|

যুদ্ধস্মৃতি

Published: Wed, 26 Jun 2019 | Updated: Wed, 26 Jun 2019

শ ম শহীদুল ইসলাম, মুক্তিযোদ্ধা

যখন নতুনের ডাক আসে তখন জাতি অস্থির হয়ে ওঠে সে ডাকে সাড়া দিতে। জাতির এ অস্থির সময়ে যুব সমাজ কিছু একটা করে দেখাতে চায়। আর সে করণীয় সম্পর্কে জানতে, খুঁজতে সেও অস্থির হয়। খুঁজে বেড়ায় কখন কোথায় গেলে সে একটা কাজে লাগতে পারবে। সে তখন হন্যে হয়ে বন্ধু-স্বজন খুঁজে ফেরে লোকালয়ে, বনবাদারে, দেশ-বিদেশে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে আমিও তরুণ, আমিও সে অস্থিরতায় ভুগেছি, পাগলের মতো খুঁজে ফিরেছি বন্ধু-স্বজনকে। যখন খুঁজে পেয়েছি, তখন আগ্নেয়াস্ত্র তাক করেছি শত্রু হননে।

আমি শ ম শহীদুল ইসলাম। জন্ম: ১৯৫৩ সালের জুলাই মাসের ৮ তারিখে। আমার বাবার নাম এসকে আব্দুল মজিদ তালুকদার, তিনি হোমিওপ্যাথ চিকিৎসক ছিলেন। মায়ের নাম ছাকিতননেসা, তিনি গৃহিণী। আমরা ৫ ভাই ১ বোন, ভাইবোনদের মধ্যে আমি পঞ্চম। এক বড় ভাই বিজি প্রেসে চাকুরি করতেন। আমার বাড়ি তৎকালীন সিরাজগঞ্জ মহুকুমার সদর থানার বহুলী ইউনিয়নের ছাব্বিশা গ্রামে। আমাদের গ্রাম বা তার আশপাশের গ্রামে কোনও হাই স্কুল ছিল না, তাই ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে উঠে সিরাজগঞ্জ শহরের ভিক্টোরিয়া হাই স্কুলে ভর্তি হই। আমার বড় ভাই আব্দুস সাত্তার তালুকদার একই স্কুলে আমার ওপরের ক্লাসে পড়তেন এবং পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের সদস্য ছিলেন। আমি তার অনুসারী হয়ে উঠি, কিন্তু আমি লেখালেখি করতে  চাইতাম, হতে চাইতাম লেখক-সাংবাদিক। একারণে দলীয় কর্মকাণ্ডে কম যুক্ত হতাম। যারা লেখালেখি করতেন অথবা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত ছিলেন তাদের সঙ্গে গড়ে ওঠে সখ্যতা। এই সব লিখিয়ে সাংস্কৃতিক কর্মীদের মধ্যে ডা. মতিয়ার রহমান, কমল গুণ, সানায়ুল্ল্যাহ শেখ, এমএ রউফ পাতা, খম আখতার, আযকার-উল হক প্রমুখের সঙ্গে আড্ডা দিতেই স্বাচ্ছন্দ বোধ করতাম। আর উত্তেজনাপূর্ণ মিছিল হলে তাতে অংশ নিতাম। 
১৯৬৯ সালে এসএসসি পাশ করে সিরাজগঞ্জ কলেজে ভর্তি হই, লেখালেখির সুযোগ আরো বেড়ে যায়, নিয়মিত কবিতা লিখি, সাহিত্যের আড্ডায় যাই, একটি সাপ্তাহিকে নিয়মিত সংবাদ পাঠাই। যোগাযোগ রাখি ছাত্রলীগের সঙ্গে। মধ্যে সত্তুরের নির্বাচন আসে, এলাকার তরুণদের সঙ্গে নিয়ে নাওয়া খাওয়া ভুলে ভোট চেয়ে বেড়াই আওয়ামী লীগ প্রার্থীদের পক্ষে, এটা যেন আমার কাছে বাঙালির অস্তিত্বের লড়াই। আমাদের আসনে নির্বাচনে সহজ বিজয় ঘটে আওয়ামী লীগের এমএনএ পদে মোতাহার হোসেন তালুকদার ও এমপিএ পদে সৈয়দ হায়দার আলীর। বিজয় ঘটে সারাদেশেই, এ বিজয় জনগণের বিজয়, বাঙালির বিজয়। আমরা নিশ্চিত হই যে, এবার পাকিস্তানকে বাঙালিদের পক্ষে শাসন করবেন বাংলার অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার দল আওয়ামী লীগ। আমি খোশ মেজাজে আবার সাহিত্য চর্চা, সাংবাদিকতা আর পড়াশোনায় ব্যস্ত হয়ে পড়ি।
কিন্তু ১৯৭১ সালের ১ মার্চে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের ঘোষনায় আবারো ক্ষেপে যায় বাঙালিরা। এদিন পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্ট কালের জন্য স্থগিত ঘোষনা করা হয়। এ ঘোষনায় আমরা যারা পাকিস্তানের ক্ষমতায় যাওয়ার স্বপ্নে বিভোর তারা চমকে উঠি। সিরাজগঞ্জ কলেজ থেকে ছাত্ররা মিছিল বের করে। আচমকা এ মিছিলে আমরাও শহরের মধ্যে থেকে শামিল হই। ছোট্ট মিছিল কিছু সময়ের মধ্যেই হয়ে ওঠে বিশাল। মিছিলের প্রধান শ্লোগান হয়ে ওঠে ‘বাঁশের লাঠি তৈরি করো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো।’ আর বাঙালির অপরিহার্য শ্লোগান ‘জয় বাংলা’ আরো বলিষ্ঠ কণ্ঠে উচ্চারিত হয়। এ মিছিল ঘুরিয়ে দেয় দেশের রাজনীতির চাকা। 

বাঙালিরা উত্তেজনায় টগবগ করে ফুটতে থাকে। প্রতিদিনই ঘটতে থাকে নতুন নতুন ঘটনা। অসহযোগ আন্দোলন, স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলন, স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠ, প্রতিদিন অসহযোগ আন্দোলনের নতুন নতুন ঘোষনা আমাদের বিশ্বাস করতে বলে যে আমরা স্বাধীন। ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে তার ঐতিহাসিক ভাষন দেন, যা আমাদের শোনার সুযোগ হয় পরের দিন সকালে। সে ভাষনে বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ আমরা বুঝে গেলাম যে, বঙ্গবন্ধু এ কথার মধ্যে দিয়ে স্বাধীনতার ডাক দিলেন। পরের দিনই গ্রামের আনসার সদস্য আজিজার রহমান বল্লা ভাই আমাদের নিয়ে তালুকদার বাড়ির পুকুর পাড়ে লাঠিসোটা দিয়ে প্রশিক্ষণ দিতে শুরু করলেন। 

এদিকে, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগ নেতা শেখ মোঃ আলাউদ্দিন (ধীতপুর-বহুলী} অসহযোগ আন্দোলনের শুরুতে ফিরে এলেন এলাকায়। তিনি সিরাজগঞ্জ কলেজে পড়াকালীন সময় থেকেই আমাদের সঙ্গে সখ্যতা, তিনি সংঘটিত করলেন আমাদের। বহুলী হাটখোলায় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করলেন তিনি। আনসার সদস্য ডা. ময়দানসহ আরো দু’তিন জন সেখানে প্রশিক্ষকের দায়িত্ব নিলেন। আমরা ছাব্বিশা গ্রামের অন্তত ১৫ জন তরুণ সে প্রশিক্ষণে নাম লেখালাম। বহুলী ইউনিয়ন এলাকার শতাধিক তরুণ নাম লেখালো সে প্রশিক্ষণে। প্রশিক্ষণ নেই আর মনে মনে শপথ নেই যে, বাংলাদেশকে শত্রু মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাআল্লাহ। 

২৬ মার্চ সকাল থেকে খবর প্রচার হতে লাগলো যে, বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষনা দিয়েছেন। তিনি কোথায় আছেন, সে ব্যপারে দু’টো খবরই প্রচার হতে লাগলো। কেউ বলে, বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করেছে পাকিস্তান সেনাবাহিনী, কেউ বা বলে, তিনি জনগণের মধ্যে আত্মগোপন করে আছেন। ঘটনা যাই ঘটুক, দেশে স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে তা বোঝা যেতে লাগলো। ঝড়ের আগের মূহুর্তের মতো দেশটা থমথমে হয়ে পড়তে লাগলো। দু’তিন দিনের মধ্যে অবর্ণনীয় দুঃখ কষ্ট ভোগ করে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নির্যাতন সহ্য করে ঢাকাসহ বিভিন্ন বড় শহর থেকে গ্রামে চলে আসতে শুরু করে বাঙালিরা। তারা রাস্তায় যেতে যেতে পথে পথে বলতে থাকে পাকিস্তানিদের নির্যাতনে খবর। আমার বাড়ির সামনের রাস্তায় সে সব মানুষের মিছিল থেকে শুনতে থাকি পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়ার কথা। এতে বাঙালিদের ক্ষোভ আরো বেড়ে যায়।

আলাউদ্দিন ভাই কয়েক জনকে নিয়ে চলে যান বাঘাবাড়িতে, পাকিস্তানি বাহিনীকে প্রতিরোধ করবেন বলে। নানা কারণে আমি সেখানে যেতে ব্যর্থ হই। কিন্তু এলাকার নির্যাতীত মানুষের কাফেলাকে আশ্রয়, খাওয়া দিয়ে সহযোগিতা করতে থাকি। গ্রামের তরুণেরা সবাই একাট্টা হই, এগ্রাম সেগ্রামে ঘুরে বেড়াই, বলতে থাকি, স্বাধীনতা হীনতায় কে বাঁচিতে চায়? আরো বলতে থাকি যে ছাত্র-তরুণেরা এবার যে কোনও মূল্যে দেশকে স্বাধীন করবেই। ওদিকে, ২৭ এপ্রিল সিরাজগঞ্জ শহরে এসে পড়ে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। তারা যাকে যেখানে পায় তাকেই হত্যা করতে শুরু করে। বাড়িঘরে আগুন দিতে থাকে কোনও বাছবিচার ছাড়াই। প্রথম দিনেই বহুলী ইউনিয়নের ধীতপুর আলাল গ্রাম পুড়িয়ে ছাই করে দেয়। সেখানে হত্যা করে বিভিন্ন গ্রামের অন্তত ৩৯ জন বাঙালিকে। তার আগেই বাঘাবাড়ি থেকে পিছিয়ে আসে মুক্তিযোদ্ধারা। ফিরে আসেন ছাত্রনেতা আলাউদ্দিন ভাইও। কিন্তু এ পরিস্থিতিতে তাকে খুঁজে পাওয়া দুস্কর হয়ে পড়ে। আমাদের গ্রামের সাইফুল, হামিদ, মজিদ, তাহের, সাইদসহ আরো কয়েক জন তাকে খুঁজে ফিরি হন্যে হয়ে । তিনি তখন প্রকাশ্যে চলাচল বন্ধ করে দিয়েছেন। শুধু তিনিই নন, সকল ছাত্রনেতাই তখন পলাতক। আমরা বহুলীর ছাত্র তরুণেরা ছাত্রলীগ নেতা আলাউদ্দিন ভাইয়ের ওপরেই নির্ভরশীল। তাকে না পেলে আমরা নেতৃত্বহীণ। অবশেষে ধীতপুর গ্রামে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ধ্বংসযজ্ঞের ঘটনার সপ্তাহ খানেক পর তাকে খুঁজে পাই পাশ্ববর্তী মুনশুমী গ্রামে। বহুলীসহ অন্যান্য আশপাশের ইউনিয়নের তরুণেরা তার সঙ্গে দেখা করি। তিনি জানান, তার পরিকল্পনার কথা। তিনি জানান, এসডিও শামসুদ্দিন কাজীপুরের দিকে দেখা করার কথা বলেছিলেন, তাকে এখনো খুঁজে পাইনি। এখনতো আমাদের পিছু হটে আসতে হয়েছে, একটু গুছিয়ে নিতে হবে। তোমরা যারা ছাত্রলীগ করেছ তারা কেউ বাড়িতে থাকবে না, সাবধানে আশপাশের এলাকায়ই থাকবে। আমাকেও এক/দেড় মাস পালিয়ে থাকতে হবে, পরিস্থিতি বুঝে সিদ্ধান্ত নেবো। তবে আমাদের যুদ্ধ ছাড়া কোনও পথ নেই মনে রেখ। শোনা যাচ্ছে, ভারত মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে, আমি সব খোঁজ খবর নিয়ে ফিরবো, তোমরা কেউ এলাকা ছাড়বে না, আবার ধরাও পড়বে না। এসব বলে আমাদের সবাইকে বিদায় করলেন।

আমি, সাইফুল, সাইদ আর মজিদ প্রায় এক সঙ্গেই পালিয়ে পালিয়ে থাকি। দিনে বের হই না বললেই চলে। রাতে প্রয়োজন মনে করলে নিজেদের মধ্যে দেখাসাক্ষাৎ আলাপ আলোচনা হয়। আশাহতাশায় দোলায়িত হয়ে সময় কাটতে থাকে। পাশ্ববর্তী গ্রামগুলোই হয়ে ওঠে আমাদের আশ্রয়। প্রায় দুই মাস পরে জুলাই মাসের প্রথম দিকে খবর পাই যে, আলাউদ্দিন ভাই ভারত থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে এলাকায় ফিরেছেন। খোঁজ নিয়ে জানতে পারি যে, তিনি রায়গঞ্জের বিভিন্ন গ্রামে তিনি ঘোরাফেরা করছেন। আমি, সাত্তার ভাই, সাইদ, হামিদ আর সাইফুল রায়গঞ্জের বিভিন্ন গ্রাম ঘুরতে ঘুরতে তাকে পেয়ে যাই এক গ্রামে। স্বস্থি ফিরে আসে আমাদের মধ্যে। হয়তো তিনি আমাদের ভারতে প্রশিক্ষণে পাঠাবেন অথবা কোনও ব্যবস্থা করবেন। আলাউদ্দিন ভাই জানান, তিনি মুজিব বাহিনীর প্রশিক্ষণসহ কয়েকজনকে নিয়ে দেশে ফিরে এসেছেন। এখন দল গোছাবেন, আশ্রয়ের ব্যবস্থা করবেন, অন্যদের প্রশিক্ষণে পাঠাবেন। যতদিন প্রশিক্ষণে পাঠাতে না পারছেন, ততদিন স্থানীয়ভাবে প্রশিক্ষণ নিয়ে স্থানীয়ভাবে অস্ত্র সংগ্রহ করে দল চালাতে হবে। আমরা হয়ে পড়ি তার দলভূক্ত। শুরু হয় মুক্তিযোদ্ধা জীবন। 

অস্ত্রের সঙ্গে পরিচয় ছিল না, আবার যুদ্ধের সময় প্রকাশ্যে অস্ত্র প্রশিক্ষণ নেওয়ার সুযোগও ছিল না, আমরা যখন শেল্টারে থাকতাম, তখন সহযোদ্ধাদের কাছে থেকে থ্রিনটথ্রি রাইফেল খোলাজোড়া, টার্গেট ঠিক করা এসব শিখে নেই। আমাদের বলা হয়, সুযোগ পেলেই তোমাদের ভারতে প্রশিক্ষণের জন্য পাঠানো হবে। মাঝে এক/দুই বার তালিকাও করা হয় যে, কাকে কাকে প্রশিক্ষণের জন্য পাঠানো হবে। এভাবেই চলতে থাকে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ। 

আমরা মুক্তিযোদ্ধারা সাধারণত দিনে বের হতাম না বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া। গভীর রাতে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠকদের সহযোগিতায় দল বেঁধে এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে চলে যেতাম। প্রতি ৫/৬ জন মুক্তিযোদ্ধার গ্রুপ এক এক বাড়িতে একটি ঘরে থাকার ব্যবস্থা  হতো। সে ঘরটিই হয়তো ওই গৃহস্থবাড়ির মূল ঘর। এমনি একদিন এক বাড়িতে আমাদের থাকার ব্যবস্থা হয়েছে, পরে জানতে পারি যে ওই ঘরে কিছুক্ষণ আগেই এক নারী তার সন্তান প্রসব করেছেন। আমরা চলে আসায় প্রসূতি আর তার নবজাতককে অন্য ঘরে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। ভেবে পাইনা যে, মুক্তিযোদ্ধাদের কত গুরুত্ব দেওয়া হলে এ কাজটি সম্ভব! এভাবেই সাধরণ মানুষ গুরুত্ব দিতে থাকে মুক্তিযোদ্ধাদের। জনগণ এ সব  করেছে মুক্তিযোদ্ধাদের নিরাপত্তার কথা ভেবে। আমাদের নিয়ে রাখা হতো বাড়ির ভিতরের সবচেয়ে নিরাপদ ঘরে। আমরা মুক্তিযোদ্ধারা তাদের বাড়িতে গেলে তাদের খুব কষ্ট হতো, কিন্তু তারা তা হাসি মুখেই মেনে নিতেন। আরো দেখেছি, আশেপাশের মানুষ যদি জানতে পারতেন যে, কোনও বাড়িতে মুক্তিযোদ্ধা আশ্রয় নিয়েছে, তাহলে তারা আমাদের দেখতে আসতো যেন মুক্তিযোদ্ধারা রূপকথার রাজপুত্তুর। আমার সহযোদ্ধাদের মধ্যে এই মূহুর্তে যাদের নাম মনে পড়ছে তারা হলেন, আব্দুস সাত্তার, সাইদ, সাইফুল, তাহের, মান্নান, মজিদ, আনোয়ার, হামিদ, আব্দুল জলিল, আজিজ, আবুল কালাম, সাবেক সেনাসদস্য সানাউল্লাহ প্রমুখ। এলাকায় মুক্তিযুদ্ধের কয়েকজন সংগঠক ছিলেন, তারাই আমাদের থাকার ব্যবস্থা করে দিতেন। কোন কোন বাড়িতে মুক্তিযোদ্ধারা আশ্রয় নেবে তা এরাই ঠিক করে দিতেন। এদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন সূবর্ণগাঁতীর বাদশা ভাই। তিনি সুপরিচিত ছিলেন রায়গঞ্জ এলাকার বিভিন্ন গ্রামে। দিনের বেলায় বিভিন্ন গ্রামে যেতেন, জনগণের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন, মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে জনগণকে আশার বাণী শোনাতেন। রাতে মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে গিয়ে বাড়িতে বাড়িতে ভাগ করে থাকার ব্যবস্থা করতেন।
(চলবে)
 

অনুলিখন- সাইফুল ইসলাম, মুক্তিযোদ্ধা, লেখক