|

যুদ্ধকথা: মুক্তিযোদ্ধা মো. আজিজুল হক 

Published: Wed, 29 Jul 2020 | Updated: Wed, 29 Jul 2020

আমি মো. আজিজুল হক সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া উপজেলার মোহনপুর ইউনিয়নের দহকুলা গ্রামে জন্ম গ্রহণ করি ১৯৫৩ সালের ১০ অক্টোবর। আমার বাবা আজগর আলী ছিলেন একজন কৃষক এবং মা জমিলা খাতুন ছিলেন গৃহিনী। আমরা দুই ভাই-বোনের মধ্যে আমি বড়। আমি ১৯৬৯ সালে মোহনপুর হাই স্কুল থেকে এসএসসি পাশ করে শাহজাদপুর কলেজে ইন্টারমিডিয়েটে ভর্তি হই। আমি ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষার্থী ছিলাম ১৯৭১ সালে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ৭ই মার্চে ভাষণ দেন ‘তোমাদের যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলায় জন্য প্রস্তুত থাকো’। 

এই বক্তব্যের মাধ্যমে আমি উদ্বুদ্ধ হই এবং তাঁর ডাকে সাড়া দেই পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য। আমরা আমাদের দহকুলা গ্রামে একটা দল গঠন করি যুদ্ধে যেতে। সে দলে আমি ছাড়াও যারা ছিলেন তারা হলেন তায়জাল হোসেন, ছরাফ আলী, আব্দুল রশিদ, শামসুল হক, আবুল কাশেম, মুজিবুল হক, মাজেদ আলী। আমরা যুদ্ধের জন্য তৈরি হতে থাকি এবং নিজ গ্রামে প্রাথমিকভাবে ট্রেনিং নেই। আমাদের সে সময় প্রাথমিক ট্রেনিং দেন বেলাল দারোগা। সে ট্রেনিং শেষ করে আমরা ভারতে ট্রেনিং নিতে চলে যাই। 

সিরাজগঞ্জের রান্ধনীবাড়ী থেকে আমরা ভারতে যাবার জন্য নৌকায় উঠি। ১০০ টাকা ভাড়া দিয়ে আমরা মানকাচর পৌঁছাই। আমাদের ভারত যেতে সময় লাগে দুই দিন। রৌমারীতে মুক্তিযোদ্ধার রিক্রুট ক্যাম্প ছিল। রৌমারী ছিল মুক্ত এলাকা। আমরা চলে যাই সেখানে। রৌমারী থানার কমান্ডার ছিল সিরাজগঞ্জ কলেজের ভিপি ইসমাইল হোসেন। সেখানেই আমরা অবস্থান করি। রৌমারীতে অবস্থান করার পরে উচ্চতর ট্রেনিংয়ের জন্য আমরা ১৬০ জনের দল তুরা শহর থেকে বিমানযোগে দিল্লীতে চলে যেতে চাই। কিন্তু ভাগ্যক্রমে ওখানে ট্রাক এক্সিডেন্ট হয়। পরে আমাদের আর যাওয়া হয় না। 

সেখানে স্থানীয় ভারত আর্মি ক্যাম্পে একদিন অবস্থান করি। সেখান থেকে আমাদের পাঠিয়ে দেয়া হয় মেঘলায় রিক্রুট ক্যাম্পে যেখানে কিছুদিন অবস্থান করে ট্রেনিং করতে থাকি। তারপর আমরা কার্তিক পাড়া অবস্থান করি। সেখান থেকে আমরা দেশের মধ্যে চলে আসি। তিন মাস বিভিন্ন জায়গায় ট্রেনিং নেই আমরা। আমাদের শবে বরাত, রমজান, ঈদ সব ভারতেই কাটে। ঈদের পরে আমরা দেশের ভিতরে ঢুকি। 

আমাদের প্রথমে ময়মনসিংহ যেতে বলা হয়, কিন্তু অপরিচিত জায়গার জন্য আমরা সেখানে যেতে চাই না। অবশ্য আমাদের একটা দল ময়মনসিংহ যুদ্ধ করে। পরে আবার আমাদের সাথে যোগ দেয়। আমরা যখন দেশের ভিতরের রাস্তায় ডুকে পড়েছি, সে সময় লতিফ মির্জার নৌকার সাথে আমাদের দেখা হয়। তিনি নৌকার বহর নিয়ে ভারত যাচ্ছিলেন আর আমরা দেশের মধ্যে চলে আসছিলাম। তারপর আমরা নিজ গ্রামে চলে এসে ক্যাম্প স্থাপন করি রাজমানে। সে ক্যাম্পের কমান্ডার ছিলেন আব্দুল ছামাদ। আর আমাদের ক্যাম্পে অন্যান্যরা যারা ছিলেন তারা হলেন তায়জাল হোসেন, ছরাফ আলী, আব্দুল রশিদ, শামসুল হক, আবুর কাশেম, মুজিবুল হক, মাজেদ আলী। আমরা ছোট ছোট অপারেশন করতে থাকি। 

উল্লাপাড়ার শ্রীফলগাঁতীতে রাজাকারের কমান্ডার ছিলেন মোসলেম উদ্দিন। তার পরিবারে ভাই, ভাতিজা, ছেলে ও ভাগ্নেসহ ২২ জন রাজাকার ছিলেন। আমরা মোসলেম উদ্দিনের বাড়ি ঘেরাউ করি এবং তাকে আমরা ধরে নিয়ে আসি। সে সময় আমরা তার বাড়ি থেকে কিছু মালামালও নিয়ে আসি আমাদের ক্যাম্পের জন্য। যাতে খাওয়া-দাওয়াতে আমাদের কোনো সম্যসা না হয়। পরে তাকে মেরে ফেলা হয়। 

এরপরে আমরা আমাদের পার্শ্ববর্তী থানার একটি গ্রামে আরেক রাজাকারের তথ্য পাই। সাধারণ মানুষদের নানাভাবে অত্যাচার করতো তারা। যেদিন রাতে সেই রাজাকারের বাড়ির কাছাকাছি অবস্থান করি, সেদিন সাধারণ মানুষই আমাদের তার সন্ধান দেয়। কমান্ডারসহ আমি, তায়জাল মাষ্টার, শামসুল কয়েকজন মিলে রাজাকারটির বাড়ি ঘেরাউ করে আমরা তাকে হত্যা করি।

এদিকে উল্লাপাড়া থেকে মোহনপুর বাজারে কয়েকজন মিলিটারি প্রতিদিন রেললাইন দিয়ে হেঁটে আসতো। আমরা তাদেরকে প্রতিহত করার জন্য শ্যামপুর ব্রিজে বাধা সৃষ্টি করি। ছোট একটা যুদ্ধ হয় সেখানে। তখন একজন মিলিটারিকে আমরা মারতে সক্ষম হই এবং তার চাইনিজ অস্ত্রটা আমরা নিয়ে আসি। অন্য মিলিটারিরা পালিয়ে চলে যায়।

রাজাকারদের দমন করার জন্য দহকুলা ব্রিজ অপারেশন করি আমরা। লতিফ মির্জার দলের সাথে পরিকল্পনা করে আমরা যুদ্ধ করি। আমরা থাকি দহকুলার হাটে আর মির্জার দল থাকে উত্তর দিকে। আমরা হাটের দিকের আগেই পজিশন করে থাকি। রাজাকাররা হাটের দিকে আমাদের দিকে আক্রমণ করে গুলি করে, কিন্তু আমরা গুলি করি না। আমরা চুপচাপ থাকি রাজাকাররা আমাদের দিকে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসতে থাকে। আর আমাদের দিকে আসলেই আমরা রাজাকারদের ধরে ফেলি। ঘটনাস্থলে কয়েকজন রাজাকার মারাও যায়। আমরা তাদের অস্ত্র নিয়ে নেই। এভাবে চলতে থাকে আমাদের যুদ্ধ। আমি থ্রিনটথ্রি, মিলিটারিদের চাইনিজ রাইফেল, মার্ক-৪ দ্বারা যুদ্ধ করতাম।

যুদ্ধ শেষ হয়। স্বাধীন দেশে তার কয়েক দিন পরেই আমরা সিরাজগঞ্জ কলেজ মাঠে প্রবাসী সরকারের অর্থমন্ত্রী ক্যাপ্টেন এম. মনসুর আলীর কাছে আমরা মুক্তিযোদ্ধারা আনুষ্ঠানিকভাবে অস্ত্র সমর্পণ করি।

(যুদ্ধ শেষে আজিজুল হক ফিরে যান কলেজে। ১৯৭২ সালে ইন্টারমিডিয়েট পাস করে পাবনার ভাংগুড়া কলেজে ডিগ্রিতে ভর্তি হন তিনি। কিন্তু ডিগ্রিটা শেষ করা হয় না তাঁর। তারআগেই শিক্ষকতায় পেশায় যোগ দেন মোহনপুর হাইস্কুলে। ১৯৭৪ সালে মমতাজ বেগমকে বিয়ে করেন। তাঁদের ঘরে জন্ম নেয় এক ছেলে আব্দুল মালেক ও চার মেয়ে ফাতেমা, হালিমা, খাদিজা পারভীন, আরজিনা পারভীন। শিক্ষকতা থেকে তিনি ২০১৩ সালে অবসর নেন। বর্তমানে তিনি তার জন্মস্থান দহগ্রামেই রয়েছেন। 

অনুলিখন: ইমরান হোসাইন

ও/ডব্লিউইউ