|

জেল হোসেন মণ্ডলের যুদ্ধকথা

Published: Sat, 29 Jun 2019 | Updated: Sat, 29 Jun 2019

চাষাভুঁষা মানুষ আমি, নাম জেল হোসেন মণ্ডল। বাবার নাম ছাবেদ আলী মণ্ডল।

মায়ের নাম জেলা খাতুন। জন্ম ১৯৪৯ সালে। গ্রাম: তেলকুপি, ইউনিয়ন: খোকসাবাড়ি, জেলা: সিরাজগঞ্জ। 

আমাদের গ্রামটি সিরাজগঞ্জ শহরের একেবারে কাছেই। লেখাপড়া জানতাম না আমি, বাবা কৃষি কাজ করতেন। তাই আমাকেও কৃষিকাজেই যুক্ত হতে হয়। মাঠে যখন কাজ থাকতো না তখন রাজমিস্ত্রির জোগালের কাজও করতাম। আর জোগালের কাজ করতে গিয়ে ওই বয়সেই ঘুরে বেড়িয়েছি ঢাকা, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন বড় শহর। আমার বয়স যখন মাত্র সতের বছর তখন অর্থাৎ ১৯৬৭ সালে আমার বাবা-মা আমাকে বিয়ে করান। আমার স্ত্রীর নাম শাহিদা খাতুন। 

১৯৬৯ সালে দেশে শুরু হয় ছাত্র আন্দোলন। তখন আমাদের পাশের ধীতপুর আলাল গ্রামের মো. আলাউদ্দিন শেখ ছাত্রলীগ করতেন। তিনি মাঝেমধ্যেই আমাদের শহরে মিছিল করতে নিয়ে যেতেন, তাদের সংগঠনের কর্মী সভা হলেও যেতে বলতেন। আমরাও গ্রামের লেখাপড়া জানা বা না জানা তরুণেরা যেতাম, তবে রাজনীতির কিছু বুঝতাম না। মিছিল করতে ভালো লাগতো তাই যেতাম, মিছিলে দৃঢ় পায়ে হাঁটতে হাঁটলে মনে হতো দেশের জন্য কাজ করছি। এ ভাবেই লেখাপড়া না জানা সত্বেও জড়িয়ে পড়ি স্থানীয় ছাত্রলীগের সঙ্গে। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আশপাশের গ্রামে দল বেঁধে আওয়ামী লীগের নৌকা মার্কায় ভোট চেয়ে বেড়াই। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী এমএনএ পদে মোতাহার হোসেন তালুকদার এবং এমপিএ পদে সৈয়দ হায়দার আলী বিপুল ভোটে বিজয়ী হন। দেখা যায়, আওয়ামী লীগের এ বিজয় শুধু সিরাজগঞ্জেই নয়, সারাদেশেই সম্ভব হয়েছে। মনে হতে থাকে, এ বিজয় যেন আওয়ামী লীগের নয়, এ বিজয় জনগণের। আমরা জনগণ আনন্দে আত্মহারা হয়ে যাই।
 
১৯৭১ সালের মার্চ পর্যন্ত আমরা ভেবেছিলাম বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ অর্থাৎ বাঙালিরা পাকিস্তানের ক্ষমতা নেবে। কারণ বঙ্গবন্ধুর দল আওয়ামী লীগই পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ দল। কিন্তু বাঙালিদের সে স্বপ্ন ভেঙে খান খান করে দেয় পাকিস্তানের সামরিক সরকার ইয়াহিয়া খানের ঘোষণা। ১ মার্চ সে ঘোষণা করে, ৩ মার্চের পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করা হয়। জনগণ ভাবে, এটা পাকিস্তানিদের বাঙালিদের হাতে ক্ষমতা না দেওয়ার ষড়যন্ত্র। আবার ক্ষেপে যায় ছাত্ররা। 

রাস্তায় রাস্তায় স্লোগান ওঠে, ‘বাঁশের লাঠি তৈরি করো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো।’ বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করলেন, পাকিস্তানকে আর কোনও সহযোগিতা নয়। আবার গ্রাম থেকে মিছিল নিয়ে শহরে যাওয়া, গলা ফাটিয়ে স্লোগান তোলা, ছাত্রনেতাদের বক্তৃতার কথায় কথায় হাততালি দেওয়া শুরু হয়ে গেল আমাদের। সিরাজগঞ্জের এসডিও একে শামসুদ্দিনও আর এসডিপিও আনোয়ার উদ্দিন লস্কর প্রশাসন ছেড়ে নেমে এলেন জনতার মিছিলে। 

পঁচিশ মার্চের কালো রাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী হামলা চালায় নিরীহ বাঙালির ওপর। এ খবরে মিছিলের ঢল নামে শহরে। বিভিন্ন গ্রাম থেকে মিছিল যায় শহরে, আমাদের গ্রাম থেকেও মিছিল যায় শহর কাঁপাতে। যারা পাকিস্তানের পক্ষে ছিল তারাও বাঙালিদের আন্দোলনকে সমর্থন জানাতে শুরু করে। সিরাজগঞ্জে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর কোন ক্যাম্প ছিল না, ফলে বিনা যুদ্ধে শুধু মিছিলে মিছিলেই মুক্ত হয় সিরাজগঞ্জ মহুকুমা। শুরু হয় সিরাজগঞ্জকে হানাদার মুক্ত রাখার তৎপরতা।

পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হামলায় আক্রান্ত বাঙালিরা ঢাকাসহ বিভিন্ন শহর থেকে নিঃস্ব হয়ে ঘরে ফিরতে শুরু করে। তাদের মাধ্যমে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নির্মম অত্যাচারের খবর ছড়িয়ে পড়তে থাকে দেশের প্রত্যন্ত এলাকায়। ভীত হয়ে পড়ে সাধারণ মানুষ। এদিকে, প্রচার হতে থাকে যে, যে কোনও দিন পাকিস্তানি মিলিটারিরা চলে আসবে সিরাজগঞ্জেও। এতে ভীতসন্ত্রস্থ সিরাজগঞ্জবাসী শহর থেকে আশ্রয়ের সন্ধানে ছোটে গ্রামের দিকে। আমাদের তেলকুপি গ্রাম শহরের লাগোয়া, আমরাও বাড়ির গুরুত্বপূর্ণ জিনিসপত্র মাটির নিচে পুঁতে রেখে বাড়ি ছাড়ি, চলে যাই প্রত্যন্ত গ্রামের দিকে। 

২৭ এপ্রিল ভোর রাতে ঈশ্বরদী ও সৈয়দপুরের অবাঙালিদের সঙ্গে নিয়ে পাক-বাহিনী ঢোকে সিরাজগঞ্জ শহরে। তারা এসেই অগ্নিসংযোগ, হত্যা, ধর্ষণের মধ্য দিয়ে সিরাজগঞ্জ শহর ও তার আশপাশ এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। ভষ্মিভূত হয় সিরাজগঞ্জ শহর। শহরতলীর আমাদের গ্রামের প্রায় সব বাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়। বেশ কিছু নারী-পুরুষকেও হত্যা করাা হয় আমাদের গ্রামের মধ্যে। থমথমে হয়ে পড়ে সমগ্র এলাকা, আওয়ামী লীগ ও ছাত্রনেতারা চলে যায় আত্মগোপনে। 

পাকিস্তান সেনাবাহিনী শহরে আসার পর তাদের সহযোগিতার পথ বেছে নেয় মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামীসহ পাকিস্তানপন্থী রাজনৈতিক দল ও ব্যক্তিরা। আমাদের গ্রামের মুসলিম লীগ, জামায়াত কর্মীরাও সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়। কিন্তু সিরাজগঞ্জের এসডিও শামসুদ্দিন ও এসডিপিও আনোয়ার লস্কর শহর ছেড়ে চলে গেছেন তার আগেই। তাহলে পাকিস্তান কাকে দিয়ে চালাবে বেসামরিক প্রশাসন? প্রথমে দোয়াতবাড়ি গ্রামের জনৈক আলী ইমাম নামের এক অবাঙালি, তারপর মুসলিম লীগ নেতা তরিকুল ইসলাম লেবু মিয়াকে এসডিওর দায়িত্ব দিয়ে চালু করা হয় ভেঙে পড়া পাকিস্তানি প্রশাসন। 

তাদের সহযোগিতা করতে গঠন করা হয় শান্তি কমিটি, রাজাকার বাহিনী। মুসলিম লিগ, জামায়াত নেতাকর্মীদের প্ররোচনায় ধীরে ধীরে ফিরতে শুরু করে শহরের মানুষ। আমিও পরিবার-পরিজনের সাথে ফিরি নিজ গ্রামে, কিন্তু বাড়িতেও থাকি পালিয়ে পালিয়ে। চড়ার মধ্যে কাজ করি, পারতপক্ষে বাড়িতে আসি না, রাতে এসে খেয়েদেয়ে অন্য কোনও বাড়িতে গিয়ে থাকি।
  
এলাকার চেয়ারম্যান মেম্বাররা পাক-বাহিনীকে সহযোগিতার পথ বেছে নেয়। তারাও শান্তি কমিটি ও রাজাকার বাহিনী গঠনে সহযোগিতা করতে শুরু করে। আমাদের গ্রামের মেম্বারের ওপর চাপ আসে রাজাকার বাহিনীতে তরুণদের নাম দেওয়ার জন্য। আমাদের এলাকার মেম্বার নামের লিস্ট দেওয়ার সময় আমার নামও ঢুকিয়ে দেয়। এক কান দু’কান করে একথা সহজেই জানাজানি হয়ে যায়। রাজাকার বাহিনীতে যোগ দেওয়ার চাপে ভীত হয়ে পড়ি। একদিন গ্রামের মুরুব্বী ময়দান প্রামানিক আসেন আমার বাড়িতে। আলাদা করে বাইরে নিয়ে ফিস ফিস করে বলেন- তোর নামতো রাজাকার বাহিনীতে দিছে। আমি তাকে জিজ্ঞেস করি- কী করবো, বুদ্ধি দেন, আপনে তো আমার মুরুব্বি। তিনি বলেন- গ্রাম ছেড়ে চলে যা, তাও রাজাকারে যাসনে। দরকার পড়লে মুক্তিযুদ্ধে যা, তোদের মতো জোয়ান মানুষ ঘরে বসে থেকে মার খাবি কেন, দেশের কাজে লেগে যা। তাকে বললাম- আমার হাতে তো একটা পয়সাও নেই, এ অবস্থায় কী করবো। তিনি তখন তার পকেট থেকে ১০ টাকা বের করে আমার হাতের মধ্যে গুঁজে দিলেন। বললেন- আমার দেওয়ার মতো এই আছে, তুই এলাকা ছেড়ে মুক্তিযুদ্ধে চলে যা। বাড়িতে ফিরে রাতে বউকে খোলাসা করে না বলে বল্লাম- মেম্বার সাব আমার নাম রাজাকার বাহিনীতে দিয়েছে, কিন্তু আমি যাব না সেখানে। আমার স্ত্রী আর কী বলবেন, তারও তো বলার কিছু নেই। আসলে তিনিও চান না যে, আমি রাজাকার বাহিনীতে যোগ দেই। 
 
সকালে উঠে খেয়েদেয়ে কাউকে কিছু না বলে রওনা হলাম অজানার উদ্দেশ্যে। এক কাপড়েই রওনা হতে হলো, কারণ, বেশি কাপড় নিতে গেলে জানাজানি হবে। বাড়ি থেকে বের হয়ে ভাবলাম, ইন্ডিয়ায় যাব, যোগ দেব মুক্তিযুদ্ধে। অনেকের কাছেই শুনেছি যে, শুভগাছার যমুনার ঘাট থেকে প্রায় প্রতিদিনই নৌকা যাচ্ছে রৌমারী মাইনকার চরে। সেখানে প্রশিক্ষণ নিচ্ছে মুক্তিযোদ্ধারা। রওনা হলাম সেদিকেই। পথেই দেখা, চন্দ্রকোনার আনোয়ার, খালেক, লুৎফর, টুম্পা, গোলামের সঙ্গে। ওরাও যাবে মুক্তিযুদ্ধে। ওদের পেয়ে সাহস আরো বেড়ে গেল। 

নৌকার মাঝির সঙ্গে মাইনকার চরে যাওয়ার ব্যাপারে কথা হলো। আমার কাছে পয়সা কম, তবুও নৌকার মাঝি নিতে রাজী হলো। শুভগাছা ঘাটেই দেখা রহমতগঞ্জের ইসমাইল আর জাকিরের সঙ্গে। ওদের সঙ্গে কথাবার্তা বলে নৌকায় উঠতে যাবো, সে সময় বাঁধা দিলো ইসমাইল (রহমতগঞ্জ)। বলল যে, তোমার রৌমারীতে গিয়ে কোনও লাভ নেই, কারণ ওখানে কমপক্ষে ম্যাট্রিক পাশ ছেলেদেরই ট্রেনিংয়ে নেয়। সেখানে গেলে আবার ফিরেই আসতে হবে। ইসমাইলই ওসমান মাঝিকে দায়িত্ব দেয় আমার থাকার ব্যবস্থা করতে। আর ইসমাইল চলে যায় কয়েকজনকে রৌমারী পৌঁছে দিতে। আমি মাইনকার চর যেতে না পেরে হতাশ হয়ে পড়ি। সেদিনের মতো থেকে যাই শুভগাছার ওসমান মাঝির বাড়িতেই।
 
শুভগাছা থেকে বাড়ির পথ মাত্র এক বেলার, কিন্তু বাড়িতে ফিরতে মন টানে না, কিন্তু যাবো কোথায়? এ আত্মীয় বাড়ি, ও বন্ধুর বাড়ি, আমিনপুর, ফুলকোচা ঘুরে ঘুরে তিন দিন পর ফিরে আসি বাড়িতেই। কিন্তু বাড়িতে থাকি না রাজাকার হওয়ার ভয়ে। সারাদিন চড়ার মধ্যে থাকি, ক্ষেতে কাজ করি, কারো সঙ্গে যেন দেখা না হয়, সেভাবেই চলাফেরা করি। রাতের অন্ধকারে চোরের মতো বাড়িতে ঢুকে চারটে খেয়ে আবার পালাই যাতে কেউ দেখতে না পায়। এ অবস্থায় খবর পাই যে, লতিফ মির্জা ভদ্রঘাটে মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প খুলেছে। খবর পেয়েই  আমার চাচাতো ভাই কুদ্দুসকে সঙ্গে নিয়ে যাই ভদ্রঘাট। কিন্তু সেখানে গিয়ে জানতে পারি যে, আগের দিনই অর্থাৎ ১৭ জুন লতিফ মির্জার বাহিনীর সঙ্গে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর তুমুল যুদ্ধ হয়েছে। সেখান থেকে মুক্তিযোদ্ধারা সরে গেছে দূরে কোথাও। অল্পের জন্য মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেওয়া হলো না বলে হতাশ হয়ে আবার ফিরে আসি এলাকায়। আবারো বনেবাদারে ঘুরে বেড়াই, ক্ষেতে কাজ করি পালিয়ে পালিয়ে, আর রাতে গোপনে বাড়ি গিয়ে খেয়ে চলে আসি, অন্য কারো বাড়িতে রাত কাটাই।
 
একদিন দুপুরে চন্দ্রকোনার ক্ষেতে কাজ করছি, কুদ্দুস এসে জানায় যে, রৌমারী থেকে ফিরে এসেছে ইসমাইল, আমাকে দেখা করতে বলেছে। তখনই ইসমাইলের সঙ্গে দেখা করতে যাই কুদ্দুসকে সঙ্গে নিয়ে। ইসমাইল তখন বাড়িতেই, সে আমাকে একটি রাইফেল হাতে দিয়ে কুদ্দুসকে গুলি করতে বলে। আমি ভ্যাবচ্যাকা খেয়ে যাই, ইতস্তত করি। কুদ্দুসও বলে, কমান্ডার যখন বলছে, মার গুলি, দেখি তোর কত সাহস! আমিও রাইফেল হাতে তুলে নিই, তাক করি কুদ্দুসের দিকে। তখন ইসমাইল আমাকে ঠেকিয়ে দিয়ে বলে, ঠিক আছে তুই পারবি। আজ সন্ধ্যায় আসিস, অপারেশনে যাবো। আমি আর কুদ্দুস দু’জনেই তখনকার মতো চলে আসি।
 
সন্ধ্যায় নির্দিষ্ট সময়ের আগেই সঠিক স্থানে পৌঁছে যাই। সেখানে আমার মতোই জড় হয় আরো ১৪/১৫ জন। আসে ইসমাইলও। তার কথা মতো, উত্তর দিকে রওনা দেই সবাই, কিন্তু কোথায় যাচ্ছি তা জানি না। যেতে যেতে পৌঁছে যাই কেচুয়াহাটা গ্রামে। আমাদের কয়েক জনকে গ্রামের বাইরে রেখে অন্যরা গ্রামে ঢুকে পড়ে। সেখানে এক ডাকাতকে ধরা হয়। তার কাছে থেকে উদ্ধার করা হয় তিনটি রাইফেল আর বেশ কয়েকটি গুলি। ডাকাতকে ছেড়ে দিয়ে আমরা সবাই আবার ফিরে আসি এলাকায়। সারাদিন গ্রামের আশেপাশে থাকি। আবার সন্ধ্যায় একত্রিত হই। এ ভাবে চলতে চলতে আসে বর্ষাকাল। নদীনালা, খালবিল ভরে ওঠে বর্ষার পানিতে। তখন একটি নৌকা ঠিক করা হয়। ইসমাইলের নেতৃত্বে আমরা প্রায় ২৫ জনের মুক্তিযোদ্ধা উঠে পড়ি নৌকায়। আজ বেলকুচি তো কাল চলে আসি কামারখন্দ এলাকায়। কখনো বা বাগবাটী রতনকান্দি অঞ্চলে। 

রতনকান্দির শ্যামপুর গ্রাম থেকে একদিন আমরা রওনা হলাম চক ডাকাতিয়া নদী হয়ে। সেখানে লতিফ মির্জার পলাশডাঙ্গা বাহিনী অবস্থান করছিল। আমরা সেখানে ঢুকতেই আমাদের ‘হল্ট’ করতে বলা হলো। আমরা হাত উপরে তুলে পরিচয় দিলাম। তখন আমাদের সে এলাকায় ঢুকতে দেওয়া হলো। আলোচনা শেষে আমাদের ইসমাইল বাহিনী মিশে গেল পলাশডাঙ্গায়।
 
ইসমাইলের নিয়ন্ত্রণে দেওয়া হলো দু’টি নৌকা- ৯-এ ও ৯-বি। আমাকে নিয়ে যাওয়া হলো ব্যাটালিয়ন কমান্ডার লুৎফর রহমান অরুণের নৌকায়। অরুণদা বললেন- তুমি আমার বডিগার্ড। কিন্তু তখনো জানিনা বডিগার্ড কথার মানে কী? অরুণদা বুঝিয়ে বললেন, সব সময় আমার সাথে সাথে থাকবি, আমি যেখানে যাই, সেখানে যাবি, যা করতে বলি করবি। সেদিন থেকেই অরুণদার ছায়াসঙ্গী হয়ে পড়ি। ধীরে ধীরে লেখাপড়া জানা মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে চলতে চলতে বুঝতে পারি যে বডিগার্ড মানে দেহরক্ষী। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে লুৎফর রহমান অরুণের বডিগার্ড হতে পারাটা আমার জন্য বিরাট গর্বের, কারণ তিনি ছিলেন পলাশডাঙ্গার কমান্ডার, তার স্নেহ ছায়াতলে থাকার কারণেই পলাশডাঙ্গার সকল মুক্তিযোদ্ধার কাছে আলাদা খাতির-সন্মান পেয়েছি। তার অংশ নেওয়া সকল যুদ্ধেই আমাকে অংশ নিতে হয়েছে। সে সব যুদ্ধের কথা অনেকেই লিখেছেন, অনেকে লিখবেন, আর বড় মানুষেরা যখন যুদ্ধের কথা বলবেন, তখন তাদের যুদ্ধকথাই সবাই শুনবেন। তাই যুদ্ধ আলোচনার চেয়ে অন্য কথা বলাই ভালো বলে মনে হয়।
 
পলাশডাঙ্গার তখন অনেকগুলো নৌকা, পঞ্চাশটির কম নয়। সবগুলো নৌকা কাছাকাছি একটি বড় গ্রাম বা কয়েকটি ছোট ছোট গ্রামের মধ্যে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকতো। সকালে সবার জন্য প্রতিদিন বরাদ্দ করা পাঁচ সিকা করে ব্যাটালিয়নের নৌকা থেকে নিয়ে আসতে হতো। টাকা বিতরণ করতেন পলাশডাঙ্গার ক্যাসিয়ার রতনকান্দির চিলগাছা গ্রামের আব্দুল হাই তালুকদার। নৌকার যে কোনও একজন বাজার করে আনতো। বাজার শেষে যদি কিছু থাকতো তবে তার ভাগ ফেরত পেতাম। কেউ বিড়ি খেতো, কেউ সিগারেট, তাও আনতে হতো বাজার থেকে। সন্ধ্যার আগেই খাওয়াদাওয়া শেষ করতে হতো, কারণ রাতে নৌকায় বাতি জ্বালানো নিষেধ। সন্ধ্যায় নৌকায় মুক্তিযোদ্ধাদের হাজিরা নেওয়া হতো। তারপর নৌকা গণনা হতো। তারপর আগের দিনের আশ্রয় ছেড়ে চলে যেতে হতো নতুন আশ্রয়ে।
 
রোজার প্রথম দিন। আমরা হান্ডিয়াল-নওগাঁ অঞ্চলে নোঙর করে আছি। প্রায় সবাই রোজা রয়েছে, নৌকায় নৌকায় সেদিন বিশেষ বাজারের ব্যবস্থাও করা হয়েছে। বিকেলের দিকেই ইসমাইলের নৌকা থেকে দাওয়াত দিয়ে গেল যে, আমরা ইসমাইল বাহিনীতে যারা ছিলাম, তারা সবাই এক সঙ্গে ইফতার করবো। এ ব্যাপারে অরুণদাকে বলতেই তিনি যেতে নিষেধ করলেন। ইফতারের আগে আগে আবারো খবর এলো, ইসমাইলের নৌকায় ইফতার করার জন্য। এবারো অরুণ দা নিষেধ করে বললেন, আমরাও তো এক সঙ্গে ইফতার করবো, নিজের দলের সঙ্গেই রোজার প্রথম ইফতার করা দরকার। মনে হলে ইফতারের পরে গিয়ে দেখা করে এসো। আমার আর ইসমাইলের নৌকায় ইফতার করতে যাওয়া হলো না। 

ইফতার ও রাতের খাওয়া শেষে এবার এ আশ্রয় ছেড়ে অন্য আশ্রয়ে যাওয়ার পালা, তার আগে মুক্তিযোদ্ধা হাজিরা, নৌকার হাজিরা। নৌকার হাজিরা দেখতে গিয়ে পাওয়া গেল যে, ৯-এ আর ৯-বি অনুপস্থিত। নেই ইসমাইলের নৌকা। সে দুই নৌকার মুক্তিযোদ্ধারাও নেই। তার মানে, ইসমাইলরা পলাশডাঙ্গা ছেড়ে চলে গেছে। পরে খোঁজ নিয়ে দেখা গেল যে , ইসমাইলের সঙ্গে পলাশডাঙ্গায় আসা সবাইকে এভাবে ইফতারের কথা বলে গোছানো হয়েছে। প্রায় সবাই সে ইফতার করতে গিয়ে চলেও গেছে ইসমাইলের সঙ্গে। বুঝতে পারলাম, কেন ইসমাইলের নৌকায় ইফতার করার জন্য আমাকে টানা হেঁচড়া করছিল। আবার স্পষ্ট করে বলেনি যে, যদি তাদের পরিকল্পনা ফাঁস হয়ে যায়! আমি মনে মনে আল্লাহকে ধন্যবাদ দেই যে, ইসমাইলের নৌকায় ইফতার করতে না গিয়ে ভালোই হয়েছে। ইসমাইল যাই চেষ্টা করুক অথবা আমার পুরনো সহযোদ্ধারা থাকুক, একটা বড় বাহিনী ছেড়ে আমাকে চলে যেতে হয়নি।
 
১১ নভেম্বর বড় ধরণের আঘাত আসে পলাশডাঙ্গার ওপর, আমরা সেদিন আশ্রয় নিয়েছি হাণ্ডিয়াল-নওগাঁ এলাকায় জিন্দান শাহর মাজার ঘিরে, ঘাটে ঘাটে নৌকা বাঁধা আছে। ভোর রাতের দিকে বোঝা গেল যে, পাকিস্তানি সৈন্য ও তার সহযোগিরা আমাদের ঘিরে ফেলেছে। কিন্তু ঘেরাওয়ের মধ্যে পড়েও ঘাবড়ে যাইনি আমরা। যার যার মতো ছড়িয়ে ছিটিয়ে বিভিন্ন স্থানে পজিশন নেই, শুরু হয় তুমুল যুদ্ধ। সে যুদ্ধ চলে পরদিন দুপুর পর্যন্ত। পাকিস্তানী সেনাবাহিনী হয়তো ভেবেছিলো যে, দু’তিন ঘণ্টার মধ্যেই আমাদের পরাজিত করতে পারবে, কিন্তু আমরাও মাটি কামড়ে পড়ে থাকি। ধীরে ধীরে পাকিস্তানিরা ঘাবড়ে যেতে থাকে। সময় যত গড়ায়, পাকিস্তানিরা কাঁদা-প্যাঁকে আটকা পড়তে থাকে। বুট জুতা, জামাকাপড়, অস্ত্রশস্ত্র চলনবিলের কাঁদামাটিতে ভিজে তা ভারি হয়ে উঠতে শুরু করে। সময় যত গড়াতে থাকে, এলাকার মানুষজনেরও সাহস বাড়তে থাকে। তারাও ঘিরে ধরতে শুরু করে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও তার সহযোগিদের। দুপুরের দিকেই আমাদের বিজয় নিশ্চিত হয়, পাকিস্তানিরা পালানোর পথ খুঁজতে থাকে। এক সময় তারা অস্ত্রশস্ত্র ফেলে পালাতে শুরু করে। এ পরিস্থিতিতে জনগণও তাদের ইচ্ছেমতো মারপিট শুরু করে। মেয়েরা পর্যন্ত তাদের ঘষির মাঁচা থেকে ধরে এনে আমাদের কাছে জমা দিতে থাকে অস্ত্রগুলি সহ। এ ভাবেই বিজয়ী হই আমরা পলাশডাঙ্গার মুক্তিযোদ্ধারা। 

একজন ক্যাপ্টেন সহ অন্তত ১২ জন ধরা পড়ে, আর মারা পড়ে এক কোম্পানি পাকিস্তানি সৈন্য, শতাধিক রাজাকার। আমাদের কেউ শহীদ হননি। তবে, জামতৈলের কাঞ্চু, মধু নাইন্নার সালামসহ ৪ মুক্তিযোদ্ধা আহত হন। যুদ্ধ শেষে দেখা গেল, বেশ কিছু মুক্তিযোদ্ধা পলাশডাঙ্গা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। এ বিজয় পলাশডাঙ্গার মুক্তিযোদ্ধাদের আরো আত্মবিশ্বাসী করে তোলে, কিন্তু যুদ্ধের কৌশল পাল্টানোর প্রয়োজন পড়ে। 

কমান্ডাররা নৌকা ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, কারণ তখন বন্যা আর নেই, সংকুচিত হয়ে এসেছে চলনবিলের পানিবহুল এলাকাও। হান্ডিয়াল-নওগাঁ এলাকা ছেড়ে আপাতত অন্য চলে যাওয়ার ব্যপারেও ভাবনা চিন্তা শুরু হয়। এর দু’দিন পরেই আমরা গুরুদাসপুর এলাকায় যাওয়ার চেষ্টা করি, কিন্তু সে এলাকায় পাকিস্তানি মিলিটারি ও রাজাকারদের চাপ বেড়ে যাওয়ায় ওদিকে যাওয়া হয় না। বগুড়ার দিকেও একই অবস্থা। মোহনপুরের দিকেও যাওয়া সম্ভব হয় না। নাটোরের তালম এলাকায় সরে যাই আমরা। ওই এলাকার রাণীরহাট গ্রামে আমাদের রোজার ঈদ পার হয়। আবার ফিরে আসি পরিচিত এলাকার দিকে। নিমগাছীর দিকে এসে সেখানকার চেয়ারম্যানের কাছে আশ্রয়ের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দিলে তাদের বাড়িঘর পুড়িয়ে দেবে বলে তারা কান্নাকাটি করতে শুরু করে। তখন আমাদের দল বগুড়ার ধুনুট হয়ে কাজীপুর-রতনকান্দির দিকে সরে যাওয়ার চিন্তা করে। আমরা বগুড়ার চান্দাইকোনা বাজার হয়ে ধুনুটের মধ্যে ঢুকে পড়ি। কমান্ডারেরা সিদ্ধান্ত নেয় কয়েকদিন এলাকা ছেড়ে থাকার। এজন্য তারা সিদ্ধান্ত নেয় মুক্ত এলাকা নিরাপদ আশ্রয় মাইনকারচর হয়ে রৌমারী যাওয়ার। আমরা চলে আসি ব্রহ্মগাছার পাশ্ববর্তী চকডাকাতিয়া গ্রামে।

নওগাঁ যুদ্ধের আগের দিন পলাশডাঙ্গা থেকে কয়েক জন মুক্তিযোদ্ধা ছুটি নিয়ে বাড়িতে গেছে বাবামায়ের সঙ্গে দেখা করতে। এলাকা ছাড়ার আগেই তাদের বাহিনীতে নিয়ে আসতে হবে, এজন্য আমাকে পাঠানো হয় আমার এলাকায়। হয়তো এ ভাবেই অন্য এলাকায় আরো কাউকে পাঠানো হয়। আমি চন্দ্রকোনা থেকে ইনসাফ, খায়ের ও গোলামকে খুঁজে বের করি এবং যুদ্ধের খবরাখবর ও বাহিনীর সিদ্ধান্ত জানাই। ওরা সঙ্গে সঙ্গেই রওনা হই। এর পর আমি খোকসাবাড়ীতে যাই আব্দুল হাইকে খুঁজতে। ওর বাড়ি গিয়ে জানতে পারি যে আব্দুল হাই রৌমারীতে চলে গেছে। আমি রতনকান্দির ক্ষুদ্রবয়ড়া গ্রামে এসে পলাশডাঙ্গার সঙ্গে যুক্ত হই। সেখানে জানতে পারি যে, এ কয়দিনে কমান্ডারেরা নৌকা ঠিক করে রেখেছে রৌমারীতে যাওয়ার জন্য। পরের দিন আমরা পলাশডাঙ্গার সবাই মেছড়ার যমুনার ঘাট থেকে উঠে পড়ি রৌমারীর উদ্দেশ্যে। নানা বাধাবিপত্তি পেরিয়ে তিন/চার দিনে অর্থাৎ নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে আমরা পৌঁছে যাই বাংলাদেশের অন্যতম মুক্ত এলাকা কুড়িগ্রামের রৌমারীতে। সেখানে আমাদের থাকার ব্যবস্থা হয়। আমাদের ছেড়ে নেতারা ছোটেন কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ ও পরবর্তী নির্দেশনার জন্য।

ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে শুরু হয় আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের চূড়ান্ত পর্ব। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ও ভারতীয় সেনাবাহিনী যুক্ত হয়ে গঠন করা হয় মিত্র বাহিনী। তারা বিভিন্ন দিক থেকে ঢুকে পড়ে বাংলাদেশের মধ্যে। ১৬ ডিসেম্বর বিকেলে আত্মসমর্পণ করে পাকিস্তান বাহিনীর জেনারেল নিয়াজি। বিজয়ী হয় মুক্তিযুদ্ধ। এর দু’তিন দিনের মধ্যে পলাশডাঙ্গার নেতৃবৃন্দ, যারা বিভিন্ন স্থানে গিয়েছিলেন যোগাযোগ করতে, তারা ফিরে আসেন। আমরাও রওনা হই সিরাজগঞ্জের দিকে। 

ভাটির টানে আসতে সময় লাগে না, আমরা দেড় দিনের মধ্যে পৌঁছে যাই সিরাজগঞ্জে। জেলখানার ঘাটে এসে নামি সবাই। এক ধরণের কৌতুহল থেকে জেলখানার ভিতরে ঢুকি। পরিচিত যারা স্বাধীনতার বিরোধীতা করেছে তাদেরও দেখি সেখানে আটকা থাকতে। আমাকে দেখে পরিচিতরা মুখ লুকায়। কেউ কেউ কথা বলার চেষ্টা করে, কিন্তু আমি মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে বের হয়ে আসি জেলখানা থেকে।
 
পলাশডাঙ্গার প্রথম ক্যাম্প করা হয় সিরাজগঞ্জ কলেজের হোস্টেলে। কয়েকদিন সেখানে থাকার পর কলেজের পড়াশোনা শুরু হওয়ার তোড়জোর শুরু হয়, ফলে হোস্টেল ছেড়ে দিতে হয়। পলাশডাঙ্গার সবাই ঠাঁই নেয় মোক্তারপাড়ার মোড়ের সাহারা হোটেলে। এর মধ্যে জানুয়ারির মাঝামাঝি কলেজ মাঠে আমাদের অস্ত্র জমা দেওয়া হয়, অস্ত্র জমা দেওয়ার অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত হন প্রবাসী সরকারের অর্থমন্ত্রী ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী। ধীরে ধীরে পলাশডাঙ্গার মুক্তিযোদ্ধারা যার যার কাজে স্কুল কলেজে বা বাড়িতে ফিরতে শুরু করেন। আমিও ফিরে যাই নিজের বাড়িতে পরিবারের কাছে। 

অনুলিখন- সাইফুল ইসলাম, মুক্তিযোদ্ধা-লেখক।  

[বীর মুক্তিযোদ্ধা জেলহোসেন মন্ডল। পলাশডাঙ্গা যুব শিবিরের একজন সদস্য হিসেবে তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। তিনি ৩ কন্যা ৩ পুত্র সন্তানের জনক। বর্তমানে খোকসাবাড়ী ইউপি সদস্য।]
  

অআই