|

টুনিরহাটে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি...

Published: Sat, 20 Jul 2019 | Updated: Sat, 20 Jul 2019

[তৃতীয় পর্ব]
রাস্তার দু’পাশের ধান ক্ষেত কুয়াশায় ঢাকা থাকায় সামনের জনকে দেখার যাচ্ছে না। তবুও শীতের রাতে হেঁটে চলেছি আমরা প্রায় তিরিশ মুক্তিযোদ্ধা। প্রায় তিন ঘণ্টা হাঁটার পর গাইড জানালো আর বেশি দূরে নয় টুনিরহাট। টুনিরহাটের এক পাশে ডাঙ্গার হাট, অপর পাশে খোকার হাট। মাঝখানের টুনিরহাটে শত্রু সেনাদের ক্যাম্প। 

একটা ছোট্ট খাল। শীতকাল বলেই হয়তো খালটি শুকনা খটখটে। খালটা পাড় হতেই হঠাৎ থমকে গেলাম আমরা সবাই। সামনেই মাত্র দশ হাত দূরে সার বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে পাকিস্তানি দস্যূরা। ফলইন করিয়ে হয়তো তাদের ডিউটি ভাগ করা হচ্ছে। থমকে দাঁড়ালাম সবাই, এক ঝটকায় ওদের সুযোগ না দিয়েই খালের আড়ে পজিশন নিলাম, ওরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই আমাদের কেউ এক জন পিন খুলে ছুড়ে দিল গ্রেনেড। প্রথম সুযোগে আমরা জিতে গেলাম। এবার পিছু হটার পালা। কিন্তু আমাদের বিপত্ত্বি বাধালো ওদের পর্যবেক্ষণ টাওয়ার। সেখান থেকে এলএমজির ব্রাস ফায়ার আসতে লাগলো। আমরাও পাল্টা গুলি চালাই আর পিছু হটি, কিন্তু আমাদের এদিক থেকে যদি পাঁচটি গুলি ছুড়তে পারি তো ওরা ছোড়ে শত শত। ফলে ছত্রভঙ্গ হতে হলো আমাদের। 

হাইডে ফিরে এলাম, কিন্তু গুণে দেখা গেল আমাদের দু’জন তখনো ফেরেনি। এক জন ময়মনসিংহের আরশেদ, অন্যজন আমাদের বাহুকার শহীদুল। দুই জন সহযোদ্ধা নিখোঁজ! এটাতো হতে পারে না। ফলে আবার ফিরে যাই টুনির হাটের কাছে। আতিপাতি করে খুঁজতে থাকি সহযোদ্ধা দুজনকে। খুঁজতে খুঁজতে শহীদুলকে পাওয়া গেল একটি ধান ক্ষেতের মধ্যে অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে, কিন্তু আহত হয়নি। স্বস্থির নিঃশ্বাস ফেলা গেল ওকে পেয়ে। 

স্থানীয় এক জন জানালো, পাশেই অন্যজন পড়ে আছে আহত হয়ে, যুদ্ধ হয়েছে সেখানে, হয়তো মুক্তিযোদ্ধাই হবে। সেদিকে ছুটলাম আমরা কয়েক জন। খুঁজে পাওয়া গেল আরশেদকে, তবে জীবিত নয়। এলাকাবাসী জানালো, যুদ্ধ চলাকালে সে এখান দিয়ে দৌড়ে যাচ্ছিল, এ সময় তার শরীরে গুলি লাগে। এলাকাবাসী তাকে টেনে তুলে নেয়, স্থানীয়ভাবে হাজারো চেষ্টা করেও তাকে বাঁচাতে পারেনি। শহীদ হয় আরশেদ। আমরা এলাকাবাসীর সহায়তায় আশরাফের মরদেহ নিয়ে আসি আমাদের হাইড হিসেবে পরিচিত মধ্যছাতনাই গ্রামে। তারপর তাকে যথাযোগ্য মর্যাদায় কবরস্থ করি। তখনই মধ্য ছাতনাই গ্রামটি শহীদ আরশেদনগর নামে নামকরণ করা হয়।

দিন গড়ায়, মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত পর্বে চলে আসি আমরা। ২১ নভেম্বর ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, ভারতীয় সেনাবাহিনী হয়ে ওঠে আমাদের মিত্র বাহিনী, যা আগেও ছিল, কিন্তু ঘোষণা দিয়ে নয়। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও ভারতীয় সেনাবাহিনীকে নিয়ে গঠন করা হয় যৌথ বাহিনী। ভারতীয় সেনাবাহিনীর সমাবেশ ঘটতে থাকে সীমান্তে, বেজে ওঠে যুদ্ধের দামামা। বিএসএফ সদস্যরা বলতে শুরু করে, তোমাদের এখন অন্য সেক্টরে পাঠানো হবে। আমরা তখন নিজ এলাকায় ফিরে যাওয়ার জন্য অস্থির হয়ে উঠি। এর মধ্যে ৩ ডিসেম্বর পাকিস্তান হামলা চালায় ভারতের পশ্চিমাঞ্চলে, তাদের বিরোধের স্থান কাশ্মীর সীমান্তে। ফলে যুদ্ধে ভারতে সহযোগিতার লুকোচুরির সমাপ্তি ঘটে। প্রকাশ্যেই নেমে পড়ে ভারত। ফলে সীমান্ত যুদ্ধে এফএফ গেরিলাদের প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে যায়। আমরা গোঁ ধরতে থাকি এলাকায় ফিরে যাওয়ার।
 
ভারতের বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়ার পর আমাদের এলাকায় ফিরে যেতে বলা হয়। কারণ, সীমান্ত এলাকা থেকে তখন পাকিস্তানিরা যুদ্ধের চাপে সরে আসতে বাধ্য হচ্ছিল কেন্দ্রের দিকে। তাই মুক্তিযোদ্ধাদের সীমান্ত এলাকায় থাকার আর কোনও প্রয়োজন ছিল না। এজন্য বিএসএফের ব্যবস্থাপনায় আমাদের পাঠিয়ে দেওয়া হয় মাইনকারচর। সম্ভবত ১১ ডিসেম্বর মাইনকারচরে পৌঁছে শুনতে পাই, আহসান হাবীবসহ অনেকেই- যারা এক সঙ্গে এলাকা ছেড়েছিলাম মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে- তারা কিছুক্ষণ আগেই রওনা হয়েছে সিরাজগঞ্জের উদ্দেশ্যে। তারাও নিশ্চয়ই অন্য সীমান্তে আমাদের মতোই যুদ্ধ করে এখন এলাকায় ফিরে যাচ্ছে। আমরাও দেরি না করে এলাকার মুক্তিযোদ্ধারা উঠে পড়লাম নৌকায়। যত দ্রুত সম্ভব এলাকায় ফিরবো, হানাদার মুক্ত করবো নিজ এলাকা। যারা এক সঙ্গে নিজ এলাকায় রওনা হলাম তারা হলো, আমি, আশরাফুল ইসলাম জগলু চৌধুরী (বাহুকা এলাকা), আলতাব, দুলাল, শহীদুল, মতি [জয়কৃষ্ণপাড়া এলাকা], শাজাহান আলী কালু (বাহুকা), তোজাম (কেছুয়াহাটা)।
 
১৩ ডিসেম্বর সকাল বেলায়-ই নামলাম যমুনা তীর কেছুয়াহাটায়। কারণ, আমাদের সঙ্গে থাকা তোজামের বাড়ি সে গ্রামে। দু’দিন ধরে নাওয়াখাওয়া ঠিক নেই। এলাকার পরিস্থিতি সম্পর্কেও জানা দরকার। তাই তোজামের বাড়িতে গেলাম সবাই। তোজামকে ফিরে পেয়ে গ্রামের সবাই খুব খুশি। সেখানে খবর পেলাম, আমির হোসেন ভুলু সিরাজগঞ্জ মুক্ত করতে শহরের দিকে এগিয়ে গেছেন। এফএফ মুক্তিযোদ্ধারা তার সঙ্গে আছে। সকল মুক্তিযোদ্ধাকেই তিনি সিরাজগঞ্জ শহরের দিকে এগিয়ে যেতে বলেছেন। তোজামের বাড়ির লোকজন ততক্ষণে আমাদের খাওয়ার আয়োজন করেছেন, কিন্তু না খেয়েই আমরা ছুটলাম সিরাজগঞ্জের দিকে।
 
ব্রাহ্মণবয়ড়া পর্যন্ত আসতেই নানা কথা শোনা গেলো। এলাকায় নানা গুজব ছড়াতে লাগলো যে, বয়ড়া-বাহিরগোলা রেল লাইনের ধারে তুমুল যুদ্ধ হয়েছে আমির ভাইয়ের মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে পাক-সেনাদের। সেখানে নাকি অনেক মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হয়েছেন। আমির ভাই নিজেও অসুস্থ হয়ে খোকসাবাড়ি হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে খবর ছিল যে, পাক-সেনারা শৈলাবাড়ি থেকে পালিয়ে গেছে, তারা সিরাজগঞ্জ থেকেও চলে গেছে। কিন্তু রেল লাইনের ওপরে বাঙ্কার করে পাক-সেনারা তখনো ছিল, তা মুক্তিযোদ্ধারা বুঝতে পারেনি। সেখান থেকে নাকি একজন মুক্তিযোদ্ধাকে পাকিস্তানিরা ধরেও নিয়ে গেছে।
 
জানা গেল, সেখানে শহীদ হয়েছেন অন্তত ৫ জন মুক্তিযোদ্ধা। শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের মরদেহ যার যার বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। আহসান হাবীবের মরদেহ করব দিতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে তার বাড়িতে। আমরাও ছুটলাম সেখানে। বিপুল মুক্তিযোদ্ধা-জনতার উপস্থিতিতে যথাযোগ্য মর্যাদায় কবরস্থ করা হলো বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ আহ মরদেহ।
 
পরদিন জানা গেল যে, রাতেই সিরাজগঞ্জ থেকে পাক-সেনারা পালিয়ে গেছে ঈশ্বরদীর দিকে। আমরা দলবল নিয়ে জনতার মিছিলের সঙ্গে ছুটলাম শহরের দিকে। বীরদর্পে সিরাজগঞ্জ শহরে ঢুকে পড়লাম আমরা মুক্তিযোদ্ধা-জনতা। এফএফ মুক্তিযোদ্ধারা ক্যাম্প করে বসলাম ভিক্টোরিয়া হাই স্কুলে। অন্যান্য মুক্তিযোদ্ধারা বিভিন্ন স্কুল-কলেজে, জুট মিল, স্পিনিং মিল ছাড়াও বিভিন্ন পরিত্যাক্ত বাসাবাড়িতে।

পাকিস্তানি প্রশাসনে কর্মরত পুলিশ, রাজাকার ও সরকারি কর্মচারীরা হয় পালিয়ে গেছে অথবা ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে লুকিয়ে আছে। এ ভাবেই ভেঙে পড়েছে পাকিস্তানি প্রশাসন। সেখানে চালু করা হলো মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশাসন। সে প্রশাসনে বিভিন্নভাবে আমাদের কাজ করানো হতে লাগলো। এক সময় ভিক্টোরিয়া স্কুলে স্থান সংকুলান না হওয়ায় আমাদের জায়গা করে দেওয়া হলো জ্ঞানদায়িনী হাই স্কুলে। 

প্রবাসী সরকার ফিরে এলো ঢাকায়, তাদের পক্ষ থেকে চালু হলো প্রশাসন, নিউ মার্কেটে স্থাপন করা হলো মিলিশিয়া ক্যাম্প। বিভিন্ন চাকরিতে যোগদানের জন্য আমাদের বলা হলো, মিলিশিয়া ক্যাম্পে যোগদানের জন্য, কিন্তু আমরা তো তখনো ছাত্র, আর ততদিনে খুলে ফেলছে স্কুল-কলেজ।  আমি স্কুলে ফিরে যেতে জ্ঞানদায়িনী স্কুলের ক্যাম্প থেকে বিদায় নিলাম জানুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে।

[ চলবে....]

মুক্তিযোদ্ধা মোফাজ্জল হোসেন বানুর মুক্তিযুদ্ধকালীন স্মৃতি অবলম্বনে

অনুলিখন: সাইফুল ইসলাম, মুক্তিযোদ্ধা।  

অআই