|

ভারতে প্রশিক্ষণ শেষে শত্রুবধের অভিযান

Published: Sat, 20 Jul 2019 | Updated: Sat, 20 Jul 2019

[দ্বিতীয় পর্ব]

ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের কাছাকাছি চমৎকার গ্রাম নতুন বন্দর। গ্রামের সামনে দিয়ে সীমান্ত থেকে রৌমারীর দিকে চলে গেছে হেরিংবোন করা সড়ক। সে সড়কের পাশে গ্রামের প্রাইমারি স্কুল, স্কুলের সামনে বিশাল মাঠ। স্কুলের পুব পাশ দিয়ে বয়ে গেছে একটি ছোট্ট নদী। সে স্কুলে আমাদের থাকার ব্যবস্থা হলো। কিন্তু ১ শ’ ৪ জনের স্থান সংকুলান হলো না স্কুল ঘরে, পরে কয়েকটি তাঁবুরও ব্যবস্থা হলো, তাঁবু গাড়া হলো স্কুলের মাঠের মধ্যে। অবরুদ্ধ এলাকা থেকে মুক্ত এলাকায় এসে থাকার জায়গা পেয়ে অনেকটা নিশ্চিন্ত হলাম আমরা সবাই। এখন প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা হবেই। বিশেষ করে যখন আমাদের নেতা মোতাহার হোসেন তালুকদারকে পাওয়া গেছে। সেদিনের খাওয়া অবশ্য যার যার ট্যাঁকের পয়সা খরচ করেই করতে হয়েছিল। 

রাতে নিশ্চিন্তে ঘুমাতে যাই সবাই, কেউ স্কুল ঘরের মধ্যে, কেউবা স্কুল মাঠের মধ্যে তাঁবুতে। কিন্তু রাতেই হঠাৎ বিপত্তি বাঁধলো। তা হলো, পাহাড়ি বন্যায় হঠাৎ প্লাবিত হলো এলাকা। আমরা যারা স্কুল ঘরে ঠাঁই পেয়েছিলাম, তাদের কোনও অসুবিধা হলো না, বিপদে পড়লো যারা ঠাঁই নিয়েছিল তাঁবুতে। মাঠে মধ্যে পানিতে টইটুম্বুর হয়ে তা তাঁবুতে ঢুকে পড়লো। এমন হঠাৎ বন্যার মোকাবেলা আমরা কোনও দিনও করিনি। ফলে যারা তাঁবুতে ছিল তাদের কাপড়চোপর বা সঙ্গে যাই ছিল, সবই ভিজে চুপচুপে হয়ে গেল। তারা সারারাত ঘুমাতে পারলো না। পরের দিন সকালে তালুকদার সাহেব আরো কয়েক জনকে সঙ্গে নিয়ে এলেন, আমাদের দুরবস্থা দেখে আবার নতুন আশ্রয়ের খোঁজ করলেন। আমাদের ব্যবস্থা হলো, পাকিস্তানি পুলিশদের পালিয়ে যাওয়ায় পরিত্যক্ত রৌমারী থানায়। আমাদের সে থানায় গিয়ে ওঠার আগে পর্যন্ত থানাটিতে কেউ থাকতো না, কর্মরতরা সবাই হয় পালিয়ে বাড়িতে চলে গিয়েছিল অথবা মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছিল। 

আমরা গেলাম রৌমারী থানায়, শুরু হলো মুক্তিযুদ্ধে বিশাল অবদান রাখার রৌমারী ক্যাম্প। প্রথমে আমাদের সিরাজগঞ্জের আমাদের ১ শ’ ৪ জন নিয়ে শুরু হলো বলে এ ক্যাম্প নিয়ে আমরা গর্বিত। খুব দ্রুতই ক্যাম্প মুক্তিযোদ্ধাদের দিয়ে ভরে উঠলো। তবে, শুরুতে যে কোনও বিষয়ই থাকে অব্যবস্থাপনার চূড়ান্ত পর্যায়ে, এখানেও তাই ছিল। খাদ্য ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে ছিলেন, মোতাহার হোসেন তালুকদারের বড় ভাইয়ের ছেলে, জহুরুল ইসলাম তালুকদার, তিনি সিরাজগঞ্জ মুকুল ফৌজের সংগঠক ছিলেন। রান্নার দায়িত্ব পালন করতেন এসডিও অফিসের গাড়িচালক নুরু ভাই। খাবারের অব্যবস্থাপনাই ছিল চূড়ান্ত পর্যায়ে, ঠিকমতো সরবরাহ না থাকায় নিয়মিত রান্নাই হতো না, ফলে আমরা ক্ষেপে যেতাম নুরু ভাইয়ের ওপরে। দিনে এক বেলা তো দূরের কথা, সপ্তাহে তিন/চার দিন খাবার জুটতো কিনা সন্দেহ। খাবার না পেয়ে আমরা ক্ষেপে যেতাম নুরু ভাইয়ের ওপরে, কিন্তু তার সহ্য ক্ষমতা দারুণ, তিনি কখনো আমাদের ওপর রাগ করতেন না, বোঝানোর চেষ্টা করতেন তার অসহায়ত্ব। তারপরেও প্রতিনিয়ত সে ক্যাম্পে শরীর চর্চা হতো, এটা করাতেন চিলগাছার কামাল ভাই, তাকে আমরা মিলিটারি কামাল বলে জানতাম। 

শুরুটা যত কষ্টই হোক, আমাদের একটা সৌভাগ্য যে, হায়ার ট্রেনিংয়ের রিক্রুটের একটি টিম চলে এলো মাত্র ১৫ দিনের মধ্যেই। ফলে ইয়ুথ ক্যাম্পের ভোগান্তি কম ভুগেই আমরা গেলাম মূল প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে। এখন শুধু স্বপ্ন দেখা, কবে প্রশিক্ষণ শেষ হবে, অস্ত্র তুলে দেবে আমাদের হাতে, আমরা এলাকায় ফিরে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী হননে মেতে উঠবো। আমাদের শপথ বঙ্গবন্ধুর ভাষায়, দেশকে শত্রুমুক্ত করে ছাড়বো ইনশাআল্লাহ। আমরা আরো শপথ নিতাম স্বাধীনতা অথবা মৃত্যুর। 

আমাদের নিয়ে যাওয়া হলো দার্জিলিয়ের মুক্তিনালা মুজিব ক্যাম্পে। এটি ভারতের একটি ক্যান্টনমেন্টের পাশে অবস্থিত। এ ক্যাম্পের দায়িত্বে ছিলেন প্রিন্স চৌহান, মেজর র‌্যাঙ্কের। প্রশিক্ষণের দায়িত্বে ছিলেন প্রেমাংশু। এখানে শুধু আমরাই নই, বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলার শত শত তরুণ এসেছে প্রশিক্ষণ নিতে। এখানে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর শর্ট কোর্সের একটা প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা হয়। তাতে অংশ নিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছেলে শেখ কামালও। যাই হোক, সেকশন, প্লাটুনে ভাগ করে প্রতিদিন সকালে প্যারেড-পিটি, তারপর নাস্তা, তারপর আবার অস্ত্র প্রশিক্ষণ, দুপুরের খাবার, একটু বিশ্রাম নিয়ে আবার অস্ত্র প্রশিক্ষণ। এতে আমরা যারা একই এলাকায় এক জোট ছিলাম, তারা বিভিন্ন ভাগে বিভক্ত হয়ে গেলাম। আমাদের দলে আমরা কয়েকজন রয়ে গেলাম এক সাথে। যারা এক সঙ্গে রয়ে গেলাম তারা হলাম আশরাফুল ইসলাম জগলু চৌধুরী [বাহুকা], আলতাব [বাহুকা], দুলাল [বাহুকা], মতি [জয়কৃষ্ণপাড়া], শাজাহান আলী কালু [বাহুকা], শহীদুল ইসলাম [বাহুকা], আমির হোসেন [বেতুয়া], হাসেম [বাহুকা], তোজাম [কেছুয়াহাটা]।

আমাদের ধারণা ছিল প্রশিক্ষণ শেষে অস্ত্র, প্রয়োজনীয় গোলাবারুদ দিয়ে পাঠানো হবে নিজ এলাকায়, কিন্তু তা পাঠানো হলো না, আমাদের পাঠানো হলো রংপুরের হাতীবান্ধা সীমান্ত এলাকায়। 

আমরা ৩০ জন মুক্তিযোদ্ধার একটি দল। আমাদের মূলত থাকতে হতো বাংলাদেশের সীমান্তের ভিতরে, কোথাও মুক্ত এলাকা, কোথাও অবরুদ্ধ এলাকা। মুক্ত এলাকায় থাকলেও পাক-হানাদার বাহিনীর দখল করা এলাকায়, স্বাধীনতাবিরোধী ও পাক-হানাদার বাহিনীর ওপর অতর্কিত হামলা চালিয়ে ফিরে আসতে হতো আশ্রয়ে, যাকে আমরা ‘হাইড’ বা লুকিয়ে থাকার জায়গা বলতাম। এভাবে আক্রমণ করার কারণ পাক-বাহিনী যেন মুক্তিযোদ্ধাদের ভয়ে ভীত-সন্ত্রস্ত থাকে সব সময়। সুযোগ পেলে দিনে অথবা রাতে আমরা এসব হামলা চালাতাম। আমরা সাধারণত ছোট ছোট গ্রুপে এসব হামলা চালাতাম। কিছুক্ষণ গোলাগুলি করেই আবার ফিরে আসতাম নিরাপদ আশ্রয়ে। এসব আশ্রয়কে আমরা বলতাম হাইড বা পালিয়ে থাকার স্থান। আমাদের এসব হামলায় সহযোগিতা করতো রাস্তাঘাট চেনা স্থানীয় গাইডেরা। তারাই পথ দেখিয়ে অপারেশনে নিয়ে যেত, আবার নিরাপদ আশ্রয়ে ফিরিয়ে নিয়ে আসতো। আর আমাদের সকল কর্মকাণ্ডকে পরিচালনা করতেন ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বা বিএসএফ। অসুখ-বিসুখ হলে চিকিৎসার জন্য তাকে পাঠিয়ে দেওয়া হতো বিএসএফ ক্যাম্পে, সেখান থেকে ভারতের ভিতরের কোনও হাসপাতালে। আমাদের খাবারের ব্যবস্থা, হাত খরচের টাকা-পয়সা দেওয়া হতো বিএসএফ থেকেই। আমরা অপারেশন করতাম প্রধানত রংপুর এলাকার হাতীবান্ধা, বড়খাদা, সিংড়িমারী, বাওরা, ডিমলা এলাকায়। জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত আমাদের প্রায় তিরিশটি ছোটবড় অপারেশনে অংশ নিতে হয়েছে। তবে টুনির হাট যুদ্ধের কথা কোনও দিনও ভুলবার নয়।
নভেম্বর মাসের মাঝামাঝি সময়, শীতের কুয়াশায় আচ্ছন্ন হয়ে থাকে প্রায় সারাদিন। চার হাত দূরের মানুষকে দেখা যায় না। এতে এক দিকে সুবিধা, পাক-হানাদার বাহিনী সহজে আমাদের দেখতে পায় না। আবার সেটাই কখনো কখনো সমস্যা হয়ে দেখা দেয়, কারণ আমরাও তাদের দেখতে পাই না। সেদিনের এমনি এক বিপদে আমাদের পড়তে হয়েছিল টুনিরহাট পাক-সেনা ক্যাম্পে হানা দিতে গিয়ে। স্থানীয় গাইড এসে জানালো যে, টুনিরহাটে জনা তিরিশেক পাক-সেনা অবস্থান করছে, রাজাকারও আছে ২০/২৫ জন। এলাকার মানুষ তাদের অত্যাচারে অতিষ্ট। এলাকাবাসী চায় যে, ওই পাক-সেনা ক্যাম্পে মুক্তিযোদ্ধারা হামলা করে তাদের তাড়িয়ে দিক। আমরাও সিদ্ধান্ত নিলাম, টুনিরহাট পাকিস্তানি ক্যাম্পে হানা দেবো, আধা ঘন্টা গোলাগুলি করে আবার ফিরে আসবো হাইডে অর্থাৎ নিরাপদ আশ্রয়ে। প্রস্তুত হলাম আমরা জনা তিরিশেক মুক্তিযোদ্ধা। রওনা দিলাম গভীর রাতে। 

[ চলবে....]

মুক্তিযোদ্ধা মোফাজ্জল হোসেন বানুর মুক্তিযুদ্ধকালীন স্মৃতি অবলম্বনে

অনুলিখন: সাইফুল ইসলাম, মুক্তিযোদ্ধা-লেখক।

এসএ/