|

যুদ্ধকথা

Published: Wed, 26 Jun 2019 | Updated: Wed, 26 Jun 2019

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানিদের হাতে থেকে রক্ষা পেতে শহর ছেড়ে প্রায় সবাই গ্রামে আশ্রয় নিয়েছে, কিন্তু তাতেও রেহাই পায়নি সাধারণ মানুষ। গ্রামে গিয়ে হামলা চালিয়েছে স্বাধীনতা বিরোধীরা, অথবা জীবন রক্ষার প্রলোভন দিয়ে ডেকে নিয়ে আসা হয়েছে শহরে, নির্মমভাবে পিটিয়ে আহত করে লোকজনকে দেখাতে শহরে দেওয়া হয়েছে মহড়া। তারপর তাকে হত্যা করে পুঁতে দেওয়া হয়েছে তারই নেতার বাড়ির আঙ্গিনায়। এমন অনেক শহীদের এক জনের নাম শহীদ আবুল হোসেন গুলমহাজন (৪০)। তার পিতার নাম: রজব আলী, বাড়ি সিরাজগঞ্জ পৌর এলাকার দিয়ারধানগড়া গ্রামে। 

শহীদ আবুল হোসেন গুলমহাজনের স্ত্রী মোছাঃ সালেহা খাতুন (৮০) জানান, তার স্বামী আবুল হোসেন গুলমহাজন রেলে কুলির কাজ করতেন, পাশাপাশি শহরে ছিল ছোট হোটেল ব্যবসা। তার দুই সন্তান আব্দুস সালাম (৬০) ও আব্দুল আলীম (৫০)। তার স্বামী আওয়ামী লীগের সক্রিয় কর্মী ছিলেন। যেখানেই সংগঠনের মিছিল মিটিংয়ের কর্মসূচি থাকতো সেখানেই চলে যেতেন তিনি সদলবলে। এ কারণে তিনি আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ নেতাদের কাছে হয়ে উঠেছিলেন প্রিয়পাত্র। যাইহোক, ১৯৭১ সালের ২৭ এপ্রিল ভোর রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী দখলে নেয় সিরাজগঞ্জ মহুকুমা শহর। তার আগেই আবুল হোসেন স্ত্রী সন্তানদের নিয়ে শহর ছেড়ে চলে যান তার এক নিকটাত্মীয়ের বাড়ি সদর থানার শিয়ালকোল ইউনিয়নের রঘুনাথপুর গ্রামে। পাশাপাশি চেষ্টা চলতে থাকে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ নেতাদের খোঁজার কাজ। অপরদিকে, পাকিস্তান সেনাবাহিনী সিরাজগঞ্জ শহর দখলে নিয়ে পাকিস্তানপন্থী রাজনৈতিক দল মুসলিম লিগ জামায়াতে ইসলামী ও তাদের সমর্থকদের নিয়ে গঠন করে শান্তি কমিটি, গঠন করা হয় রাজাকার বাহিনী। শুরু হয় আওয়ামী সমর্থকদের খুঁজে বের করা। তার স্বামী আবুল হোসেনকে গ্রামের মুরুব্বিরা খবর পাঠান দেখা করার জন্য। তাকে বলা হয় যে, তাকে কিছুই করা হবে না। তিনিও সরল বিশ্বাসে চলে আসেন গ্রামের মুরুব্বির সঙ্গে দেখা করতে। 

শহীদ আবুল হোসেনের স্ত্রী মোছাঃ সালেহা খাতুন (৮০) জানান, ঘটনার পর তিনি খবর পেয়েছেন যে, তার স্বামী দিয়ারধান গড়া পীর বাড়ির সামনে আসার পর পীরের মুরিদ ও রাজাকারের তাকে আটক করে বেধড়ক মারপিট করে আধামরা করে ফেলে। পরে তাকে বেঁধে শহরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করানো হয়। এ সময় শহরবাসীকে শোনানো হয় যে, পাকিস্তানের বিরোধীতা করা হলে এভাবেই শাস্তি পেতে হবে। শহর ঘুরিয়ে আবুল হোসেনকে নিয়ে আসা হয় মাড়োয়ারি পট্টিস্থ মহুকুমা আওয়ামী সভাপতি মোতাহার হোসেন তালুকদার এমএএর বাস ভবনের সামনে, সেখানে কৃষ্ণচূড়া গাছতলায় অর্ধমৃত অবস্থায় পুঁতে রাখা হয় তাকে। 

শহীদ আবুল ও তার দুই ছেলে
শহীদ আবুল ও তার দুই ছেলে

শহীদের বড় ছেলে আব্দুস সালাম (৬০) জানান, সিরাজগঞ্জ মুক্ত হওয়ার পর গ্রামের মানুষ ও আত্মীয় স্বজন তার বাবার কঙ্কাল  মোতাহার হোসেন তালুকদারের বাসভবনের সামনের কৃষ্ণচূড়া তলা থেকে তুলে আনে এবং গ্রামে জানাযা করা হয়। পরে সেই কঙ্কাল দাফন করা হয় মালশাপাড়া কবরস্থানে। তিনি আরো জানান, বাবা আবুল হোসেন গুলমহাজন শহীদ হওয়ার পর একই গ্রামের তার নানা সালু শেখ তাদের পরিবারকে নিয়ে ঠাঁই দেয়। তারা সেখানেই অবস্থান করছেন। শহীদের স্ত্রী সালেহা খাতুন জানান, স্বাধীনতার পরে বঙ্গবন্ধুর শহীদ পরিবারের জন্য দান করা দুই হাজার টাকা পেয়েছেন। পাশাপাশি ঘর তোলার জন্য টিন টিউবওয়েল পেয়েছেন। তাকে নারী পূনর্বাসন কেন্দ্রে ভর্তি করা হয়েছিল, সেখান থেকে এক বছর ধরে দৈনিক দুই টাকা করে মজুরী এবং দুপুরের খাবার পেয়েছেন। সেখানে তাকে দর্জির কাজ শেখানো হয়েছিল, কিন্তু পরবর্তীতে তা নানা কাজে লাগাতে পারেন নি। তার বাবা ভাইয়ের বাড়িতে থেকে তাদের সহযোগিতায় এতিম ছেলে দু’টোকে কোনও রকমে মানুষ করেছেন। পরে তাদের বিদেশে পাঠিয়েছিলেন। দু’জনই এখন দেশে ফিরে এসে ঘরসংসার করে খাচ্ছে। 

শহীদের ছোট ছেলে আব্দুল আলীম (৫০) জানান, দেশের প্রায় সব নেতাই তাদের বক্তৃতায় বলেন, তিরিশ লক্ষ শহীদের বিনিময়ে এদেশ স্বাধীন হয়েছে, সে তিরিশ লক্ষ শহীদের মধ্যে আমার বাবার রক্ত রয়েছে, এ জন্য আমরা গর্বিত। কিন্তু সে সব শহীদ পরিবারকে যথাযোগ্য মর্যাদা দেওয়া হয়না। আমরা অর্থনৈতিক সাহায্য সহযোগিতা বা পূণর্বাসনের দাবিও করি না, কিন্তু আমরা আশা করি যে এদেশের জন্য আমাদের পরিবারের এই অবদান, এটা রাষ্ট্র মনে রাখুক। আমার পরিবারকে শহীদ পরিবারের মর্যাদা দেওয়া হোক এটাই আশা করে আমার পরিবার। 
লেখক- মুক্তিযোদ্ধা ও সিরাজগঞ্জের গণহত্যা অনুসন্ধান কমিটির আহ্বায়ক।    

লেখক মুক্তিযোদ্ধা সাইফুল ইসলাম

 

/এসিএন