|

আমার দেখা বরইতলার যুদ্ধ : ফজলুল হক মনোয়ার

Published: Mon, 10 Aug 2020 | Updated: Mon, 10 Aug 2020

রোজার শেষদিক, ঈদের মাত্র ২/৩ দিন বাকি আছে। কিন্তু  ঈদের আমেজ নেই যুদ্ধের কারণে। মানুষ সবসময় আতঙ্কিত থাকে। বাড়িটি বেশ ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। কারণ গতরাতেও বাড়িতে প্রায় ৪০/৫০ জন লোক ছিল। 

আমাদের বাড়িতে মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প ছিল। গতরাতে খাবার খেয়ে সবাই উত্তর পাড়া চলে যায়। তারা চলে যাবার পরই মা  সিগারেটের গোড়াগুলো মাটিতে পুঁতে রাখে। পাকসেনারা এসে এত সিগারেটের অংশ  দেখলে সন্দেহ করতে পারে, তাই এ কাজ করেন তিনি।  

পরদিন সকালে প্রায় ৯/১০টার দিকে ১২৫/১২৬ জন মুক্তিযোদ্ধা গেঞ্জি গায়ে রাইফেল কাঁধে করে আমাদের বাড়ির পাশের রাস্তা দিয়ে লাইন ধরে নয়াপাড়া পার হয়ে বরইতলার দিকে যাচ্ছে। যতদূর  চোখ গেল চেয়ে দেখলাম। মার কাছে শুনলাম রাতে প্রায় ১৫০/১৬০ জন মুক্তিযোদ্ধা আমাদের বাড়িতে মিটিং করে সবাই উত্তর পাড়া চলে যায়। তারাই এখন বরইতলারদিকে যাচ্ছে। 

আগের দিন মুক্তিযোদ্ধারা চলে যাওয়ার কারণে বাড়িটি ফাঁকা হয়ে গেছে। শেষ রাতে (১২ নভেম্বর দিবাগত রাতে) সেহরি খেতে বসেছি, হঠাৎ করে শব্দ হলো। মা বললো, দেখতো নৌকাটা মনে হয় কেউ নিয়ে যাচ্ছে। আমি খাওয়া দাওয়া বাদ দিয়ে নৌকাটা কেউ নিয়ে গেল কি না দেখার জন্য ঘরের বাইরে গেলাম। আসার সাথে সাথে আমার বড়ভাই (চাচাতো ভাই)র সালা মন্তাজ ভাই চিৎকার দিয়ে এসে বললো, বরইতলায় মেলিটারি এসেছে। সারা গ্রামে আগুন, সবাই বাড়ির পশ্চিম পাশে গিয়ে দেখি আগুন আর আগুন। মাঝে মাঝে ঝাঁকে ঝাঁকে গুলি ছুড়ছে তারা। 

বাড়ির মহিলাদের বাড়ির পূর্বদিকে পাঠিয়ে দিয়ে বাড়িতে চলে আসলাম। আর মনে করছিলাম, হয়তো মুক্তিযোদ্ধারা বিপদে পড়েছে,  ঘটনাও তাই। চেয়ারম্যান  ইমান আলীর লোকেরা নাকি পাক সেনাদের মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থানের কথা জানায়িছে। 

যুদ্ধ চলেছে। আমরা আমাদের আম বাগানের ভিতর দাঁড়িয়ে দেখছি। গুলি মাঝে মাঝে বাগানের সামনে জমির ভিতরে পানিতে পড়ছে।  আমাদের করার মত তখন কিছুই ছিল না। দুপুর ১টার দিকে খবর এলো আমাদের পাড়ার দিকে পাকসেনারা আসছে (পূর্বদিক থেকে)। আমরা তখন দক্ষিণ দিকের সড়ক পার হয়ে আড়ালে গিয়ে দাঁড়ালাম। পাকসেনারা তখন আমাদের বাঁশবাগান পার হয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের পিছন থেকে আক্রমণ করার উদ্দেশ্যে এই  ব্যবস্থা নিয়েছে। তারা সংখ্যায় ছিল ২৬ জন।  আমাদের গ্রামের সন্তেশ চাচাকে ওরা ধরে নিয়ে আসে পথ দেখানোর জন্য। আমরা সংবাদ দেয়ার আগেই তাদের আসার সংবাদ মুক্তিযোদ্ধারা জেনে যায়। তাই তাদের কোনো ক্ষতি ওরা করতে পারে না। 

ওরা চলে যাবার পর আমরা নয়াপাড়ার দিকে এগোতে থাকি। হঠাৎ আমাদের কাছে আখক্ষেতের মধ্য থেকে গুলির আওয়াজ এলো। এর পর শোনা গেলো না। আমরা সেদিকে এগিয়ে গেলাম। দেখলাম, আমাদের স্কুলের দশম শ্রেণীর জয়নাল ভাই (যিনি একজন জাদুকরও ছিলেন) খুব দুর্বল অবস্থায় রাইফেল হাতে একবার উঠছেন আবার বসছেন, আমরা এগিয়ে গেলাম। দেখলাম তাঁর সারা শরীর পানিতে ভেজা, পানির ভিতর থেকে যুদ্ধ করতে করতে দলছুট হয়েছেন। তাতে তাঁর রাইফেলে কাদা ঢুকেছে। আমরা ওনাকে সাধ্যমত সেবা দিলাম। উনি চলে গেলেন। যুদ্ধ চলতে থাকলো। 

সন্ধার আগে বরইতলা হতে পাকসেনারা খামারপাড়া আগুন দিয়ে পূর্বদিকের থানার দিকে চলে গেলে যুদ্ধ থেমে যায়। এই যুদ্ধে আমার দুই সহপাঠী কুদ্দুস ও চানমিয়াসহ ১০৪  জন শহীদ হন। শহীদ হন রবিলাল দাস, সুজাবত আলী, আব্দুস সামাদ নামের তিন জন মুক্তিযোদ্ধা আর ৬ জন পাক আর্মিসহ এক রাজাকার নিহত হয়। পরে জানা যায়, অনেক পাক আর্মি নিহত হয়েছে। তাদের লাশ পাটের গাড়িতে সিরাজগঞ্জ পাঠানো হয়েছে। 

উল্লেখ্য, আমার বন্ধু কুদ্দুস ও তাঁর পিতা শামসুল হক এক সাথে শহীদ হন এবং কুদ্দুসের চাচা আফছার কানের পাশে গুলি লেগে আহত হন। গুলির স্মৃতিচিহ্ন আজও বয়ে বেড়াচ্ছেন তিনি। ওইদিন ‘ইতেকাফে’ বসা মুসুল্লিরাও তাদের হাত হতে বাঁচতে পারেনি। সেদিন আমাদের পাশের বাড়ির ওমেদ আলীর স্ত্রী আখক্ষেতে একটি মেয়ে সন্তান জন্ম দেন। সকলে তার নাম দেয় মুক্তি, আজো সে মুক্তি নামেই পরিচিত।

ও/ডব্লিউইউ