|

যুদ্ধস্মৃতি : মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মান্নান তালুকদার

Published: Wed, 26 Aug 2020 | Updated: Wed, 26 Aug 2020

আমি আব্দুল মান্নান তালুকদার সিরাজগঞ্জ সদরের রতরকান্দি ইউনিয়নের গজারিয়াগ্রামে পিতা রিয়াজউদ্দিন তালুকদার ও মাতা ওমিছা বেগমের ঘরে ১৯৫১ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি জন্ম গ্রহণ করি। আমি এসএসসি পাশ করি ১৯৬৮ সালে। ভর্তি হই সিরাজগঞ্জ কলেজে। মোতাহার হোসেন তালুকদারের ভাইয়ের ছেলে হিসেবে স্কুল জীবনেই জড়িয়ে পড়ি পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের সঙ্গে। কলেজে ভর্তি হয়ে সে ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ন থাকে। এ সময় আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন আমির হোসেন ভুলু, আমিনুল ইসলাম চৌধুরী, এমএ রউফ পাতা, বিমল কুমার দাস, ইসহাক আলী, গোলাম কিবরিয়া, আব্দুল আজিজ মির্জা, সোহরাব আলী সরকার, আজিজুল হক বকুল প্রমুখ ছাত্রনেতারা। তাঁরা কর্মীসভা, জনসভা, মিছিলে যেতে বলতেন। আমরা দলবল বেঁধে চলে যেতাম। 

১৯৭০ সালে কলা বিভাগে এইচএসসি পাশ করে একই কলেজে বিএ ক্লাসে ভর্তি হই। পাকিস্তান জাতীয় পরিষদে কাজীপুর ও সিরাজগঞ্জ থানা মিলে পাবনা- ১ আসন এবং আমাদের ইউনিয়ন কাজীপুরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে প্রাদেশিক পরিষদে পাবনা-১ আসন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। আওয়ামী লীগ জাতীয় পরিষদে মোতাহার হোসেন তালুকদার এবং প্রাদেশিক পরিষদে আমাদের ইউনিয়নের বাসিন্দা ক্যাপ্টেন এম. মনসুর আলীকে প্রার্থী করা হয়। মোতাহার হোসেন তালুকদারের ভাইয়ের ছেলে এবং ছাত্রলীগের কর্মী হিসেবে আমি সত্তরের নির্বাচনী প্রচারাভিযানে অংশ নেই। উভয় নির্বাচনে সারাদেশের মতো আমাদের আসনেও এমএনএ পদে মোতাহার হোসেন তালুকদার এবং এমপিএ পদে ক্যাপ্টেন এম. মনসুর আলী বিপুল ভোটে বিজয়ী হন। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগ সমগ্র পাকিস্তানে একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দলে পরিণত হয়। নির্বাচনী ফল পাওয়ার পর নিশ্চিন্ত হই যে, এবার পাকিস্তানকে শাসন করবে বাঙালিদের দল আওয়ামী লীগ। আবার সংশয়ও জাগে যে, পাকিস্তানের সামরিক শাসক কি বাঙালিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করবে? তবুও আমি কলেজে ফিরে গিয়ে পড়াশোনায় মনোযোগ দেই। 

কিন্তু ১৯৭১ সালের ১ মার্চ এ অঞ্চলের রাজনীতির হাওয়া আবার ঘুরে যায়। পাকিস্তানের সামরিক শাসক এক ঘোষণায় পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের অধিবেশন যা ঢাকায় ৩ মার্চ বসার কথা ছিল তা অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করে। প্রতিবাদে ছাত্রদের সঙ্গে রাস্তায় নেমে আসে জনতাও। মিছিলে স্লোগান ওঠে ‘বাঁশের লাঠি তৈরি করো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো।’ আপামর জনসাধারণও ভাবতে শুরু করে, ইসলামের দোহাই দিয়ে শাসন করা পাকিস্তানের সঙ্গে আর নয়। প্রতিদিনই গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটতে থাকে। ২ মার্চ ঢাকায় স্বাধীনতার পতাকা উড়িয়ে দেয়া হয়, ৩ মার্চ স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠ করা হয়। ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণে বাঙালিদের ‘প্রত্যেক ঘরে ঘরে দূর্গ গড়ে’ তোলার আহ্বান জানান। তিনি আরো বলেন, ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ তাঁর এ ঘোষণাকে আমরা স্বাধীনতার ঘোষণা বলেই মনে করতে থাকি, স্কুল-কলেজ বন্ধ হয়ে যায়। এসব স্থান হয়ে ওঠে অস্ত্র প্রশিক্ষণের কেন্দ্র। এসময় আমি সিরাজগঞ্জ শহর ছেড়ে গ্রামের বাড়ি চলে যাই।  

বিভিন্ন গ্রামের ছাত্র-তরুণদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখি, দেশের পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয় তা বোঝার চেষ্টা করি। ২৫ মার্চ গণহত্যা শুরু করে পাকবাহিনী। পাকিস্তানি শাসন ব্যবস্থা সম্পূর্ণই ভেঙে পড়ে, বিভিন্ন শহর থেকে পালিয়ে আসতে শুরু করে সাধারণ মানুষ। পাক-বাহিনীর নির্যাতনের খবর চলে আসতে থাকে গ্রামের মানুষের কাছে। সাধারণ মানুষ এতে ভয় পেয়ে গেলেও পাকিস্তানিদের ওপর যেটুকু আস্থা ছিল তাও শেষ হয়ে যায়। সিরাজগঞ্জ শহর থেকেও মানুষজন গ্রামে চলে আসতে শুরু করে, যদিও তখনো সিরাজগঞ্জ শহর মুক্তিকামী জনতার নিয়ন্ত্রণে ছিলো। 

১৭ এপ্রিল মুজিবনগরে প্রবাসী সরকার শপথ নেয়ার পরপরই আমাদের চাচা মোতাহার হোসেন তালুকদার আত্মগোপনে অর্থাৎ প্রবাসী সরকারের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করতে চলে যান। তাঁর পরিবার চলে আসে গ্রামে। ২৭ এপ্রিল পাকবাহিনী সিরাজগঞ্জ দখলে নিয়ে শহরকে ধ্বংসস্তুপে পরিণত করে। তারা বিভিন্ন গ্রামে হামলা চালাতে শুরু করে। একই সাথে বিভিন্ন ইউনিয়নে শান্তি কমিটি গঠন করা হয়, গঠন করা হয় রাজাকার বাহিনী। এলাকার মানুষ মনে করতে শুরু করে, যে কোনো সময় আমাদের গ্রামেও হামলা চালাবে পাকসেনারা। কারণ, এ গ্রাম মানে আওয়ামী লীগ নেতা মোতাহার হোসেন তালুকদারের গ্রাম। যদিও আমাদের গ্রামের একজন সে বছর আমাদের ইউনিয়ন চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন, তিনি যুক্ত হয়ে পড়েন পাকিস্তানিদের সঙ্গে। ফলে ভয়ে ভয়ে সময় কাটতে শুরু করে আমাদের গ্রামের মানুষের। 

এরমধ্যে একদিন বালিঘুরঘুরি গ্রামের রাধাকান্তর বাড়িতে ডাকাতি সংঘটিত হয়। এর কয়েকদিন পর মে মাসের শেষ বা জুনের প্রথম সপ্তাহে বাগবাটী গ্রামে গণহত্যা চালায় পাকবাহিনী ও তার এদেশীয় সহযোগীরা। এতে আরো বেশি আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এলাকায় আর আমাদের গ্রামবাসী আরো ভীত হয়ে পড়ে। অনেকেই ভয়ে গ্রাম ছেড়ে অন্য গ্রামে আশ্রয় নিতে থাকে। বাগবাটীর ঘটনার কয়েকদিন পরই মোতাহার হোসেন তালুকদারের পরিবার ভারতের উদ্দেশ্যে গ্রাম ছাড়েন। কিন্তু আতঙ্ক আমাদের পিছু ছাড়ে না, কারণ তখন স্বাধীনতা বিরোধীরা তৎপর হয়ে ওঠে।

আমরা খবর পাচ্ছিলাম যে, কুড়িগ্রামের রৌমারী থানা তখনও মুক্ত আছে এবং সেখানে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। তখন গ্রামের তরুণরা সংগঠিত হতে শুরু করি মুক্তিযুদ্ধে যোগদানের জন্য। একদিন সন্ধ্যায় গ্রাম থেকে বের হয়ে পড়ি, চলে যাই শুভগাছায়। তার আগেই নৌকায় যমুনা-ব্রহ্মপুত্র নদ হয়ে রৌমারী যাওয়া সম্পর্কে খোঁজখবর নেয়া হয়েছিল। যাঁরা সেদিন গ্রাম থেকে বের হয়ে এসেছিলাম, তাঁদের মধ্যে যাদের কথা এই মূহুর্তে মনে পড়ছে তারা হলো আব্দুল হামিদ তালুকদার, আমজাদ হোসেন তালুকদার, হযরত আলী খাজা, নজরুল ইসলাম ননী, হারুণর রশীদ, ফরিদুল ইসলামসহ আরো কয়েকজন। সন্ধ্যার পরে শুভগাছায় যমুনার ঘাটে এসে নৌকায় উঠে পড়ি। নৌকা ছাড়ে রৌমারীর উদ্দেশ্যে। 

রাস্তায় রাস্তায় বিপদ আর দেশ মুক্ত করার আকাঙ্খা নিয়ে আমরা প্রায় পাঁচ দিনের মাথায় পৌঁছে যাই ভারতের মাইনকার চর। সেখান থেকে লোকজনকে জিজ্ঞেস করে খুব সহজেই রৌমারীতে চলে যাই। কুড়িগ্রামের রৌমারী থানার ফ্লাগ স্ট্যান্ডে তখনও পতপত করে উড়ছে স্বাধীনতার পতাকা। সেখানে শত শত তরুণ প্রশিক্ষণ নিচ্ছে বাংলাদেশকে মুক্ত করতে। এসব দেখে খুব ভালো লাগলো। ঢুকে গেলাম থানা বাউন্ডারির ভেতরে, নাম লেখালাম মুক্তিযুদ্ধাদের তালিকায়। সেখানে পাওয়া গেল ইসমাইল হোসেন (দোয়াতবাড়ি), জহুরুল ইসলাম তালুকদার মিন্টু (গজারিয়া, আমার চাচাতো ভাই), রেফাজউদ্দিন (কাজীপুর), নূরুল ইসলাম (ওয়াপদা কর্মচারী)। তাঁদের মধ্যে ইসমাইল হোসেন প্রশাসন দেখতেন, জহুরুল ইসলাম তালুকদার মিন্টু প্রশিক্ষণ দেখতেন আর খাবারের বিষয় সামলাতেন নূরুল ইসলাম। 

ক্যাম্পে মাঝেমধ্যেই খাবারের সঙ্কট হতো, কিন্তু প্রশিক্ষণ এগিয়ে চললো। প্রশিক্ষণে প্রথমে শরীর চর্চা, এরপরেই প্রশিক্ষণে যুক্ত হয় অস্ত্র, মানে থ্রিনটথ্রি রাইফেল। ক্যাম্পে মাঝে মাঝে আসতেন প্রবাসী সরকারের অর্থমন্ত্রী ক্যাপ্টেন এম. মনসুর আলী, এমএএ মোতাহার হোসেন তালুকদার, এমপিএ সৈয়দা হায়দার আলী, জেড ফোর্সের অধিনায়ক মেজর জিয়াউর রহমানসহ আরো অনেকে। এখানে প্রশিক্ষণ দিতেন বেলকুচির ইপিআর সদস্য নামদার হোসেনসহ আরো কয়েকজন। এসময় আমাদের বলা হতো যে, সবাইকে উচ্চতর প্রশিক্ষণ অর্থাৎ হায়ার ট্রেনিংয়ে পাঠানো হবে। তারপর অস্ত্র হাতে পাঠানো হবে দেশকে মুক্ত করতে।  

ওদিকে রৌমারী এলাকা মুক্ত রাখতে ব্রহ্মপুত্র নদের বিভিন্ন চরে ডিফেন্স গড়েছিল ১ম, ৩য় ও ৮ম বেঙ্গল রেজিমেন্ট। তারা রৌমারী স্কুলে নিয়ে আমাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে। আমরা অনেকেই সে প্রশিক্ষণে অন্তর্ভূক্ত হই। পাকবাহিনী প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করে বেঙ্গল রেজিমেন্টের ওপর। তখন আমাদের বিভিন্ন মুক্তিযোদ্ধাকে গ্রুপ করে বিভিন্ন স্থানে ট্রেন্স ও বাঙ্কারে করে ডিফেন্সের কাজে লাগানো হয়। তখন রৌমারী ইয়থ ক্যাম্পে দেখা দেয় কিছুটা বিশৃঙ্খলা। ক্যাম্পের একাংশ নিয়ে যাওয়া হয় রৌমারীর পাশে নতুন বন্দর স্কুল মাঠে। এ সময়ে বেঙ্গল রেজিমেন্টের ১ম ও ৩য় বেঙ্গল রেজিমেন্টের শূন্যস্থান পূরণের জন্য স্পেশাল ব্যাচে রিক্রুট করা হয়। 

এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, পাকিস্তানের বিভিন্ন ক্যান্টেনমেন্ট থেকে বাঙালিরা যখন বেড়িয়ে আসে তখন তাদের অনেকেই আসতে পারেনি অথবা আসেনি, সেই শূন্যস্থান পূরণ করা হয় নতুন রিক্রুট করে, তাদের বলা হয় স্পেশাল ব্যাচ। নতুন বন্দর থেকেও ১ম ও ৩য় বেঙ্গলের জন্য দুই দফায় রিক্রুট করা হয়। আমাদের দফায় আমরা ৮৬ জন রিক্রুট হই। অনেকেই বেঙ্গল রেজিমেন্টে রিক্রুট হতে না পেরে মন খারাপ করে। গজারিয়া থেকে বেঙ্গল রেজিমেন্টে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পাই আমি, আব্দুল হামিদ তালুকদার, হযরত আলী খাজা, হারুণর রশীদ, নজরুল ইসলাম ননী ও আব্দুল হামিদ তালুকদার। আমার চাচাতো ভাই সাইফুল ইসলামের স্বাস্থ্য খারাপ বলে তাঁকে নেয়া হয় না। ইউনিয়নের যারা বেঙ্গল রেজিমেন্টে রিক্রুট হন তাঁরা হলেন সাহার উদ্দিন, হাবিবুর রহমান (মইশামুড়া), আজিজুর রহমান (ঐ), ঈমান আলী (ঐ), আজাহার আলী (একডালা) প্রমুখ। আমাদের রিক্রুট করে পাঠানো হয় তেলঢালা বেঙ্গল রেজিমেন্টের প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে। 

নিয়মিত বাহিনীর সৈনিক হিসেবে গড়ে তুলতে আমাদের কঠোর প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। প্রশিক্ষণের শুরুতেই সাধারণ মুক্তিযোদ্ধাদের লুঙ্গি-শার্ট-গামছা ছেড়ে দেয়া হয় সৈনিকের পোশাক। নিজেদের পরিবর্তিত পোশাকে খারাপ লাগার কথা নয়, বরং আমরা আরো উৎসাহিত হই। এখানে মনে রাখা দরকার যে, নিয়মিত বাহিনীর একজন সৈনিককে গড়ে তুলতে সময় লাগে কমপক্ষে দুই বছর, সেখানে আমাদের প্রশিক্ষণের সময় নির্ধারণ হয় মাত্র ২ মাস। আমরাও দেশকে শত্রুমুক্ত করবো বলে দিনরাত কঠোর পরিশ্রম করে প্রশিক্ষণ নিতে লাগলাম। দীর্ঘ দুই মাস প্রশিক্ষণ নিয়ে আমরা নিজেদের প্রস্তুত করলাম নিয়মিত বাহিনীর উপযোগী করে। সময় এলো যুদ্ধে যাবার। 

আমাদের কোম্পানি কমান্ডার নিযুক্ত হলেন ক্যাপ্টেন আকবর। জুনিয়র কমিশন্ড অফিসার (জেসিও) নিযুক্ত হলেন আমাদের ইউনিয়নের সাহার উদ্দিন। আমাকে নিযুক্ত করা হলো প্লাটুন হাবিলদার। প্রশিক্ষণ শেষে এলেন মুক্তিবাহিনীর প্রধান কর্নেল এমএজি ওসমানী আমাদের প্রশিক্ষণ সমাপনী দিনে, যেদিনকে সেনাবাহিনীর ভাষায় বলা হয় পাসআউট। ততদিন আমাদের দেয়া হয়েছে নিয়মিত বাহিনীর খাকি পোশাক, আমরা সে পোশাক পড়ে ফলইন হলাম। কর্নেল ওসমানী তার ভাষণে বললেন, ‘দ্রুতই স্বাধীন হবে বাংলাদেশ। এজন্য প্রয়োজন মিত্ররাষ্ট্রের সীমান্ত এলাকায় শত্রুদের হটিয়ে দিয়ে গড়ে তুলতে হবে মুক্ত এলাকা। তাই আমাদের জন্য স্থান নির্ধারণ হয়েছে সিলেটের বিয়ানীবাজার সীমান্ত। তার ইচ্ছা, নিজের এলাকা তিনি আগে মুক্ত করতে চান, সেখানে হবে মুক্তিবাহিনীর হেডকোয়ার্টার। সেখান থেকে নেতৃত্ব দেয়া হবে মুক্তিযুদ্ধের। আর এই গুরু দায়িত্ব দেয়া হচ্ছে আমাদের। প্রশিক্ষণ শেষে আমাদের এখন সেখানেই পাঠানো হবে। কালকেই বাহিনী সেদিকে রওনা হতে হবে। পরে কর্নেল ওসমানী সৈনিকদের অর্থাৎ মুক্তিযোদ্ধাদের তাঁবুতে তাঁবুতে গিয়ে সবার সঙ্গে করমর্দন করলেন। একসময় তিনি বিদায় নিলেন আমাদের ক্যাম্প থেকে। তিনি চলে যাওয়ার পরে আমাদের সিলেট সীমান্তে যাওয়ার তোড়জোড় শুরু হয়ে গেল। 

আমাদের বহন করে নিয়ে যেতে চলে এলো অনেকগুলো মিলিটারি লড়ি। আমরাও যার যার মালপত্র নিয়ে লাফিয়ে উঠে পড়লাম সে লড়িতে। মেঘালয়, আসামের পাহাড় দিয়ে চড়াই উৎরাই ঠেলে চলতে লাগলো আমাদের গাড়ির বহর। জনমানবহীন পাহাড়ি এলাকার মাঝেমধ্যেই শরণার্থী শিবির। তারা আমাদের গাড়ির বহর দেখলেই হাত তুলে অভিবাদন জানাতো। স্থানীয় মানুষেরাও ‘জয়বাংলা’ স্লোগান দিয়ে আমাদের অভিনন্দন জানাতো। সারাদিন চলার পর আমরা ভারতের বিখ্যাত শিলং শহরে রাত্রি যাপন করি। পরের দিন সকালে আবার যাত্রা শুরু। বিকেলের দিকে পৌঁছে যাই আমাদের গন্তব্য সিলেটের বিয়ানীবাজারের উল্টো দিকের সীমান্তে। আমরা সীমান্তে বাঙ্কার-ট্রেন্স করে ঘাঁটি গড়ি। দিনে সীমান্ত পাহারা আর রাতে ভেতরে পাকসেনার ঘাঁটিতে হামলা চালানো -এই ছিল আমাদের নিত্যকাজ।

কিন্তু ধীরে ধীরে আমাদের মধ্যে হতাশা নেমে আসতে শুরু করে। কারণ আমাদের এই রেজিমেন্টের বেশির ভাগই ছাত্র, কেউ কেউ কৃষক ও শ্রমিক। আমরা চাইতাম, নিজের পরিচিত এলাকায় গেরিলা যুদ্ধ করতে, কিন্তু আমাদের লাগানো হয় নিয়মিত বাহিনীতে। প্রথম দিকে যে আবেগ বা দেশপ্রেম যাই থাকুক না কেন তা দিয়ে যুদ্ধকে মেলাতে অসুবিধা হচ্ছিল। এদিকে, ওই এলাকার সাধারণ মানুষের যে সহযোগিতা আশা করতাম তা পেতাম না। আমাদের মনে হতো যে, এলাকার সাধারণ মানুষের অবস্থান পাকিস্তানের পক্ষে অর্থাৎ স্থানীয়দেরকে আমাদের কাছে স্বাধীনতাবিরোধী মনে হতো। অবশ্য নিয়মিত বাহিনীর সদস্য হিসেবে ছাড়াও প্রধানত সীমান্ত এলাকায় অবস্থান থাকায় সাধারণ মানুষের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগও ছিল কম। আর আমাদের মানসিক প্রস্তুতি ছিল গেরিলা যুদ্ধের, নিয়মিত যুদ্ধের যে মানসিক প্রস্তুতি প্রযোজন তা আমাদের ছিল না। 

এদিকে, আমাদের গ্রামের আব্দুল হামিদ তালুকদার ভীষণভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন, ফলে তাঁকে পাঠিয়ে দেয়া হয় শিলংয়ের ভারতীয় সেনাবাহিনীর হাসপাতালে। যুদ্ধ যে কবে শেষ হবে তার কোনো ঠিক নেই। ফলে আমাদের মধ্যে এক ধরনের হতাশাও কাজ করছিল। এর মধ্যেই চলে আসে রোজার ঈদ। দারুণ হতাশা থেকে অনেকেই ঈদের দিনেও না খেয়ে থাকে। 

খবর পেয়ে চলে আসেন মুক্তিফৌজের প্রধান সেনাপতি কর্নেল এমএজি ওসমানী। তিনি আমাদের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনেন। তিনি বলেন, দ্রুতই শুরু হবে চূড়ান্ত লড়াই, হানাদার মুক্ত হবে বাংলাদেশ। তাই আমাদের হাতে সময় খুবই কম। এখন আর কোথাও কাউকে ‘মুভ’ করানো সম্ভব নয়। সে চূড়ান্ত লড়াইয়ে তিনি মনযোগ দিয়ে যুদ্ধ করার প্রস্তুতি নিতে বলেন। তাঁর কথায় আমরা কিছুটা আশার আলো দেখে আশাবাদী হয়ে উঠি। কর্নেল ওসমানীর কথার সত্যতাও পাওয়া যায়। মিত্রবাহিনী অর্থাৎ যৌথবাহিনীর সৈন্য সমাবেশ ঘটতে থাকে সীমান্ত এলাকায়। আমাদের বাহিনীতেও ভারি অস্ত্র যুক্ত হতে শুরু করে। এসব থেকে আমরা বেঙ্গল রেজিমেন্টের সাধারণ সদস্যরাও বুঝতে পারি যে, চূড়ান্ত লড়াইয়ের আর বেশি দেরি নেই। নতুন উদ্যোমে মনোযোগ দেই মুক্তিযুদ্ধে। 

এগিয়ে আসে ডিসেম্বর মাস। আমাদের ছড়িয়ে দেয়া হয় সিলেট জেলার বিভিন্ন সীমান্তে। ৩ ডিসেম্বর পশ্চিম পাকিস্তান সীমান্তে ভারতের ওপর হামলা চালায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। ভারতও তার পাল্টা জবাব দেয়। পাশাপাশি আমরা বাংলাদেশকে স্বাধীন করতে ঢুকে পড়ি দেশের ভেতরে। বিশ্বরাজনীতিতেও পরিবর্তন ঘটতে শুরু করে। নেপাল, ভূটান পরে ভারত সরকারও আমাদের স্বাধীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়। ততদিনে আমাদের গেরিলাদের আক্রমণে নাজেহাল হয়ে মনোবল সম্পূর্ণই হারিয়ে ফেলেছে পাকসেনারা। তারা সীমান্ত ছেড়ে দিয়ে একসাথে হতে শুরু করে তাদের বিভিন্ন ঘাঁটি এলাকায়। আমরা বেঙ্গল রেজিমেন্ট তাদের ধাওয়া করতে থাকি। 

সীমান্ত থেকে পিছু হটে পাকবাহিনী। আমরা তাদের ধাওয়া করতে শুরু করি। পাকবাহিনী টেংরাটিলায় ঘাঁটি করে আমাদের প্রতিরোধের চেষ্টা করে। সেখানে শুরু হয় তুমুল যুদ্ধ, কিন্তু সে প্রতিরোধ বালির বাঁধের মতোই ভেঙে যায়। অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকে আমাদের। অবশেষে ওরা ঢুকে পড়ে সিলেট শহরে। আমরা বেঙ্গল রেজিমেন্ট ওদের অবরোধ করি। এবার পাকসেনাদের আত্মসমর্পন ছাড়া আর কোনো পথ নেই, কারণ ইতিমধ্যেই ১৬ ডিসেম্বর খোদ ঢাকায় তাদের কমান্ডারেরা এর আগে আত্মসমর্পণ করে বসে আছে। বাংলাদেশের মাটিতে পরাজয় স্বীকার করে নিয়েছে পাকসেনারা। 

কিন্তু ওরা মনে করতে থাকে যে, গত নয় মাসের নির্মম নির্যাতনের প্রতিশোধ নিতে পারে বাঙালিরা, তাই ওরা বাঙালিদের কাছে আত্মসমর্পণ করতে নারাজ। ওরা শর্ত দেয় যে, মুক্তিবাহিনীর কাছে নয়, ভারতীয় বাহিনীর কাছে ওরা আত্মসমর্পণ করতে রাজি আছে। তখন ভারতীয় বাহিনীর কাছে খবর পাঠানো হয়। ১৯ ডিসেম্বর মিত্র বাহিনীর প্রতিনিধি সিলেট শহরে ঢোকে এবং পাকবাহিনীর আত্মসমর্পণের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে। তারপরে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে একটি স্থানে আটক রেখে আমাদের জন্য সিলেট উন্মুক্ত করা হয়। হয়তো তারাও ভেবেছিলো যে, মুক্তিযোদ্ধারা পাকবাহিনীর ওপর প্রতিশোধ নিতে পারে, এ জন্যই আমাদের ঢুকতে দেয়া হয়নি সিলেটে। আমরা ঢুকে পড়ি সিলেট শহরে। আমাদের অস্থায়ী ক্যাম্প করা হয় নতুন মেডিকেল কলেজে।

আমরা স্পেশাল ব্যাচের বেঙ্গল রেজিমেন্টের সদস্য হয়ে যাঁরা যুদ্ধ করেছি, তাঁদের চাকরিজীবীর মতোই দেখা হতে থাকে। চাকরির শর্ত অনুযায়ী পদত্যাগের পরে পাওনা-দেনা মিটিয়েই আমরা সেখান থেকে বিদায় নিতে পারি। স্পেশাল ব্যাচের সবাইকে বলা হলো, বেঙ্গল রেজিমেন্টে থেকে যাওয়ার জন্য। আমাদের গ্রামের হারুণ জানালো যে, দেশে গিয়ে কী করবো? তার চেয়ে যুদ্ধ করতে করতে চাকরি পেয়ে গেলাম, এটাই আমার জন্য ভালো। সে রেজিমেন্টেই থেকে যাবে বলে জানালো। তাঁর মতোই আরো কেউ কেউ বেঙ্গল রেজিমেন্টের চাকরিকেই পছন্দ করে নিল। আমাদের ইউনিয়নেরও কেউ হয়তো থেকে গেল, তবে তার সংখ্যা খুবই কম। বেশির ভাগই মুক্তি চাইলো বেঙ্গল রেজিমেন্ট থেকে। তারা পদত্যাগ পত্র জমা দিয়ে দিল। বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতা শেষে রইলো বেতন বাকি। ততদিনে আমি অস্থির হয়ে পড়েছি দেশে আসার জন্য। কতদিন বাবা-মা, ভাইবোন, গ্রামের মানুষের মুখ দেখি না! তাই বেতন ফেলে রেখেই রওনা হলাম বাড়ির উদ্দেশ্যে। এভাবেই শেষ হলো আমার মুক্তিযোদ্ধা জীবন।

অনুলিখন : সাইফুল ইসলাম 

ও/ডব্লিউইউ