|

ঘর-পালানো তরুণ তুর্কীর যুদ্ধকথা (দ্বিতীয় অংশ)

Published: Thu, 12 Sep 2019 | Updated: Thu, 12 Sep 2019

[পূর্ব প্রকাশের পর]
মোহনপুরের কাছে গিয়ে রেললাইনে উঠি। সে লাইন ধরে হাঁটতে থাকি ঈশ্বরদীর দিকে। কিন্তু সে পথে চলা তখন খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ, চলনবিল তখন বর্ষার পানিতে ভরে গেছে। রেললাইনটি শুধু জেগে আছে, সে রেললাইনে মাঝে মধ্যেই পাক-বাহিনী রেলইঞ্জিন নিয়ে টহল দিতে আসে। তারা এসে পড়লে রেললাইন ছেড়ে যাওয়ার কোনও সুযোগ নেই, নির্ঘাত ধরা পড়তে হবে তাদের হাতে। তবুও আগে পিছে দূরত্ব বজায় রেখে হাঁটতে থাকি আমরা ৬ জন। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামে। আমরা সন্ধ্যার পর গিয়ে দিলপাশার স্টেশনে পৌঁছি। কিন্তু ওখান থেকে রেজাউলের আত্মীয় বাড়ি নৌকা ছাড়া পৌঁছা সম্ভব নয়। একজন মাত্র দোকানদার বসে আছে, সে জানালো, আর কিছুক্ষণ পরে ঈশ্বরদী থেকে পাক-বাহিনী ইঞ্জিন নিয়ে আসবে, তাই এখান থেকে এখনই সরে না পড়লে ধরা পড়তে হবে পাক-বাহিনীর হাতে। 

কিভাবে নৌকা পাবো এ চিন্তায় আমরা দিশেহারা হয়ে নৌকা খুঁজতে থাকি। কাছেই একটা জেলে নৌকা পাওয়া যায়, কিন্তু সে এখন নিয়ে যেতে পারবে না। বাধ্য হয়ে তাকে ভয় দেখাই, সে তখন পার করে দিতে রাজী হয়। আমরা নৌকায় উঠে রওনা হওয়ার দুদণ্ডের মধ্যেই চলে আসে রেলইঞ্জিনটি। আমরা অল্পের জন্য পাক-সেনাদের হাতে ধরা পড়া থেকে বেঁচে যাই। দূরত্বের কারণে রেজাউলদের সঙ্গে এ আত্মীয় বাড়িতে কোনও যোগাযোগই নেই, ওরা আমাদের পেয়ে খুব খুশি হয়। অনেক আদরযত্ন করে। 

পরের দিন সকালে উঠেই রওনা হই রেল লাইন ধরে। গুয়াখাড়া স্টেশনের কাছে গিয়ে রেললাইন ছেড়ে হাঁটতে থাকি পশ্চিম দিকে। দয়ারামপুুর জমিদার বাড়ি পার হয়ে এবার খুঁজতে থাকি টুনিপাড়া শহীদুলের আত্মীয় বাড়ি। খুঁজতে খুঁজতে অবশেষে পাওয়া গেল সে বাড়ি। তাদের থাকার ঘর একটাই, সে ঘরের মেঝেতেই কাঁথা বিছিয়ে সবার থাকার ব্যবস্থা হলো। আবার ভোরেই রওনা হলাম তাদের অনেক অনুরোধ সত্বেও, কারণ আমরা তো নিমন্ত্রণ খেতে আসিনি, যত তাড়াতাড়ি পারি আমাদের সীমান্ত পার হতে হবে।

হাঁটতে হাঁটতে আবার রেললাইন, আব্দুলপুর স্টেশনের পাশ দিয়ে রেললাইন পার হয়ে আমরা চলে এলাম রাজশাহী জেলার চারঘাটের কাছে পদ্মা নদীর কাছে। আমাদের সবার কাছে টাকাকড়ির অভাব, অনেক খুঁজে সস্তায় একটা নৌকা পাওয়া গেল। তাতে পদ্মা পার হয়ে আমরা পৌঁছে গেলাম ভারতের নদীয়া জেলায়। নাম লেখালাম কেচুয়াডাঙ্গার বিধানচন্দ্র বিদ্যানিকেতনে স্থাপিত ইয়ুথ ক্যাম্পে। সেখানে পাবনাসহ বিভিন্ন জেলা থেকেও অনেতে এসেছে মুক্তিযুদ্ধে নাম লেখাতে। পাবনার ছিল বকুল, সাইদুল, শফি, রাজ্জাক সহ অনেকেই। এর সপ্তাহ দুয়েক পরেই একদিন ৬০/৭০ জন ছেলে নিয়ে ক্যাম্পে এলেন শাহজাদপুরের এমপি আব্দুর রহমান। তিনি এসে দু’তিন দিন পর আমাদের শত খানেক তরুণকে নিয়ে গেলেন বেড়ার এমএনএ অধ্যাপক আবু সায়ীদের বালুরঘাট কামারপাড়া ক্যাম্পে। কিন্তু তিন দিন পরই আবার ফিরে আসতে হলো আগের ক্যাম্পে। এই টানাহেঁচড়ার মধ্যে ক্যাম্প থেকে দেশে ফিরে গেল শহীদুল। আবার কয়েকদিন পরই আগের ক্যাম্প শিফট করে আমাদের চলে আসতে হলো পাতিরামপুর নতুন ক্যাম্পে।

পাতিরামপুর নতুন ক্যাম্পে সকাল-বিকাল প্যারেড পিটির পাশাপাশি চলতে লাগলো প্রশিক্ষণের জল্পনা কল্পনা, কবে আমাদের হায়ার ট্রেনিংয়ে পাঠানো হবে এসব। একদিন হঠাৎ করে ক্যাম্পে হাজির হলেন আমাদের সঙ্গী সরোয়ারের বাবা আবু বকর, তিনি তার ছেলেকে খুঁজতে খুঁজতে চলে এসেছেন এখানে। তার আগে কোলকাতায় গিয়ে আওয়ামী লীগ নেতাদের খুঁজে বের করে এ ক্যাম্পের নাম পেয়েছেন। তিনি সারাদিন আমাদের সঙ্গে থাকলেন, এলাকার পরিস্থিতি, সবার বাড়ির খবর জানালেন। বিকেলের দিকে অশ্রু সজল চোখে আমাদের কাছে থেকে বিদায় নিলেন।

১৪ আগস্ট আমাদের ইয়ুথ ক্যাম্পে একটি টিম এলো হায়ার ট্রেনিংয়ে রিক্রুট করতে। ওই দিনই খুব সহজেই আমরা ৫ জন রিক্রুট হয়ে গেলাম। এখন শুধু মনোযোগ দিয়ে প্রশিক্ষণ নেওয়া, অস্ত্র হাতে এলাকায় ফিরে যাওয়া আর শত্রু হননে মেতে উঠে দেশকে হানাদার মুক্ত করা। পরদিন ১৫ আগস্ট আমরা রওনা হলাম হায়ার ট্রেনিংয়ের উদ্দেশ্যে। আমরা সমতলের মানুষ, কিন্তু আমাদের যেতে হবে পাহাড়ে। প্রথমে ট্রাকে, তারপর ট্রেনে, আবার ট্রাকে সমতল থেকে আমরা যেতে লাগলাম পাহাড়ের দিকে। সমতলের মানুষ, পাহাড় দেখার উত্তেজনা অনুভূতি আলাদা। 

ট্রেন আমাদের নামিয়ে দিল শিলিগুড়িতে, তারপর আবার ট্রাকে পাহাড়ের আঁকাবাকা পথে, অবশেষে আমরা পৌঁছে গেলাম পানিঘাটা প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে। শুরুতেই নামধাম লিখে আমাদের পড়ার জন্য কিছু কাপড়চোপর, খাওয়ার জন্য একটি প্লেট একটি মগ দেওয়া হলো। আমাদের থাকার  ব্যবস্থা হলো তাবুতে। ঝর্ণার পাশে স্থাপন করা হয়েছে প্রশিক্ষণ ক্যাম্প। ক্যাম্পের পাশ দিয়ে ঝর্ণার পার  হতে ঝুলন সেতু, যা আমাদের এলাকায় অকল্পনীয়। 

পরদিন শুরু হয়ে গেল ৪০ দিনের প্রশিক্ষণ। ৩৬ গ্রেনেড, থ্রিনটথ্রি রাইফেল, এসএলআর, স্টেনগান, সাব-মেসিন গান, মর্টার গান- পর্যায়ক্রমে এক্সপ্লোসিভ প্রশিক্ষণও হতে লাগলো। সকালে প্যারেড-পিটি, ৮টার দিকে চা-নাস্তা, এরপর অস্ত্রের প্রশিক্ষণ, ১১টার দিকে চা-নাস্তা, ১টা পর্যন্ত অস্ত্র প্রশিক্ষণ, দুপুরে গোসল খাওয়া অল্প বিশ্রাম, ৩টার দিকে আবার প্রশিক্ষণ বিকেল পর্যন্ত। প্রশিক্ষণ চলাকালে বিভিন্ন এলাকার মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গেও পরিচয় হতে লাগলো। সিরাজগঞ্জ মহুকুমারই পাওয়া গেল অনেককে। এর মধ্যে তাড়াশের আমজাদ হোসেন মিলনকে দোভাষী হিসেবে পেলাম আমরা, কারণ সে হিন্দি ভালো বুঝতো। 

শেষ পর্যায়ে এসে আমাদের সেকশনে ভাগ করে গ্রুপ করে দেওয়া হলো। আমাদের গ্রুপ হলো ২৩ জনের, গ্রুপের কমান্ডার হলেন কুয়াত-ইল ইসলাম। গ্রুপ কমান্ডার কুয়াত-ইল ইসলামের সঙ্গে আমাদের আগে পরিচয় ছিল না, প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে এসেই পরিচয়। যদিও তিনি আমাদের এলাকারই লোক। তিনি তখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের নেতা এবং তখনকার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র-সংসদের সহ-সাহিত্য সম্পাদক। প্রশিক্ষণ শেষে সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে আমাদের পাঠানো হলো মোহদীপুর ক্যাম্পে, সেখান থেকে পাঠানো হলো চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জের অপর পাড়ে। সেখানে ভারতীয় সেনাদের নিয়ন্ত্রণে আমাদের দায়িত্ব দেওয়া হলো ভারতীয় ডিফেন্সে। আমরা সেখানে নিয়মিত সীমান্ত পাহারা দিতে লাগলাম, পাশাপাশি রাতে সীমান্ত পার হয়ে পিছন দিক থেকে পাক-সেনাদের ওপর হামলা চালাতাম। 
[চলবে]

 

লেখক- মুক্তিযোদ্ধা নূর মোহাম্মদ নূরনবী

/এসিএন