|

যুদ্ধকথা: মুক্তিযোদ্ধা মো. মজিবুল হক

Published: Thu, 13 Aug 2020 | Updated: Thu, 13 Aug 2020

আমি মো. মজিবুল হক সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া উপজেলার মোহনপুর ইউনিয়নের দহকুলা গ্রামে ১৯৫৪ সালের ২৯ ডিসেম্বর জন্ম গ্রহণ করি। আমার বাবা মনছুর আলী ছিলেন একজন শিক্ষক ও মা আজিরন নেছা ছিলেন গৃহিনী। আমরা দুই ভাই ও তিন বোন। ভাই-বোনের মধ্যে আমি দ্বিতীয়। আমি ১৯৭১ সালে লাহিড়ী মোহনপুর হাইস্কুলের নবম কি দশম শ্রেণীর ছাত্র ছিলাম ।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ই মার্চের ডাকে সাড়া দিয়ে লতিফ মির্জার সাথে মিছিল করি এবং আমাদের দহকুলা গ্রামে বাঁশের লাঠি দিয়ে প্রশিক্ষণ নেই। আমাদের ট্রেনিং করান আনসার বাহিনীর সদস্য ওয়াজেদ শাহ ও তছির আকন্দ এবং বেল্লাল দারোগা ও রোস্তম ফকির। সিরাজগঞ্জ থেকে আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ মোহনপুর আসতেন। তারা আমাদের পাখি মারা বন্ধুক গ্রামে গ্রামে থেকে সংরক্ষণ করতে বলেন এবং আমরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে তা সংরক্ষণ করি। যারা এ কাজ করি তাঁরা হলেন ইয়াছিন আলী, লতিফ মির্জা ও আমিসহ আরো কয়েকজন ছেলে। আমরা যে কয়টা পেলাম তা নিয়ে আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দর কাছে জমা দেই।

দহকুলা ব্রীজেই রাজাকার ক্যাম্প। তার পাশেই ব্রীজের দক্ষিণ-পূর্বে আমার বাড়ি। রাজাকার এবং পাক বাহিনী একদিন রাত ১১টা কিংবা ১২টার দিকে আমার বাড়িতে ও গ্রামে হামলা-গোলাগুলি করে। তাদের ভয়ে আমার বৃদ্ধ প্যারালাইসিস বাবা ও আমার ছোট ভাই মাজেদুল হককে (৫ থেকে ৬) বাড়ির পাশে দবির নামক এক লোকের সাথে কলাগাছের ভোলায় তুলে দিলাম। মাঠের মধ্যে আমন ধান। দবির ধান ক্ষেতের মধ্যে দিয়ে চন্ডিপুর ছোরহাব মাষ্টারের বাড়িতে নিয়ে গেল। বাবার ছাত্র ছোরহাব মাষ্টার, আবার বাবার সাথেই তিনি শিক্ষকতা করতেন।

আমি বিয়ে করে ছিলাম যুদ্ধের এক দেড় বছর আগে। পাকসেনা ও রাজাকাররা আমাদের বাড়িতে এসে গুলি করে মেরে ফেলবে এই ভয়ে জান বাঁচানোর জন্য আমি, আমার মা, তিন বোন ও পেটে ৬/৭ মাসের বাচ্চা নিয়ে আমার স্ত্রীসহ পাশের বাড়ির দুই বয়স্ক মহিলা আমরা সবাই পেটের নিচে কলস নিয়ে আনুমানিক এক মাইল সাঁতার কেটে ঐ ছোরহাব মাষ্টারের বাড়িতে গিয়ে উঠি। বাড়ির লোকজন আমাদের শুকনো কাপড়-চোপড় দেয়। আমরা ভেজা কাপড় ছেড়ে শুকনো কাপড় পরে নিই।

তার দুই একদিন পরেই আমাদের গ্রাম রাজাকার ও পাক সেনারা পুড়িয়ে দেয়। রাজাকাররা যে ব্রিজে ক্যাম্প করেছিল তার প্রায় সাথেই আমার বাড়িসহ ৬৩ বাড়ি পুড়িয়ে দেয়। চন্ডিপুর থেকে ভাটবেড়া বাবার মামার বাড়িতে আমরা সাবই আশ্রয় নেই। আষাঢ়-শ্রাবণ মাস। কোনো কোনো দিন পালিয়ে গ্রামে এসে দুই চারজনের সাথে সাক্ষাৎ করে যেতাম।

এরপর আমাদের গ্রামের আমার বয়সের ছেলেদের সাথে কথাবার্তা হল যে, আমরা ভারতে মুক্তিযুদ্ধের জন্য গেরিলা ট্রেনিং নিতে যাব। ট্রেনিং করে এসে দেশের ভেতর পাক সেনাদের সাথে যুদ্ধ করবো। এরপর এক হিন্দু ঘোষ তার সাথে কথা হল। তাকে কিছু টাকা দিলে সে নৌকায় করে ভারত নিয়ে যাবে। 

একদিন শনিবার কিংবা মঙ্গলবার রাজমান হাটের দিন তালগাছি কিংবা মশিপুর গ্রামের খেয়াঘাটে রয়েছি। ওখানে খেয়াঘাট পার হয়ে নদীর পূর্ব পাড়ে গিয়ে সব এক হব এই কথা ছিল। ঘোষের ভারত যাওয়া মিটানোর পর আমার শ্বশুর বাড়ি হাওড়া গ্রামে যাই। শ্বশুরের কাছে আমার চারশত টাকা ছিল। আমি তখন একখানা ডোঙ্গা নৌকা নিয়ে টাকা আনার জন্য চলে গেলাম সেখানে।

টাকা নিয়ে দহকুলা ব্রিজের উত্তর থেকে ব্রিজের নিচ দিয়ে নদীর দক্ষিণে বাড়ির দিকে আসতে ছিলাম আর ব্রিজের ক্যাম্পের থেকে রাজাকাররা আমাকে ডাক দিয়ে নৌকা পাড়ে নিতে বলে। তখন আমি নৌকা নিয়ে পাড়ে গেলাম। আমাকে ব্রিজের উপর সিগন্যালের সাথে নিয়ে দাঁড় করালো। তারপর আমাকে গুলি করার জন্য আমার পেটে রাইফেল লাগিয়ে গুলি করতে চাইলো। তার আগে আমাকে লাথি ও বন্ধুক দিয়ে পেটাতে লাগল। আর আমাকে নানানভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করলো। আমার আত্মা আছে কি নাই এই রকম অবস্থা হলো।

ক্যাম্পের রাজাকাররা উল্লাপাড়ার দিকে থাকে। আমার গ্রামের দুই একজনকে আমি ডাকতে থাকি। তাদেরকে ডাকতে ডাকতে প্রায় ২৫ মিনিট পর তারা আমার কাছে আসে। তার কথা শুনে বুঝি আমাকে রাজাকারের হাত থেকে আমাকে ছাড়িয়ে নিয়েছে সে। আল্লাহ্ -নবী রাসুলের কাছে খুব কান্নাকাটি করে ছিলাম। তাই আল্লাহর রহমতে আমি বেঁচে যাই। মনে মনে চিন্তা করলাম যে, আল্লাহর কৃপায় যদি মুক্তিফৌজ হয়ে আসতে পারি তাহলে এর প্রতিশোধ নিবো।

খেয়াঘাটে গিয়ে সবাই এক সাথে হবার কথা। আমরা সবাই রাজমান হাট দিয়ে তালগাছি মুশিপুর নদীর খেয়াঘাট পার হয়ে এক সাথে হই। ঘোষ আমাদের হাঁটাতে হাঁটাতে সিরাজগঞ্জের দক্ষিণে মাইঝাল গ্রাম নামে এক বাড়িতে নিয়ে গেল। ওখানে একদুইদিন থাকার পর ৬ কিংবা ৭ শ’ মণের একটা নৌকার মাচালের নিচে ডওরার ভিতর বসালো আমাদের। নৌকায় শরণার্থী অনেক ছিল। এই মাঝির গ্রামের বাড়িটা ছিল যমুনা নদীর পাড়ে, এক সাথে লাগানো। 

মাঝি আমাদের সঙ্গে নিয়ে নৌকা ছাড়লো। যমুনা নদীতে ভারত পথে যাত্রা শুরু করলাম। পাকসেনারা পিসবোর্ড ও গানবোর্ড নিয়ে মুক্তিযোদ্ধা ও শরণার্থী ধরার জন্য ধাওয়া করতে লাগে। আমরা যখন গানবোর্ড ও পিসবোর্ড দেখি তখন আমাদের নৌকার মাঝি আমাদের যমুনার চরে নামিয়ে দেয়। আবার গ্রাম থেকে চরে বাড়ি থাকলে সেখানে পালাবার জন্য নামিয়ে দেয়। এইভাবে কয়েকদিন কয়েকরাত যাওয়ার পর যমুনা নদীর পাড়ে গ্রামের মত কয়েকটি বাড়ির ঘাটে নৌকা দাঁড় করালো ।

নদী পার হতে বাহাদুরাবাদ ঘাট ও ফুলছড়ি ঘাট এক রাতের পথ। কিন্তু দুই ঘাটেই পাকসেনারা সার্চলাইট ধরে। আমরা যমুনার পাড়ে এক গ্রামের পাশে নৌকা লাগিয়েছি। ওখানে আমাদের গায়ে এসে লাইটের আলো লাগে। ভয়ে আমাদের আত্মা থরথর করে কাঁপতে থাকে। আমাদের মত মুক্তিযোদ্ধা ও শরণার্থী নৌকা অন্তত ২০টি ছিল। বড় নৌকায় আর যাওয়া যাবে না বলে আমরা ছোট ইলিশ মারা নৌকা ভাড়া করলাম। নৌকার মাঝিরা ইলিশ মারার ভান করে জাল-দড়ি নিয়ে বাহাদুরাবাদ ঘাট ও ফুলছড়ি ঘাটের মধ্যে দিয়ে ভারতে মানকাচর যাওয়ার উদ্দেশ্যে রওনা দেয়।

বাহাদুরাবাদ ঘাট ও ফুলছড়ি ঘাটে শেষ রাত্রে গিয়ে পৌঁছলাম। ঘাট ছিল খুব ভয়ঙ্কর। দুই ঘাটের দুই দিক থেকেই গুলি করা হয়। সবাই মাচাল, বইঠা, থাল, ছেওতি যাই পেলাম তাই দিয়ে ‘হেই ‘ মেরে দুই ঘাট পার হলাম। বেলা এক প্রহরের সময় মানকারচর পৌঁছলাম। এসে শুনতে পারলাম যে, পাকসেনারা গুলি শুরু করে দিয়েছিল। তাতে পিছের নৌকায় যে বাদামের হাল ধরে সে হালের পিছে বসেছিলো। তার পায়ের থোঁড়া পাশ দিয়ে একশ’টার মত গুলি গেছে।

যাই হোক আমাদের আবার ভারতের বর্ডার সংলগ্ন এলাকা রৌমারী থানায় নিয়ে আসে। সেখানে যেকয় দিন ছিলাম ডিফেন্সে যারা যুদ্ধ করেছে তাদেরকে যুদ্ধ করানোর জন্য আমাদেরকে দিয়ে সাহায্য-সহযোগিতা করিয়েছে। আমার গ্রামের যারা আমার সাথে গিয়েছিল তারা হল আজিজুল হক, ছামাদ, জলিল, দবির, হাই। আমাকে ও আবুল কাশেমকে রৌমারী থানায় রেখে আজিজুল হকের সাথে কয়েকজন কোথায় যেন চলে গেল তা জানিনি। তার কয়েক দিন পরে শুনতে পারলাম ভারতের হেড অফিস থেকে খবর আসছে। শুনতে পারলাম যে, দুইতিন শ’ ছেলেকে শিলিগুড়ির পানিঘাটায় হায়ার ট্রেনিংয়ের জন্য পাঠানো হবে। সেই সাথে আমি আর আবুল কাশেম অর্থাৎ আমাদের দুইজনকে ওই দুইতিন শ’ ছেলের সাথে পাঠিয়ে দেয়া হলো।

শিলিগুড়ির পানিঘাটায় বাসে চড়ে গেলাম। যেখানে নামলাম ওখানকার নাম জানি না। তবে নদীর তীরে ধুপগুড়ি টাউন। ওখানে হয়ত এক দিন এক রাত ছিলাম।

তারপর ট্রেনে যেতে লাগলাম। সেখান থেতেই আমার চোখে হঠাৎ যন্ত্রনা শুরু হলো। চোখে পানি দিলে একটু ভালো লাগে, পরে আবার খুব যন্ত্রনা শুরু হয়। এইভাবে তরঙ্গপুর পৌঁছলাম। ক্যাম্পে ডাক্তার ছিলো। ডাক্তারের কাছে গিয়ে লাইন ধরে দাঁড়ালাম। ডাক্তার চোখে মলম দিলেন। একদিন বা দুইদিন পর ভালো হয়ে গেল। তারপর আবার ট্রেনে কি বাসে খেয়াল নেই তবে মনে হয় বাসে গিয়ে শিলিগুড়ির পানিঘাট পৌঁছলাম। ওখানে ২১ কিংবা ৩১ দিন আমাদেরকে ট্রেনিংয়ে রাইফেল, এসএলআর স্টেনগান, এলএমজি দিয়ে যুদ্ধ করানো শিখালো। 

রাজাকারদেরকে ক্যাম্প থেকে কীভাবে ধরে তা শিখায়; ব্রীজ ভাঙা, বিল্ডিং ভাঙা, গাড়ি উড়িয়ে দেয়া এসবও শিখায়। ট্রেনিং শেষ করে চলে আসার সময় আমাদের তরঙ্গপুর পাঠানো হয়। তরঙ্গপুর শুনছি হেড অফিস। এই তরঙ্গপুর হতেই আমাদের গ্রুপকে এসএলআর, স্টেনগান, এলএমজি, মাইন, গ্যানেট, এসপ্লোজিপ, ডেটোনাটার ইত্যাদি আরো অস্ত্র দিয়ে দেয়। 

আমাদের গ্রুপে ছিলাম ১৭ জন। ৫৩০ নং গ্রুপের আমাকে দিল স্টেনগান ও আবুল কাশেম ভাইকে দিল রাইফেল। তরঙ্গপুর থেকে এসে মানকাচর পৌঁছলাম এবং রৌমারী থানা দিয়ে মানকাচর ঘাট হয়ে নৌকা করে যুদ্ধ করতে করতে বাংলাদেশের মধ্যে ঢুকলাম। আর বাহাদুরাবাদ ঘাট ও ফুলছড়ি ঘাটের মধ্যে দিয়ে এক দুইদিন পর আসলে আমাদের লক্ষ্য করে দুইটা বিমান এসে উপর থেকে দুইতিনটা গুলি ছুড়লো।

আমাদের একসাথে মুক্তিযোদ্ধা নৌকা ১৫/২০টা ছিলো। আমাদের নৌকা কিনারে লাগিয়ে আমরা খাওয়া-দাওয়া করছি, এমন সময় আমাদের কমান্ডার বললেন যে, তোমরা যমুনার পাড়ে ভিতর থেকে যে বালু আসছে ওর ভিতর গিয়ে পজিশন নিয়ে গুলি আরম্ভ করো। আমরা পজিশন নিয়ে গুলি করবো এমন সময় পাক সেনারা বিমান থেকে বুঝতে পেরে চলে যায়। পরে শুনলাম যে, আমাদের কোনো এক নৌকার পিছনে গুলি লেগে ভেঙে গেছে। 

তারপর আবার আমরা রওনা দিলাম। হয়ত দুই তিনদিন পর আমরা সিরাজগঞ্জের পাশে যমুনার তীরে নামলাম। ওখান থেকে রাজাকার-পাকসেনাদের সাথে দুই তিনদিন কোনো কোনো জায়গায় গোলাগুলি করেছি।

উল্লাপাড়ার মাছিয়া কান্দি গ্রামের এবি. এম. এ. হাই সিদ্দিকী ছিলেন আমাদের গ্রুপ কমান্ডার ও ডেপুটি কমান্ডার ছিলেন আব্দুস সামাদ। এলাকায় এসে সব অস্ত্র তাঁদের কাছে জমা রাখি। তাঁরা আমাদেরকে ভারতেই বলেছিলেন, তোমরা যাওয়ার পথে শত্রু পেলে তাদের সাথে যুদ্ধ করবে। আর তোমাদের এলাকায় গিয়ে তোমাদের বাবা-মার সাথে দেখা করে আসবে। আমাদের দুই জনের বাড়ি প্রায় পাশাপাশি। এসে দেখি আল্লাহ তা’লা একটি মেয়ে সন্তান দিয়েছে। আমার বাবা নাম রেখেছে মর্জিনা খাতুন। দেখা-সাক্ষাৎ করে আমাদের কমান্ডার যেখানে যেতে বলেছিলেন, আমরা আবার সেখানে গিয়ে পৌঁছলাম।

ধলুল বিলের ভেতর রাজাকার ধরতে গিয়ে যুদ্ধ হয়। ওখানে আমরা বেশ কয়েকজন রাজাকারকে ধরে ছিলাম এবং শান্তি কমিটির লোকদেরও ধরেছিলাম। এরপর সিএনবি রোডে রাজাকার ও পাক সেনাদের সাথে দুই তিন জায়গায় যুদ্ধ করেছি। সিএনবি রোডে এসপ্লোজিপ ও মাইন সেট করে আমরা ব্রিজ ভাঙার জন্য ও পাকসেনাদের গাড়ি হামলা করার জন্য গেলে পাটধারী ও রাঙ্গাপুরী ব্রিজের পারের লোকজন আমাদের এসপ্লোজিপ ফিউচ ডেটোনাটার, মাইন, এন্ট্রি ট্যাংক মাইন প্রভৃতি আমাদের সেট করতে দেয়নি। ওখানকার লোকজন সবাই বললো আপনারা চলে যাওয়ার পরই রাজাকার-পাকসেনারা এসে আমাদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দিবে। ওরা আমাদের মেরে ফেলবে। সিএনবি রোডের সবাই একি কথা বলল। এই জন্য আমরা ওই মিশন সফল করতে পারিনি। 

দবির উদ্দিন সাহেব আমাদের আশেপাশে থাকতেন। তাঁর পরামর্শেও বহু কাজ করেছি। সিরাজগঞ্জ এলাকায় বেশ কয়েক জায়গায় আমরা যুদ্ধ করেছি তাঁর পরামর্শে। সেভেন সেক্টরের আন্ডারে আমরা কাজ করেছি। হঠাৎ ভারত থেকে একদিন ১৫-২০টি বিমান এসে পাকবাহিনীদের ক্যাম্পে ক্যাম্পে বোম্বিং শুরু করলো। আমরা পাকসেনাদের ধরা শুরু করলাম। মারপিটও করলাম তাদের।তাদের নিজেদের যে অস্ত্র-বোমা ছিলো ঐসব আমাদের হাতে পড়বে বলে ওরা নিজেরাই কতক পুড়িয়ে ছিল। 

অবশেষে লতিফ মির্জা চিঠির মাধ্যমে আমাদের জানালো যে, তোমরা এসো, আরো সব গ্রুপ আসছে। আমরা সবাই মিলে উল্লাপাড়ার পাকসেনাদের হামলা করবো। তখন আমরা সবাই এসে পাকসেনা ক্যাম্পে হামলা করলাম। গোলাগুলি শুরু করি। আর আমরা তাদের ধরা আরম্ভ করি। বেতের ঝোপঝাড়ের খোপে দুই পাকসেনা পালিয়েছিলো। তাদের ধরে নিয়া আসি। থানায় যারা কমান্ডার ছিলো তাঁদের কাছে জমা দিই। তাঁরা সিরাজগঞ্জ এ চালান করে দিলেন। আরো শান্তি কমিটির যারা ছিল তাদেরকেও ধরিয়ে দেই।

এইভাবে হামলা চালাতে চালাতে ১৩ ডিসেম্বর উল্লাপাড়া থানা মুক্ত করলাম। যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরে অর্ডার হলো, অস্ত্র জমা দিতে হবে। পরে আমার স্টেনগান ও ১০ রাইন্ড গুলিসহ জমা দিয়ে দেই।

যুদ্ধ শেষে বাড়ি ফিরে ব্যবসা ও কৃষি পেশায় যুক্ত হই। স্ত্রী নুরজাহান (নাছিমা)র গর্ভে আমাদের সাত সন্তানদের জন্ম হয়। তারা হলো পুত্র নুরুল ইসলাম এবং কন্যা মরজিনা খাতুন, মারুফা খাতুন, মিনা খাতুন, নাসিমা খাতুন, আফরজা খাতুন ও মারুফা পারভীন। বর্তমানে আমরা আমার জন্মস্থান দহকুলা গ্রামেই বসবাস করছি।

অনুলিখন: ইমরান হোসাইন

ও/ডব্লিউইউ