|

মুক্তিযুদ্ধ

Published: Mon, 07 Sep 2020 | Updated: Mon, 07 Sep 2020

যুদ্ধকথা : বীরমুক্তিযোদ্ধা আজিজার রহমান

আমি মো. আজিজার রহমান নীলফামারী মহকুমার জলঢাকা থানার কাঁঠালি ইউনিয়নের কাঁঠালি গ্রামে ১৯৪৭ সালে জন্মগ্রহণ করি। আমার পিতা মো. কাছিম উদ্দিন (কাছুয়া মামুদ) পেশায় একজন কৃষক ছিলেন এবং মাতা মোছা. আছিয়া বেগম একজন গৃহিণী ছিলেন। আমারা দুই ভাই বোন। আমার অবস্থান দ্বিতীয়।

প্রাথমিক শিক্ষা লাভের পর শালডাঙ্গা হাই স্কুলে ভর্তি হই। দিনাজপুর জেলার দেবীগঞ্জ থানার শালডাঙ্গা ইউনিয়নে এক ভগ্নিপতির বাড়িতে থেকে পড়াশোনা করতে থাকি। আমি নিয়মিত রেডিও অনুষ্ঠান শুনতাম। ৭ মার্চের ভাষণ রেডিওতে শুনি। শেখ মুজিবুর রহমান ভাষণে যুদ্ধের আগাম বার্তা পৌঁছে দেন। দেবীগঞ্জে এসে আমি ছাত্ররাজনীতির সাথে যুক্ত হয়ে পড়ি। দেশের হালচাল প্রতিনিয়তই বিবিসি বাংলা খবর থেকে শুনতাম। ২৫ মার্চ রাতের বীভৎস চিত্রগুলো সম্পর্কে রেডিওর মাধ্যমে শুনতে পাই। মাথায় খুন চেপে বসে। দু’-একদিনের মধ্যেই চারদিকে ধরপাকড় শুরু হয়ে যায়। সেনাবাহিনী আর রাজাকার গুণ্ডাদের জ্বালাও-পোড়াও হত্যাযজ্ঞ দিনদিন বাড়তে থাকে।

এদিকে আমার এসএসসি পরীক্ষা। দেশ নাকি পরীক্ষা আগে এই কথা মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল? অবশেষে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলি, যে করেই হোক যুদ্ধে যেতে হবে। এই নরপিশাচের হাত থেকে দেশকে মুক্ত করতে হবে।

বাড়ির সবার জোরজবরদস্তিতে স্কুলে টেস্ট পরীক্ষার হল পর্যন্ত যাই এবং কোনরকম খাতায় নাম বসিয়ে টেবিলের উপর রেখে বের হয়ে আসি। এই অবস্থা দেখে স্যার বলল, কী খবর, আজিজ! বসতে না বসতেই প্রকৃতির ডাক? শরীর খারাপ করলো নাকি?  জ্বি স্যার, শরীর মন দু’টাই খারাপ। বের হয়ে আমার বন্ধু অলিয়ারের সাথে এ বিষয়ে কথা বলি। যে করে হোক ভারতে যেতে হবে। সেখানে নাকি যুদ্ধের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে? আমাদের ট্রেনিং নিতে হবে এবং দেশের এই ক্রান্তিকালে যুদ্ধ করতে হবে। শত্রুমুক্ত স্বদেশ গড়তে হবে। অলিয়ার আমার কথায় রাজি হয়ে গেল।

বাড়ি এসে শুনতে পাই দিন-দুপুরে দেবিগঞ্জ থেকে যুবক ছেলে-মেয়েদের ধরে নিয়ে যাচ্ছে এবং নদীর পারে নিয়ে জবাই করে পানিতে ফেলে দিচ্ছে। কী নরপিশাচ রে বাবা! গা কাঁটা দিয়ে উঠলো। আমার এক বন্ধু নোয়াবু কবিতার ছন্দে বলল,

‘বাঁচতে হলে লড়তে হবে
ছাড়তে হবে এ দেশ,
বীরের বেশে ফিরতে হবে
গড়তে সোনার দেশ।’

তার কথা শুনে বাসার দিকে এগিয়ে আসি। বিকেলের দিকে শুনতে পাই নোয়াবুকে ধরে নিয়ে গেছে রাজাকার। একথা শোনামাত্রই আঙুল দিয়ে দু’কর্ণ চেপে ধরি। কী হচ্ছে দুনিয়ায়? অলিয়ারসহ ভারতের দিকে শুরু করি ম্যারাথন দৌড়। শালডাঙ্গা থেকে করতোয়া নদী পাড়ি দিয়ে ভারতের জলপাইগুড়ি জেলার দেওয়ানগঞ্জের বগদুলঝুলা দিয়ে প্রবেশ করি। সারারাত ধকল সহ্য করতে হয়েছে। সকালবেলা আট আনা দিয়ে একটা রুটি আর চার আনা দিয়ে এক কাপ দুধ দু’জনে ভাগ করে খাই। তারপরে ক্যাম্পের দিকে এগিয়ে যাই। দেওয়ানগঞ্জ যুব শিবিরের দায়িত্বে ছিলেন আফসার আলী আহমদ এমএনএ। সেখানে রিক্রুট করে আমাদের প্রশিক্ষণের জন্য পাঠায়।

ভারতের মেঘালয় রাজ্যের মূর্তি পাহাড়ে মূর্তি ক্যাম্প নামক (মুজিব ক্যাম্প)এ যাই। আমরা যারা যুদ্ধে যাবো তাদেরকে একত্রিত করা হয়। সেখানে ছিল দেবী চরণ (লক্ষ্মীচাব), যাদব (লক্ষ্মীচাব), নবীন চন্দ্র বর্মন (ঐ), মনোধর বর্মন (ঐ), মদন চন্দ্র বর্মন (ঐ), অরবিন্দ রায় (ঐ), সুনীল চন্দ্র মহন্ত (ঐ), দিনাজপুরের অলিয়ারসহ আরো অনেকে।

গাড়িতে উঠলাম। সারাদিন চলে গাড়িটি রাত্রিবেলা ক্যাম্পে গিয়ে পৌঁছল। সেখানে আরো শত শত যোদ্ধা অপেক্ষা করছে। অনেকেই এসে জিজ্ঞেস করল, কে, কোথা থেকে আসা হলো? কোনো পরিচিত কেউ আছে কি না ইত্যাদি। 

আমরা জলঢাকা থেকে ৩২ জনের একটা গ্ৰুপ হলাম। বেশির ভাগ সহযোদ্ধা ছিল লক্ষ্মীচাবের। লক্ষ্মীচাব ইউনিয়ন আগে জলঢাকা থানার অধীনে ছিল এখন নীলফামারী জেলার অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। সবাই মিলে ২১ দিন প্রশিক্ষণ নিলাম। আবার অনেকে ৩০ দিন পর্যন্ত প্রশিক্ষণ নিল। প্রশিক্ষণ শেষে আমাদের চানমারি নিয়ে যাওয়া হয়। পাহাড়ের ঢালু পথ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি। কিছুদূর গিয়ে সবাই চানমারির প্রস্তুতি নেই। অনেকেই প্রথমদিকে টার্গেট করেও লক্ষ্যবস্তুতে হিট করতে পারেনি। কিন্তু আমার প্রথম ফায়ারে লক্ষ্যবস্তু ভেদ করে। ভারতীয় সেনা কর্মকর্তা (নামটা মনে নেই) আমার দিকে তাকিয়ে থেকে বলেন, তুম মুজাহিদ হায়। মুখটা লাল হয়ে গেছে রাগে। আমি তাকাতে পারছি না। আমার হাত ধরে টেনে নিয়ে যেতে থাকে, কিছুই বুঝতে পারি না। কী হচ্ছে এসব? পাশে দেখি আফসার আলী আহমদ এমএনএ, আমিন বিএসসি এমএনএ, জনাব উকিল, আব্দুর রউফ এমএনএ, আজহারুল ইসলাম এমপিএ সকলে বসে আলোচনা করছেন। তাঁদেরকে দেখে দু’চোখ দিয়ে ঝরঝর করে পানি ঝরতে লাগল। কাঁদো কাঁদো গলায় বললাম, ‘রউফ ভাই আমাকে নিয়ে যাচ্ছে।’ আর কিছুই বলতে পারিনি।

রউফ ভাই ইশারা দিয়ে বললেন, উসকো কিয়া করতাথা?
: সাচ্চা মুজাহিদ হ্যায়।
: নেহি উসকা স্টুডেন্ট হ্যায়।
: নেহি উসকো মুজাহিদ হ্যায়, নো আনসার হ্যায়।
: মেরা ঘর কা ছেলে হ্যায়, ছোড়দো উসকো ।
তিনি কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারলেন না। ওই সেনা কর্মকর্তা বললেন, উসকো টারগেট বিলকুল ঠিক হ্যায়, এ মুজাহিদ প্যাহেলা রাউন্ড মিনারকা লাগাতাথা। 

রউফ ভাই কিছু না বলে, আমাকে টেনে নিলেন। মনে মনে বললাম আর এরকম হবে না। টার্গেটে আঘাত করাটা কী আমার অপরাধ? আল্লাহ যা করে মঙ্গলের জন্য। শুকুর আলহামদুলিল্লাহ। 

দু'একদিন পর আমরা পঞ্চগড়ের বোদা থানায় যাত্রা করি। সেখানকার রঙ্গিয়ানী হাটে খরচ করি যাতে ক্যাম্পে রান্না করে খাওয়া দাওয়া করা যায়। অপারেশনের জ‌ন্য প্রস্তুতি নেই। আমার বডি নম্বর হলো ১৫৭/২৮। দিনের বেলা রেকি করে এসে আমাদের সমস্ত খবরা-খবর জানানো হয়। রাত হলেই আমরা হামলা চালাই। ভুল্লীতে পাকিস্তানি বাহিনীর উপর হানা দেই। আমাদের আক্রমণে মারা যায় দুইজন রাজাকার আর পাঁচজন-ছয়জন পাকসেনা। বাকিরা ভীত হয়ে কোনো রকম পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। আমরা ক্যাম্প থেকে দুইজন মেয়েকে উদ্ধার করি বিবস্ত্র অবস্থায়। সমস্ত শরীরে নরপিশাচের খাবায় খানখান হয়ে আছে। নখের আঁচড় আর কামড় দিয়ে সমস্ত শরীরকে বিষিয়ে তুলেছে। সুন্দর মুখখানা ভয়ে-আতঙ্কে নীল বিষ হয়ে আছে। তাঁদের গায়ে চাদর জড়িয়ে দিয়ে চিকিৎসার জন্য পাঠিয়ে দেই। সেদিন এই দৃশ্য দেখে আমার মাথায় খুন চেপে ধরে। হায়েনাদের ধরে ফালি ফালি করে কেটে আগুনে জ্বালিয়ে দেই। তবুও যেন রাগ থামতে চায় না। এখনো বলতে গেলে গা কাঁটা দিয়ে ওঠে।

এরপরে অপারেশনের জন্য প্রস্তুতি নেই ঠাকুরগার উদ্দেশ্যে। দলের সবাই ধীরে ধীরে পজিশন নিয়ে যাই। ফায়ারিং করতে করতে আমরা এগিয়ে যাই। পাকবাহিনীর সাথে মুখোমুখি গোলাগুলি শুরু হয়। একপর্যায়ে একের পর এক ধরাশায়ী হয়ে পড়তে থাকে পাকসেনা আর রাজাকার গুণ্ডারা। সেখানে আর টিকতে পারল না। পাকিস্তানি সেনাসদস্যরা পালাতে লাগল কাঞ্চন ব্রিজের দিকে। ব্রিজ পার হয়ে আমাদের হাত থেকে রক্ষার জন্য গোলার আঘাতে ব্রিজটি ভেঙে দেয়। ঠাকুরগাঁও মুক্ত হয়ে পড়ে। আমরা ফিরে আসি ক্যাম্পে। কোথাও কোনো পাকবাহিনী নেই। 

সকলে মিলে মিলিশিয়া ক্যাম্পে অবস্থান করি। এই ক্যাম্পেই কেউ আনসারে, কেউ পুলিশে, কেউ সেনাবাহিনীতে যোগদান করে। অনেক দিন থেকে বাড়ির বাইরে আছি, মা-বাবাকে দেখার জন্য মন ব্যাকুল হয়ে পড়ে। মিলিশিয়া ক্যাম্প থেকে মেজর ছদর উদ্দিন আমাকে তাঁর বাসায় নিয়ে যান। তিনি আমাকে প্রচন্ড ভালোবাসতেন। বেগম জিয়ার শাসনামলে তাঁকে ফাঁসি দিয়ে মারা হয়।

যুদ্ধ শেষ হলেও আমার যুদ্ধ শেষ হয়নি। চারদিকে ঘুরে ঘুরে দেখতাম। জনমানবশূন্য এলাকা, কোথাও কেউ নেই। কোথায় কী হয়েছে সেসব তথ্য সংগ্রহ করি। ঠাকুরগাঁওয়ের পশ্চিম পাশে একা একা হাঁটি। কোথাও কাউকে চোখে পড়ছে না। একটা গন্ধ। নাকে আসতেই থমকে দাঁড়াই। চোখ তুলে তাকাতে বীভৎস চিত্রটি দৃশ্যমান হয়। সেখান থেকে একদৌড়ে ফিরে আসি মেজর ছদর উদ্দিন সাহেবের কাছে। সব কিছু বলি এবং বেশ কয়েকজন যোদ্ধাসহ চলে যাই সেখানে। মানুষের লাশগুলো স্তুপে স্তুপে পড়ে আছে। কিছু লাশ থেকে পচা দুর্গন্ধ বের হয়ে আসছে। সারি সারি পিঁপড়া লাইন ধরে লাশের ভিতরে প্রবেশ করেছে। মশা-মাছির উৎপাত বেড়ে গেছে।

মেজর ছদর উদ্দিন সাহেব বললেন, দ্রুত কবর দেয়ার ব্যবস্থা করো, এভাবে রাখলে পরিবেশের ক্ষতি হবে। কোনো উপায়ন্তর না দেখে সকলে মিলে একটা পুকুর খনন করি। সেখানেই লাশগুলো শায়িত করে মাটি দেই। বর্তমানে সেখানে শহীদ মিনার তৈরি করেছে বাংলাদেশ সরকার।

পাকবাহিনীর সদস্যরা যে ডাকবাংলোতে থাকতো তার আশেপাশে কিছুই দৃষ্টিগোচর হয় না। কিন্তু রুমের ভিতরে প্রবেশ করে দেখি মদ আর সিগারেটের গন্ধ চারিদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। সামনে এগোতেই একটা মেয়ের লাশ দেখতে পাই। মাথার চুলগুলো পিছন দিক থেকে ঢেকে রেখেছে। দু’জন মিলে এগিয়ে যাই। কাছে গিয়ে দেখি মাথা থেকে রক্ত বের হয়ে রোয়াকে জমাট বেঁধে আছে। শরীরে কোন কাপড় নেই। 

ছেলে মানুষ মারা গেলে চিৎ হয়ে পড়ে থাকে কিন্তু মেয়ে মানুষ মারা গেলে নিজের লজ্জাস্থান ঢেকে উপুড় হয়ে পড়ে থাকে। এটা সেদিনই প্রকাশ পেল আমার সামনে। তাঁকে নিজ হাতে কবর দিয়ে এসেছি। এখনো সে কবরটা আছে। এরপর ঠাকুরগাঁয়ের ইপিআর হেডকোয়াটারে অস্ত্র জমা দেই।

যোদ্ধাজীবন শেষ করে গ্রামে ফিরে আসি। অভাবের সংসারে পড়াশোনার পাঠ চুকিয়ে কাজের সন্ধান করতে হয়। কোথাও কোনো কাজ না পেয়ে রাগে-দুঃখে কৃষি কাজ করতে বাধ্য হই। টানাপোড়েনের সংসারে ১৯৭২ সালের শেষ দিকে বিয়ে করি। বর্তমানে আমি পাঁচ সন্তানের জনক। তারা হলো আফরুজা বেগম, টুলটুলি আক্তার, মিলনুর রহমান মিলন, মশিয়ার রহমান, সাহানাজ পারভিন।

অনুলিখন : হাসান সোহেল

ও/ডব্লিউইউ

Published: Wed, 26 Aug 2020 | Updated: Wed, 26 Aug 2020

যুদ্ধকথা : বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আব্দুল গফফার

আমি মো. আব্দুল গফফার নীলফামারীর জলঢাকা মহকুমার বালগ্রাম পোস্ট অফিসের অন্তর্গত পশ্চিম বালাগ্ৰাম গ্ৰামে ১৯৫৩ সালের ৩১ মার্চ জন্ম গ্রহণ করি। পিতা মো. জামাল উদ্দিন পেশায় একজন কৃষক ছিলেন। মাতা মোসাম্মাৎ গোলেমন নেছা গৃহিণী ছিলেন। আমরা চার ভাই চার বোন। আমি ভাইবোনের মধ্যে পঞ্চম। চাচা আফছার আলী আহম্মেদ প্রাক্তণ এমএনএ। 

ব্রহ্মত্তর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করি। ১৯৬৯ সালে জলঢাকা সরকারি মডেল পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় হতে এসএসসি পাশ করে রংপুর কারমাইকেল কলেজে একাদশ শ্রেণীতে ভর্তি হই। কলেজ হোস্টেলে থাকা অবস্থায় ‘মাসিক সন্ধানী’ পত্রিকা বের করি। সেনা শাসকের অন্যায়-অত্যাচার, জুলুম-নির্যাতনের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানাই। বাঙালি জনসাধারণকে আন্দোলন-সংগ্রামে উদ্বুদ্ধ করি। পাশাপাশি থিয়েটারে অভিনয় করতে থাকি এসব বিষয়ে।

ছোটবেলা থেকেই ছাত্র রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত ছিলাম। জলঢাকায় থাকাকালীন অবস্থায় ১৯৬৯ সালে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ জলঢাকা শাখার সভাপতি নির্বাচিত হই। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রাণের সংগঠনে দায়িত্ব নিয়ে মাঠে-ময়দানে কাজ করতে থাকি। চারদিকে জুলুম-নিপীড়ন শুরু হয়ে গেলে জনগণের স্বার্থে স্বতঃস্ফূর্তভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করি। ১৯৭০এর নির্বাচনেই আমাদের বাঙালির মুক্তির পথ, নির্বাচন আমাদের শাসন-শোষণ জুলুম নির্যাতনের হাত থেকে বাঁচার একমাত্র পথ -এ লক্ষ্যে বাঙালি জনসাধারণকে উদ্বুদ্ধ করি। অর্থনীতি, শিক্ষা, সংস্কৃতি, যোগাযোগ, শিল্প-কারখানা সবদিক থেকে রংপুর পিছিয়ে ছিল। এসব সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য বাংলার জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে নির্বাচনে আওয়ামী লীগের পাশে দাঁড়ায়।। বাংলার মানুষ মুসলিম লীগের বলয়বৃত্ত ভেঙে শেখ মুজিবুর রহমানের ৬ দফা আর ছাত্রদের ১১ দফা চুম্বকের মতো আকর্ষণ করে মানুষকে। ১৯৭০ সালের নির্বাচন আমরা জয়লাভ করি।

নির্বাচনে জয়লাভের পরও ক্ষমতা হস্তান্তরের টালবাহানা শুরু হয়ে যায়। পাকিস্তানি সেনাশাসক ইয়াহিয়া খান ক্ষমতার মঞ্চে বসে আওয়ামী লীগের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করার প্রক্রিয়া শুরু করলে তা ভুট্টো খানের চক্রান্তে বাতিল হয়ে যায়। এরূপ পরিস্থিতিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অ্যাসেম্বলিতে যোগদান থেকে বিরত থাকেন এবং ২ মার্চ সারাদেশে হরতালের ডাক দেন। বঙ্গবন্ধুর ডাকে সারাদেশে মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করে। সারাদেশে থমথমে অবস্থা বিরাজ করতে থাকে ।

৭ই মার্চ রেসকোর্স ময়দানে লক্ষ লক্ষ জনতাকে সামনে রেখে এক সুন্দর প্রাঞ্জল ভাষায় দিক নির্দেশনামূলক ভাষণ প্রদান করেন তিনি। সেদিন তিনি বলেন, ‘প্রত্যেক ঘরে ঘরে দূর্গ গড়ে তোলো। তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করো।’ তিনি স্বৈরাচারী শাসকের বিরুদ্ধে বাঙালি জনতাকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করে নিজ নিজ অঞ্চল থেকে প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানান।

ভুট্টো খানের সাথে ইয়াহিয়া খান পৈশাচিক হত্যাযজ্ঞের নীল নকশা অঙ্কন করেন। সে অনুযায়ী ২৫ মার্চ রাতে ঢাকা শহর শ্মশান করে দেয়। এরপর ছড়িয়ে পড়ে সারা পূর্ব পাকিস্তানে। দেশের প্রধান প্রধান শহরে অত্যাচার-নির্যাতনের মাত্রা বেড়ে যায়। দিনে-দুপুরে যুবক ছেলেদের ধরে নিয়ে হত্যা করতেও দ্বিধাবোধ করে না তারা। মা ও শিশুদের নিয়ে পৈশাচিক খেলায় মেতে ওঠে। এ পরিস্থিতিতে রংপুর শহরে আর থাকতে না পেরে না চলে আসি জলঢাকায়। দেশের এই পরিস্থিতিতে আমি, মনসুর আলী, মিজানুর চৌধুরী (সংসদ সদস্য), ফজলুল হক, দুলাল চৌধুরীসহ জলঢাকার মাটিতে দাঁড়িয়ে হাতে হাত রেখে শপথ গ্রহণ করি। দেহের শেষ রক্তবিন্দু থাকতে এদেশে স্বৈরাচারী সরকারের পতন না হওয়া পর্যন্ত রণাঙ্গণ ছাড়বো না বলে শপথ নেই। এরপর দিকবিদিক না দেখে মহান মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ি।

১৯৭১ সালের ১৪ এপ্রিল মুক্তিযুদ্ধে যোগদানের জন্য পায়ে হেঁটে বাড়ি থেকে ডিমলা দিয়ে ভারতের জলপাইগুড়ি জেলার দেওয়ানগঞ্জ যাই। দেওয়ানগঞ্জ যুব শিবিরের দায়িত্বে ছিলেন আফসার আলী আহমদ (এমএনএ)। যুবশিবিরে রিক্রুট করে ট্রেনিং সেন্টারে পাঠানো হয়। আমাদের মেডিকেল করানোর পর একটা গাড়ি আসলে সবাই তাতে ওঠার পর মুজিব ক্যাম্পের দিকে এগিয়ে চলল।

আমরা প্রত্যেকে একা একা যেভাবে পারি যুদ্ধে যোগ দেই। ভারতের মেঘালয় রাজ্যের মূর্তি পাহাড়ে ক্যাম্প করা হয়েছে। বিএলএফ নামে একটি বিশেষ ক্যাম্প ছিল। বিএলএফ অর্থ বাংলাদেশ লিবারেশন ফ্রন্ট যা মুজিব বাহিনী হিসেবে পরিচিতি। এ ক্যাম্পে ২৯ দিন প্রশিক্ষণ নেই। এসএলআর, এলএমজি, এলএমজি, থ্রিনটথ্রি রাইফেল, মর্টার, গ্ৰেনেড, মাইন প্রভৃতি সম্পর্কে বিশদভাবে জ্ঞান দান করা হয়। ক্যাম্প কর্মকর্তা আমাকে উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য ইন্টেলিজেন্স এবং সিগন্যাল শাখায় পাঠায়। সেখানে আরো ২৯ দিন প্রশিক্ষণ নেই। বিভিন্ন সংকেতের মাধ্যমে সংবাদ আদান-প্রদান ব্যাপারটা দক্ষতার সাথে শিখে ফেলি। আমার প্রশিক্ষক ছিলেন ভগবান সিং। ভারত স্বাধীন হওয়ার পরেও আমি চিঠির মাধ্যমে স্যারের সাথে যোগাযোগ রাখি। আমার বডি নাম্বার S/সিগ-২৫।

প্রশিক্ষণ শেষে মানিকগঞ্জের পাশে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে বড়শশী বোদা থানায় ক্যাম্প স্থাপন করি। বর্তমানে শহিদুল ইসলাম চেয়ারম্যানের বাড়িটি ক্যাম্প হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল। ইন্টেলিজেন্স শাখায় কাজ করা অবস্থায় চিলাহাটি নামক স্থানে দিনের বেলায় রেকি করি। এক একদিন এক এক ধরনের বেশ নিয়ে বের হই। কখনো কৃষক, কখনো ফেরিওয়ালা, কখনো হাঁটুরে হয়ে ঘুরে বেড়াই। একদিন সবকিছু দেখে এসে অপারেশনের প্রস্তুতি নিয়ে বেরিয়ে পড়ি ভোররাত্রে মুক্তিরহাট নামক স্থানে পাক বাহিনীর উপর আক্রমণ করি এবং পাকসেনাদের আধুনিক অস্ত্রের মুখে টিকতে না পেরে পিছু হটতে বাধ্য হই। কোনো প্রকার জীবন নিয়ে দলবলসহ ক্যাম্পে ফিরে আসি। সেদিন সেখানে আমাদের দু’জন সসহযোদ্ধকে হারাই। 

এ সময় আমার সাথে ছিল মেজর গোলাম রব্বানী কোম্পানি কমান্ডার, দেবিগঞ্জ পঞ্চগড়ের জলিল ভূঁইয়া, লালমনিরহাটের শহীদুল্লাহ, রংপুর পীরগাছার আব্দুস সালাম এবং আমি সেকশন কমান্ডার হিসেবে কাজ করি। কখনও ভাউলাগঞ্জ-চিলাহাটির দিকে রেকি করতাম। এ কাজের জন্য মাঝেমধ্যে কারো বাড়িতে থাকতে হতো। আব্দুল জব্বারের বাড়িতে আমি থাকতাম। তিনি বর্তমানে খাদ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তা। তাঁর বাড়িতে থেকে দিনে খোঁজখবর নেই এবং এ রিপোর্টের ভিত্তিতে রাতের দিকে অপারেশন করি। রিপোর্টের ভিত্তিতে চিলাহাটি রেলব্রিজ অপারেশন করা হয়। সৈয়দপুর থেকে খান সেনারা রেলপথে রসদ ও সৈন্য সরবরাহ করতো। এজন্য রেলব্রিজটি ধ্বংস করা জরুরি হয়ে পড়ে। হামিদুর রহমানের নেতৃত্বে একদল যোদ্ধা সেখানে উপস্থিত হয়ে অবস্থান নেয়। আমাদের সামান্য ভুলের জন্য সেদিন অপারেশন সফল হয়নি।  ওই যুদ্ধে ৩ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন।

এভাবে যুদ্ধ পরিচালনার কাজ করতে থাকি। শেষের দিকে এসে পাক বাহিনীর ক্যাম্প পেয়ে আক্রমণ করতে গিয়ে আমার দু’জন সহযোদ্ধাকে হারাই (এই মুহূর্তে তাদের নাম মনে পড়ছে না)। মুক্তিরহাটকে শত্রু মুক্ত করে সহযোদ্ধা দু’জনকে কবর দিয়ে ক্যাম্পে ফিরে যাই। একের পর এক যুদ্ধ করতে থাকি আর সাফল্য অর্জন করি। সম্ভবত ১২ ডিসেম্বর জলঢাকা হানাদার মুক্ত হয়। ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হলে আমরা সেক্টর কমান্ডারের কাছে অস্ত্র জমা দেই।

ফিরে আসি আপন গৃহে। আবার পাঠচর্চায় মনোনিবেশ করি। ১৯৭২ সালে এইচএসসি পরীক্ষা পাস করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হই। সেখানে ছাত্ররাজনীতির সাথে যুক্ত হয়ে পড়ি। রাকসুর আন্তঃসম্পাদকের দায়িত্ব পালন করি। অধ্যায়নরত অবস্থায় ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং তাঁর পরিবারের সকল সদস্যকে নির্মমভাবে হত্যা করা হলে দেশের মানুষ হতভম্ব হয়ে পড়ে। আমাকে সেনাসদস্যরা ধরে নিয়ে যায়। এদিকে পরিবারের সবাই বলতে থাকে আমাকে মেরে ফেলা হয়েছে। প্রতিদিন সকাল-বিকেল সেনাসদস্যরা নির্যাতন চালাতো আমার ওপর। অবশেষে আল্লাহর অশেষ রহমতে মৃত্যুকূপ থেকে বেঁচে যাই।

১৯৭৫ সালে শামীমা বেগমের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করে জলঢাকা কলেজে গ্রন্থাগার হিসেবে নিয়োগ পাই। বর্তমানে আমি দুই সন্তানের জনক। মেয়ে শাকিলা খাতুন। ছেলে রসায়নবিদ মো. সাদিক-উল ইসলাম। আমার বর্তমান ঠিকানা নীলফামারীর জলঢাকা উপজেলার আঁচলের কলেজ পাড়া। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় একাডেমিক কাউন্সিলের সদস্য হিসেবে কাজ করি। ২০১৩ সালে জলঢাকা সরকারি মহাবিদ্যালয় থেকে অবসর গ্রহণ করে বর্তমানে বিভিন্ন সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠনের দায়িত্ব পালন করছি। 

অনুলিখন হাসান সোহেল

ও/ডব্লিউইউ
 

Published: Wed, 26 Aug 2020 | Updated: Wed, 26 Aug 2020

যুদ্ধস্মৃতি : মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মান্নান তালুকদার

আমি আব্দুল মান্নান তালুকদার সিরাজগঞ্জ সদরের রতরকান্দি ইউনিয়নের গজারিয়াগ্রামে পিতা রিয়াজউদ্দিন তালুকদার ও মাতা ওমিছা বেগমের ঘরে ১৯৫১ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি জন্ম গ্রহণ করি। আমি এসএসসি পাশ করি ১৯৬৮ সালে। ভর্তি হই সিরাজগঞ্জ কলেজে। মোতাহার হোসেন তালুকদারের ভাইয়ের ছেলে হিসেবে স্কুল জীবনেই জড়িয়ে পড়ি পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের সঙ্গে। কলেজে ভর্তি হয়ে সে ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ন থাকে। এ সময় আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন আমির হোসেন ভুলু, আমিনুল ইসলাম চৌধুরী, এমএ রউফ পাতা, বিমল কুমার দাস, ইসহাক আলী, গোলাম কিবরিয়া, আব্দুল আজিজ মির্জা, সোহরাব আলী সরকার, আজিজুল হক বকুল প্রমুখ ছাত্রনেতারা। তাঁরা কর্মীসভা, জনসভা, মিছিলে যেতে বলতেন। আমরা দলবল বেঁধে চলে যেতাম। 

১৯৭০ সালে কলা বিভাগে এইচএসসি পাশ করে একই কলেজে বিএ ক্লাসে ভর্তি হই। পাকিস্তান জাতীয় পরিষদে কাজীপুর ও সিরাজগঞ্জ থানা মিলে পাবনা- ১ আসন এবং আমাদের ইউনিয়ন কাজীপুরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে প্রাদেশিক পরিষদে পাবনা-১ আসন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। আওয়ামী লীগ জাতীয় পরিষদে মোতাহার হোসেন তালুকদার এবং প্রাদেশিক পরিষদে আমাদের ইউনিয়নের বাসিন্দা ক্যাপ্টেন এম. মনসুর আলীকে প্রার্থী করা হয়। মোতাহার হোসেন তালুকদারের ভাইয়ের ছেলে এবং ছাত্রলীগের কর্মী হিসেবে আমি সত্তরের নির্বাচনী প্রচারাভিযানে অংশ নেই। উভয় নির্বাচনে সারাদেশের মতো আমাদের আসনেও এমএনএ পদে মোতাহার হোসেন তালুকদার এবং এমপিএ পদে ক্যাপ্টেন এম. মনসুর আলী বিপুল ভোটে বিজয়ী হন। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগ সমগ্র পাকিস্তানে একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দলে পরিণত হয়। নির্বাচনী ফল পাওয়ার পর নিশ্চিন্ত হই যে, এবার পাকিস্তানকে শাসন করবে বাঙালিদের দল আওয়ামী লীগ। আবার সংশয়ও জাগে যে, পাকিস্তানের সামরিক শাসক কি বাঙালিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করবে? তবুও আমি কলেজে ফিরে গিয়ে পড়াশোনায় মনোযোগ দেই। 

কিন্তু ১৯৭১ সালের ১ মার্চ এ অঞ্চলের রাজনীতির হাওয়া আবার ঘুরে যায়। পাকিস্তানের সামরিক শাসক এক ঘোষণায় পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের অধিবেশন যা ঢাকায় ৩ মার্চ বসার কথা ছিল তা অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করে। প্রতিবাদে ছাত্রদের সঙ্গে রাস্তায় নেমে আসে জনতাও। মিছিলে স্লোগান ওঠে ‘বাঁশের লাঠি তৈরি করো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো।’ আপামর জনসাধারণও ভাবতে শুরু করে, ইসলামের দোহাই দিয়ে শাসন করা পাকিস্তানের সঙ্গে আর নয়। প্রতিদিনই গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটতে থাকে। ২ মার্চ ঢাকায় স্বাধীনতার পতাকা উড়িয়ে দেয়া হয়, ৩ মার্চ স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠ করা হয়। ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণে বাঙালিদের ‘প্রত্যেক ঘরে ঘরে দূর্গ গড়ে’ তোলার আহ্বান জানান। তিনি আরো বলেন, ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ তাঁর এ ঘোষণাকে আমরা স্বাধীনতার ঘোষণা বলেই মনে করতে থাকি, স্কুল-কলেজ বন্ধ হয়ে যায়। এসব স্থান হয়ে ওঠে অস্ত্র প্রশিক্ষণের কেন্দ্র। এসময় আমি সিরাজগঞ্জ শহর ছেড়ে গ্রামের বাড়ি চলে যাই।  

বিভিন্ন গ্রামের ছাত্র-তরুণদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখি, দেশের পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয় তা বোঝার চেষ্টা করি। ২৫ মার্চ গণহত্যা শুরু করে পাকবাহিনী। পাকিস্তানি শাসন ব্যবস্থা সম্পূর্ণই ভেঙে পড়ে, বিভিন্ন শহর থেকে পালিয়ে আসতে শুরু করে সাধারণ মানুষ। পাক-বাহিনীর নির্যাতনের খবর চলে আসতে থাকে গ্রামের মানুষের কাছে। সাধারণ মানুষ এতে ভয় পেয়ে গেলেও পাকিস্তানিদের ওপর যেটুকু আস্থা ছিল তাও শেষ হয়ে যায়। সিরাজগঞ্জ শহর থেকেও মানুষজন গ্রামে চলে আসতে শুরু করে, যদিও তখনো সিরাজগঞ্জ শহর মুক্তিকামী জনতার নিয়ন্ত্রণে ছিলো। 

১৭ এপ্রিল মুজিবনগরে প্রবাসী সরকার শপথ নেয়ার পরপরই আমাদের চাচা মোতাহার হোসেন তালুকদার আত্মগোপনে অর্থাৎ প্রবাসী সরকারের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করতে চলে যান। তাঁর পরিবার চলে আসে গ্রামে। ২৭ এপ্রিল পাকবাহিনী সিরাজগঞ্জ দখলে নিয়ে শহরকে ধ্বংসস্তুপে পরিণত করে। তারা বিভিন্ন গ্রামে হামলা চালাতে শুরু করে। একই সাথে বিভিন্ন ইউনিয়নে শান্তি কমিটি গঠন করা হয়, গঠন করা হয় রাজাকার বাহিনী। এলাকার মানুষ মনে করতে শুরু করে, যে কোনো সময় আমাদের গ্রামেও হামলা চালাবে পাকসেনারা। কারণ, এ গ্রাম মানে আওয়ামী লীগ নেতা মোতাহার হোসেন তালুকদারের গ্রাম। যদিও আমাদের গ্রামের একজন সে বছর আমাদের ইউনিয়ন চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন, তিনি যুক্ত হয়ে পড়েন পাকিস্তানিদের সঙ্গে। ফলে ভয়ে ভয়ে সময় কাটতে শুরু করে আমাদের গ্রামের মানুষের। 

এরমধ্যে একদিন বালিঘুরঘুরি গ্রামের রাধাকান্তর বাড়িতে ডাকাতি সংঘটিত হয়। এর কয়েকদিন পর মে মাসের শেষ বা জুনের প্রথম সপ্তাহে বাগবাটী গ্রামে গণহত্যা চালায় পাকবাহিনী ও তার এদেশীয় সহযোগীরা। এতে আরো বেশি আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এলাকায় আর আমাদের গ্রামবাসী আরো ভীত হয়ে পড়ে। অনেকেই ভয়ে গ্রাম ছেড়ে অন্য গ্রামে আশ্রয় নিতে থাকে। বাগবাটীর ঘটনার কয়েকদিন পরই মোতাহার হোসেন তালুকদারের পরিবার ভারতের উদ্দেশ্যে গ্রাম ছাড়েন। কিন্তু আতঙ্ক আমাদের পিছু ছাড়ে না, কারণ তখন স্বাধীনতা বিরোধীরা তৎপর হয়ে ওঠে।

আমরা খবর পাচ্ছিলাম যে, কুড়িগ্রামের রৌমারী থানা তখনও মুক্ত আছে এবং সেখানে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। তখন গ্রামের তরুণরা সংগঠিত হতে শুরু করি মুক্তিযুদ্ধে যোগদানের জন্য। একদিন সন্ধ্যায় গ্রাম থেকে বের হয়ে পড়ি, চলে যাই শুভগাছায়। তার আগেই নৌকায় যমুনা-ব্রহ্মপুত্র নদ হয়ে রৌমারী যাওয়া সম্পর্কে খোঁজখবর নেয়া হয়েছিল। যাঁরা সেদিন গ্রাম থেকে বের হয়ে এসেছিলাম, তাঁদের মধ্যে যাদের কথা এই মূহুর্তে মনে পড়ছে তারা হলো আব্দুল হামিদ তালুকদার, আমজাদ হোসেন তালুকদার, হযরত আলী খাজা, নজরুল ইসলাম ননী, হারুণর রশীদ, ফরিদুল ইসলামসহ আরো কয়েকজন। সন্ধ্যার পরে শুভগাছায় যমুনার ঘাটে এসে নৌকায় উঠে পড়ি। নৌকা ছাড়ে রৌমারীর উদ্দেশ্যে। 

রাস্তায় রাস্তায় বিপদ আর দেশ মুক্ত করার আকাঙ্খা নিয়ে আমরা প্রায় পাঁচ দিনের মাথায় পৌঁছে যাই ভারতের মাইনকার চর। সেখান থেকে লোকজনকে জিজ্ঞেস করে খুব সহজেই রৌমারীতে চলে যাই। কুড়িগ্রামের রৌমারী থানার ফ্লাগ স্ট্যান্ডে তখনও পতপত করে উড়ছে স্বাধীনতার পতাকা। সেখানে শত শত তরুণ প্রশিক্ষণ নিচ্ছে বাংলাদেশকে মুক্ত করতে। এসব দেখে খুব ভালো লাগলো। ঢুকে গেলাম থানা বাউন্ডারির ভেতরে, নাম লেখালাম মুক্তিযুদ্ধাদের তালিকায়। সেখানে পাওয়া গেল ইসমাইল হোসেন (দোয়াতবাড়ি), জহুরুল ইসলাম তালুকদার মিন্টু (গজারিয়া, আমার চাচাতো ভাই), রেফাজউদ্দিন (কাজীপুর), নূরুল ইসলাম (ওয়াপদা কর্মচারী)। তাঁদের মধ্যে ইসমাইল হোসেন প্রশাসন দেখতেন, জহুরুল ইসলাম তালুকদার মিন্টু প্রশিক্ষণ দেখতেন আর খাবারের বিষয় সামলাতেন নূরুল ইসলাম। 

ক্যাম্পে মাঝেমধ্যেই খাবারের সঙ্কট হতো, কিন্তু প্রশিক্ষণ এগিয়ে চললো। প্রশিক্ষণে প্রথমে শরীর চর্চা, এরপরেই প্রশিক্ষণে যুক্ত হয় অস্ত্র, মানে থ্রিনটথ্রি রাইফেল। ক্যাম্পে মাঝে মাঝে আসতেন প্রবাসী সরকারের অর্থমন্ত্রী ক্যাপ্টেন এম. মনসুর আলী, এমএএ মোতাহার হোসেন তালুকদার, এমপিএ সৈয়দা হায়দার আলী, জেড ফোর্সের অধিনায়ক মেজর জিয়াউর রহমানসহ আরো অনেকে। এখানে প্রশিক্ষণ দিতেন বেলকুচির ইপিআর সদস্য নামদার হোসেনসহ আরো কয়েকজন। এসময় আমাদের বলা হতো যে, সবাইকে উচ্চতর প্রশিক্ষণ অর্থাৎ হায়ার ট্রেনিংয়ে পাঠানো হবে। তারপর অস্ত্র হাতে পাঠানো হবে দেশকে মুক্ত করতে।  

ওদিকে রৌমারী এলাকা মুক্ত রাখতে ব্রহ্মপুত্র নদের বিভিন্ন চরে ডিফেন্স গড়েছিল ১ম, ৩য় ও ৮ম বেঙ্গল রেজিমেন্ট। তারা রৌমারী স্কুলে নিয়ে আমাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে। আমরা অনেকেই সে প্রশিক্ষণে অন্তর্ভূক্ত হই। পাকবাহিনী প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করে বেঙ্গল রেজিমেন্টের ওপর। তখন আমাদের বিভিন্ন মুক্তিযোদ্ধাকে গ্রুপ করে বিভিন্ন স্থানে ট্রেন্স ও বাঙ্কারে করে ডিফেন্সের কাজে লাগানো হয়। তখন রৌমারী ইয়থ ক্যাম্পে দেখা দেয় কিছুটা বিশৃঙ্খলা। ক্যাম্পের একাংশ নিয়ে যাওয়া হয় রৌমারীর পাশে নতুন বন্দর স্কুল মাঠে। এ সময়ে বেঙ্গল রেজিমেন্টের ১ম ও ৩য় বেঙ্গল রেজিমেন্টের শূন্যস্থান পূরণের জন্য স্পেশাল ব্যাচে রিক্রুট করা হয়। 

এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, পাকিস্তানের বিভিন্ন ক্যান্টেনমেন্ট থেকে বাঙালিরা যখন বেড়িয়ে আসে তখন তাদের অনেকেই আসতে পারেনি অথবা আসেনি, সেই শূন্যস্থান পূরণ করা হয় নতুন রিক্রুট করে, তাদের বলা হয় স্পেশাল ব্যাচ। নতুন বন্দর থেকেও ১ম ও ৩য় বেঙ্গলের জন্য দুই দফায় রিক্রুট করা হয়। আমাদের দফায় আমরা ৮৬ জন রিক্রুট হই। অনেকেই বেঙ্গল রেজিমেন্টে রিক্রুট হতে না পেরে মন খারাপ করে। গজারিয়া থেকে বেঙ্গল রেজিমেন্টে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পাই আমি, আব্দুল হামিদ তালুকদার, হযরত আলী খাজা, হারুণর রশীদ, নজরুল ইসলাম ননী ও আব্দুল হামিদ তালুকদার। আমার চাচাতো ভাই সাইফুল ইসলামের স্বাস্থ্য খারাপ বলে তাঁকে নেয়া হয় না। ইউনিয়নের যারা বেঙ্গল রেজিমেন্টে রিক্রুট হন তাঁরা হলেন সাহার উদ্দিন, হাবিবুর রহমান (মইশামুড়া), আজিজুর রহমান (ঐ), ঈমান আলী (ঐ), আজাহার আলী (একডালা) প্রমুখ। আমাদের রিক্রুট করে পাঠানো হয় তেলঢালা বেঙ্গল রেজিমেন্টের প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে। 

নিয়মিত বাহিনীর সৈনিক হিসেবে গড়ে তুলতে আমাদের কঠোর প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। প্রশিক্ষণের শুরুতেই সাধারণ মুক্তিযোদ্ধাদের লুঙ্গি-শার্ট-গামছা ছেড়ে দেয়া হয় সৈনিকের পোশাক। নিজেদের পরিবর্তিত পোশাকে খারাপ লাগার কথা নয়, বরং আমরা আরো উৎসাহিত হই। এখানে মনে রাখা দরকার যে, নিয়মিত বাহিনীর একজন সৈনিককে গড়ে তুলতে সময় লাগে কমপক্ষে দুই বছর, সেখানে আমাদের প্রশিক্ষণের সময় নির্ধারণ হয় মাত্র ২ মাস। আমরাও দেশকে শত্রুমুক্ত করবো বলে দিনরাত কঠোর পরিশ্রম করে প্রশিক্ষণ নিতে লাগলাম। দীর্ঘ দুই মাস প্রশিক্ষণ নিয়ে আমরা নিজেদের প্রস্তুত করলাম নিয়মিত বাহিনীর উপযোগী করে। সময় এলো যুদ্ধে যাবার। 

আমাদের কোম্পানি কমান্ডার নিযুক্ত হলেন ক্যাপ্টেন আকবর। জুনিয়র কমিশন্ড অফিসার (জেসিও) নিযুক্ত হলেন আমাদের ইউনিয়নের সাহার উদ্দিন। আমাকে নিযুক্ত করা হলো প্লাটুন হাবিলদার। প্রশিক্ষণ শেষে এলেন মুক্তিবাহিনীর প্রধান কর্নেল এমএজি ওসমানী আমাদের প্রশিক্ষণ সমাপনী দিনে, যেদিনকে সেনাবাহিনীর ভাষায় বলা হয় পাসআউট। ততদিন আমাদের দেয়া হয়েছে নিয়মিত বাহিনীর খাকি পোশাক, আমরা সে পোশাক পড়ে ফলইন হলাম। কর্নেল ওসমানী তার ভাষণে বললেন, ‘দ্রুতই স্বাধীন হবে বাংলাদেশ। এজন্য প্রয়োজন মিত্ররাষ্ট্রের সীমান্ত এলাকায় শত্রুদের হটিয়ে দিয়ে গড়ে তুলতে হবে মুক্ত এলাকা। তাই আমাদের জন্য স্থান নির্ধারণ হয়েছে সিলেটের বিয়ানীবাজার সীমান্ত। তার ইচ্ছা, নিজের এলাকা তিনি আগে মুক্ত করতে চান, সেখানে হবে মুক্তিবাহিনীর হেডকোয়ার্টার। সেখান থেকে নেতৃত্ব দেয়া হবে মুক্তিযুদ্ধের। আর এই গুরু দায়িত্ব দেয়া হচ্ছে আমাদের। প্রশিক্ষণ শেষে আমাদের এখন সেখানেই পাঠানো হবে। কালকেই বাহিনী সেদিকে রওনা হতে হবে। পরে কর্নেল ওসমানী সৈনিকদের অর্থাৎ মুক্তিযোদ্ধাদের তাঁবুতে তাঁবুতে গিয়ে সবার সঙ্গে করমর্দন করলেন। একসময় তিনি বিদায় নিলেন আমাদের ক্যাম্প থেকে। তিনি চলে যাওয়ার পরে আমাদের সিলেট সীমান্তে যাওয়ার তোড়জোড় শুরু হয়ে গেল। 

আমাদের বহন করে নিয়ে যেতে চলে এলো অনেকগুলো মিলিটারি লড়ি। আমরাও যার যার মালপত্র নিয়ে লাফিয়ে উঠে পড়লাম সে লড়িতে। মেঘালয়, আসামের পাহাড় দিয়ে চড়াই উৎরাই ঠেলে চলতে লাগলো আমাদের গাড়ির বহর। জনমানবহীন পাহাড়ি এলাকার মাঝেমধ্যেই শরণার্থী শিবির। তারা আমাদের গাড়ির বহর দেখলেই হাত তুলে অভিবাদন জানাতো। স্থানীয় মানুষেরাও ‘জয়বাংলা’ স্লোগান দিয়ে আমাদের অভিনন্দন জানাতো। সারাদিন চলার পর আমরা ভারতের বিখ্যাত শিলং শহরে রাত্রি যাপন করি। পরের দিন সকালে আবার যাত্রা শুরু। বিকেলের দিকে পৌঁছে যাই আমাদের গন্তব্য সিলেটের বিয়ানীবাজারের উল্টো দিকের সীমান্তে। আমরা সীমান্তে বাঙ্কার-ট্রেন্স করে ঘাঁটি গড়ি। দিনে সীমান্ত পাহারা আর রাতে ভেতরে পাকসেনার ঘাঁটিতে হামলা চালানো -এই ছিল আমাদের নিত্যকাজ।

কিন্তু ধীরে ধীরে আমাদের মধ্যে হতাশা নেমে আসতে শুরু করে। কারণ আমাদের এই রেজিমেন্টের বেশির ভাগই ছাত্র, কেউ কেউ কৃষক ও শ্রমিক। আমরা চাইতাম, নিজের পরিচিত এলাকায় গেরিলা যুদ্ধ করতে, কিন্তু আমাদের লাগানো হয় নিয়মিত বাহিনীতে। প্রথম দিকে যে আবেগ বা দেশপ্রেম যাই থাকুক না কেন তা দিয়ে যুদ্ধকে মেলাতে অসুবিধা হচ্ছিল। এদিকে, ওই এলাকার সাধারণ মানুষের যে সহযোগিতা আশা করতাম তা পেতাম না। আমাদের মনে হতো যে, এলাকার সাধারণ মানুষের অবস্থান পাকিস্তানের পক্ষে অর্থাৎ স্থানীয়দেরকে আমাদের কাছে স্বাধীনতাবিরোধী মনে হতো। অবশ্য নিয়মিত বাহিনীর সদস্য হিসেবে ছাড়াও প্রধানত সীমান্ত এলাকায় অবস্থান থাকায় সাধারণ মানুষের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগও ছিল কম। আর আমাদের মানসিক প্রস্তুতি ছিল গেরিলা যুদ্ধের, নিয়মিত যুদ্ধের যে মানসিক প্রস্তুতি প্রযোজন তা আমাদের ছিল না। 

এদিকে, আমাদের গ্রামের আব্দুল হামিদ তালুকদার ভীষণভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন, ফলে তাঁকে পাঠিয়ে দেয়া হয় শিলংয়ের ভারতীয় সেনাবাহিনীর হাসপাতালে। যুদ্ধ যে কবে শেষ হবে তার কোনো ঠিক নেই। ফলে আমাদের মধ্যে এক ধরনের হতাশাও কাজ করছিল। এর মধ্যেই চলে আসে রোজার ঈদ। দারুণ হতাশা থেকে অনেকেই ঈদের দিনেও না খেয়ে থাকে। 

খবর পেয়ে চলে আসেন মুক্তিফৌজের প্রধান সেনাপতি কর্নেল এমএজি ওসমানী। তিনি আমাদের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনেন। তিনি বলেন, দ্রুতই শুরু হবে চূড়ান্ত লড়াই, হানাদার মুক্ত হবে বাংলাদেশ। তাই আমাদের হাতে সময় খুবই কম। এখন আর কোথাও কাউকে ‘মুভ’ করানো সম্ভব নয়। সে চূড়ান্ত লড়াইয়ে তিনি মনযোগ দিয়ে যুদ্ধ করার প্রস্তুতি নিতে বলেন। তাঁর কথায় আমরা কিছুটা আশার আলো দেখে আশাবাদী হয়ে উঠি। কর্নেল ওসমানীর কথার সত্যতাও পাওয়া যায়। মিত্রবাহিনী অর্থাৎ যৌথবাহিনীর সৈন্য সমাবেশ ঘটতে থাকে সীমান্ত এলাকায়। আমাদের বাহিনীতেও ভারি অস্ত্র যুক্ত হতে শুরু করে। এসব থেকে আমরা বেঙ্গল রেজিমেন্টের সাধারণ সদস্যরাও বুঝতে পারি যে, চূড়ান্ত লড়াইয়ের আর বেশি দেরি নেই। নতুন উদ্যোমে মনোযোগ দেই মুক্তিযুদ্ধে। 

এগিয়ে আসে ডিসেম্বর মাস। আমাদের ছড়িয়ে দেয়া হয় সিলেট জেলার বিভিন্ন সীমান্তে। ৩ ডিসেম্বর পশ্চিম পাকিস্তান সীমান্তে ভারতের ওপর হামলা চালায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। ভারতও তার পাল্টা জবাব দেয়। পাশাপাশি আমরা বাংলাদেশকে স্বাধীন করতে ঢুকে পড়ি দেশের ভেতরে। বিশ্বরাজনীতিতেও পরিবর্তন ঘটতে শুরু করে। নেপাল, ভূটান পরে ভারত সরকারও আমাদের স্বাধীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়। ততদিনে আমাদের গেরিলাদের আক্রমণে নাজেহাল হয়ে মনোবল সম্পূর্ণই হারিয়ে ফেলেছে পাকসেনারা। তারা সীমান্ত ছেড়ে দিয়ে একসাথে হতে শুরু করে তাদের বিভিন্ন ঘাঁটি এলাকায়। আমরা বেঙ্গল রেজিমেন্ট তাদের ধাওয়া করতে থাকি। 

সীমান্ত থেকে পিছু হটে পাকবাহিনী। আমরা তাদের ধাওয়া করতে শুরু করি। পাকবাহিনী টেংরাটিলায় ঘাঁটি করে আমাদের প্রতিরোধের চেষ্টা করে। সেখানে শুরু হয় তুমুল যুদ্ধ, কিন্তু সে প্রতিরোধ বালির বাঁধের মতোই ভেঙে যায়। অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকে আমাদের। অবশেষে ওরা ঢুকে পড়ে সিলেট শহরে। আমরা বেঙ্গল রেজিমেন্ট ওদের অবরোধ করি। এবার পাকসেনাদের আত্মসমর্পন ছাড়া আর কোনো পথ নেই, কারণ ইতিমধ্যেই ১৬ ডিসেম্বর খোদ ঢাকায় তাদের কমান্ডারেরা এর আগে আত্মসমর্পণ করে বসে আছে। বাংলাদেশের মাটিতে পরাজয় স্বীকার করে নিয়েছে পাকসেনারা। 

কিন্তু ওরা মনে করতে থাকে যে, গত নয় মাসের নির্মম নির্যাতনের প্রতিশোধ নিতে পারে বাঙালিরা, তাই ওরা বাঙালিদের কাছে আত্মসমর্পণ করতে নারাজ। ওরা শর্ত দেয় যে, মুক্তিবাহিনীর কাছে নয়, ভারতীয় বাহিনীর কাছে ওরা আত্মসমর্পণ করতে রাজি আছে। তখন ভারতীয় বাহিনীর কাছে খবর পাঠানো হয়। ১৯ ডিসেম্বর মিত্র বাহিনীর প্রতিনিধি সিলেট শহরে ঢোকে এবং পাকবাহিনীর আত্মসমর্পণের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে। তারপরে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে একটি স্থানে আটক রেখে আমাদের জন্য সিলেট উন্মুক্ত করা হয়। হয়তো তারাও ভেবেছিলো যে, মুক্তিযোদ্ধারা পাকবাহিনীর ওপর প্রতিশোধ নিতে পারে, এ জন্যই আমাদের ঢুকতে দেয়া হয়নি সিলেটে। আমরা ঢুকে পড়ি সিলেট শহরে। আমাদের অস্থায়ী ক্যাম্প করা হয় নতুন মেডিকেল কলেজে।

আমরা স্পেশাল ব্যাচের বেঙ্গল রেজিমেন্টের সদস্য হয়ে যাঁরা যুদ্ধ করেছি, তাঁদের চাকরিজীবীর মতোই দেখা হতে থাকে। চাকরির শর্ত অনুযায়ী পদত্যাগের পরে পাওনা-দেনা মিটিয়েই আমরা সেখান থেকে বিদায় নিতে পারি। স্পেশাল ব্যাচের সবাইকে বলা হলো, বেঙ্গল রেজিমেন্টে থেকে যাওয়ার জন্য। আমাদের গ্রামের হারুণ জানালো যে, দেশে গিয়ে কী করবো? তার চেয়ে যুদ্ধ করতে করতে চাকরি পেয়ে গেলাম, এটাই আমার জন্য ভালো। সে রেজিমেন্টেই থেকে যাবে বলে জানালো। তাঁর মতোই আরো কেউ কেউ বেঙ্গল রেজিমেন্টের চাকরিকেই পছন্দ করে নিল। আমাদের ইউনিয়নেরও কেউ হয়তো থেকে গেল, তবে তার সংখ্যা খুবই কম। বেশির ভাগই মুক্তি চাইলো বেঙ্গল রেজিমেন্ট থেকে। তারা পদত্যাগ পত্র জমা দিয়ে দিল। বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতা শেষে রইলো বেতন বাকি। ততদিনে আমি অস্থির হয়ে পড়েছি দেশে আসার জন্য। কতদিন বাবা-মা, ভাইবোন, গ্রামের মানুষের মুখ দেখি না! তাই বেতন ফেলে রেখেই রওনা হলাম বাড়ির উদ্দেশ্যে। এভাবেই শেষ হলো আমার মুক্তিযোদ্ধা জীবন।

অনুলিখন : সাইফুল ইসলাম 

ও/ডব্লিউইউ

Published: Fri, 21 Aug 2020 | Updated: Fri, 21 Aug 2020

আটঘরিয়ার লক্ষীপুর গণহত্যার স্বীকৃতি দাবি: আমিরুল ইসলাম রাঙা

১৯৭১ সালের ২০ আগস্ট, শুক্রবার। পাবনার আটঘরিয়া উপজেলার লক্ষীপুর ইউনিয়নের লক্ষীপুর গ্রামে পাকিস্তান সেনাবাহিনী অতর্কিত হানা দিয়ে ব্যাপক লুঠতরাজ, অগ্নিসংযোগ, ধর্ষণ ও নির্যাতন করে বহু মানুষকে হত্যা করেছিল। লক্ষীপুরের এই গণহত্যার উল্লেখযোগ্য দিক হলো, মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসে আটঘরিয়ার দেবোত্তর, বংশিপাড়া, গড়রী, আটঘরিয়া বাজার এবং একদন্তের বেলদহ এলাকার মধ্য সবচেয়ে বেশি মানুষকে হত্যা করা হয় এই লক্ষীপুর গ্রামে। এছাড়া এদিন লক্ষীপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান, দেশখ্যাত সঙ্গীত শিল্পী ওস্তাদ এম. এ. গফুরকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছিল।

উল্লেখ্য, মুক্তিযুদ্ধের এই সময়কালে পাবনায় ভয়াবহ বন্যা হয়ে চারিদিকে ডুবে যায়। পাবনা শহরের রাস্তাঘাটে নৌকা চলাচল করেছে। এমনতর অবস্থায় পাকিস্তানী সৈন্য এবং তাদের দোসরদের নির্মম অত্যাচারে মানুষ দিশেহারা হয়ে পড়ে। একদিকে খাদ্য সঙ্কট এবং অন্যদিকে হানাদার বাহিনীর নির্যাতনে মানুষ চরম বিপাকে পড়ে। বিশেষ করে সংখ্যালঘু হিন্দু পরিবার, আওয়ামী লীগ সমর্থকদের পরিবার এবং তরুণ, যুবকরা নিজেদের নিরাপত্তার জন্য দূর-দূরান্তের গ্রামসমূহে আশ্রয় নেয়। শহর এলাকা থেকে গ্রামে আশ্রয় নেয়া পরিবারগুলোর উপর বিভিন্ন এলাকায় লুটতরাজসহ নারীর ইজ্জতহানির বহু ঘটনা তখন ঘটতে থাকে। এসব ঘটনায় স্বাধীনতা বিরোধীরা এমনকী অনেক এলাকায় অসৎ চরিত্রহীন দৃর্বত্তরা এইসব অপকর্ম ঘটাতে থাকে। তখনও এই অঞ্চলে মুক্তিযোদ্ধাদের তৎপরতা শুরু হয়নি। 

পাবনার বিভিন্ন এলাকায় অবরুদ্ধ অসহায় মানুষের উপর পাক আর্মিদের আক্রমণ এবং হত্যাকাণ্ডের পরিমাণ ক্রমেই বাড়তে থাকে। আটঘরিয়ার পার্শ্ববর্তী হাদল এবং ডেমরায় ভয়াবহ গণহত্যা সংগঠিত হয়। এসব গ্রামসমূহে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এবং তাদের দোসররা হানা দিয়ে শত শত লোককে একসাথে গুলি করে হত্যা করে এবং ঐসব গ্রামের নারী-যুবতী-কিশোরী এমনকী শিশুদেরকেও ঐ পিশাচরা ধর্ষণ করে। ডেমরা হত্যাকাণ্ডে প্রায় সাড়ে আট শত লোককে একসাথে দাঁড় করিয়ে হত্যা করা হয়েছিল। ঠিক এমনি একটি সময়েই আটঘরিয়ার লক্ষীপুর গ্রামে পাকিস্তানি সৈন্যরা হামলা করে।

১৯৭১ সালের ২০ আগস্ট, শুক্রবার দুপুর প্রায় সাড়ে ১২টার দিকের ঘটনা। গ্রামের মানুষ স্থানীয় মসজিদে জুমার নামাজ পড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এমন সময় গোটা গ্রামজুড়ে হৈ চৈ, দৌড়া-দৌড়ি আর কান্নার শব্দ ভেসে উঠলো। মাঝে মাঝে গুলির শব্দ। মানুষজন বিশেষ করে উত্তর দিকে বিলের মধ্য পালাতে পারলেও পালাতে পারলো না গ্রামের হিন্দু পাড়ার বাসিন্দারা। স্থানীয় হিন্দু পাড়ায় শহর থেকে অনেক হিন্দু পরিবার এসে আশ্রয় নিয়েছিল সেখানে। অতর্কিত পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও তাদের দোসররা সেখানে আক্রমণ করে বহু মানুষকে আটক করে। সেখানে পুরুষদের ধরে একজায়গায় জড়ো করা হয়। এরপর তারা নারীদের উপর নির্যাতন, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ করতে থাকে। শহর থেকে যাওয়া অজ্ঞাতনামা বহু মানুষকে গ্রাম সংলগ্ন ইছামতি নদীর পাড়ে দাঁড় করিয়ে হত্যা করে খোরস্রোতা নদীতে ভাসিয়ে দেয়া হয়।

এছাড়া লক্ষীপুর গ্রামের ২৮ জনকে কালী মন্দিরের সামনে এনে হত্যা করা হয়। লক্ষীপুর গ্রামে কয়েক ঘন্টাব্যাপী তাণ্ডব চালিয়ে হানাদার বাহিনী গ্রামের পশ্চিম দিকে কৈজুরী শ্রীপুর বাজারে এসে লক্ষীপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান প্রখ্যাত সঙ্গীত শিল্পী ডা. এম. এ. গফুরকে আটক করে। আওয়ামী লীগকে সহায়তা করার অভিযোগে তাঁকে নির্মমভাবে নির্যাতন করতে থাকে। জানা যায়, এই শিল্পীকে যখন নির্যাতন করা হচ্ছিল, তখন তাঁর সামনে থাকা রেডিও থেকে তাঁরই গাওয়া গান পরিবেশিত হচ্ছিল। শিল্পী একথা পাকসেনাদের বলার পরও তাদের মন গলাতে পারেনি। এরপর এই মরমী শিল্পীকে বেয়োনেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করে পাশের ইছামতি নদীতে লাশ ভাসিয়ে দেয়া হয়। সে সময় বাজার থেকে অজ্ঞাত আরো একজনকে ধরে একইভাবে হত্যা করা হয়। 

লক্ষীপুরে সেদিন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হাতে নিহত শহীদেরা হলেন ১. অধীর চন্দ্র দাস, পিতা: মোহন দাস। ২. অখিল চন্দ্র চন্দ, পিতা: খিতিশ চন্দ্র চন্দ, ৩. অবনী চন্দ্র দাস, পিতা: তারাপদ দাস, ৪. অশ্বিনী কুমার সর, পিতা :  অক্ষয় কুমার সর, ৫. অণীল চন্দ্র দাস, পিতা: মেঘলাল দাস, ৬. অমল কুমার হালদার, পিতা: চৈতন্য হালদার, ৭. আশুতোষ দত্ত, পিতা: রতিলাল দত্ত, ৮. কানাই লাল দাস, পিতা: কুশল দাস, ৯. কুশল চন্দ্র পাল, পিতা: মনোহর পাল, ১০. কমল চন্দ্র পাল, পিতা: মনোহর পাল, ১১. গৌর চন্দ্র ভদ্র, পিতা: চন্দন ভদ্র, ১২. গোপাল চন্দ্র দাস, পিতা: মোহন চন্দ্র দাস, ১৩. তারাপদ দাস, পিতা: কালীচরণ দাস, ১৪. তারাপদ হালদার, পিতা: মুকুন্দ হালদার, ১৫. ধীরেন্দ্র নাথ চর, পিতা: রাধাকান্ত চর, ১৬. নিজাম উদ্দিন শেখ, পিতা: কুশাই শেখ, ১৭. নিরঞ্জন পাল, পিতা: মনোহর পাল, ১৮. নরেশ চন্দ্র দাস, পিতা: গোড় চন্দ্র দাস, ১৯. ব্রজ গোপাল সর, পিতা: সদানন্দ সর, ২০. বিমল চন্দ্র দাস, পিতা: বিষু চন্দ্র দাস, ২১. ভাদু মোল্লা, পিতা: জব্বার মোল্লা, ২২. মোহন দাস, পিতা: মিরণ দাস, ২৩. সূর্যকান্ত দাস, পিতা: যুগল চন্দ্র দাস, ২৪. সদানন্দ সর, পিতা: রমানন্দ সর, ২৫. সনাতন দত্ত, পিতা: রসিক দত্ত, ২৬. সুরেন্দ্র নাথ দাস, পিতা: মেঘলাল দাস, ২৭. হারান লাল হালদার, পিতা: রসিক লাল হালদার, ২৮. রতিলাল দত্ত, পিতা: গরানাথ দত্ত। 

স্বাধীনতার এত বছর পর এই লেখাটি লিখতে বসে মনের কাছে বার বার প্রশ্ন জেগে উঠছে, দেশমাতৃকার জন্য জীবন দেয়া এই শহীদদের কথা কি কারো মনে আছে? আমার মনে হয় স্বজনদের কারো কাছে মনে পড়লেও ভুলে গেছি আমরা সরকার এবং রাষ্ট্র!! রাষ্ট্রের কাছে এদের তালিকা নেই। সরকার এদের স্মরণ করে না। এরা এখনও শহীদ হিসেবে স্বীকৃতি পায়নি। পাবে কি না সেটাও অনিশ্চিত। তবে হ্যাঁ এই শহীদদের একজন শহীদ এম. এ. গফুর স্মরণে ২০০০ সালে ডাকবিভাগ দুই টাকা মূল্যমানের ডাকটিকিট প্রকাশ করেছিল। স্মরণের ইতিহাস এতটুকুই। এরপর আর নাই ...!! এখন যা আছে তা শুধু জীবিতদের জন্য। মৃতদের আর শহীদদের কথা আমরা যেন ভুলে গেছি। 

পরিশেষে প্রত্যাশা অনতিবিলম্বে দেশের জন্য জীবন উৎসর্গকারী এই শহীদদের নাম সরকারিভাবে তালিকাভুক্ত করা হোক। গণহত্যা সংঘটিত স্থানে একটি স্মৃতিস্তম্ভ স্থাপন করে শহীদের নামের তালিকা সংযুক্ত করা হোক। প্রতি বছর ২০ আগস্ট "লক্ষীপুর গণহত্যা দিবস" পালন করা হোক। শহীদদের স্মৃতি অমর হোক। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হোক। 

তথ্যসুত্র: 
১. আব্দুল মালেক সরকার (শহীদ এম. এ. গফুরের পুত্র)
২. যাহিদ সুবহান, লেখক ও গবেষক

ও/ডব্লিউইউ

Published: Thu, 13 Aug 2020 | Updated: Thu, 13 Aug 2020

যুদ্ধকথা: মুক্তিযোদ্ধা মো. মজিবুল হক

আমি মো. মজিবুল হক সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া উপজেলার মোহনপুর ইউনিয়নের দহকুলা গ্রামে ১৯৫৪ সালের ২৯ ডিসেম্বর জন্ম গ্রহণ করি। আমার বাবা মনছুর আলী ছিলেন একজন শিক্ষক ও মা আজিরন নেছা ছিলেন গৃহিনী। আমরা দুই ভাই ও তিন বোন। ভাই-বোনের মধ্যে আমি দ্বিতীয়। আমি ১৯৭১ সালে লাহিড়ী মোহনপুর হাইস্কুলের নবম কি দশম শ্রেণীর ছাত্র ছিলাম ।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ই মার্চের ডাকে সাড়া দিয়ে লতিফ মির্জার সাথে মিছিল করি এবং আমাদের দহকুলা গ্রামে বাঁশের লাঠি দিয়ে প্রশিক্ষণ নেই। আমাদের ট্রেনিং করান আনসার বাহিনীর সদস্য ওয়াজেদ শাহ ও তছির আকন্দ এবং বেল্লাল দারোগা ও রোস্তম ফকির। সিরাজগঞ্জ থেকে আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ মোহনপুর আসতেন। তারা আমাদের পাখি মারা বন্ধুক গ্রামে গ্রামে থেকে সংরক্ষণ করতে বলেন এবং আমরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে তা সংরক্ষণ করি। যারা এ কাজ করি তাঁরা হলেন ইয়াছিন আলী, লতিফ মির্জা ও আমিসহ আরো কয়েকজন ছেলে। আমরা যে কয়টা পেলাম তা নিয়ে আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দর কাছে জমা দেই।

দহকুলা ব্রীজেই রাজাকার ক্যাম্প। তার পাশেই ব্রীজের দক্ষিণ-পূর্বে আমার বাড়ি। রাজাকার এবং পাক বাহিনী একদিন রাত ১১টা কিংবা ১২টার দিকে আমার বাড়িতে ও গ্রামে হামলা-গোলাগুলি করে। তাদের ভয়ে আমার বৃদ্ধ প্যারালাইসিস বাবা ও আমার ছোট ভাই মাজেদুল হককে (৫ থেকে ৬) বাড়ির পাশে দবির নামক এক লোকের সাথে কলাগাছের ভোলায় তুলে দিলাম। মাঠের মধ্যে আমন ধান। দবির ধান ক্ষেতের মধ্যে দিয়ে চন্ডিপুর ছোরহাব মাষ্টারের বাড়িতে নিয়ে গেল। বাবার ছাত্র ছোরহাব মাষ্টার, আবার বাবার সাথেই তিনি শিক্ষকতা করতেন।

আমি বিয়ে করে ছিলাম যুদ্ধের এক দেড় বছর আগে। পাকসেনা ও রাজাকাররা আমাদের বাড়িতে এসে গুলি করে মেরে ফেলবে এই ভয়ে জান বাঁচানোর জন্য আমি, আমার মা, তিন বোন ও পেটে ৬/৭ মাসের বাচ্চা নিয়ে আমার স্ত্রীসহ পাশের বাড়ির দুই বয়স্ক মহিলা আমরা সবাই পেটের নিচে কলস নিয়ে আনুমানিক এক মাইল সাঁতার কেটে ঐ ছোরহাব মাষ্টারের বাড়িতে গিয়ে উঠি। বাড়ির লোকজন আমাদের শুকনো কাপড়-চোপড় দেয়। আমরা ভেজা কাপড় ছেড়ে শুকনো কাপড় পরে নিই।

তার দুই একদিন পরেই আমাদের গ্রাম রাজাকার ও পাক সেনারা পুড়িয়ে দেয়। রাজাকাররা যে ব্রিজে ক্যাম্প করেছিল তার প্রায় সাথেই আমার বাড়িসহ ৬৩ বাড়ি পুড়িয়ে দেয়। চন্ডিপুর থেকে ভাটবেড়া বাবার মামার বাড়িতে আমরা সাবই আশ্রয় নেই। আষাঢ়-শ্রাবণ মাস। কোনো কোনো দিন পালিয়ে গ্রামে এসে দুই চারজনের সাথে সাক্ষাৎ করে যেতাম।

এরপর আমাদের গ্রামের আমার বয়সের ছেলেদের সাথে কথাবার্তা হল যে, আমরা ভারতে মুক্তিযুদ্ধের জন্য গেরিলা ট্রেনিং নিতে যাব। ট্রেনিং করে এসে দেশের ভেতর পাক সেনাদের সাথে যুদ্ধ করবো। এরপর এক হিন্দু ঘোষ তার সাথে কথা হল। তাকে কিছু টাকা দিলে সে নৌকায় করে ভারত নিয়ে যাবে। 

একদিন শনিবার কিংবা মঙ্গলবার রাজমান হাটের দিন তালগাছি কিংবা মশিপুর গ্রামের খেয়াঘাটে রয়েছি। ওখানে খেয়াঘাট পার হয়ে নদীর পূর্ব পাড়ে গিয়ে সব এক হব এই কথা ছিল। ঘোষের ভারত যাওয়া মিটানোর পর আমার শ্বশুর বাড়ি হাওড়া গ্রামে যাই। শ্বশুরের কাছে আমার চারশত টাকা ছিল। আমি তখন একখানা ডোঙ্গা নৌকা নিয়ে টাকা আনার জন্য চলে গেলাম সেখানে।

টাকা নিয়ে দহকুলা ব্রিজের উত্তর থেকে ব্রিজের নিচ দিয়ে নদীর দক্ষিণে বাড়ির দিকে আসতে ছিলাম আর ব্রিজের ক্যাম্পের থেকে রাজাকাররা আমাকে ডাক দিয়ে নৌকা পাড়ে নিতে বলে। তখন আমি নৌকা নিয়ে পাড়ে গেলাম। আমাকে ব্রিজের উপর সিগন্যালের সাথে নিয়ে দাঁড় করালো। তারপর আমাকে গুলি করার জন্য আমার পেটে রাইফেল লাগিয়ে গুলি করতে চাইলো। তার আগে আমাকে লাথি ও বন্ধুক দিয়ে পেটাতে লাগল। আর আমাকে নানানভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করলো। আমার আত্মা আছে কি নাই এই রকম অবস্থা হলো।

ক্যাম্পের রাজাকাররা উল্লাপাড়ার দিকে থাকে। আমার গ্রামের দুই একজনকে আমি ডাকতে থাকি। তাদেরকে ডাকতে ডাকতে প্রায় ২৫ মিনিট পর তারা আমার কাছে আসে। তার কথা শুনে বুঝি আমাকে রাজাকারের হাত থেকে আমাকে ছাড়িয়ে নিয়েছে সে। আল্লাহ্ -নবী রাসুলের কাছে খুব কান্নাকাটি করে ছিলাম। তাই আল্লাহর রহমতে আমি বেঁচে যাই। মনে মনে চিন্তা করলাম যে, আল্লাহর কৃপায় যদি মুক্তিফৌজ হয়ে আসতে পারি তাহলে এর প্রতিশোধ নিবো।

খেয়াঘাটে গিয়ে সবাই এক সাথে হবার কথা। আমরা সবাই রাজমান হাট দিয়ে তালগাছি মুশিপুর নদীর খেয়াঘাট পার হয়ে এক সাথে হই। ঘোষ আমাদের হাঁটাতে হাঁটাতে সিরাজগঞ্জের দক্ষিণে মাইঝাল গ্রাম নামে এক বাড়িতে নিয়ে গেল। ওখানে একদুইদিন থাকার পর ৬ কিংবা ৭ শ’ মণের একটা নৌকার মাচালের নিচে ডওরার ভিতর বসালো আমাদের। নৌকায় শরণার্থী অনেক ছিল। এই মাঝির গ্রামের বাড়িটা ছিল যমুনা নদীর পাড়ে, এক সাথে লাগানো। 

মাঝি আমাদের সঙ্গে নিয়ে নৌকা ছাড়লো। যমুনা নদীতে ভারত পথে যাত্রা শুরু করলাম। পাকসেনারা পিসবোর্ড ও গানবোর্ড নিয়ে মুক্তিযোদ্ধা ও শরণার্থী ধরার জন্য ধাওয়া করতে লাগে। আমরা যখন গানবোর্ড ও পিসবোর্ড দেখি তখন আমাদের নৌকার মাঝি আমাদের যমুনার চরে নামিয়ে দেয়। আবার গ্রাম থেকে চরে বাড়ি থাকলে সেখানে পালাবার জন্য নামিয়ে দেয়। এইভাবে কয়েকদিন কয়েকরাত যাওয়ার পর যমুনা নদীর পাড়ে গ্রামের মত কয়েকটি বাড়ির ঘাটে নৌকা দাঁড় করালো ।

নদী পার হতে বাহাদুরাবাদ ঘাট ও ফুলছড়ি ঘাট এক রাতের পথ। কিন্তু দুই ঘাটেই পাকসেনারা সার্চলাইট ধরে। আমরা যমুনার পাড়ে এক গ্রামের পাশে নৌকা লাগিয়েছি। ওখানে আমাদের গায়ে এসে লাইটের আলো লাগে। ভয়ে আমাদের আত্মা থরথর করে কাঁপতে থাকে। আমাদের মত মুক্তিযোদ্ধা ও শরণার্থী নৌকা অন্তত ২০টি ছিল। বড় নৌকায় আর যাওয়া যাবে না বলে আমরা ছোট ইলিশ মারা নৌকা ভাড়া করলাম। নৌকার মাঝিরা ইলিশ মারার ভান করে জাল-দড়ি নিয়ে বাহাদুরাবাদ ঘাট ও ফুলছড়ি ঘাটের মধ্যে দিয়ে ভারতে মানকাচর যাওয়ার উদ্দেশ্যে রওনা দেয়।

বাহাদুরাবাদ ঘাট ও ফুলছড়ি ঘাটে শেষ রাত্রে গিয়ে পৌঁছলাম। ঘাট ছিল খুব ভয়ঙ্কর। দুই ঘাটের দুই দিক থেকেই গুলি করা হয়। সবাই মাচাল, বইঠা, থাল, ছেওতি যাই পেলাম তাই দিয়ে ‘হেই ‘ মেরে দুই ঘাট পার হলাম। বেলা এক প্রহরের সময় মানকারচর পৌঁছলাম। এসে শুনতে পারলাম যে, পাকসেনারা গুলি শুরু করে দিয়েছিল। তাতে পিছের নৌকায় যে বাদামের হাল ধরে সে হালের পিছে বসেছিলো। তার পায়ের থোঁড়া পাশ দিয়ে একশ’টার মত গুলি গেছে।

যাই হোক আমাদের আবার ভারতের বর্ডার সংলগ্ন এলাকা রৌমারী থানায় নিয়ে আসে। সেখানে যেকয় দিন ছিলাম ডিফেন্সে যারা যুদ্ধ করেছে তাদেরকে যুদ্ধ করানোর জন্য আমাদেরকে দিয়ে সাহায্য-সহযোগিতা করিয়েছে। আমার গ্রামের যারা আমার সাথে গিয়েছিল তারা হল আজিজুল হক, ছামাদ, জলিল, দবির, হাই। আমাকে ও আবুল কাশেমকে রৌমারী থানায় রেখে আজিজুল হকের সাথে কয়েকজন কোথায় যেন চলে গেল তা জানিনি। তার কয়েক দিন পরে শুনতে পারলাম ভারতের হেড অফিস থেকে খবর আসছে। শুনতে পারলাম যে, দুইতিন শ’ ছেলেকে শিলিগুড়ির পানিঘাটায় হায়ার ট্রেনিংয়ের জন্য পাঠানো হবে। সেই সাথে আমি আর আবুল কাশেম অর্থাৎ আমাদের দুইজনকে ওই দুইতিন শ’ ছেলের সাথে পাঠিয়ে দেয়া হলো।

শিলিগুড়ির পানিঘাটায় বাসে চড়ে গেলাম। যেখানে নামলাম ওখানকার নাম জানি না। তবে নদীর তীরে ধুপগুড়ি টাউন। ওখানে হয়ত এক দিন এক রাত ছিলাম।

তারপর ট্রেনে যেতে লাগলাম। সেখান থেতেই আমার চোখে হঠাৎ যন্ত্রনা শুরু হলো। চোখে পানি দিলে একটু ভালো লাগে, পরে আবার খুব যন্ত্রনা শুরু হয়। এইভাবে তরঙ্গপুর পৌঁছলাম। ক্যাম্পে ডাক্তার ছিলো। ডাক্তারের কাছে গিয়ে লাইন ধরে দাঁড়ালাম। ডাক্তার চোখে মলম দিলেন। একদিন বা দুইদিন পর ভালো হয়ে গেল। তারপর আবার ট্রেনে কি বাসে খেয়াল নেই তবে মনে হয় বাসে গিয়ে শিলিগুড়ির পানিঘাট পৌঁছলাম। ওখানে ২১ কিংবা ৩১ দিন আমাদেরকে ট্রেনিংয়ে রাইফেল, এসএলআর স্টেনগান, এলএমজি দিয়ে যুদ্ধ করানো শিখালো। 

রাজাকারদেরকে ক্যাম্প থেকে কীভাবে ধরে তা শিখায়; ব্রীজ ভাঙা, বিল্ডিং ভাঙা, গাড়ি উড়িয়ে দেয়া এসবও শিখায়। ট্রেনিং শেষ করে চলে আসার সময় আমাদের তরঙ্গপুর পাঠানো হয়। তরঙ্গপুর শুনছি হেড অফিস। এই তরঙ্গপুর হতেই আমাদের গ্রুপকে এসএলআর, স্টেনগান, এলএমজি, মাইন, গ্যানেট, এসপ্লোজিপ, ডেটোনাটার ইত্যাদি আরো অস্ত্র দিয়ে দেয়। 

আমাদের গ্রুপে ছিলাম ১৭ জন। ৫৩০ নং গ্রুপের আমাকে দিল স্টেনগান ও আবুল কাশেম ভাইকে দিল রাইফেল। তরঙ্গপুর থেকে এসে মানকাচর পৌঁছলাম এবং রৌমারী থানা দিয়ে মানকাচর ঘাট হয়ে নৌকা করে যুদ্ধ করতে করতে বাংলাদেশের মধ্যে ঢুকলাম। আর বাহাদুরাবাদ ঘাট ও ফুলছড়ি ঘাটের মধ্যে দিয়ে এক দুইদিন পর আসলে আমাদের লক্ষ্য করে দুইটা বিমান এসে উপর থেকে দুইতিনটা গুলি ছুড়লো।

আমাদের একসাথে মুক্তিযোদ্ধা নৌকা ১৫/২০টা ছিলো। আমাদের নৌকা কিনারে লাগিয়ে আমরা খাওয়া-দাওয়া করছি, এমন সময় আমাদের কমান্ডার বললেন যে, তোমরা যমুনার পাড়ে ভিতর থেকে যে বালু আসছে ওর ভিতর গিয়ে পজিশন নিয়ে গুলি আরম্ভ করো। আমরা পজিশন নিয়ে গুলি করবো এমন সময় পাক সেনারা বিমান থেকে বুঝতে পেরে চলে যায়। পরে শুনলাম যে, আমাদের কোনো এক নৌকার পিছনে গুলি লেগে ভেঙে গেছে। 

তারপর আবার আমরা রওনা দিলাম। হয়ত দুই তিনদিন পর আমরা সিরাজগঞ্জের পাশে যমুনার তীরে নামলাম। ওখান থেকে রাজাকার-পাকসেনাদের সাথে দুই তিনদিন কোনো কোনো জায়গায় গোলাগুলি করেছি।

উল্লাপাড়ার মাছিয়া কান্দি গ্রামের এবি. এম. এ. হাই সিদ্দিকী ছিলেন আমাদের গ্রুপ কমান্ডার ও ডেপুটি কমান্ডার ছিলেন আব্দুস সামাদ। এলাকায় এসে সব অস্ত্র তাঁদের কাছে জমা রাখি। তাঁরা আমাদেরকে ভারতেই বলেছিলেন, তোমরা যাওয়ার পথে শত্রু পেলে তাদের সাথে যুদ্ধ করবে। আর তোমাদের এলাকায় গিয়ে তোমাদের বাবা-মার সাথে দেখা করে আসবে। আমাদের দুই জনের বাড়ি প্রায় পাশাপাশি। এসে দেখি আল্লাহ তা’লা একটি মেয়ে সন্তান দিয়েছে। আমার বাবা নাম রেখেছে মর্জিনা খাতুন। দেখা-সাক্ষাৎ করে আমাদের কমান্ডার যেখানে যেতে বলেছিলেন, আমরা আবার সেখানে গিয়ে পৌঁছলাম।

ধলুল বিলের ভেতর রাজাকার ধরতে গিয়ে যুদ্ধ হয়। ওখানে আমরা বেশ কয়েকজন রাজাকারকে ধরে ছিলাম এবং শান্তি কমিটির লোকদেরও ধরেছিলাম। এরপর সিএনবি রোডে রাজাকার ও পাক সেনাদের সাথে দুই তিন জায়গায় যুদ্ধ করেছি। সিএনবি রোডে এসপ্লোজিপ ও মাইন সেট করে আমরা ব্রিজ ভাঙার জন্য ও পাকসেনাদের গাড়ি হামলা করার জন্য গেলে পাটধারী ও রাঙ্গাপুরী ব্রিজের পারের লোকজন আমাদের এসপ্লোজিপ ফিউচ ডেটোনাটার, মাইন, এন্ট্রি ট্যাংক মাইন প্রভৃতি আমাদের সেট করতে দেয়নি। ওখানকার লোকজন সবাই বললো আপনারা চলে যাওয়ার পরই রাজাকার-পাকসেনারা এসে আমাদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দিবে। ওরা আমাদের মেরে ফেলবে। সিএনবি রোডের সবাই একি কথা বলল। এই জন্য আমরা ওই মিশন সফল করতে পারিনি। 

দবির উদ্দিন সাহেব আমাদের আশেপাশে থাকতেন। তাঁর পরামর্শেও বহু কাজ করেছি। সিরাজগঞ্জ এলাকায় বেশ কয়েক জায়গায় আমরা যুদ্ধ করেছি তাঁর পরামর্শে। সেভেন সেক্টরের আন্ডারে আমরা কাজ করেছি। হঠাৎ ভারত থেকে একদিন ১৫-২০টি বিমান এসে পাকবাহিনীদের ক্যাম্পে ক্যাম্পে বোম্বিং শুরু করলো। আমরা পাকসেনাদের ধরা শুরু করলাম। মারপিটও করলাম তাদের।তাদের নিজেদের যে অস্ত্র-বোমা ছিলো ঐসব আমাদের হাতে পড়বে বলে ওরা নিজেরাই কতক পুড়িয়ে ছিল। 

অবশেষে লতিফ মির্জা চিঠির মাধ্যমে আমাদের জানালো যে, তোমরা এসো, আরো সব গ্রুপ আসছে। আমরা সবাই মিলে উল্লাপাড়ার পাকসেনাদের হামলা করবো। তখন আমরা সবাই এসে পাকসেনা ক্যাম্পে হামলা করলাম। গোলাগুলি শুরু করি। আর আমরা তাদের ধরা আরম্ভ করি। বেতের ঝোপঝাড়ের খোপে দুই পাকসেনা পালিয়েছিলো। তাদের ধরে নিয়া আসি। থানায় যারা কমান্ডার ছিলো তাঁদের কাছে জমা দিই। তাঁরা সিরাজগঞ্জ এ চালান করে দিলেন। আরো শান্তি কমিটির যারা ছিল তাদেরকেও ধরিয়ে দেই।

এইভাবে হামলা চালাতে চালাতে ১৩ ডিসেম্বর উল্লাপাড়া থানা মুক্ত করলাম। যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরে অর্ডার হলো, অস্ত্র জমা দিতে হবে। পরে আমার স্টেনগান ও ১০ রাইন্ড গুলিসহ জমা দিয়ে দেই।

যুদ্ধ শেষে বাড়ি ফিরে ব্যবসা ও কৃষি পেশায় যুক্ত হই। স্ত্রী নুরজাহান (নাছিমা)র গর্ভে আমাদের সাত সন্তানদের জন্ম হয়। তারা হলো পুত্র নুরুল ইসলাম এবং কন্যা মরজিনা খাতুন, মারুফা খাতুন, মিনা খাতুন, নাসিমা খাতুন, আফরজা খাতুন ও মারুফা পারভীন। বর্তমানে আমরা আমার জন্মস্থান দহকুলা গ্রামেই বসবাস করছি।

অনুলিখন: ইমরান হোসাইন

ও/ডব্লিউইউ

Published: Mon, 10 Aug 2020 | Updated: Mon, 10 Aug 2020

আমার দেখা বরইতলার যুদ্ধ : ফজলুল হক মনোয়ার

রোজার শেষদিক, ঈদের মাত্র ২/৩ দিন বাকি আছে। কিন্তু  ঈদের আমেজ নেই যুদ্ধের কারণে। মানুষ সবসময় আতঙ্কিত থাকে। বাড়িটি বেশ ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। কারণ গতরাতেও বাড়িতে প্রায় ৪০/৫০ জন লোক ছিল। 

আমাদের বাড়িতে মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প ছিল। গতরাতে খাবার খেয়ে সবাই উত্তর পাড়া চলে যায়। তারা চলে যাবার পরই মা  সিগারেটের গোড়াগুলো মাটিতে পুঁতে রাখে। পাকসেনারা এসে এত সিগারেটের অংশ  দেখলে সন্দেহ করতে পারে, তাই এ কাজ করেন তিনি।  

পরদিন সকালে প্রায় ৯/১০টার দিকে ১২৫/১২৬ জন মুক্তিযোদ্ধা গেঞ্জি গায়ে রাইফেল কাঁধে করে আমাদের বাড়ির পাশের রাস্তা দিয়ে লাইন ধরে নয়াপাড়া পার হয়ে বরইতলার দিকে যাচ্ছে। যতদূর  চোখ গেল চেয়ে দেখলাম। মার কাছে শুনলাম রাতে প্রায় ১৫০/১৬০ জন মুক্তিযোদ্ধা আমাদের বাড়িতে মিটিং করে সবাই উত্তর পাড়া চলে যায়। তারাই এখন বরইতলারদিকে যাচ্ছে। 

আগের দিন মুক্তিযোদ্ধারা চলে যাওয়ার কারণে বাড়িটি ফাঁকা হয়ে গেছে। শেষ রাতে (১২ নভেম্বর দিবাগত রাতে) সেহরি খেতে বসেছি, হঠাৎ করে শব্দ হলো। মা বললো, দেখতো নৌকাটা মনে হয় কেউ নিয়ে যাচ্ছে। আমি খাওয়া দাওয়া বাদ দিয়ে নৌকাটা কেউ নিয়ে গেল কি না দেখার জন্য ঘরের বাইরে গেলাম। আসার সাথে সাথে আমার বড়ভাই (চাচাতো ভাই)র সালা মন্তাজ ভাই চিৎকার দিয়ে এসে বললো, বরইতলায় মেলিটারি এসেছে। সারা গ্রামে আগুন, সবাই বাড়ির পশ্চিম পাশে গিয়ে দেখি আগুন আর আগুন। মাঝে মাঝে ঝাঁকে ঝাঁকে গুলি ছুড়ছে তারা। 

বাড়ির মহিলাদের বাড়ির পূর্বদিকে পাঠিয়ে দিয়ে বাড়িতে চলে আসলাম। আর মনে করছিলাম, হয়তো মুক্তিযোদ্ধারা বিপদে পড়েছে,  ঘটনাও তাই। চেয়ারম্যান  ইমান আলীর লোকেরা নাকি পাক সেনাদের মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থানের কথা জানায়িছে। 

যুদ্ধ চলেছে। আমরা আমাদের আম বাগানের ভিতর দাঁড়িয়ে দেখছি। গুলি মাঝে মাঝে বাগানের সামনে জমির ভিতরে পানিতে পড়ছে।  আমাদের করার মত তখন কিছুই ছিল না। দুপুর ১টার দিকে খবর এলো আমাদের পাড়ার দিকে পাকসেনারা আসছে (পূর্বদিক থেকে)। আমরা তখন দক্ষিণ দিকের সড়ক পার হয়ে আড়ালে গিয়ে দাঁড়ালাম। পাকসেনারা তখন আমাদের বাঁশবাগান পার হয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের পিছন থেকে আক্রমণ করার উদ্দেশ্যে এই  ব্যবস্থা নিয়েছে। তারা সংখ্যায় ছিল ২৬ জন।  আমাদের গ্রামের সন্তেশ চাচাকে ওরা ধরে নিয়ে আসে পথ দেখানোর জন্য। আমরা সংবাদ দেয়ার আগেই তাদের আসার সংবাদ মুক্তিযোদ্ধারা জেনে যায়। তাই তাদের কোনো ক্ষতি ওরা করতে পারে না। 

ওরা চলে যাবার পর আমরা নয়াপাড়ার দিকে এগোতে থাকি। হঠাৎ আমাদের কাছে আখক্ষেতের মধ্য থেকে গুলির আওয়াজ এলো। এর পর শোনা গেলো না। আমরা সেদিকে এগিয়ে গেলাম। দেখলাম, আমাদের স্কুলের দশম শ্রেণীর জয়নাল ভাই (যিনি একজন জাদুকরও ছিলেন) খুব দুর্বল অবস্থায় রাইফেল হাতে একবার উঠছেন আবার বসছেন, আমরা এগিয়ে গেলাম। দেখলাম তাঁর সারা শরীর পানিতে ভেজা, পানির ভিতর থেকে যুদ্ধ করতে করতে দলছুট হয়েছেন। তাতে তাঁর রাইফেলে কাদা ঢুকেছে। আমরা ওনাকে সাধ্যমত সেবা দিলাম। উনি চলে গেলেন। যুদ্ধ চলতে থাকলো। 

সন্ধার আগে বরইতলা হতে পাকসেনারা খামারপাড়া আগুন দিয়ে পূর্বদিকের থানার দিকে চলে গেলে যুদ্ধ থেমে যায়। এই যুদ্ধে আমার দুই সহপাঠী কুদ্দুস ও চানমিয়াসহ ১০৪  জন শহীদ হন। শহীদ হন রবিলাল দাস, সুজাবত আলী, আব্দুস সামাদ নামের তিন জন মুক্তিযোদ্ধা আর ৬ জন পাক আর্মিসহ এক রাজাকার নিহত হয়। পরে জানা যায়, অনেক পাক আর্মি নিহত হয়েছে। তাদের লাশ পাটের গাড়িতে সিরাজগঞ্জ পাঠানো হয়েছে। 

উল্লেখ্য, আমার বন্ধু কুদ্দুস ও তাঁর পিতা শামসুল হক এক সাথে শহীদ হন এবং কুদ্দুসের চাচা আফছার কানের পাশে গুলি লেগে আহত হন। গুলির স্মৃতিচিহ্ন আজও বয়ে বেড়াচ্ছেন তিনি। ওইদিন ‘ইতেকাফে’ বসা মুসুল্লিরাও তাদের হাত হতে বাঁচতে পারেনি। সেদিন আমাদের পাশের বাড়ির ওমেদ আলীর স্ত্রী আখক্ষেতে একটি মেয়ে সন্তান জন্ম দেন। সকলে তার নাম দেয় মুক্তি, আজো সে মুক্তি নামেই পরিচিত।

ও/ডব্লিউইউ

Published: Wed, 29 Jul 2020 | Updated: Wed, 29 Jul 2020

যুদ্ধকথা: মুক্তিযোদ্ধা মো. আজিজুল হক 

আমি মো. আজিজুল হক সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া উপজেলার মোহনপুর ইউনিয়নের দহকুলা গ্রামে জন্ম গ্রহণ করি ১৯৫৩ সালের ১০ অক্টোবর। আমার বাবা আজগর আলী ছিলেন একজন কৃষক এবং মা জমিলা খাতুন ছিলেন গৃহিনী। আমরা দুই ভাই-বোনের মধ্যে আমি বড়। আমি ১৯৬৯ সালে মোহনপুর হাই স্কুল থেকে এসএসসি পাশ করে শাহজাদপুর কলেজে ইন্টারমিডিয়েটে ভর্তি হই। আমি ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষার্থী ছিলাম ১৯৭১ সালে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ৭ই মার্চে ভাষণ দেন ‘তোমাদের যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলায় জন্য প্রস্তুত থাকো’। 

এই বক্তব্যের মাধ্যমে আমি উদ্বুদ্ধ হই এবং তাঁর ডাকে সাড়া দেই পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য। আমরা আমাদের দহকুলা গ্রামে একটা দল গঠন করি যুদ্ধে যেতে। সে দলে আমি ছাড়াও যারা ছিলেন তারা হলেন তায়জাল হোসেন, ছরাফ আলী, আব্দুল রশিদ, শামসুল হক, আবুল কাশেম, মুজিবুল হক, মাজেদ আলী। আমরা যুদ্ধের জন্য তৈরি হতে থাকি এবং নিজ গ্রামে প্রাথমিকভাবে ট্রেনিং নেই। আমাদের সে সময় প্রাথমিক ট্রেনিং দেন বেলাল দারোগা। সে ট্রেনিং শেষ করে আমরা ভারতে ট্রেনিং নিতে চলে যাই। 

সিরাজগঞ্জের রান্ধনীবাড়ী থেকে আমরা ভারতে যাবার জন্য নৌকায় উঠি। ১০০ টাকা ভাড়া দিয়ে আমরা মানকাচর পৌঁছাই। আমাদের ভারত যেতে সময় লাগে দুই দিন। রৌমারীতে মুক্তিযোদ্ধার রিক্রুট ক্যাম্প ছিল। রৌমারী ছিল মুক্ত এলাকা। আমরা চলে যাই সেখানে। রৌমারী থানার কমান্ডার ছিল সিরাজগঞ্জ কলেজের ভিপি ইসমাইল হোসেন। সেখানেই আমরা অবস্থান করি। রৌমারীতে অবস্থান করার পরে উচ্চতর ট্রেনিংয়ের জন্য আমরা ১৬০ জনের দল তুরা শহর থেকে বিমানযোগে দিল্লীতে চলে যেতে চাই। কিন্তু ভাগ্যক্রমে ওখানে ট্রাক এক্সিডেন্ট হয়। পরে আমাদের আর যাওয়া হয় না। 

সেখানে স্থানীয় ভারত আর্মি ক্যাম্পে একদিন অবস্থান করি। সেখান থেকে আমাদের পাঠিয়ে দেয়া হয় মেঘলায় রিক্রুট ক্যাম্পে যেখানে কিছুদিন অবস্থান করে ট্রেনিং করতে থাকি। তারপর আমরা কার্তিক পাড়া অবস্থান করি। সেখান থেকে আমরা দেশের মধ্যে চলে আসি। তিন মাস বিভিন্ন জায়গায় ট্রেনিং নেই আমরা। আমাদের শবে বরাত, রমজান, ঈদ সব ভারতেই কাটে। ঈদের পরে আমরা দেশের ভিতরে ঢুকি। 

আমাদের প্রথমে ময়মনসিংহ যেতে বলা হয়, কিন্তু অপরিচিত জায়গার জন্য আমরা সেখানে যেতে চাই না। অবশ্য আমাদের একটা দল ময়মনসিংহ যুদ্ধ করে। পরে আবার আমাদের সাথে যোগ দেয়। আমরা যখন দেশের ভিতরের রাস্তায় ডুকে পড়েছি, সে সময় লতিফ মির্জার নৌকার সাথে আমাদের দেখা হয়। তিনি নৌকার বহর নিয়ে ভারত যাচ্ছিলেন আর আমরা দেশের মধ্যে চলে আসছিলাম। তারপর আমরা নিজ গ্রামে চলে এসে ক্যাম্প স্থাপন করি রাজমানে। সে ক্যাম্পের কমান্ডার ছিলেন আব্দুল ছামাদ। আর আমাদের ক্যাম্পে অন্যান্যরা যারা ছিলেন তারা হলেন তায়জাল হোসেন, ছরাফ আলী, আব্দুল রশিদ, শামসুল হক, আবুর কাশেম, মুজিবুল হক, মাজেদ আলী। আমরা ছোট ছোট অপারেশন করতে থাকি। 

উল্লাপাড়ার শ্রীফলগাঁতীতে রাজাকারের কমান্ডার ছিলেন মোসলেম উদ্দিন। তার পরিবারে ভাই, ভাতিজা, ছেলে ও ভাগ্নেসহ ২২ জন রাজাকার ছিলেন। আমরা মোসলেম উদ্দিনের বাড়ি ঘেরাউ করি এবং তাকে আমরা ধরে নিয়ে আসি। সে সময় আমরা তার বাড়ি থেকে কিছু মালামালও নিয়ে আসি আমাদের ক্যাম্পের জন্য। যাতে খাওয়া-দাওয়াতে আমাদের কোনো সম্যসা না হয়। পরে তাকে মেরে ফেলা হয়। 

এরপরে আমরা আমাদের পার্শ্ববর্তী থানার একটি গ্রামে আরেক রাজাকারের তথ্য পাই। সাধারণ মানুষদের নানাভাবে অত্যাচার করতো তারা। যেদিন রাতে সেই রাজাকারের বাড়ির কাছাকাছি অবস্থান করি, সেদিন সাধারণ মানুষই আমাদের তার সন্ধান দেয়। কমান্ডারসহ আমি, তায়জাল মাষ্টার, শামসুল কয়েকজন মিলে রাজাকারটির বাড়ি ঘেরাউ করে আমরা তাকে হত্যা করি।

এদিকে উল্লাপাড়া থেকে মোহনপুর বাজারে কয়েকজন মিলিটারি প্রতিদিন রেললাইন দিয়ে হেঁটে আসতো। আমরা তাদেরকে প্রতিহত করার জন্য শ্যামপুর ব্রিজে বাধা সৃষ্টি করি। ছোট একটা যুদ্ধ হয় সেখানে। তখন একজন মিলিটারিকে আমরা মারতে সক্ষম হই এবং তার চাইনিজ অস্ত্রটা আমরা নিয়ে আসি। অন্য মিলিটারিরা পালিয়ে চলে যায়।

রাজাকারদের দমন করার জন্য দহকুলা ব্রিজ অপারেশন করি আমরা। লতিফ মির্জার দলের সাথে পরিকল্পনা করে আমরা যুদ্ধ করি। আমরা থাকি দহকুলার হাটে আর মির্জার দল থাকে উত্তর দিকে। আমরা হাটের দিকের আগেই পজিশন করে থাকি। রাজাকাররা হাটের দিকে আমাদের দিকে আক্রমণ করে গুলি করে, কিন্তু আমরা গুলি করি না। আমরা চুপচাপ থাকি রাজাকাররা আমাদের দিকে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসতে থাকে। আর আমাদের দিকে আসলেই আমরা রাজাকারদের ধরে ফেলি। ঘটনাস্থলে কয়েকজন রাজাকার মারাও যায়। আমরা তাদের অস্ত্র নিয়ে নেই। এভাবে চলতে থাকে আমাদের যুদ্ধ। আমি থ্রিনটথ্রি, মিলিটারিদের চাইনিজ রাইফেল, মার্ক-৪ দ্বারা যুদ্ধ করতাম।

যুদ্ধ শেষ হয়। স্বাধীন দেশে তার কয়েক দিন পরেই আমরা সিরাজগঞ্জ কলেজ মাঠে প্রবাসী সরকারের অর্থমন্ত্রী ক্যাপ্টেন এম. মনসুর আলীর কাছে আমরা মুক্তিযোদ্ধারা আনুষ্ঠানিকভাবে অস্ত্র সমর্পণ করি।

(যুদ্ধ শেষে আজিজুল হক ফিরে যান কলেজে। ১৯৭২ সালে ইন্টারমিডিয়েট পাস করে পাবনার ভাংগুড়া কলেজে ডিগ্রিতে ভর্তি হন তিনি। কিন্তু ডিগ্রিটা শেষ করা হয় না তাঁর। তারআগেই শিক্ষকতায় পেশায় যোগ দেন মোহনপুর হাইস্কুলে। ১৯৭৪ সালে মমতাজ বেগমকে বিয়ে করেন। তাঁদের ঘরে জন্ম নেয় এক ছেলে আব্দুল মালেক ও চার মেয়ে ফাতেমা, হালিমা, খাদিজা পারভীন, আরজিনা পারভীন। শিক্ষকতা থেকে তিনি ২০১৩ সালে অবসর নেন। বর্তমানে তিনি তার জন্মস্থান দহগ্রামেই রয়েছেন। 

অনুলিখন: ইমরান হোসাইন

ও/ডব্লিউইউ

Published: Wed, 29 Jul 2020 | Updated: Wed, 29 Jul 2020

যুদ্ধকথা: মুক্তিযোদ্ধা মো. ময়দান আলী

আমি মো. ময়দান আলী। আমি সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া উপজেলার মোহনপুর ইউনিয়নের চরমোহনপুর গ্রামে জন্ম গ্রহণ করি ১৯৫৫ সালের ১৮ এপ্রিল। আমার বাবা জয়নাল আবেদীন একজন কৃষক ছিলেন। মা সার্মত বানু ছিলেন গৃহিনী। দুই ভাই-দুই বোনের মধ্যে আমি বড়। আমি মোহনপুর হাইস্কুলে দশম শ্রেণীর ছাত্র ছিলাম ১৯৭১ সালে। পড়াশোনার সময়ই আমি যুদ্ধে যোগ দেই।

আমাদের দেশের মধ্যে পাকিস্তানি মিলিটারি বিভিন্নভাবে প্রবেশ করতে থাকে। আমাদের মোহনপুরও মিলিটারি আসতো। কারণ হলো আমাদের মোহনপুরে ট্রেনের যোগাযোগটা ভালো ছিল। পাক আর্মি মোহনপুর ইস্টিশনে নেমে মোহনপুরের আশেপাশের মানুষদের বিভিন্নভাবে অত্যাচার ও নির্যাতন করতো। হিন্দুদের ওপর বিশেষ করে বেশি অত্যাচার চালাতো। মুসলিমদেরও বাদ দিত না যারা জয় বাংলা বলতো। বাড়ি-ঘরও পুড়িয়ে দিত।

গ্রাম থেকে নারীদের ধরে নিয়ে এসে বিভিন্নভাবে নির্যাতন চালাতো। একদিন যে নারীকে নির্যাতন করতো, অন্যদিন তাকে করতো না, নতুন এক নারীকে আবার নির্যাতন করতো। এভাবে মিলিটারিরা নির্যাতন করতেই থাকে মা বোনদের উপরে। মা-বোনদের ওপর নির্যাতন ও সাধারণ মানুষদের উপরেও নির্মম অত্যাচার দেখে আমরা বিভিন্ন গ্রাম থেকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিতে থাকি যে, আমাদের যুদ্ধ করা ছাড়া কোন উপায় নাই। এদিকে ৭ই মার্চে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ভাষণ দেন, ‘তোমাদের যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলায় জন্য প্রস্তুত থাকো।

এই বক্তব্যের মাধ্যমে আমরা আরো উদ্বুদ্ধ হই। আমরা যুদ্ধতে যোগ দিতে চলে যাই সিরাজঞ্জের ব্রক্ষগাছাতে। সেখানে গিয়ে পলাশডাঙ্গা যুব শিবিরে যোগ দেই। যুদ্ধতে যারা যোগ দেই তারা সবাই প্রায়ই ছাত্র ছিলাম। ছাত্ররাতো অস্ত্র চালাতে জানতো না। কিন্তু এই দিকে মিলিটারিরা পাবনা দখল করে সিরাজঞ্জের দিকে গাড়ি নিয়ে আক্রমণ করতে আসতে থাকে। এতে সিরাজগঞ্জ মহকুমার জেলা প্রশাসক এই অবস্থা দেখে অস্ত্রগার খুলে দেয় এবং সিরাজগঞ্জের কলেজের ছাত্রদের যুদ্ধে যোগ দেয়ার জন্য আহ্বান জানান। 

অস্ত্রগার থেকে মহিষের গাড়ির মাধ্যমে অস্ত্রগুলো সোজা নিয়ে আসা হয় কালিয়াহরিপুরের একটি বাগানে। আমাদের অস্ত্র সরবরাহ হয়ে যায়। একটি গ্রুপের মাধ্যমে দরকার এখন ট্রেনিং। তারপর পলাশডাঙ্গা যুব শিবির নামে একটি গ্রুপ করার হয়। এই গ্রুপের পরিচালক ছিলেন আব্দুল লতিফ মির্জা আর কমান্ডার ছিলেন আব্দুল সালাম। আমরা ধীরে ধীরে ট্রেনিং নিতে থাকি। ট্রেনিং শেষ করে একটা সময় আমরা পাকা শিকারি হয়ে যাই। 

প্রশিক্ষণ শেষ করে আমরা চলনবিল এলাকায় অবস্থান করি। সেই সময় আমাদের ১১টা নৌকা ছিল। আমরা ধীরে ধীরে ছোট ছোট অপারেশন চালাতে থাকি আর আমরা অস্ত্র সংগ্রহ করতে থাকি। আমাদের এইভাবে গ্রুপটা বড় হতে থাকে। আমরা প্লাটিনা থেকে কোম্পানি, কোম্পানি থেকে ব্যাটালিয়ান কোম্পানি হয়ে যাই। সিরাজগঞ্জ, পাবনা, নাটোরে আব্দুল লতিফ মির্জার পরিচালনায় পলাশডাঙ্গা যুব শিবির বিশাল একটি গ্রুপ হয়ে যায়। আমরা প্রতাপ থেকে চলনবিলের মাঝে যাবো, এতে আমরা নৌকায় রওনা হই সেখানে যাবার জন্য। আমাদের একটাই পথ ছিল নওগাঁ দিয়ে যাওয়ার, তা ছাড়া আর কোনো পথ ছিল না। কারণ হল আমাদের চারদিক দিয়ে ঘিরে ফিলছে মিলিটারিরা। 

চলনবিলে যেতেই নৌকা ভিড়াই আমরা নওগাঁর হাটখোলায়। সেদিন ছিল ১০ নভেম্বর। আমরা জানতাম না যে, নওগাঁতে মিলিটারি আছে। আমাদের বড় একটি যুদ্ধ হয় মাজার নওগাঁতে। আমাদের গ্রুপে একটা ইমাম ছিল আমাদের কেউ মারা গেলে তাঁকে জানাজা করানোর জন্য। ইমাম সাহেব ফজরের নামাজ পড়ার জন্য নওগাঁ মাজার মসজিদে যান আজানের বেশ কিছু সময় আগেই। মাজারের ভেতরে প্রবেশ করতেই মিলিটারিরা হলফ করে। 

মিলিটারিরা বলে, ‘বল তুই কে হে?’ ইমাম বলেন, ‘আমি ইমাম হে।’ ইমামের উপস্থিত বুদ্ধিও ছিল বটে। ইমাম বলেন, ‘এই মসজিদে আমি আজান দেই। আমি আজান দিবো, তাই চলে আইছি আজানের আগেই। আরো আগে আসি আমি মসজিদে।’ ‘ঠিক হে, ঠিক হে, ইমাম সাহেব।’ ইমাম চলে যান মসজিদে। ইমাম সাহেব চিন্তা করেন যে, ‘আল্লাহ, এখান থেকে বের হই কি করে। না বেরিয়ে তো উপায় নেই। না বের হলে আমাদের লোকজন জানবে না তো মিলিটারি আমাদের চারদিকে ঘিরে ফেলছে। সকালবেলা গিয়ে ফায়ার করে আমাদের শেষ করে ফেলবে।’

তখন ইমাম চিন্তা করে বুদ্ধি বের করেন, বদনা নিয়ে বের হয়ে বাইরে চলে আসতে থাকে। সেই সময় মিলিটারিরা বলেন, হে ইমাম, তুই একবার যাতে গা, আবার আসতে হে, তোর মতলফ কী হে?’ তিনি বলেন, ‘না,  হুজুর পায়খানা-প্রস্রাব করবো। মাজার শরীফে পায়খানা-প্রস্রাব করতে নেই্। তাই বাইরে গিয়ে পায়খানাপ্রস্রাব করবো।’ তারপরে মিলিটারিরা বলে, ‘ঠিক হে, তারাতারি যা।’ ওখান থেকে বের হয়েই দৌড় দিয়ে এসে চিৎকার দিয়ে উঠে ইমাম। তখনও আজান দেয়নি, হয়তো তিন চার মিনিট বাকি আছে। সেই সময় আমরা সবাই জানতে পারলাম যে, চতুর্দিক থেকেই আমাদের ঘিরে ফেলছে মিলিটারি। এখন আমাদের যুদ্ধ ছাড়া কোন উপায় নাই। তাই যুদ্ধ আমাদের এখানেই করতে হবে। জানার সাথে সাথে আমরা গ্রামের মানুষদের কাছ থেকে কোদাল নিয়ে বাংকার করে ফেলি। ১১ নভেম্বর ফজরের আজানের পরে যুদ্ধ শুরু হয় । 

মিলিটারিরাই  প্রথম ফায়ার করে। তারপর আমরা গুলি করতে থাকি। কিন্তু আমরা মাঝে মাঝে ফায়ার করতে থাকি। কারণ আমাদের গুলির সংখ্যা কম ছিল, যা ছিল তাই নিয়ে আমাদের যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হবে। তা আমাদের আগেই বলা হয়েছে। সকাল ১০টার পরে আমরা তুমুল আকারে ফায়ার করবো। যাতে করে এর মধ্যে পাকিস্তানি মিলিটারিদের গুলির সংখ্যা কমে যায়। মিলিটারিদের গুলি কমে যাওয়ার পরে আমাদের শুরু হবে ফায়ার। 

মাঝে মাঝে গ্রেনেড চার্চ করি যাতে করে মিলিটারিরা এগিয়ে আসতে না পারে। সকাল ১০টা বাজার সাথে সাথে অর্ডার এসে যায়। ব্যাটলিয়ান কমান্ডার অরুন বাবু বাঁশি দেয়ার সাথে সাথে আমাদের এসেলার গ্রুপের সাইট থেকে ফায়ার শুরু হয়ে যায়, সবাই তুমুল আকারে যুদ্ধ করতে থাকি। দুপুর পর্যন্ত যুদ্ধ হয়। ১২টা কি ১টার সময় আমরা জয় বাংলা ধ্বনি দিয়ে উঠি। আর  চারদিক থেকে আমরা মিলিটারিদেরকে ধরতে থাকি আর মারতে থাকি। এদিকে গ্রামের লোকজনও এগিয়ে আসে জয় বাংলা বলার পরেই। মিলিটারি পালাতে থাকলে গ্রামের লোকজনও দৌড়ায়ে গিয়ে ধরতে থাকে আর মারতে থাকে। গ্রামের লোকজন প্রায় ৭-৮ জন মিলিটারিকে মেরে ফেলে। এই যুদ্ধে অনেক মিলিটারি মারা যায়। আমাদের কেউ মারা যায় না আল্লাহ রহমতে। কিন্তু হাতে-পায়ে গুলিবদ্ধ  হয়ে আহত হন অনেকেই। আমরা দু’জন মিলিটারি অফিসারকে জীবিত ধরি। কিন্তু তাদেরকে ধরে আমরা আরেক ঝামেলায় পড়ি।

আমাদের জেলহাজত নাই, ওদের রাখবো কোথায়। পরে নৌকার ডয়রায় রাখি। কিন্তু ওদের নিয়ে খুব ভয় লাগে। ওরা অফিসার মানুষ সব কিছু জানে। বিশাল বিশাল লম্বা মানুষ, তাদের নিয়ে কি আর শুয়ে থাকা যায়। পরে উপর মহলে জানানো হলো। আমরা জীবত দু’জন মিলিটারি অফিসারকেকে ধরেছি। এদের কী করবো, পরে আমাদের কাছেই রাখতে বলা হয়। কিন্তু কেউই রাখতে চায় না। সবাই বলে রাখার উপায় নেই।  

এই রকম চলতে থাকে। পরে উপর মহলকে বললাম, এদেরকে রেখে আমরা কী করবো। আমাদের অর্ডার দেন না কেন, মেরে ফেলি। পরে আমাদের অর্ডার দেওয়া হয় মারার জন্য। আমরা শীতলাই রাজবাড়ী নিয়ে গিয়ে কানের কাছে রাইফেল ঠ্যাকায়ে গুলি করে মেরে ফেলি। 

নওগাঁতে যুদ্ধের সময় পাকিস্তানি মিলিটারি ওয়ার্লেসের মাধ্যমে উপর মহল পাক আর্মিদের সাথে যোগাযোগ করে ছিল। তারা বলেন, আমাদের মুক্তিবাহিনী ঘিরে ফেলছে নওগাঁতে তারাতারি সৈন্য দরকার। কিছু সৈন্য ঠিক বিমানের মাধ্যমে তারাতারি চলে আসে। তা মাজার নওগাঁতে না এসে জেলা নওগাঁতে চলে যায়। ওদের ভুলের জন্য আমাদের যুদ্ধটা সহজ হয়েছিল। এদিকে নওগাঁর যুদ্ধের সময় আমাদের পলাশডাঙ্গা যুব শিবির গ্রুপের গোলাবারুদ শেষ হয়ে যায়। আমাদের চারদিকে মিলিটারিরা ঘিরেও ফেলছে। কী করা যায়! পরে অনেক চিন্তা-ভাবনা করে লতিফ মির্জা আমাদের কিছুদিন আড়াল হয়ে থাকতে বলেন। 

তিনি আরো বলেন, গোলাবারুদ সংগ্রহ করতে পারলে আমরা সবাই আবার দলবদ্ধ হবো। তারপর আমরা কিছু দিনের জন্য ছত্রভঙ্গ হয়ে যাই। লতিফ মির্জার সাথে অনেকে ভারতে চলে যায়। আর কিছু থেকে যায়। এরপরে আমরা কয়েকজন মিলে আরেকটি গ্রুপ করে ফেলি। আমাদের গ্রুপের কমান্ডার ছিলেন আব্দুল হামিদ (বড়)। আমরা উধুনিয়া গিয়ে ক্যাম্প করি। ক্যাম্পে আমরা দিনে থাকি কিন্তু রাতে থাকি না । কারণ যেকোন সময় মিলিটারিরা আমাদের হামলা করতে পারে। 

আমরা ছোট ছোট অপারেশন চালিয়ে যেতে থাকি। দহকুলা ব্রিজ, দিলপয়সা ব্রিজ, কৈডাঙ্গাব্রিজ এই রকম বিভিন্ন জায়গায় অপারেশন করে বিভিন্ন জায়গা দখল করতে থাকি। আমরা মোহনপুর দখল করি। তারপর উল্লাপাড়া, সর্বশেষ সিরাজগঞ্জও আমরা দখল করে ফেলি। এইভাবেই আমাদের দেশ শত্রু মুক্ত হতে থাকে। আমি যুদ্ধের সময় থ্রিনটথ্রি অস্ত্র ব্যবহার করি। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে আমরা সিরাজগঞ্জ কলেজ মাঠে প্রবাসী সরকারের অর্থমস্ত্রী ক্যাপ্টেন এম. এ. মনসুর আলীর কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে অস্ত্র সমর্পণ করি।

(যুদ্ধ শেষে ময়দান আলী ফিরে যান স্কুলে। ১৯৭২ সালে এসএসসি পাস করেন। তারপর শেফালী খাতুনকে বিয়ে করেন। পুত্র : সোহেল রানা, রুবেল হোসেন ও কন্যা : মুর্শিদা খাতুন ও খুশি পারভীন। তাঁর বর্তমান পেশা ব্যবসা। বর্তমান ঠিকানা চরমোহনপুর, উপজেলা : উল্লাপাড়া, জেলা : সিরাজগঞ্জ।

অনুলিখন : ইমরান হোসাইন

ও/ডব্লিউইউ

Published: Mon, 27 Jul 2020 | Updated: Mon, 27 Jul 2020

বীর মুক্তিযোদ্ধা আমির হোসেন মিয়া’র যুদ্ধস্মৃতি

“৭- মার্চ যখন ভাষণ হয়, তখন আমি ইন্টারমিডিয়েট ফাইনাল ইয়ারের ছাত্র। আমাদের পরীক্ষার তারিখ ঘোষণা করা হলো। পরীক্ষা দেবো। এর ভেতরে - মার্চের যে ভাষণ, রেসকোর্স ময়দানে গেলাম। সেখানে দেখলাম, যখন ভাষণ হচ্ছিল সেখানে ওপর দিয়ে কয়েকটা প্লেস উড়ে গেলো। বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শুনলাম। এবং তখন অতটুকু বোধবুদ্ধি ছিল না, বঙ্গবন্ধু কি বললো। তবে মনের ভেতর সেই কথাগুলো আমার আটকানো ছিল, আমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়া মাঠে নেমে পড়ো।”

Published: Sun, 26 Jul 2020 | Updated: Sun, 26 Jul 2020

বীর মুক্তিযোদ্ধা আমিনুর রহমান আবু’র যুদ্ধস্মৃতি

আমি তেজগাঁও পলিটেকনিক্যাল স্কুলের ছাত্র। পাশে আমাদের সরকারি বিজ্ঞান স্কুল এন্ড কলেজ। ওখানে একটা পুকুর আছে। ওইখানে আমরা গোসল করি। গোসল করি, মাঠ আছে, খেলাধুলা করি। পাশেই আবার স্টেশন, তেজগাঁও স্টেশন। তো, তেজগাঁও স্টেশনটা বিহারী অধ্যুষিত।