- ফয়জুল আরাফাত, ফারুক ইয়াসির, ফিরোজ, ফেরদৌস ও ফরিদা পারভীন। পেশা- ব্যবসা ও রাজনীতি। দীর্ঘদিন যাবত তিনি উল্লাপাড়া উপজেলার আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ও সাবেক কমান্ডার এবং  মোহনপুর ইউনিয়ানের আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন। বর্তমান ঠিকানা- লাহিড়ীপাড়া, মোহনপুর, উপজেলা: উল্লাপাড়া, জেলা: সিরাজগঞ্জ।- অনুলেখক]
 

অনুলিখন : ইমরান হোসাইন

ও/এসএ/

Published: Mon, 13 Jul 2020 | Updated: Mon, 13 Jul 2020

যুদ্ধস্মৃতি : মুক্তিযোদ্ধা একেএম হেদায়েতুল আলম

মুক্তিযুদ্ধের আগে পরিবারের একজন যখন রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ে তখন ‘আগের হাল যেদিকে যায়, পরের হালও সেদিকে হাঁটে’ গ্রাম বাংলার এ প্রবাদ অনুযায়ী পরিবারের অন্যরা এমনকি গোষ্ঠীর সদস্যরাও সে রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়তো। আমিও তেমনি এক রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়া পরিবারের সন্তান। এমন পরিবারে জন্ম নিয়ে এবং আমাদের একই পরিবারের তিন ভাই মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে পেরে আমি গর্বিত। 

আমি একেএম হেদায়েতুল আলম, জন্ম: ১৯৫০ সালের ১৩ মার্চ। পিতার নাম: কাজী ইসমাইল হোসেন, বিবাহ রেজিষ্ট্রার হিসেবে কর্মরত ছিলেন তিনি। মাতা: সালেহা বেগম গৃহিনী। গ্রাম: তেলকুপি, ইউনিয়ন: বহুলী, সদর থানা, মহুকুমা: সিরাজগঞ্জ। ছয় ভাইবোনের মধ্যে আমি তৃতীয়। ১৯৬৫ সালে আমি ভিক্টোরিয়া হাই স্কুল থেকে এসএসসি পাশ করি এবং সিরাজগঞ্জ কলেজে ভর্তি হই। তারও আগে আমার বড় ভাই মোঃ আলাউদ্দিন শেখ সিরাজগঞ্জ বিএ কলেজে ভর্তি হন এবং পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগে যুক্ত হয়ে পড়েন। ফলে আমাদের পরিবার যুক্ত হয়ে পড়ে ছাত্রলীগ তথা আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে। 

বড় ভাই আলাউদ্দিন শেখ এক সময় সিরাজগঞ্জ কলেজ থেকে বিএ পাশ করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। তিনি যখন ছুটিতে এলাকায় আসতেন তখন নিয়মিত এলাকর বিভিন্ন কর্মসূচিতে এলাকা থেকে লোকজন নিয়ে যেতেন। তার অনুপস্থিতিতে আমাদের দুই ভাইকে এ সংগঠনিক কাজটি করতে হতো। এ জন্য আওয়ামী লীগ নেতা ক্যাপ্টেন এম. মনসুর আলী, মোতাহার হোসেন তালুকদার, সৈয়দ হায়দার আলী, শহীদুল ইসলাম তালুকদারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। যোগাযোগ রাখতে হতো তৎকালীন ছাত্রনেতা আমির হোসেন ভুলু, আমিনুল ইসলাম চৌধুরী, ইসমাইল হোসেন [দোয়াতবাড়ি], আব্দুল লতিফ মির্জা, এমএ রউফ পাতা, বিমল কুমার দাস, গোলাম কিবরিয়া, ইসহাক আলী, আজিুজুল হক বকুল, আমির হোসেন খান, সোহরাব আলী সরকার প্রমুখ ছাত্রলীগ নেতার সঙ্গে। 

উনসত্তুরের ৬ দফা ও ১১ দফা আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে কোনঠাঁসা হয়ে পড়ে পাকিস্তান সরকারের তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল মুসলিম লিগ, সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রভাব বাড়তে থাকে ছাত্রদের তথা আওয়ামী লীগের। এ আন্দোলনের ফলে আয়ুব খানের পতন এবং নতুন সামরিক শাসন এলেও আওয়ামী লীগের প্রধানতম নেতা শেখ মুজিবুর রহমান ‘বঙ্গবন্ধু’ হয়ে ওঠেন, বাঙালিদের নেতা হিসেবে তাঁর একটি ভাবমূর্তি গঠে দেশবাসীর মধ্যে। পাশাপাশি আমরা ছাত্ররা গ্রামে গ্রামে তৎপর থাকি আওয়ামী লীগের পক্ষে। ফলে জনগণের মধ্যে দলটির জনসমর্থণ বাড়তে থাকে। এ পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের নতুন সামরিক শাসক ইয়াহিয়া খান কিছু দাবিদাওয়া মেনে নেয়। যে সব দাবিদাওয়া মেনে নেয় তারমধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পূর্ব ও পশ্চিশ পাকিস্তানের দুই ইউনিট বাতিল করে জনসংখ্যা অনুযায়ী আসন বন্টন করা হয়। এতে আমরা সংখ্যা অনুপাতে পাকিস্তান জাতীয় সংসদের ১শ’ ৬০টি আসন পাই, আর পশ্চিম পাকিস্তানের বিভিন্ন প্রদেশ পায় ১ শ’ ৪০ আসন। পাশাপাশি ‘পূর্ব পাকিস্তানে’ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অন্যান্য নেতাদের পিছনে ফেলে একক নেতা হিসেবে আবির্ভূত হন, আর আওয়ামী লীগ হয়ে ওঠে একক রাজনৈতিক দল।  

পাকিস্তানে নতুন নির্বাচন ঘোষনা করা হয়। সিরাজগঞ্জে আমাদের আসনে জাতীয় সংসদে প্রার্থী মনোনয়ন দেওয়া হয় মোতাহার হোসেন তালুকদারকে এবং প্রাদেশিক পরিষদের মনোনয়ন পান সৈয়দ হায়দার আলী। আমরা ছাত্ররা নিজ দায়িত্বে গ্রামে গ্রামে ঘুরে ঘুরে ঘুরে জনগণের দোরগোরায় গিয়ে ভোট প্রার্থণা করি। তখন আমাদের অর্থাৎ নৌকা মার্কার পক্ষে জোয়ার আসে। আমাদের এলাকার প্রার্থীরা বিপুল ভোটে বিজয়ী হন। জাতীয় সংসদে ‘পূর্ব পাকিস্তানে’ দুটি ছাড়া সবগুলো আসনে বিজয়ী হন আওয়ামী প্রার্থীরা। এর ফলে সমগ্র পাকিস্তানে নির্বাচনের মাধ্যমে সংগরিষ্ঠের দলে পরিণত হয় আওয়ামী লীগ। জনগণও ভাবতে শুরু করে যে, দীর্ঘদিন পর এবার বাঙালিদের দল আওয়ামী পাকিস্তানকে শাসন করবে। নির্বাচনের ফলাফলে ভীষণ খুশি হয় সাধারণ মানুষ। 

কিন্তু ১৯৭১ সালের ১ মার্চের পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিতের ঘোষনা দেয় ইয়াহিয়া খানের সামরিক সরকার। এটাকে বাঙালিরা তাদের হাতে পাকিস্তানের ক্ষমতা না দেওয়ার ষড়যন্ত্র বলে মনে করে। এ ঘোষনা রেডিওতে প্রচারের সঙ্গে সঙ্গে ছাত্রলীগ প্রতিবাদ জানিয়ে মিছিল নিয়ে রাস্তায় নামে। সারাদেশেই মিছিলে শ্লোগান ওঠে ‘বাঁশের লাঠি তৈরি করো বাংলাদেশ স্বাধীন করো।’ তাতে দলমত নিবিশেষে যোগ দেয় সাধারণ মানুষ। আমিও সিরাজগঞ্জ শহরের সে মিছিলে অংশ নেই। পরদিন ঢাকায় ছাত্রসভায় স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়ে দেওয়া হয়। হাতে হাতে ঘুরে ঘুরে সে পতাকা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে সারাদেশে। ৭ মার্চে রেসকোর্স ময়দানে বিশাল জনসভায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ‘প্রত্যেক ঘরে ঘরে দূর্গ’ গড়ে তুলে ‘যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা’ করার আহ্বান জানান। এটাকেই সিরাজগঞ্জবাসী বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষনা বলে সর্বাত্বক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হয়ে যায়। সিরাজগঞ্জ মহুকুমার এসডিও একে শামসুদ্দিন এবং এসডিপিও আনোয়ার উদ্দিন লস্করসহ সবাই নেমে আসেন জনতার কাতারে। এ সময়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাড়িতে চলে আসেন আমার বড় ভাই আলাউদ্দিন শেখ। 

বিভিন্ন স্থানে শুরু হয়ে যায় অস্ত্র প্রশিক্ষণ। আলাউদ্দিন ভাই সহ বেশ কয়েক জন মিলে বহুলী হাটখোলায় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেন স্থানীয় তরুণদের জন্য। ডামি রাইফেল আনা হয় সিরাজগঞ্জ কলেজ থেকে। প্রশিক্ষণ দেন স্থানীয় ময়দান ডাক্তার, আনসার সদস্য আব্দুল আজিজ ও আব্দুস সামাদ। এই প্রশিক্ষণে এলাকার বেশ কিছু তরুণের সঙ্গে আমিও অংশ নেই। এই প্রশিক্ষণ সীমাবদ্ধ ছিল মূলত শরীর চর্চায়। তবুও নিয়মিত প্রশিক্ষণে যেতাম, এলাকার মানুষ ভীড় করে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আমাদের সে প্রশিক্ষণে উৎসাহ দিত। সেখানে প্রশিক্ষণ নেওয়ার কয়েক দিন পর বহুলী থেকে আমি সহ কয়েক জন তরুণকে সিরাজগঞ্জ কলেজ মাঠের প্রশিক্ষণে পাঠানো হয়। সেখানে অস্ত্রের প্রশিক্ষণের পাশাপাশি গেরিলা যুদ্ধের কলাকৌশলও শেখানো হয়। প্রশিক্ষণ দেন সেনা সদস্য লুৎফর রহমান অরুণ, রবিউলসহ আরো কয়েক জন। এখানে প্রশিক্ষণ শেষে চাঁনমারীও করানো হয়। ইতিমধ্যেই ২৫ মার্চ রাতে বিভিন্ন ক্যান্টনমেন্ট থেকে বেড়িয়ে এসে গণহত্যা শুরু করে পাকবাহিনী। হামলা চালানো হয় ইপিআর ক্যাম্প ও রাজারবাগ পুলিশ লাইনে। এ খবর দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে সারাদেশে। এদিকে, পুলিশের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষনার বার্তাও চলে আসে সিরাজগঞ্জে। আর সিরাজগঞ্জে কোনও ক্যান্টনমেন্ট বা সেনা ক্যাম্প না থাকা এবং মহুকুমা প্রশাসনের সবাই স্বাধীনতার পক্ষে থাকায় সহজেই স্বাধীন বাংলাদেশের অংশ হয়ে পড়ে এ অঞ্চল। কিছু তরুণকে পাঠানো হয় বাঘাবাড়িতে পাকসেনাদের ঠেকানোর জন্য, আর কিছু তরুণকে রাখা হয় শহরের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা করতে। আমি বাঘাবাড়িতে যেতে চাইলেও আমাকেসহ পুলিশ, আনসার সদস্য এবং আমাদের মতো কিছু তরুণকে শহরের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার গ্রুপের সঙ্গে রাখা হয়।

ঢাকা থেকে বের হয়ে পাকসেনারা আমাদের মুক্ত এলাকাগুলো দখলে নিতে শুরু করে। সিরাজগঞ্জেও গুজব ছড়িয়ে পড়ে পাকসেনা আসার। শহর ছাড়তে শুরু করে সিরাজগঞ্জবাসী। ২৬ এপ্রিল শহর ছেড়ে যান সিরাজগঞ্জের মহুকুমা প্রশাসক একে শামসুদ্দিন এবং এসডিপিও আনোয়ার উদ্দিন লস্কর। তার আগে মাইকে ঘোষনা করা হয় সাধারণ মানুষজনকেও শহর ছেড়ে যাওয়ার জন্য। আমি এলাকার অন্যদের সঙ্গে শহর ছেড়ে চলে আসি নিজের গ্রামে। আমরা তিন ভাই মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার সময় ছোট বোন আর মাকে রেখে গিয়েছিলাম বাড়িতে। বাড়িতে এসে দেখলাম, তারা চলে গেছেন নিরাপদ আশ্রয়ে। আমি মামাদের বাড়ি ধীতপুরে চলে যাই, কিন্তু সে গ্রামের বাসিন্দাদের অনেকেই ততক্ষণে চলে গেছেন নিরাপদ আশ্রয়ে। 

২৭ এপ্রিল ভোর রাতে ট্রেনে করে সিরাজগঞ্জ চলে আসে পাকসেনারা। দশ/এগারোটার দিকে চান্দাইকোনা-সিরাজগঞ্জ রোড হয়ে পাকসেনাদের একটি গ্রুপ আমাদের বাড়ির পাশ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে চলে যায় সিরাজগঞ্জ। পরে আবারো বিকেল তিনটের দিকে সিরাজগঞ্জ শহর থেকে পাকসেনাদের একটি গ্রুপ আসে আমাদের গ্রামে। তারা আমাদের বাড়ি থেকে আগুন দেওয়া শুরু করে, এ সময় আগুন দেওয়া হয় গ্রামের প্রায় সব বাড়িতে। গ্রামের যারা তখনো সরে যায়নি তাদের দেখা মাত্র গুলি করে হত্যা করা হয়। কিছু মানুষকে ধরে এনে নদীর পাড়ে লাইনে দাঁড় করিয়ে হত্যা করা হয়। এর মধ্যে অনেকেই শহর থেকে আমাদের গ্রামে এসে আশ্রয় নিয়েছিলেন, তাদেরও হত্যা করা হয়।

এ পরিস্থিতিতে নিজের এলাকায় আত্মগোপন করে থাকি আর নিজের বাবা-মা, ভাইবোন ও সহযোদ্ধাদের খুঁজতে থাকি। এ সময় আমার সঙ্গে যুক্ত হন আমার মামাতো ভাই আব্দুর রাজ্জাক জামিল। খবর পাই যে, আলাউদ্দিন ভাই আমার চাচাতো ভাই আনোয়ারের মামার বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় আছে। কিন্তু সেখানে গিয়ে তার কোনও খবর জোগাড় করতে পারি না। কিন্তু জানতে পারি যে, তার সঙ্গে থাকা পাঁচটি থ্রিনটথ্রি রাইফেল ও কিছু গুলি লুকিয়ে রাখা হয়েছে ওই বাড়িতে। অস্ত্রগুলো আলাউদ্দিন ভাইয়ের সঙ্গে থাকা মুক্তিযোদ্ধারা নিয়ে এসেছিলেন বাঘাবাড়ি থেকে। সেখানেই ভাসা ভাসা খবর পাওয়া যায় যে, আলাউদ্দিন ভাই ভারতে চলে গেছেন, আবার কেউ কেউ বলেন, তিনি এলাকায়ই আছেন, মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে একটি দল গঠনের চেষ্টা করছেন। 

ইতিমধ্যেই খবর পাওয়া যায় যে, ছাত্রনেতা আব্দুল লতিফ মির্জা ভদ্রঘাটে সোহরাব আলী সরকারের মামার বাড়িতে আছেন। সেখানে ছাত্রলীগের বেশ কিছু নেতাকর্মী সংগঠিত হয়েছেন, গঠন করা হয়েছে মুক্তিযোদ্ধাদের দল। যোগাযোগ করে আমি আর আব্দুর রাজ্জাক জামিল আরো কয়েক জনকে সঙ্গে নিয়ে চলে যাই ভদ্রঘাটে। সঙ্গে নিয়ে যাই আলাউদ্দিন ভাইয়ের রাখা পাঁচটি থ্রিনটথ্রি রাইফেলও। অস্ত্রগুলো আব্দুল লতিফ মির্জার কাছে জমা দিয়ে আমরা কয়েকজন যুক্ত হই পলাশডাঙ্গায়। নিজের কাছে রেখে দেই থ্রিনটথ্রি রাইফেলের কিছু গুলি আর একটি গ্রেনেড। সে দিনই বাবার খোঁজে তাড়াশ যেতে হবে বলে কয়েক দিন ছুটি চেয়ে নেই লতিফ মির্জার কাছে থেকে। আমি আর আমার মামাতো ভাই আব্দুর রাজ্জাক জামিল রওনা হই তাড়াশের দিকে। পথে কয়েক জন কলেজ ছাত্রের সঙ্গে দেখা হয়। তারা আগে থেকেই আমার পরিচিত। তাদের সঙ্গে আলোচনা ওঠে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে। তাদের বলি যে, আমরা মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছি। তারা আমাদের বোঝানোর চেষ্টা করে যে, পাকবাহিনীর সঙ্গে লড়াই করে কখনোই বিজয়ী হওয়া সম্ভব নয়, তাই পাকিস্তানকে মেনে নেওয়াই ভালো। হাজার বছর যুদ্ধ করলেও বাংলাদেশ স্বাধীন করা সম্ভব নয়। কিন্তু আমরা ওদের কথা মানতে নারাজ। আমরা ওদের সঙ্গে তর্ক জুড়ে দেই, কিন্তু এক সময় ভয়ও পেয়ে যাই যে, ওরা স্বাধীনতা বিরোধীদের দলে যুক্ত হয়ে থাকতে পারে। এ নিয়ে তর্কও হয় ওদের সাথে। এক সময় দুপক্ষই রণে ভঙ্গ দিয়ে ওরা চলে যায়, আমরাও দ্রুত ওই এলাকা ছেড়ে অন্য পথ ধরে চলে যাই তাড়াশে।

তাড়াশ কাজী অফিসে বিয়ে রেজিষ্ট্রার হিসেবে চাকরি করতেন আমার বাবা, থাকতেন সেখানেই। কিন্তু হতাশ হতে হলো সেখানে গিয়ে। আশপাশের লোকজনের কাছে জানা গেল যে, তিনি কয়েক দিন হয় এলাকায় চলে গেছেন তিনি। সে সময়ে অন্য কোথাও যাওয়ার চেয়ে সেখানে থাকাই নিরাপদ মনে হয়। কেউ কেউ অভয় দেন যে, সেখানে থাকা কোনও সমস্যা নয়। আমি আর জামিল আমাদের কাছে থাকা গুলি আর গ্রেনেড সিলিংয়ের উপর রেখে ওখানেই থেকে যাই। কিন্তু দু’একদিন যেতে না যেতেই মনে হয়, আমাদের মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সন্দেহ করা হচ্ছে, যে কেউ থানায় বলে দিলে নির্ঘাত আমাদের ধরা পড়ে যেতে হতে পারে। এ পরিস্থিতিতে সেখান থেকে বের হয়ে পড়ি সেখান থেকে। কিছু দূর আসার পর মনে হয় গুলি আর গ্রেনেডের কথা। ফিরে রওনা হই গুলি আর গ্রেনেড আনার জন্য। গুলি আর গ্রেনেড নিয়ে কিছু দূর আসার পরই দেখতে পাই যে, কাজী অফিসে হানা দিয়েছে পাকসেনারা। অল্পের জন্য পাকসেনাদের হাতে ধরা পড়া থেকে বেঁচে যাই। তাড়াশ থেকে রওনা হই ভদ্রঘাটের দিকে। পথে খবর পাই যে, ভদ্রঘাটে পলাশডাঙ্গার মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে হামলা চালিয়েছিল পাকসেনারা। সেখান থেকে ছত্রভঙ্গ হয়ে গেছে লতিফ মির্জা সহ মুক্তিযোদ্ধারা। এ খবর পেয়ে হতাশ হয়ে পড়ি, কী করবো বুঝে উঠতে না পেরে দুজন চলে আসি নিজ এলাকায়। 

এলাকায় এসে বাবা-মা ভাইবোনদের কে কোথায় আছেন তার খবর সংগ্রহ করা চেষ্টা করি, কিন্তু খুঁজে পাই না। তবে অনেকেই জানান যে, আলাউদ্দিন ভাই চলে গেছেন ভারতে প্রশিক্ষণ নিতে। পলাশডাঙ্গার মুক্তিযোদ্ধারা তাড়াশ এলাকায় কয়েকটি নৌকা নিয়ে চলনবিল এলাকায় । তখন পলাশডাঙ্গাকে খুঁজে বের করে তাদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে থাকার সিদ্ধান্ত নেই। আমি আর জামিল রওনা হই নলকা হয়ে তাড়াশের দিকে। নলকায় এক আত্মীয় বাড়িতে রাত কাটানোর জন্য অবস্থান নেই, সেখানেই জানতে পারি যে পলাশডাঙ্গার মুক্তিযোদ্ধারা নৌকায় করে এ গ্রাম সে গ্রাম ঘুরে বেড়াচ্ছে, সুযোগ পেলেই হামলা চালাচ্ছে স্বাধীনতা বিরোধীদের বাড়িতে অথবা কোনও রাজাকার ক্যাম্পে, থানা পুলিশের বিভিন্ন ক্যাম্পে বা থানায়। তাদের নৌকা মাঝেমধ্যেই আসে ফুলজোড় নদীতে। কেউ কেউ পরামর্শ দেন ফুলজোড় আর ইছামতীর তীরে নলকা এলাকাতে অবস্থান করলেই কয়েক দিনের মধ্যে এখানেই পাওয়া যাবে তাদের। আমরাও চিন্তা করি, চলনবিলের কোথায় গিয়ে খুঁজবো, তার চেয়ে এখানে অবস্থান করাই ভালো। নলকা গ্রামটির যোগাযোগ ব্যবস্থা পাকসেনাদের অনুকুলে নয়। তাই সেখানে আত্মীয় বাড়িতে থাকতে শুরু করি আমরা। আমরা সারাদিনই নলকা নদীর পারে অবস্থান করতে থাকি আর রাতে আত্মীয় বাড়িতে গিয়ে রাত কাটাই। একদিন পলাশডাঙ্গার বেশ কয়েকটি নৌকা পেয়ে নলকার ফুলজোড় নদীতে, উঠে পড়ি সে নৌকায়। 
পলাশডাঙ্গার নিয়মানুযায়ী আমাদের দুজনকেই প্রথমে হেড কোয়ার্টারে রাখা হয়, পরে জামিলকে একটি কোম্পানিতে অন্তভূক্ত করা হয়। আর আমাকে পলাশডাঙ্গার হিসাব বিভাগে রাখা হয়। আমি হিসাব বিভাগের দায়িত্বে থাকা আব্দল হাই তালুকদার ও সলপের ইকতিয়ার পান্নাকে সহযোগিতা করতে থাকি। নিয়মানুযায়ী আমাদের প্রত্যেককেই সকালে হাজিরা, শরীর চর্চা এবং অস্ত্রের প্রশিক্ষণ নিতে হতো। বিভিন্ন যুদ্ধেও অংশ নিতে হতো। সারাদিন একটি গ্রামে যার যার নৌকায় অবস্থান নিয়ে থাকতাম আমরা। এমন অনেকগুলে নৌকা ছিল পলাশডাঙ্গার। সকালেই গ্রামে কোনও মাঠে বা নদীর পারে আমাদের প্রশিক্ষণ হতো। আমরা সরাসরি পরিচালকের কাছে জবাবদিহি করতাম। কালেকশনের দায়িত্ব থাকা ব্যাক্তিগণ তাদের তোলা চাল-ডাল, অর্থ আমাদের কাছে জমা দিতেন। নিয়মানুযায়ী আমরা রেশন ও হাত খরচের টাকা প্লাটুন, সেকশনকে বিতরণ করতাম। সেকশন বা প্লাটুন কমান্ডার কাছাকাছি হাটবাজার থেকে তাদের জিনিষপত্র সংগ্রহ করে নিতো। 
১১ নভেম্বর তাড়াশের হান্ডিয়াল নওগাঁয় অবস্থান নেই আমরা। সেদিন ভোর রাতে আমাদের ওপর হামলা চালায় পাকবাহিনী ও তার সহযোগিরা। আমাদের অবস্থান ছিল সুবিধাজনক, প্রকৃতি পক্ষে, সবচেয়ে বড় কথা জনগণ ছিল আমাদের পক্ষে। ফলে প্রায় বারো ঘন্টা যুদ্ধ করে আমরা তাদের পরাস্থ করতে সক্ষম হই। সেদিন তাড়াশের কঠিন কাদামাটিও ছিল পাকবাহিনীর বিপক্ষে। পাকসেনাদের আনুমানিক এক কোম্পানি সেন্য আমাদের হাতে নিহত হয়, রাজাকার মারা যায় প্রায় ২ শ’। ধরা পড়ে একজন ক্যাপ্টেন সহ ১২ জন সৈন্য। এলএমজি সহ বেশ কিছু ভারি অস্ত্রও চলে আসে আমাদের হাতে। জনগণও অনেক পাকসেনা ও রাজাকারকে তাদের ঘষির মাঁচা থেকে ধরে এনে আমাদের হাতে সোপর্দ করে। কিন্তু আমাদের ক্ষয়ক্ষতি হয় সামান্যই। হান্ডিয়াল নওগাঁ যুদ্ধের অভিজ্ঞতা অনুযায়ী আমাদের কমান্ডারেরা কৌশল পাল্টানোর সিদ্ধান্ত নেন। কারণ বর্ষা শেষে বিস্তৃত চলনবিলের পানি কমে এসেছে। আমাদের চলাচলের এলাকা হয়ে এসেছে অনেক কম। ফলে সহজেই আমাদের অবস্থান চিহ্নিত করতে পারছিল শত্রুরা। তাই নৌকা ছেড়ে দিয়ে ডাঙ্গায় নামার সিদ্ধান্ত নেন কমান্ডারেরা। তাছাড়াও এ যুদ্ধের ফলে আমাদের হাতে নতুন অস্ত্র এলেও গুলির সংকট তীব্র হয়ে দেখা দেয়। তারপরেও কয়েক দিন চলনবিল এলাকায় টিকে থাকার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু পাকসেনা ও তার সহযোগিরা আমাদের অবস্থানকে মোটামুটি চিহ্নিত করে ফেলায় চলনবিলের চার পাশের গ্রামগুলোতে ব্যাপক লুটপাট, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট ও গণহত্যা শুরু করে। পরে নভেম্বরের দ্বিতীয়ার্ধে এসে পলাশডাঙ্গার কমান্ডার ও পরিচালকবৃন্দ সিদ্ধান্ত নেন, প্রয়োজনীয় গুলি সংগ্রহের উদ্দেশ্যে মুক্ত এলাকা রৌমারীতে যাওয়ার। এ জন্য আমরা পলাশডাঙ্গার সবাই রওনা হই রতনকান্দি কাজীপুরের দিকে।

কষ্ট লাগে বড় ভাই আলাউদ্দিন বা অন্যদের সঙ্গে দেখা হলো না। ব্রহ্মগাছা-রতনকান্দির কাছে এক গ্রামে অবস্থান নেই আমরা। পরের দিনই লতিফ ভাই বলেন, তোর ভাই আলাউদ্দিনের সাথে দেখা করবি? - গত আট মাসে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরে আর তার দেখা পাই নি, বাবামা, ভাইবোনকেও হারিয়ে ফেলেছি। এখন কোথায় পাবো আলাউদ্দিন ভাইকে? বললাম আমি। লতিফ ভাই এবার বলেন- চল যাই, আলাউদ্দিন আছে পাশের গ্রামে। দুজন চলে যাই চক ডাকাতিয়া গ্রামে। সেখানে আলাউদ্দিন ভাই অবস্থান করছিলেন তার তার গ্রুপের মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে। সেখানে এক বাড়িতে গিয়ে দেখা করি বড় ভাইয়ের সঙ্গে। আলাউদ্দিন ভাই বাঘাবাড়ি থেকে ফিরে চলে গিয়েছিলেন ভারতে। বিএলএফের দ্বিতীয় ব্যাচে প্রশিক্ষণ নিয়ে এলাকায় ফিরেছেন। তারপর বিএলএফের নিয়ম অনুযায়ী স্থানীয় ভাবে রিক্রুট করে দল গড়ে তুলেছেন। লতিফ ভাই বিএলএফের নেতৃবৃন্দের খোঁজ খবর নেন। এক সময় আমি আর লতিফ ভাই ফিরে আসি আমাদের অবস্থানে। এর পর কয়েক দিনের প্রস্তুতি নিয়ে শুভগাছার টেংলাহাটা যমুনার ঘাট থেকে নৌকায় উঠে আমরা রওনা হই কুড়িগ্রাম মহুকুমার রৌমারীর উদ্দেশ্যে।

পথে নানা ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে, বিমান হামলা এড়িয়ে তিন দিনে, অর্থাৎ নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে আমরা পৌঁছে যাই রৌমারী ইয়থ ক্যাম্পে, ততদিনে সেখানে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ রিক্রুট প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। সে ক্যাম্পেই আমাদের থাকার ব্যবস্থা হলো। দীর্ঘদিন পর শত্রুকে নিয়ে কোনও উত্তেজনা নেই, আক্রমন করার কোনও পরিকল্পনাও নেই। কিন্ত পলাশডাঙ্গার নেতৃবৃন্দের বিশ্রাম নেওয়ার কোনও সুযোগ নেই, তারা কেউ ছুটলেন কোলকাতায় প্রবাসী সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে, কেউ গেলেন বিএলএফ নেতৃবৃন্দের সঙ্গে দেখা করতে। আর রৌমারীতে বসে বসে অলস সময় কাটতে লাগলো আমাদের।
এদিকে, ডিসেম্বরের প্রথম দিন থেকেই দ্রুত পরিস্থিতি পাল্টাতে শুরু করলো। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী [মুক্তিবাহিনী] ও ভারতীয় সেনাবাহিনী [মিত্র বাহিনী]র সমন্বয়ে গঠন করা হলো যৌথ বাহিনী। পাকসেনা বাহিনী ভারতকে আক্রমন করে বসে ভারতীয় ভূখ-ে। ভারত তার পাল্টা জবাব দেয়। পাল্টা আক্রমন করে। এ যুদ্ধ চলছিল পশ্চিম পাকিস্তান সীমান্তে। যৌথ বাহিনী একের পর এক পাকবাহিনীকে হটিয়ে দিয়ে থাকে, মুক্ত হতে থাকে বাংলাদেশ। ভুটান, নেপাল ও ভারত স্বাধীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়। সহজেই বোঝা যায় যে, স্বাধীনতা এখন সময়ের ব্যাপার। অবশেষে ১৬ ডিসেম্বর বিকেলে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে যৌথ বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে পাকবাহিনীর পূর্বঞ্চলীয় কমান্ড। নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্যে দিয়ে স্বাধীন হয় বাংলাদেশ।

ইতিমধ্যেই পলাশডাঙ্গার নেতৃবৃন্দ ফিরে আসেন রৌমারীতে। ১৭ ডিসেম্বরেই আমরা বেশ কয়েকটি নৌকায় উঠে রওনা হই সিরাজগঞ্জের দিকে। এক/দুই দিনের মধ্যেই আমরা ব্রহ্মপুত্র যমুনা হয়ে আমরা ফিরে আসি মুক্ত সিরাজগঞ্জে। পুরান জেলখানার ঘাটে নামার পর আমাদের বিপুল সংবর্ধনা দেয় সিরাজগঞ্জের মুক্তিযোদ্ধা জনতা। সেদিন আমরা পুরো শহরে বিজয় মিছিল করি। আমাদের প্রথম ক্যাম্প স্থাপন করা হয় সিরাজগঞ্জ কলেজে। তারপর ক্যাম্প হয় মোক্তার পাড়ার মোড়ে সাহারা হোটেলে। 

১০ জানুয়ারি বাংলাদেশের স্থপতি পাকিস্তান কারাগার থেকে ফিরে এসে স্বাধীন বাংলাদেশের দায়িত্ব নেন। এর কয়েক দিন পরেই সিরাজগঞ্জ কলেজ মাঠে প্রবাসী সরকারের অর্থমন্ত্রী ক্যাপ্টেন এম. মনসুর আলীর কাছে আমরা পলাশডাঙ্গার মুক্তিযোদ্ধারা আনুষ্ঠানিক ভাবে অস্ত্র সমর্পণ করি, শেষ হয় আমার মুক্তিযোদ্ধা জীবন। [সমাপ্ত] 

অনুলিখন: সাইফুল ইসলাম

ও/এসএ/

Published: Sun, 05 Jul 2020 | Updated: Sun, 05 Jul 2020

যুদ্ধস্মৃতি : মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল হাই শেখ

আমি আব্দুল হাই শেখ। সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার খোকসাবাড়ি ইউনিয়নের পুরান শৈলাবাড়ি গ্রামে বাবা দিয়ানত আলী শেখ ও মাতা সেফাতন নেছার ঘরে ১৯৫৩ সালের এপ্রিল মাসের ৪ তারিখে জন্ম গ্রহণ করি। আট ভাই-দুই বোনের মধ্যে আমি পঞ্চম। তখনকার পারিবারিক নিয়ম অনুয়ায়ী মাদ্রাসা দিয়ে আমার লেখাপড়া শুরু। আমি এসএসসি পাশ করি ১৯৭০ সালে। সে বছরই ভর্তি হই সিরাজগঞ্জ আইআই কলেজে। 

এলাকার রাজনীতি অনুযায়ী গ্রামের ছাত্ররা নানাভাবে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়তো। তাছাড়াও এলাকার ছাত্ররাও বিশেষ করে আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু শাহানগাছার আমিনুল ইসলামরা আগে থেকেই ছাত্রলীগের সঙ্গে যুক্ত ছিল, তাই আমিও কলেজে ভর্তি হয়ে যুক্ত হই ছাত্রলীগে। তখন প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে ছাত্রলীগ শহরে মিছিল করতো। মিছিলের প্রধান প্রধান স্লোগান ছিল ‘জয়বাংলা’ ‘তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা মেঘনা যমুনা’ ইত্যাদি। 

ছাত্রলীগের কর্মী হিসেবে এলাকায় সত্তরের নির্বাচনী কাজে যুক্ত থাকি অন্যদের সঙ্গে। আমাদের এলাকা থেকে এমএনএ পদে মোতাহার হোসেন তালুকদার এবং এমপিএ পদে সৈয়দ হায়দার আলী বিপুল ভোটে বিজয়ী হন। একইভাবে সারাদেশে বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়ে আওয়ামী লীগ ‘পূর্ব পাকিস্তানের’ ১৬২ আসনের মধ্যে ১৬০টি আসনই লাভ করে। এভাবে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের ৩০০ আসনের মধ্যে ১৬০ আসন পেয়ে পাকিস্তানের একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দলে পরিণত হয়। ফলে নিশ্চিত হয় বাঙালিদের পাকিস্তানের ক্ষমতা গ্রহণ। তখন আনন্দে অথবা দাবি আদায়ের জন্যই কলেজে গেলে বিভিন্ন মিছিল-মিটিংয়েও তৎপর থাকতে হতো নিয়মিত।

১৯৭১ সালের ১ মার্চে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করে ইয়াহিয়া খান। এটাকে বাঙালিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর না করার ষড়যন্ত্র বলে মনে করে সাধারণ মানুষ। সিরাজগঞ্জে এ ঘোষণার সাথে সাথেই প্রতিবাদ জানাতে ছাত্রলীগ মিছিল বের করে। সে মিছিলেই স্লোগান ওঠে ‘বাঁশের লাঠি তৈরি করো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো’ অর্থাৎ বাংলাদেশের স্বাধীনতার। আমাদের ছাত্রদের সঙ্গে সে মিছিলে যোগ দেয় সাধারণ মানুষও। এরপরই শুরু হয় অসহযোগ আন্দোলন। 

প্রতিদিনই মিছিল হতে থাকে শহরে। আমাদের ক্লাস না থাকলেও মিছিল করতেই প্রতিদিন গ্রাম থেকে শহরে যাই। এরমধ্যে ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে তাঁর ভাষণে বলেন, ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ তাঁর এ ঘোষণাকেই সিরাজগঞ্জবাসী স্বাধীনতার ঘোষণা বলে মনে করে। 

ঘোষিত স্বাধীনতা রক্ষা এবং হানাদার পাকবাহিনীকে প্রতিরোধের জন্য শহরের বিভিন্ন স্থানে অস্ত্র প্রশিক্ষণ শুরু হয়। আমি প্রশিক্ষণের জন্য তৎকালীন জিন্না স্টেডিয়াম বর্তমানে শহীদ একে শামসুদ্দিন স্টেডিয়ামে অস্ত্র প্রশিক্ষণ নিতে নাম লেখাই। সেখানে মুকুল ফৌজের জহুরুল ইসলাম মিন্টু, আনসার সদস্য বাহাদুরসহ অনেকেই আমাদের প্রশিক্ষক হিসেবে প্রশিক্ষণ দেন। প্রায় প্রতিদিনই আসতেন সিরাজগঞ্জের তৎকালীন এসডিও একে শামসুদ্দিন এবং এসডিপিও আনোয়ার উদ্দিন লস্কর।

২৫ মার্চ ঢাকায় নিরীহ বাঙালিদের ওপর হামলা চালায় পাকহানাদের বাহিনী। শুরু করে গণহত্যা, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ। গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দিতে শুরু করে পাকসেনারা। বড় বড় শহর থেকে গ্রামে ফিরতে শুরু করে সাধারণ মানুষ। তাদের মাধ্যমে গ্রামে গ্রামে প্রচার হতে থাকে পাকবাহিনীর নির্যাতনের খবর। এতে সাধারণ মানুষ আরো বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। পাকিস্তানের ওপর যেটুকু আস্থা সাধারণ মানুষের ছিল তা-ও শেষ হয়ে যায়। 

এ সময় জিন্না স্টেডিয়ামে চানমারীর মধ্যে দিয়ে প্রশিক্ষণ পর্ব শেষ হয়। কেউ কেউ চলে যায় বাঘাবাড়ি ঘাটে হানাদার বাহিনীকে প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে। আমাদের বলা হয় এলাকায় গিয়ে মুক্তিযোদ্ধা দল গঠনের জন্য। আমি এলাকায় ফিরে মুক্তিযোদ্ধা দল গঠনে যুক্ত হই। আমাদের এলাকার আওয়ামী লীগ নেতা শহীদুল ইসলাম তালুকদারের ছোটভাই নজরুল ইসলাম লিচুর নেতৃত্বে ১৩/১৫ জনের একটি দলও গঠন করা হয়। এতে যুক্ত হন আনসার সদস্য শাহ আলম সরকার (বেলতা), আমার বড় ভাই আব্দুস সামাদ (পুরান শৈলাবাড়ি), ইব্রাহিম হোসেন (শৈলাবাড়ি), হেদায়েতুল আলম (তেলকুপি) প্রমুখ। এ সময়ে আমরা জোগাড় করে ফেলি প্রায় দশটি রাইফেল ও বেশ কিছু গুলি। 

এদিকে, ২৭ এপ্রিল ভোরে ট্রেনযোগে পাকবাহিনী এসে দখল করে নেয় সিরাজগঞ্জ শহর। এখানেও শুরু করে গণহত্যা, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ। সিরাজগঞ্জে শুরু হয়ে যায় স্বাধীনতাবিরোধী শান্তি কমিটি রাজাকার বাহিনীর তৎপরতা। আমাদেরও শুরু হয় দলবদ্ধভাবে গোপন তৎপরতা।

এলাকায় বিভিন্ন ছোট-বড় মুক্তিযোদ্ধা গ্রুপ গড়ে উঠতে থাকে। রহমতগঞ্জের ইসমাইল হোসেনের নেতৃত্বেও এলাকায় এমনি একটি গ্রুপের তৎপরতার খবর পাওয়া যায়। আমাদের গ্রুপের একজনের সম্পর্ক ছিল ইসমাইলের সঙ্গে। সেই সম্ভবত আমাদের খবর তার কাছে পৌঁছে দেয়। একদিন ইসমাইল এসে আমাদের কাছে প্রস্তাব দেন তাদের গ্রুপে যোগ দেওয়ার জন্য অথবা অস্ত্রগুলো তাদের গ্রুপে দিয়ে দেওয়ার জন্য। উপায়ান্তর না দেখে আমরা তাঁর গ্রুপে যোগ দেই। এতে অবশ্য দলটি বড় হয়। আমরা দলবদ্ধভাবে এলাকায় ঘোরাফেরা করতে থাকি। কখনো কখনো রাতে রাতে স্বাধীনতাবিরোধীদের বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে হুমকি দিতে থাকি। 

ইসমাইল এককভাবে দলটি পরিচালনা করতেন, সঙ্গে ছিলেন তাঁর কয়েক ভাই। এই গ্রুপের অনেক কাজই রহস্যজনক। অনেক কাজেই আমাদের যুক্ত করা হতো না। কিন্তু দলবদ্ধভাবে থাকাটা এ সময়ে আমাদের জন্য ছিল খুবই জরুরি। আমরা নিরাপত্তার প্রশ্নেই শুধু একই এলাকায় তৎপর থাকতাম না, কখনো চলে যেতাম কামারখন্দ, বেলকুচি; কখনো বা রতনকান্দি, কাজীপুর, বগুড়ার ধুনট এলাকায়। আমরা তখন কয়েকটি নৌকায় অবস্থান করতাম। 

একদিন আমরা চলে গেছি রতনকান্দি-গোপালনগর এলাকার বগা গ্রামের কাছে। এ সময় আব্দুল লতিফ মির্জার নেতৃত্বাধীন পলাশডাঙ্গা যুব শিবিরের সঙ্গে আমাদের ইসমাইল গ্রুপের দেখা হয়ে যায়। আলোচনার ভিত্তিতে আমরা ইসমাইল গ্রুপ যুক্ত হয়ে পড়ি পলাশডাঙ্গার সঙ্গে। আমাদের বিভিন্ন গ্রুপে ভাগ করে দেওয়া হয় পলাশডাঙ্গার নিয়ম অনুযায়ী। ইসমাইলকেও একটি গ্রুপ দেওয়া হয় পরিচালনার জন্য। আমাদের গ্রুপের দায়িত্ব দেওয়া হয় বেড়া অঞ্চলের এক সেনা বা ইপিআর সদস্যকে।

পলাশডাঙ্গা যুব শিবিরে যুক্ত হওয়ার দু’এক দিন পরের ঘটনা। আমরা তখন ব্রহ্মগাছার পরে নদীর মধ্যে অবস্থান করছি। সকালের প্যারেড, পিটি, প্রশিক্ষণ শেষে নাস্তা করার প্রস্তুতি নিচ্ছি। এ সময় সিরাজগঞ্জ থেকে পাকসেনার একটি দল এসে ব্রহ্মগাছার নদীতে অবস্থানরত পলাশডাঙ্গার মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর হামলা চালায়। আমরা তড়িঘড়ি করে নৌকা থেকে নেমে আশ্রয় নেই নদীর পশ্চিম পারে ব্রহ্মগাছা এলাকায়, আর পাকসেনারা আশ্রয় নেয় সুবর্ণগাতী এলাকায়। তখন সূবর্ণগাতীর বেশ কয়েক জন স্বাধীনতাবিরোধী কর্মকাণ্ডে তৎপর ছিল, তারাই পথ দেখিয়ে নিয়ে এসেছে পাকসেনাদের। 

সারাদিন উভয় পক্ষের মধ্যে গোলাগুলি হয়। এ সময় সাধারণ মানুষের সহযোগিতার কথা ভোলার নয়। সাধারণ মানুষ পাটক্ষেত, আখক্ষেতের ভিতর দিয়ে আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য মুড়ি, চিড়া, ভাত, যে যা পেরেছে এনে দিয়েছে। তা খেয়েই আমরা সেদিন জনগণের সহায়তায় সারাদিন যুদ্ধ করেছি। বিকেলের দিকে পাকসেনারা রণে ভঙ্গ দেয়, আমরাও সে এলাকা থেকে উইথড্র করি। এরপর আমরা চলে যাই চলনবিল এলাকায়। 

এ যুদ্ধের পরপরই একটি ঘটনার কথা মনে পড়ে। এ সময় আমিসহ কয়েক জনের হাতে তুলে দেওয়া হয় টিপু নামের একজনকে। বলা হয়, উল্লাপাড়া অঞ্চলের এক মুসলিম লিগ নেতা, ঐ সময় স্বাধীনতাবিরোধী শান্তি কমিটির নেতার ছেলে সে। সে পাকিস্তানিদের পক্ষে স্পাইং করার জন্য আমাদের সঙ্গে কাছে আসতে পারে। আমরা তার সঙ্গে কথা বলে জানতে পারি যে, সে ছাত্রলীগ করে। মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতেই এ বাহিনীতে এসেছে। তখন আমরা তাকে শাস্তি দিতে গড়িমসি করি। এ জন্য কমান্ডারেরা আমাকেসহ গ্রুপের অন্যদের তিরস্কার করে। পরে ঐ ছেলেকে আমাদের হাত থেকে নিয়ে ইসমাইলের আরেকটি গ্রুপের হাতে তুলে দেওয়া হয়।

পলাশডাঙ্গা যুব শিবির পরিচালিত হতো পুরোপুরি সামরিক কায়দায়। পাকসেনাবাহিনী থেকে বেড়িয়ে আসা কিছু সদস্য এসে যুক্ত হয়েছিল পলাশডাঙ্গায়, তারাই এ শৃঙ্খলা গড়ে তোলে। আব্দুল লতিফ মির্জা, বিমল কুমার দাস, সোহরার আলীসহ ছাত্রনেতারা এ বাহিনী পরিচালনা করতেন। 

এ বাহিনীর মুক্তিযোদ্ধারা সাধারণত নৌকায় থাকতো। অপারেশনের প্রয়োজনে মাটিতে নামতো, অপারেশন শেষ হলে আবার নৌকায় আশ্রয় নিত। যেহেতু বাহিনীর শৃঙ্খলা রক্ষার নিয়মগুলো সেনাসদস্যের পরামর্শে করা হয়, তাই বাহিনীতে মুক্তিযোদ্ধাদেরও কঠোর শৃঙ্খলা মেনে চলতে হতো। সেকসন, প্লাটুন, কোম্পানির নৌকাগুলো পাশাপাশি অবস্থান করতো। নিরাপত্তার প্রয়োজনে প্রতিদিন গভীর রাতে পুরাতন আশ্রয় ছেড়ে নতুন আশ্রয়ে যাওয়া হতো। কোনো না কোনো গ্রামের পাশে আমরা আশ্রয় নিতাম। ভোরে উঠে মাটিতে নামতাম প্যারেড, পিটি ও অস্ত্র প্রশিক্ষণের জন্য। সেখানে অস্ত্র প্রশিক্ষণ ও যুদ্ধের কৌশল নিয়ে আলোচনা হতো। তখন আমরা গ্রামবাসীর সঙ্গে মেলামেশার সুযোগ পেতাম। ঐসব গ্রামবাসীও আমাদের মুক্তহস্তে চালডাল তুলে দিত যা থেকে পলাশডাঙ্গার মুক্তিযোদ্ধাদের খাওয়ার চালডাল হয়ে যেত। প্রতিদিন আমাদের সামান্য কিছু হাতখরচ দেওয়া হতো।

উধুনিয়া বাজারে ছিল একটি রাজাকার ক্যাম্প। পরিকল্পনা করা হয় সে ক্যাম্প আক্রমণের। আমরা প্রায় তিনটি সেকশন সে আক্রমণে যুক্ত হই। প্রতিটি আক্রমণে সাধারণত সেনা সদস্যরাই নেতৃত্ব দিতেন। সঙ্গে থাকতেন গুরত্বপূর্ণ ছাত্রমুক্তিযোদ্ধারা। ক্যাম্প ঘিরে ফেলার পর আমাদের দিক থেকে আক্রমণ করা হয়। রাজাকারেরা তেমন প্রতিরোধই করতে পারেনি। আত্মসমর্পণ করে অন্তত পনের জন রাজাকার। পরে তাদের বিচার করে শাস্তি দেওয়া হয়। 

এ সময় রাজাকারদের অন্তত দশটি থ্রিনটথ্রি রাইফেলসহ বেশ কিছু গুলি আমাদের কাছে জমা হয়। তখন পলাশডাঙ্গা আরো একটি যুদ্ধের পরিকল্পনা করে। পরিকল্পনাটি করা হয় ঈশ্বরদী-সিরাজগঞ্জের রেললাইনের মোহনপুর দিলপাশারের একটি রেলব্রিজে। ঐসব রেলব্রিজে রাজাকার ক্যাম্প বসিয়ে পাহারা দেওয়া হতো যাতে মুক্তিযোদ্ধারা ব্রিজ ধ্বংস করে রেলপথ বন্ধ না করতে পারে। তাছাড়াও মুক্তিযোদ্ধারা ঐসব রেলব্রিজের নিচ দিয়ে যেন চলাচল না করতে পারে এ জন্যও রাজাকারদের সশস্ত্র পাহারা বসানো হতো। 

ঐ রেলব্রিজ অপারেশন পরিকল্পনা করে পলাশডাঙ্গা। সেখানে সুবিধা ছিল যে, কোনো পাকসেনা ছিল না। আবার অসুবিধা ছিল যে, যুদ্ধ শুরু হলেই ট্রেনযোগে চলে আসতে পারে পাক সেনারা, তাই অপারেশন হতে হবে সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যে। যাই হোক, ওই অপারেশনে আমাদের গ্রুপও যুক্ত হয়ে পড়ে। আমরা কয়েকটি নৌকায় ভাগ হয়ে ব্রিজের দু’পাশে নেমে রাজাকারদের ওপর আক্রমণ করি। খুব সহজেই রাজাকারেরা পরাজয় স্বীকার করে। আমাদের হাতে আসে বেশ কিছু থ্রিনটথ্রি রাইফেল ও গুলি। রাজাকারদের সেখানেই শাস্তি দেওয়া হয়, কাউকে কাউকে ছেড়ে দেয়া হয়।

আরো একটি অপারেশনের কথা খুব মনে পড়ে। সে অপারেশনটি ছিল বেলকুচি-এনায়েতপুর অঞ্চলের এক শান্তি কমিটির নেতার বাড়িতে। আমরা আমাদের বড় নৌকা ওয়াপদার ভিতরে রেখে বাইরে গিয়ে ছোট ছোট নৌকায় উঠে সে শান্তি কমিটির নেতার বাড়ি ঘেরাও করি। কিন্তু সে বাড়ি এতোই দুর্ভেদ্য যে, আমরা সে বাড়িতে ঢুকতে ব্যর্থ হই। 

অপারেশন থেকে ফিরে আসতে আমরা ওয়াপদা বাঁধে ওঠার সময় হঠাৎ একটি গুলি এসে পলাশডাঙ্গার পরিচালক আব্দুর লতিফ মির্জার পাশ দিয়ে চলে যায়। তিনি অল্পের জন্য বেঁচে যান। এ সময়েই লতিফ মির্জাকে হত্যার ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে বলে শোনা যেত। এ গুঞ্জণে তাঁর নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারও করা হয়েছিল। তাঁকে বলা হতো সাবধানে চলাফেরা করার জন্য। এ ঘটনা তারই অংশ কিনা তা অবশ্য জানা যায়নি। কিন্তু আমার মনে গভীরভাবে দাগ কাটে এ ঘটনা।

এ ঘটনার পর আবার আমরা ফিরে যাই চলনবিল এলাকায়। এরপর সেপ্টেম্বরের শেষের দিকে আমি কয়েক দিনের জন্য ছুটি নিয়ে এলাকায় আসি আমার মা-বাবা আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে দেখা করতে। এলাকায় এসে শুনতে পাই যে, ইসমাইল গ্রুপের বেশ কিছু মুক্তিযোদ্ধা ইসমাইলের নেতৃত্বে পলাশডাঙ্গা ছেড়ে চলে এসেছে। 

তার কয়েকদিন পর নভেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে তাড়াশের হান্ডিয়াল-নওগায় পাকবাহিনীর এক বিশাল দল ঘিরে ফেলে। তুমুল যুদ্ধ হয় পাকসেনা বাহিনীর সঙ্গে পলাশডাঙ্গার মুক্তিযোদ্ধাদের। সাহসের সঙ্গে লড়াই করে মুক্তিযোদ্ধারা। জনগণ ও প্রকৃতির সহায়তায় সারাদিন যুদ্ধের পর বিজয়ী হয় মুক্তিযোদ্ধারা। পাকসেনাদের অনেকেই নিহত হয়। ধরা পড়ে এক ক্যাপ্টেনসহ অন্তত বারো জন। নিহত হয় শ দেড়েক রাজাকার। বিপুল সংখ্যক অস্ত্র জমা হয় পলাশডাঙ্গার মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে। পরে জানতে পারি যে, এ যুদ্ধ করে পলাশডাঙ্গা বিপুল অস্ত্র পেলেও গুলির সঙ্কট দেখা দিয়েছে। সে যুদ্ধের খবর আমাদের এলাকায়ও জনগণের মুখে মুখে প্রচার হতে থাকে রূপকথার মতো।

এলাকায় বসে খবর পাই যে, পলাশডাঙ্গার মুক্তিযোদ্ধারা তাদের কৌশল পাল্টে নৌকা ছেড়ে ডাঙ্গায় ঠাঁই নিয়েছে। কারণ বর্ষা কমে যাওয়ায় চলনবিলের বিচরণ এলাকা ছোট হয়ে এসেছে। সরে গেছে নাটোর-বগুড়ার দিকে। ফলে পলাশডাঙ্গা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ি আমি। এতে কিছুটা হতাশ হয়ে পড়ি। কিন্তু হতাশ হলে তো চলবে না, তাই আবারো দল পাকাতে শুরু করি। বেশ কয়েকজন সঙ্গীও পাওয়া যায় মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার জন্য। এ সময় আমার সঙ্গে জুটে যায় পুরান শৈলাবাড়ির আব্দুল হালিম, গুণেরগাঁতীর আনোয়ারুল ইসলাম খান, রাণীগ্রামের আকবর আলীসহ আরো কয়েকজন। এক সময় আমরা চলে যাই শুভগাছায়, সেখান থেকে নৌকায় উঠে রওনা হই রৌমারীর উদ্দেশ্যে।

যমুনা ব্রহ্মপুত্রের উজান ঠেলে আমরা চলে যাই মাইনকার চর হয়ে রৌমারীতে। সেখানে ইয়থ ক্যাম্পে নাম লেখাই। সে ক্যাম্পের দায়িত্ব পালন করতেন ছাত্রলীগ নেতা ইসমাইল হোসেন (দোয়াতবাড়ি), জহুরুল ইসলাম তালুকদার (মুকুল ফৌজ), শহীদুল ইসলাম তালুকদার, আনোয়ার হোসেন রতু, আমির হোসেন ভুলু প্রমুখ। লঙ্গরখানায় দায়িত্ব পালন করতেন নুরুল ইসলাম। সেখানে কয়েকদিন থাকার পর আমাদের পাঠিয়ে দেওয়া হয় কাকড়ি ক্যাম্পে হায়ার ট্রেনিংয়ে। আমরা চলে যাই সেখানে। 

কাকড়ি ক্যাম্পে বিভিন্ন অস্ত্রে প্রশিক্ষণ নিতে শুরু হয়। আর বলা হয়, আরো উচ্চতর প্রশিক্ষণ নিতে আমাদের পাঠানো হবে মরণটিলায় হায়ার ট্রেনিংয়ে। এতে বোঝা যায় যে, এটিও রৌমারীর মতোই একটি ইয়থ ক্যাম্প, তবে এটি পরিচালিত হচ্ছে ভারতীয় সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে, তবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্যদেরও সেখানে দেখা যেত। কাকড়ি ক্যাম্পে প্রশিক্ষণ হয় প্রায় পনের দিন। এরপর হায়ার টেনিংয়ে পাঠানো হয় আসামের মরণটিলায়। এ ক্যাম্পটি অবশ্য মাইনকারচরের খুব কাছেই। শুরু হয় আমাদের নতুন প্রশিক্ষণ। এখানে প্রশিক্ষণের গুরুত্বটা রৌমারী ও কাকড়ি ক্যাম্পের চেয়ে একটু বেশী।

ইতিমধ্যেই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত পর্যায় চলে আসে। শোনা যেতে থাকে যে, দ্রুতই স্বাধীন হয়ে যাবে বাংলাদেশ। এর প্রভাব পড়ে মরণটিলা ক্যাম্পেও। প্রশিক্ষণের গুরুত্ব কমে যায়। ক্যাম্পের খাবারদাবারেও সমস্যা হতে থাকে। এ ক্যাম্পে থেকেই খবর পেতে থাকি যে, সীমান্ত এলাকায় থাকা বিপুল সংখ্যক এফএফ মুক্তিযোদ্ধা দলে দলে দেশের ভিতরে ঢুকে পড়ছে। আরো শুনতে পাই যে, পলাশডাঙ্গার মুক্তিযোদ্ধারা সবাই অস্ত্র আর গুলির প্রয়োজনে রৌমারীতে এসে আশ্রয় নিয়েছেন। এ অবস্থায় আমরা দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়ে যাই যে, প্রশিক্ষণ শেষ করবো নাকি মরণটিলা ক্যাম্প ছেড়ে পলাশডাঙ্গায় গিয়ে যুক্ত হবো?

ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে চূড়ান্ত যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। মিত্র বাহিনী ও মুক্তিবাহিনীর সমন্বয়ে গঠন করা হয় যৌথ বাহিনী। সীমান্ত এলাকায় তাদের তৎপরতা আগে থেকেই শুরু হয়েছিল। এখন তারা বাংলাদেশের ভিতরে ঢুকে পড়তে শুরু করেছে বাংলাদেশকে হানাদার মুক্ত করার উদ্দেশ্যে। যৌথ বাহিনীর বৈমানিকেরাও আমাদের মাথার ওপর দিয়ে বাংলাদেশের ভেতরে ঢুকে পড়তে শুরু করে যুদ্ধ বিমান নিয়ে। তখন আমাদের প্রশিক্ষণের চেয়ে দেশ মুক্ত হওয়ার খবর নেওয়াই প্রধান কাজ হয়ে পড়ে। 

এক সময় মরণটিলায় প্রশিক্ষণের আগ্রহ কমে যায়, দেশে ফেরার ইচ্ছা প্রবল হয়ে ওঠে। আব্দুস সামাদ (শৈলাবাড়ি), আব্দুল হামিদ তালুকদার (দিয়ারপাঁচিল)সহ অন্তত পনের জন চলে আসি রৌমারীতে। সেখানে আব্দুল লতিফ মির্জা, বিমল কুমার দাসসহ পুরানো সহযোদ্ধাদের সঙ্গে দেখা হয়। তারাও আমাদের গ্রহণ করে সাদরে। 

রৌমারীতেই জানা গেল যে, আমির হোসেন ভুলু, ইসমাইল হোসেন, জহুরুল ইসলামের নেতৃত্বে বিভিন্ন সেক্টর থেকে ফিরে আসা সিরাজগঞ্জের এফএফ এবং রৌমারীতে অবস্থান করা বিপুল সংখ্যক মুক্তিযোদ্ধাকে নিয়ে তারা ভেতরে ঢুকে পড়েছেন সিরাজগঞ্জ মুক্ত করতে। 

জানা গেল যে, কয়েক জন কমান্ডার গেছেন প্রবাসী সরকারের সঙ্গে দেখা করতে। তারা ফিরে এলেই আমরা রওনা হবো দেশের ভিতরে। কোলকাতায় যাওয়া কমান্ডারবৃন্দ যখন রৌমারীতে ফিরে আসে তার দু’এক দিনের মধ্যেই পাকসেনারা ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে মিত্র বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে। এ খবর পেলাম রৌমারীতে। এ খবরে আমরা উল্লসিত হয়ে পলাশডাঙ্গা প্রধান আব্দুল লতিফ মির্জার নেতৃত্বে রৌমারী থেকে মাইনকার চর পর্যন্ত বিজয় মিছিল করি।

এবার স্বাধীন দেশে ফিরে আসার পালা। পলাশডাঙ্গা দেশে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছে, এ সময় আমাদের এলাকার আওয়ামী লীগের বড় নেতা শহীদুল ইসলাম তালুকদার ডেকে নিলেন। বললেন, ‘তুই আমার সঙ্গে আমার নৌকায় চল।’ তার কথা ফেলা সম্ভব নয়। অন্য সহযোদ্ধাদের কাছে থেকে বিদায় নিয়ে তার নৌকাতেই ফেরার সিদ্ধান্ত নিলাম। দেশ মুক্ত হওয়ার একদিন পরেই তার নৌকাতেই রওনা হলাম শত্রু মুক্ত স্বাধীন বাংলাদেশে। 

বাড়িতে ফিরে দেখি, ৯ ডিসেম্বরের শৈলাবাড়ি যুদ্ধের পর পাকসেনারা আমাদের বাড়িসহ গ্রামের আরো কিছু বাড়ি পুড়িয়ে দিয়েছে। গ্রামের ও আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে দেখা করি। এরপর শহরে এসে মোক্তারপাড়ার মোড়ে স্থাপিত পলাশডাঙ্গা যুব শিবিরের প্রধান ক্যাম্পে রিপোর্ট করি এবং মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশাসনের দেওয়া বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করতে থাকি। 

১৯৭২ সালের জানুয়ারি মাসের মাঝামাঝি সময়ে সিরাজগঞ্জ কলেজ মাঠে পলাশডাঙ্গা যুব শিবিরের পরিচালক আব্দুল লতিফ মির্জার নেতৃত্বে প্রবাসী সরকারের অর্থমন্ত্রী সিরাজগঞ্জের কৃতি সন্তান ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলীর কাছে আমাদের অস্ত্র জমা দেই। শেষ হয় আমার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় মুক্তিযোদ্ধা জীবনের।

মুক্তিযুদ্ধ শেষে পড়াশোনায় ফিরে যাই। তারপর মোছা. আনোয়ারা বেগমকে বিয়ে করি ১৯৭৮ সালে। আমাদের দু’জনের সংসারে তিন সন্তান এসএম আনোয়ারুল কবীর, মোছা. সুমনা শারমীন সূবর্ণা ও শেখ আতাউল কবীরের জন্ম হয়। পরবর্তীতে ব্যবসা ও সমাজসেবামূলক কর্মে মন দেই। সাথে সাথে স্থানীয় সরকার রাজনীতিতে দ্ইু বার খোকসাবাড়ি ইউপির নির্বাচিত চেয়ারম্যান নির্বাচিত হই। বর্তমানে সিরাজগঞ্জ শহরের বাহিরগোলা ঘোষপাড়ায় বাস করছি।

অনুলিখন: সাইফুল ইসলাম

ও/ডব্লিউইউ

Published: Sat, 27 Jun 2020 | Updated: Sat, 27 Jun 2020

সাধারণের চোখে মুক্তিযুদ্ধ : রফিকুল ইসলাম তালুকদার দুল্লু

রফিকুল ইসলাম তালুকদার দুল্লু আমার নাম। সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার রতনকান্দি ইউনিয়নের গজারিয়া গ্রামে পিতা জালালউদ্দিন তালুকদার ও মাতা সফুরা খাতুনের ঘরে ১৯৫৪ সালে আমার জন্ম। পাঁচ ভাই ও পাঁচ বোনের মধ্যে আমি তৃতীয়। আমার বাবা অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী ছিলেন। আমার মেজো চাচা মোতাহার হোসেন তালুকদার তখন মহকুমা আওয়ামী লীগের সভাপতি। ফলে স্বাভাবিকভাবেই আমিও আওয়ামী লীগের সমর্থক।

সত্তর সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে চাচা মোতাহার হোসেন তালুকদার কাজীপুর-সিরাজগঞ্জ আসন থেকে এমএনএ নির্বাচিত হন। এক সময় শুরু হয় বাংলাদেশের স্বাধীনতার কথা। ২৫ মার্চ রাতে ঢাকায় নিরীহ মানুষের ওপর পাকসেনারা হামলা চালায়। তখন সবকিছুই এলেমেলো হয়ে যেতে থাকে। চাচা মোতাহার হোসেন তালুকদার চলে যান ভারতে। 

সিরাজগঞ্জে পাকসেনারা আসার আগমুহূর্তে চাচার পরিবার শহরের বাড়িঘর ফেলে চলে আসে আমাদের গ্রামে। বড় চাচার বড় ছেলে জহুরুল ইসলাম তালুকদার মিন্টু ভাইও সপরিবারে গ্রামে চলে আসেন। আমার বড় ভাই সাইফুল ইসলাম পাবনায় পড়াশোনা করতেন। তিনি গ্রামে ফিরে আসেন। মিন্টু ভাই নিয়ে এসেছিলেন বেশ কয়েকটি রাইফেল। 

একদিন আমার আরেক চাচাতো ভাই আব্দুল মান্নান তালুকদার তিনি রাইফেল হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করতে করতে ফায়ার হয়ে যায়। মিন্টু ভাই এসে তাঁকে অনেক ধমকাধমকি করেন। একদিন পাকসেনারা বাগবাটীতে এসে ব্যাপক গণহত্যা চালায়। পুড়িয়ে দেয় শত শত বাড়িঘর। বাগবাটী গণহত্যার দু’তিনদিন পরই মেজো চাচার পরিবার ও তাঁর আনা রাইফেলগুলো নিয়ে মিন্টু ভাই ভারতে যাওয়ার জন্য রৌমারীর উদ্দেশ্যে রওনা হন। এরপর আমার ভাই সাইফুল ইসলাম, আব্দুল মান্নান তালুকদারসহ গ্রামের অনেক তরুণ মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে ভারত চলে যান।

এদিকে, বাগবাটী গণহত্যার পর আমাদের গ্রামের মানুষের ধারণা হয় যে, এ গ্রাম যেহেতু এমএনএ মোতহার হোসেন তালুকদারের গ্রাম, তাই এ গ্রামেও এসে তাণ্ডব চালাবে পাকসেনারা। ফলে গ্রামের মানুষ অন্যান্য গ্রামে বিশেষ করে সড়াতৈল গ্রামে রাতে গিয়ে থাকতে শুরু করে। দিনের বেলায় তারা ফিরে এসে বাড়িতে থাকত। কেউ কেউ গ্রাম ছেড়ে আত্মীয় বাড়িতে গিয়ে থাকতে শুরু করে। এর মধ্যে একদিন বাহুকা গ্রামের বাসিন্দা পুলিশে কর্মরত সোলায়মান আসেন রাইফেলের খোঁজে। কিন্তু রাইফেল না পেয়ে তিনিও চলে যান ভারতে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে।

ধীরে ধীরে মুক্তিযোদ্ধাদের আনাগোনা বাড়তে থাকে। বিভিন্ন স্থানে মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে পাকসেনাদের যুদ্ধও সংঘটিত হতে থাকে। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে সাহসও বাড়তে থাকে। কিন্তু মোতাহার হোসেন তালুকদারের গ্রাম বলে মুক্তিযোদ্ধারা আমাদের গ্রামে সাধারণত আশ্রয় নিতে আসত না। এর মধ্যে গান্ধাইলের বড়ইতলা গ্রামে মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে তুমুল যুদ্ধ হয় পাকসেনাদের। পরের দিন ঐ মুক্তিযোদ্ধারা আসেন আমাদের গ্রামে আশ্রয় নিতে। তাদের আশ্রয় দেওয়া হয় বিভিন্ন বাড়িতে। পাকসেনারা এ গ্রামে হামলা চালালে যেন প্রতিরোধ করা যায় এজন্য মুক্তিযোদ্ধারা বাঙ্কার খুঁড়তে শুরু করে। 

এ সময় এক মুক্তিযোদ্ধা আমার চাচাতো ভাই দুলাল তালুকদার দুলু ভাইকে বাঙ্কার খুঁড়তে বলেন। ঐ মুক্তিযোদ্ধার বয়স দুলু ভাইয়ের চেয়ে কম, কিন্তু তিনি দুলু ভাইকে ‘তুমি’ বলে সম্বোধন করেন। এতে তিনি ক্ষেপে যান ঐ মুক্তিযোদ্ধার ওপরে। তিনি হচ্ছেন মোতাহার হোসেন তালুকদারের বাড়ির ছেলে। তার ওপরে তাঁর ছোটভাই আব্দুল মান্নান তালুকদারও মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছেন। ঐ মুক্তিযোদ্ধার এহেন বেয়াদবি তিনি মানবেন কেন? তাঁদের মধ্যকার এ ঝগড়া প্রায় মারামারিতে রূপ নেয়। পরে অন্য মুক্তিযোদ্ধারা ও গ্রামের মানুষ এসে এ বিরোধ মিটিয়ে দেয়। তখন ঐ মুক্তিযোদ্ধা দুলু ভাইয়ের কাছে ক্ষমা চান। 

ওদিকে আবার এক মুক্তিযোদ্ধা তাঁর রাইফেল পরিষ্কার করতে গিয়ে ফায়ার হয়ে যায়। তখন পাশের বাড়ির জাবারী খাঁ তাঁর বাইর-বাড়িতে ধান মলন দিচ্ছিলেন। ঐ গুলি গিয়ে তাঁর গরুর শরীরে লাগলে গরুটি আহত হয়। সাথে সাথেই গরুটি জবাই করে কম দামে মাংস বেচা হয়। পরের দিন মুক্তিযোদ্ধারা আমাদের গ্রাম থেকে চলে যায়। এদিন গ্রামের বেশ কয়েকজন তরুণ যাঁরা মুক্তিযুদ্ধে যোগদানের জন্য দল খুঁজছিল তাঁরা ঐ মুক্তিযোদ্ধা গ্রুপের সঙ্গে যোগ দেয়।

গ্রামে গ্রামে মুক্তিযোদ্ধাদের তৎপরতা বেড়ে যায়। ফলে সিরাজগঞ্জ শহরে পাকসেনারা থাকলেও গ্রামে স্বাধীনতা বিরোধীদের তৎপরতা কমে যায়, গ্রামের মানুষেরও সাহস বাড়তে থাকে। শৈলাবাড়ি যুদ্ধের পর সিরাজগঞ্জ শহর ছেড়ে পাকসেনারা পালিয়ে যায়। মুক্ত হয় সিরাজগঞ্জ। তখন সবার চিন্তা আমাদের গ্রাম থেকে যাঁরা মুক্তিযুদ্ধে যোগদানের উদ্দেশ্যে বাড়ি ছেড়েছে তাঁদের কী অবস্থা! তাঁরা সবাই বেঁচে আছে তো? ১৬ ডিসেম্বর পাকসেনারা ঢাকায় আত্মসমর্পণ করে। আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়ি আমরা। প্রতিটি গ্রাম থেকে মিছিল বের হয়ে, জয় বাংলা স্লোগানে স্লোগানে মাতিয়ে তোলে সাধারণ মানুষ।

গ্রামের আশেপাশেই যারা মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছিল, তাঁদের খোঁজ সহজেই পাওয়া যায়। তাঁরা বেঁচে আছে, ভালো আছে। বড় চাচার ছেলে জহুরুল ইসলাম, মিন্টু ভাই ডিসেম্বরের শুরুতেই তাঁদের দলবল নিয়ে এলাকায় চলে এসেছিলেন। মেজো চাচার ছেলে ফিরোজ তালুকদার চলে এলেন দেশ মুক্ত হওয়ার দু’দিন পরে। তাঁর কাছে খবর পাওয়া গেল যে, আমার ভাই সাইফুল ইসলাম বগুড়ায় আছেন, ভালো আছেন। তিনিও ফিরে আসবেন সহসাই। তার দুদিন পর আমার বড় ভাই ফিরে এলেন বগুড়া থেকে। স্বস্তি ফিরে আসে আমাদের পরিবারে। 

কিন্তু তখনও আরেক চাচাতো ভাই আব্দুল মান্নান তালুকদারসহ হযরত আলী খাজা, হারুণর রশীদ, নজরুল ইসলাম ননীসহ বেশ কয়েকজন মুক্তিযুদ্ধ থেকে ফিরে আসেননি। তাঁরা কোথায় আছেন তাও জানা যাচ্ছিল না। মান্নান তালুকদার ফিরে এলেন প্রায় সপ্তাহ দুয়েক পরে। তিনি জানালেন যে, তাঁরা ছিলেন সিলেট অঞ্চলে। গ্রামের অন্যরা যাঁরা এখনো ফেরেননি, তাঁরা সবাই আছেন সিলেটে। দ্রুতই বাড়ি ফিরে আসবেন তাঁরাও। তাঁর খবরে গ্রামের সবার মধ্যে স্বস্তি ফিরে আসে।

অনুলিখন : সাইফুল ইসলামু

ও/ডব্লিউইউ

Published: Thu, 25 Jun 2020 | Updated: Thu, 25 Jun 2020

সাধারণের চোখে মুক্তিযুদ্ধ : মো. আজাদ বেপারী

আমি পিতা আমির বেপারী ও মাতা সালেহা বেগমের একমাত্র সন্তান মো. আজাদ বেপারী। সিরাজগঞ্জ পৌর এলাকার শাহেদ নগরের বেপারী পাড়ায় আমাদের বাড়ি। ১৯৭১ সালে কতই বা বয়স হবে আমার, বড় জোর ১৩ বা ১৪ বছর। আমার বাবা শহরের বিভিন্ন পুকুর লিজ নিয়ে মাছ চাষ করে বাজারে বেচতেন। এটাই আমাদের এলাকার জাত ব্যবসা। সে সময় অনুযায়ী আমরা মোটামুটি সচ্ছল ছিলাম। লেখাপড়া তেমন শেখা হয়নি, কাজকর্মেও তেমন যাওয়া হয়নি তখনো।

অসহযোগ আন্দোলন শুরু হওয়ার পর স্বাধীনতার জন্য দেশের সবাই উন্মুখ হয়ে ওঠে। আমাদের গ্রামের মানুষও মিছিল নিয়ে শহরে যেতে শুরু করে। এ সময় গ্রামের মিছিলে যারা নেতৃত্ব দিতেন তাঁদের মধ্যে এই মূহুর্তে যাঁদের নাম মনে পড়ছে তাঁরা হলেন আব্দুর কাদের, দেলবার হোসেন, তারাজুল প্রমুখ। সেসব মিছিলে আমিও যোগ দিয়েছি, বাড়ি থেকেও কোনো নিষেধ করা হতো না। বিভিন্ন স্থানে গণ্ডগোলের খবর আসতো। কিন্তু কারো মধ্যে কোনো ভীতি দেখা যায়নি। সবাই উন্মুখ স্বাধীনতার জন্য। 

কিন্তু এক সময় নিরীহ বাঙালিদের ওপর পাকিস্তানিরা হামলা চালায়। সিরাজগঞ্জে পাকসেনারা না এলেও সেসব খবর চলে আসতে থাকে। এতে ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষের মধ্যে ভীতি ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। সিরাজগঞ্জেও মিলিটারি আসছে বলে খবর ছড়িয়ে পড়ে। গ্রামে যাদের আত্মীয়-স্বজন, বাড়িঘর আছে তারা আগেভাগেই শহর ছাড়ে চলে যায়। কিন্তু গ্রামে আমাদের কোনো আত্মীয়-স্বজন নেই, তাই আমরা কোথায় পালাবো? গ্রামেরই বাবার পরিচিত আফাজ বেপারী এগিয়ে আসেন সাহায্য করতে। তাঁদের আত্মীয়বাড়ি আছে শিয়ালকোল ইউনিয়নের চন্ডিদাসগাঁতী গ্রামের পাশের দাওভাঙ্গা গ্রামে। আফাজ বেপারী তাদের সঙ্গে সেখানে যাওয়ার প্রস্তাব দেন। 

এদিকে, পাকসেনা আসার খবরে শহরের মধ্যে শুরু হয় লুটপাট। গ্রামে বসেই শোনা যায় জেলখানায় বিহারী হত্যাকাণ্ড, ন্যাশনাল ব্যাংকে (বর্তমান সোনালী ব্যাংক) লুটপাটের খবর। সে রাতেই আমি আমার মা-বাবার সাথে আফাজ বেপারীর সঙ্গে তাঁর আত্মীয়বাড়ি দাওভাঙ্গ গ্রামে চলে যাই।

দাওভাঙ্গায় যখন ছিলাম তখন নানা খবর-গুজব সেখানেও পৌঁছাতে থাকে। খবর পাই যে, শহরে ঢুকেই পাকসেনারা বাড়িঘর পুড়িয়ে দিতে থাকে। এ সুযোগে লুটপাট হয় ব্যাপক। তারা বিভিন্ন গ্রামের লোককে লুটপাটে উৎসাহ দেয়। তাতে যুক্ত হয় আমাদের গ্রামেরও কেউ কেউ। কখনো কখনো এসব লোকজনকে তারা গুলি করে হত্যাও করে। জানতে পারি যে, আমাদের গ্রামের দুজনকে বড় পোস্ট অফিসের মোড়ে লুটপাট করার সময় গুলি করে হত্যা করেছে। 

দিন যেতে থাকে। শহর থেকে গ্রামে খবর পৌঁছে শান্তি কমিটি, রাজাকার বাহিনী গঠনের। অনেকে গ্রামে খবর নিয়ে য়ায়, শহরে আর আগের মতো ধরপাকড় বা মানুষ হত্যা নাই। এ পরিস্থিতিতে একদিন একাই শহরে আসি। দেখি আমাদের বাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। আমি পোড়া টিন গুছিয়ে রাখি। তারপর আবার গ্রামে ফিরে যাই। কয়েকদিন পর আবার বাবা-মায়ের সাথে শহরে চলে আসি। কিন্তু বাড়িতো পুড়িয়ে দিয়েছে, থাকবো কোথায়?

শহরে আসার পর আমাদের পরিবারকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসেন ভাঙ্গাবাড়ি গ্রামের সেকেন গাড়িয়াল। তাঁর ছেলের নাম আমির। আমার বাবার নাম আর তাঁর ছেলের নাম একই হওয়ায় সেকেন গাড়িয়ালকে তিনি শশুর বলে ডাকতেন। আমি নানা বলে ডাকতাম। এ আত্মীয়তার সূত্র ধরে তাঁর বাড়িতে গিয়ে আমরা উঠি, তিনি আমাদের জন্য একটি ঘর ছেড়ে দেন, যতদিন বাড়িতে ঘর তোলা না হবে, ততদিন সে বাড়িতে থাকার সুযোগ করে দেন। আমাকে সাধারণত বাড়ির বাইরে বের হতে দিতেন না। তবুও লুকিয়ে মাঝেমধ্যে বাড়ি থেকে বের হতাম। ওই সময় রেললাইনের পাশে সর্দার পাড়ার পোস্ট অফিসের মোড়ে বাজার বসানো হয়েছিল, সে বাজারে গিয়েছি মাঝেমধ্যে।

গ্রামের মধ্যেও মাঝে মাঝে পাকসেনা ও রাজাকারেরা চলে আসতো, কোনো কোনো বাড়ির মধ্যেও ঢুকে পড়তো। কেউ তাদের সামনে যাওয়ার সাহস পেতো না, দূর থেকে দেখেই নিরাপদে চলে যাওয়ার চেষ্টা করতো। একদিন সেকেন গাড়িয়ালের বাড়ির মধ্যেও ঢুকে পড়ে পাকসেনা ও রাজাকারের দল। আমার মা দ্রুত পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়, কিন্তু আমাকে ধরে ফেলে। ঐ সময় সেকেন গাড়িয়ালের মেয়ের পা পুড়ে গে যাওয়ায় বারান্দায় শুয়ে ছিল। 

সে মুহূর্তে আমির মামার স্ত্রী ছিলেন অবাঙালি পরিবারের। তিনি এগিয়ে আসেন। তিনি উর্দুতে আমার কথা বলেন যে, ‘ওকে ছেড়ে দাও।’ পাকসেনারা জিজ্ঞেস করে, ‘এ তোমার কী হয়।’ মামী উত্তর দেয়, ‘এ আমার ছেলে।’ ওরা বলে, ‘তোমার এতো বড় ছেলে হয় কীভাবে?’ মামী বলে, ‘হয়।’ এ কথা বলে মামী আমাকে ছাড়িয়ে নেয়। সেকেন নানার মেয়েকে শুয়ে থাকতে দেখে জিজ্ঞেস করে, ‘কী হয়েছে? বিমার?’ এ কথা বলে বাড়ি থেকে বের হয়ে যায় তারা। পরে পাশের এক বাড়িতে ঢুকে পড়ে পাকসেনা ও রাজাকারেরা। সে বাড়িতে কান্নার রোল পড়ে যায়। পরে সে বাড়ি থেকে একজনকে ধরে নিয়ে চলে যায় পাকসেনা ও রাজাকারেরা।

দেশ মুক্ত হওয়ার মাস খানেক আগে পোড়া টিন দিয়ে কোনো রকমে একটি ঘর তুলে আমরা আমাদের ভিটায় চলে আসি। এদিকে ধীরে ধীরে মুক্তিযোদ্ধারা দেশের ভিতরে আসতে শুরু করে। আমরা পাকসেনাদের সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের যুদ্ধের খবর পেতে থাকি। একদিন সিরাজগঞ্জ শহর থেকে পাকসেনারা রাতের আঁধারে পালিয়ে যায়। মুক্তিযোদ্ধারা শহরে ঢুকে পড়ে। তাঁদের সঙ্গে বিভিন্ন গ্রাম থেকে সাধারণ মানুষ ‘জয়বাংলা’ শ্লোগান দিতে দিতে শহরে ঢুকে পড়ে। আমাদের গ্রামের মানুষও মিছিল নিয়ে শহরে আসে, সে বিজয় মিছিলে যোগ দেই আমিও।

saiful

 

অনুলিখন : বীর মুক্তিযোদ্ধা সাইফুল ইসলাম 

 

 

 

ও/ডব্লিউইউ

Published: Sun, 21 Jun 2020 | Updated: Sun, 21 Jun 2020

সাধারণের চোখে মুক্তিযুদ্ধ

সন্তোষ কুমার শীল

আমি সন্তোষ কুমার শীল ১৪ অক্টোবর ১৯৫৮ সালে জন্মগ্রহণ করি। আমার বর্তমান পেশা শিক্ষকতা। সিরাজগঞ্জ পৌর এলাকার মাড়োয়ারি পট্টি (মুজিব সড়ক)-এ বসবাসরত জীবনকৃষ্ণ শীল ও মাতা গৌরীরাণী শীলের সবার বড় সন্তান আমি। আমরা পাঁচ ভাই তিন বোন। বাবা মাড়োয়ারি পট্টি-বানিয়াপট্টির মোড়ে মুদি দোকান করে সংসার চালাতেন। আমি তখন জ্ঞানদায়িনী হাই স্কুলে অষ্টম শ্রেণীতে উঠেছি। এ সময়ে উত্তাল জোয়ার শুরু হয় বাংলাদেশের স্বাধীনতার। আমরা কিশোররাও স্বাধীনতার সে মিছিলে যোগ দিয়েছি। 

সিরাজগঞ্জ মহুকুমা শহর হওয়ায় পাকবাহিনীর কোনো ক্যাম্প ছিল না। অসহযোগ আন্দোলনের শুরুতে মহকুমায় অবস্থিত পাকিস্তানের বেসামরিক প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও যুক্ত হয়ে পড়ে স্বাধীনতার সে মিছিলে।

২৫ মার্চ পাকসেনাদের বিভিন্ন স্থানে অত্যাচারের খবর চলে আসতে থাকে। এতে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়তে শুরু করে সাধারণ মানুষ। তারা শহর ছেড়ে গ্রামে আত্মীয়-স্বজন বা মুখচেনা অনাত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিতে শুরু করে। সিরাজগঞ্জে মিলিটারি আসার দু’তিন দিন আগে আমরাও সপরিবারে বাড়িঘরে তালা দিয়ে ঘোড়ার গাড়িতে উঠে শহর ছাড়ি, চলে যাই সদর থানারই এক গ্রাম সয়দাবাদে।

আমাদের বাড়িতে থেকে সিরাজগঞ্জ কলেজে পড়াশোনা করত আমার পিসতুতো ভাই রংপুরের শ্যামল কুমার শীল। সেও আমাদের সঙ্গে যায়। ২৭ এপ্রিল ভোররাতে ঈশ্বরদী ট্রেনযোগে মিলিটারিরা আসে সিরাজগঞ্জ শহরে। আমরা সয়দাবাদে বসেই দেখি, সিরাজগঞ্জ শহরে আগুন দিয়ে গণহত্যা শুরু করে। জানতে পারি, আমাদের বাড়িঘরও পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। এর তিন/চার দিন পর তারা গ্রামে নামে। গণহত্যা, নারী ধর্ষণ, লুটপাট ও বাড়িতে বাড়িতে অগ্নিসংযোগ শুরু করে। আমরা যে বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলাম, সে বাড়িটি ওয়াপদা বাঁধের কাছে হওয়ায় সে আশ্রয়কে নিরাপদ মনে হয় না, মনে হয় সহজেই মিলিটারির গাড়ি চলে আসবে এখানেও।

সয়দাবাদের আশ্রয় ছেড়ে পরিবার নিয়ে চলে যাই যমুনার চরের মধ্যে। টাঙ্গাইলের সন্তোষের পূর্বে চারাবাড়ির পাশে কাবিলা গ্রামে বাস করতেন আমার পিসতুতো বোন-জামাই সত্যরঞ্জণ শীল। আমরা তাঁর বাড়িতে গিয়ে উঠি। মাসখানেক সেখানে থাকি, কোনও কাজকর্ম নেই, এভাবে তো সংসার চলে না। তখন খবর পাওয়া যায় যে, টাঙ্গাইল শহরে পাকসেনারা কম দামি চাল-আটা বেচছে। উপায় না পেয়ে সাহস করে বাবা আমাদের শহরের চাল-আটা কিনে চরের মধ্যে বেশি দামে বেচার বুদ্ধি বের করেন।

আমরা কয়েক ভাই শহরে যেতাম। আমরা বিভিন্ন স্থানে আলাদা আলাদা লাইনে দাঁড়াতাম। হিন্দু বলে আলাদা একটা ভয় ছিল, আবার একটা সাহস ছিল যে, ওই শহরে আমাদের কেউ চেনে না। ধীরে ধীরে আমাদের সাহস বাড়ে। কয়েক ভাই মিলে চাল-আটা কিনতাম। সেসব চাল-আটা আবার এক জায়গায় করে চারাবাড়ির বাজারে বসে বেচতাম, এভাবেই আমাদের সংসার খরচ কোনও ভাবে জুটে যেত।

এদিকে, সিরাজগঞ্জ শহরের খোঁজ-খবর নিতে থাকি যে, বাড়িতে ফিরে যাওয়া যাবে কিনা? খবর পেতে থাকি যে, পাকসেনাদের ধরপাকড় কিছুটা কমে এসেছে। প্রায় চার মাস পর বাবা সিদ্ধান্ত নেন সিরাজগঞ্জ শহরে যাবার। বাবা, ঠাকুর মা আর আমাকে নিয়ে শহরে আসেন যাতে ঠাকুর মা আমাদের রান্না করে দিতে পারেন। আমাকে বাবা নিয়ে আসে কারণ, আমি যেন বাবার সঙ্গে থাকতে পারি, যেকোনো বিপদে-আপদে তাঁকে সহয়োগিতা করতে পারি। শহরে আসার পর মনে হলো, এ শহর আমাদের নয়, পাকসেনাদের তাণ্ডবে বিধ্বস্ত হয়ে পড়েছে। শহরের দু’একটি বিল্ডিং ছাড়া সবই পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। ভয়ে ভয়ে নিজেদের বাড়ির সামনে আসি। দেখি, আমাদের বাড়ি পুড়ে ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়েছে। 

আমাদের বাসার সামনে এসডিপিও অফিস। সে অফিসে দিব্বি কাজ করছেন নতুন আসা এসডিপিও, ডিউটি করছে বাঙালি পুলিশ। আমরা বাপ-বেটা আর ঠাকুর মা পোড়া টিনের মধ্যে থেকে কিছু টিন কুড়িয়ে এনে একটি ছাপরা তুলে ফেললাম কোনও রকমে দোকানদারী করার জন্য। ভিতরেও একটি ছাপরা তুলে থাকা শুরু করলাম আমরা তিন জন। আমাদের পাশের বিশ্বজিৎ দত্তদের বাড়ি দখল করে নিয়েছিল মফিজ তালুকদারের দারোয়ান রমজান বিহারি। সে আমাদের অভয় দিল যে, যেকোনো সমস্যা হলে সে দেখবে। তার দেওয়া সাহসেও আমরা কিছুটা সাহস পেলাম শহরে থাকার, যেমন জলে পড়লে খড়কুটা ধরে মানুষ বাঁচার চেষ্টা করে। বিশ্বজিৎ দত্তদের ভিতরের বড় ঘরটি ছিল অক্ষত, সে ঘরে বিভিন্ন লুটের স্তুপ করে রাখা ছিল। 

এদিকে, কয়েকদিন পর দোকানের মালামাল আর পরিবারের খোঁজ-খবর নিতে টাংগাইল যাই। সেখানে অন্য ভাইয়েরা আগের মতো কিছু মালপত্র কিনে রেখেছে, এ ছাড়াও শহর থেকে আরো মালপত্র কিনে আনি দোকান চালানো জন্য। সে সময় সঙ্গে নিয়ে আসি আমার ছোট ভাই আশুতোষকে। সে বাবার সঙ্গে দোকানদারী করতে শুরু করে। আর আমি টাংগাইল থেকে মালপত্র এনে দিতে থাকি। অন্যদিকে আমার পিসতুতো ভাই শ্যামল চারাবাড়িতে পরিবারের দেখাশোনা ও মালামাল সংগ্রহ করতে থাকে দোকানের জন্য।

একদিন এসডিপিও অফিসে পাকিস্তান মিলিশিয়ার কয়েকজন জোয়ান আসে সাতটি গুলির পেটি নিয়ে। এসডিপিও অফিসে সে গুলির পেটি রেখে যাদের দিয়ে গুলি বহন করানো হয়েছিল তাদের বিদায় করা হয়। মিলিশিয়ারা কিছুটা জিরিয়ে নিয়ে আবার গুলির পেটি নিয়ে যাবে কালীবাড়ির ক্যাম্পে। জিরানো শেষে আবার গুলির পেটি বহন করার জন্য লোক ধরা শুরু হয়। ৬ জনকে ধরার পর বাবাকেও বলা হয় যে, ঐ পেটি নিয়ে যেতে হবে। বাবা দোকান ছেড়ে বাড়ির ভিতরে আসেন শার্ট গায়ে দেওয়ার জন্য। এ কথা শুনে ঠাকুর মা আমি কান্নাকাটি করে বাবাকে ঠ্যাকানোর চেষ্টা করি। কিন্তু বাবার ভাব, গেলে কী হবে? কালীবাড়ি গিয়ে পেটি নামিয়ে দিয়েই চলে আসবে। আমাদের কান্নাকাটির ফলে বাবার বের হতে একটু দেরি হয়। বাইরে এসে দেখি, এসডিপিও অফিসের কেরানি অন্য একজনকে ধরে গুলির পেটি পাঠিয়ে দিয়েছেন, ফলে বাবাকে আর যেতে হলো না। সেদিন খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম।

এদিকে, স্বাধীনতার চূড়ান্ত সময় চলে আসে। শৈলাবাড়ির যুদ্ধের গোলাগুলির শব্দ আমরা শুনতে পাই শহরে বসে। এ সময়ে তটস্থ হয়ে পড়ে স্বাধীনতা বিরোধীরা। শোনা যেতে থাকে, যেকোনো সময় পাকসেনারা চলে যাবে শহর ছেড়ে। ১৩ ডিসেম্বর গভীর রাতে বড় ধরনের বিস্ফোরণের শব্দ পাই আমরা। পরে জানতে পারি, মাড়োয়ারি পট্টির অয়্যারলেস টাওয়ার উড়িয়ে দেওয়া হয়েছে বিস্ফোরক দিয়ে।

এর আগে আমজাদ বিহারির খোঁজে আসে পাকসেনারা। তারা আমজাদ বিহারিকে সঙ্গে যাওয়ার জন্য বলে। কিন্তু সে পাকিস্তানিদের সঙ্গে যেতে রাজি হয় না। ঐ রাতে রেলগাড়িতে করে বিদায় নেয় সিরাজগঞ্জ থাকা পাকসেনারা। পরদিন সকালে লুটের মালপত্র রেখে ঘরে তালা দিয়ে স্ত্রী আর মেয়ে শরীফুনকে নিয়ে বিদায় নেয় অবাঙালি আমজাদ বিহারি। এর কিছুক্ষণ পর থেকেই গ্রামবাসীদের সঙ্গে নিয়ে শহরে ঢুকে পড়তে শুরু করে মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন গ্রুপ। জয় বাংলা শ্লোগানে শ্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে সিরাজগঞ্জ শহর।

অনুলিখন : সাইফুল ইসলাম

ও/ডব্লিউইউ

Published: Sat, 13 Jun 2020 | Updated: Sat, 13 Jun 2020

সাধারণের চোখে মুক্তিযুদ্ধ : শফিকুল ইসলাম টুক্কা

আমার বাবা মারা যান ১৯৬১ সালে। আমার বয়স তখন তিন/সাড়ে তিন। সে হিসেবে আমার জন্ম ১৯৫৮ সালে। আমি শফিকুল ইসলাম টুক্কা। পিতার নাম মজিবর রহমান ও মাতার নাম সুফিয়া খাতুন। গ্রাম: সিরাজগঞ্জ পৌর এলাকার জানপুরে।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে আমার বয়স ১৩/১৪ বছর। বাবা মারা যাওয়ার পর আমার মা আমাকে নিয়ে অথৈ সাগরে পড়েন। সে সময় মা আমাকে নিয়ে ওঠেন তার বাবা একই গ্রামের শুকুর শেখের বাড়িতে। আমি বড় হতে থাকি নানা-মামার বাড়িতে। একটু বড় হলে মা আমাকে নানা বাড়ির সামনেই রাস্তার ধারে বসিয়ে দেন বাদাম, বুটকালাইয়ের দোকান দিয়ে। বেচাবিক্রি কী হতো তা জানি না, কিন্তু তাতে মায়ের হয়তো দু’চার পয়সা আয় হতো, কিন্তু আমরা চলতাম নানার সংসারেই।

একাত্তরের অসহয়োগ আন্দোলনের সময় গ্রামের সব মানুষের সাথে শহরে মিছিল করতে আসতাম, এতে আমার খুব আনন্দ হতো। ২৫ মার্চ ঢাকায় গণহত্যা শুরু হলে সে কথা গ্রামে গ্রামে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। ধীরে ধীরে মানুষের মধ্যে ভীতিকর অবস্থা শুরু হতে থাকে। গুজব ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে যে, পাকসেনারা সিরাজগঞ্জ শহরে চলে আসতে পারে। এ ভীতিকর অবস্থায় অনেকেই শহর ছাড়তে শুরু করে। আমাদের নানা-মামার পরিবারেও এ নিয়ে আলোচনা চলতে শুরু করে। কারণ আমাদের শহর ছেড়ে গ্রামে গিয়ে থাকার মতো কোনও আত্মীয়-স্বজন নেই, কোথা ও যাওয়ার জায়গা নেই।

২৭ এপ্রিল পাকসেনা সিরাজগঞ্জ আসার দু’এক দিন আগে সিরাজগঞ্জ বয়রাঘাটে বিমান থেকে বোমা নিক্ষেপ করে। সেখানে এক রিক্সা চালক ও এক ঘোষ শহীদ হন। অন্যদের সঙ্গে আমিও শহীদদের দেখতে যাই। তাদের দেখে আসার পরে বাড়ির সবাই প্রস্তুতি নেই গ্রামের দিকে চলে যাওয়ার জন্য। নিজেদের কোনও আত্মীয় না থাকায় বাড়ির বাৎসরিক কামলা হবির বাড়ি শাহানগাছা গ্রামে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরিবারের যা কিছু বহনযোগ্য সেসব মালামাল এবং গরুছাগল নিয়ে পরিবারের সবাই রওনা হই হবির বাড়ি শাহানগাছার দিকে। তার এক-দুইদিন পরেই সিরাজগঞ্জে পাকসেনারা এসে দখলে নিয়ে আগুন দেয়। আমরা শাহানগাছা গ্রাম থেকে সে আগুন ও আগুনের ধোঁয়া দেখতে পাই।

সিরাজগঞ্জে পাকসেনারা দখলে নিয়ে অত্যাচার শুরু করে। গণহত্যার বিভীষিকাময় কথাবার্তা গ্রাম থেকেই শুনতে পাই। এর মধ্যেই কেউ কেউ শহরে এসে ঘুরে যাচ্ছে। এতে আমাদেরও সাহস একটু বাড়ে। প্রায় কুড়ি দিন পর একদিন আমি আর রফিক মামা গ্রামে আসি বাড়ির অবস্থা দেখার জন্য। সেদিন বাড়ির কাঁঠাল গাছ থেকে বেশ কিছু কাঁঠাল নিয়ে শাহানগাছা ফিরে যাই। একই দিনে এক পুড়িয়ে দেওয়া দোকানের ছাইয়ের মধ্যে বেশ কয়েক আনা পয়সা কুড়িয়ে পাই। তা নিয়ে গিয়ে গেলে মা খুব খুশি হন। এরপর এক-দুই দিন পরপরই মামার সাথে শহরে আসতে শুরু করি। আমার শুরু হয় পোড়া দোকানের ছাইয়ের মধ্যে পয়সা খোঁজার কাজ। মামার সঙ্গে এসে কখনো মামার সঙ্গে কখনো বা একা একা পয়সা খুঁজে ফিরতাম। সবই পেতাম খুচরা পয়সা। কারণ নোট তো পুড়ে গেছে, কিন্তু খুচরা পয়সাগুলো আগুনে পুড়েও টিকে আসে। কোনও কোনও দিন পেতাম একটাকা দেড় টাকা কখনো বা দশ টাকার খুচরা পয়সাও কুড়িয়ে পেয়েছি। যেদিন বেশী পয়সা পেতাম সেদিন আনন্দে মনটা নেচে উঠতো। আমি সব পয়সা মায়ের হাতে তুলে দিতাম। মা এ সব পয়সা দিয়ে সংসারের খরচ চালাতেন। চালডাল কেনা ছাড়াও মা দুধভাতের ব্যবস্থা করতেন ব্যবস্থা করতেন সে পয়সা দিয়ে।

শহরে এসে জানপুরে নিজের বাড়ির অবস্থা দেখে ভিক্টোরিয়া স্কুলের পাশ দিয়ে ঢুকতাম শহরে। ওই রাস্তা দিয়ে চলে আসতাম চৌরাস্তা, সেখান থেকে শহরের অন্যান্ন জায়গায় যেতাম। ভিক্টোরিয়া স্কুলের মধ্যে বেশ কিছুদিন পাকসেনারা ক্যাম্প করে ছিল, সেখানে পাকসেনা ও রাজাকারদের দেখেছি। সত্যনারায়ণ সারদা সতিয়াদের বাড়িতে রাজকার, আলবদরের ক্যাম্প করা হয়েছিল। সেখানে আলবদর-রাজাকারদের আড্ডা দিতে দেখেছি। এ ছাড়াও পাকসেনা ও রাজাকারদের সিরাজগঞ্জ কলেজে। তাছাড়াও শহরের মধ্যে বড় পুলসহ শহরের বিভিন্ন স্থানে রাজাকারেরা রাইফেল কাধে নিয়ে ডিউটি করতো।

ছবি : অভিযাত্রা

মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময় আমাদের পরিবার শাহানগাছার হবির বাড়িতে আশ্রয় নিয়ে ছিলো। শেষের দিকে এসে গ্রামে গ্রামে মুক্তিযোদ্ধাদের আনাগোনা বাড়ে। সবাই তখন আলোচনা করতো, তাড়াতাড়িই দেশ স্বাধীন হয়ে যাবে। শৈলাবাড়ি যুদ্ধে গোলাগুলির আওয়াজ পাই শাহানগাছাতোই।

অবশেষে সিরাজগঞ্জ থেকে ১৩ ডিসেম্বর পাকসেনারা পালিয়ে যায়, মুক্ত হয় সিরাজগঞ্জ। এর দুতিন দিন পরেই আমরা পুরো পরিবার শাহানগাছা থেকে চলে আসি সিরাজগঞ্জ শহরে। শহরে এসে ভিক্টোরিয়া স্কুল, সিরাজগঞ্জ কলেজ সহ বিভিন্ন স্থানে দেখতে পাই মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প। ভিক্টোরিয়া রাজাকারদের দেখেছি আটকে রাখতে, যারা ক’দিন আগেও শহরময় দাপটের সাথে ধুরে বেড়াতো।

[শফিকুল ইসলাম টুক্কা- চৌরাস্তার মোড়ের চায়ের দোকান করেন। বর্তমানে এক কন্যা দুই পুত্র সন্তানের জনক।]

অনুলিখন : বীর মুক্তিযোদ্ধা সাইফুল ইসলাম

ও/এসএ/