|

মুক্তিযুদ্ধ

Published: Thu, 26 Aug 2021 | Updated: Thu, 26 Aug 2021

‘ক্যাপ্টেন দুলাভাই মুক্তিযুদ্ধে, তাই আমাদের বাড়ি জ্বালিয়ে দেয়’

অধ্যাপক ড. কামালউদ্দীন আহমদ বর্তমানে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ। জন্ম কুমিল্লার দাউদকান্দির খানেবাড়ি গ্রামে। বাবা দাউদকান্দির বিশিষ্ট সমাজসেবক, শিক্ষানুরাগী এবং আহমদ পাবলিশিং হাউজের প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত মহিউদ্দীন আহমদ। মা রহিমা খাতুন।

এরআগে অধ্যাপক ড. কামালউদ্দীন আহমদ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে দীর্ঘদিন শিক্ষকতা করেন, সবশেষ বিভাগের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্বপালন করেন। পরে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর, গ্রন্থাগারিক (ভারপ্রাপ্ত) এবং আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন এই শিক্ষাবিদ।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় কামালউদ্দীন আহমদ ছিলেন ১২/১৩ বছরের কিশোর। ঢাকায় বাংলাবাজারে বাবার ব্যবসা ও জিন্দাবাহারের পৈত্রিক বাড়ি থাকলেও মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে জীবনের নিরাপত্তায় তিনি পরিবারের সঙ্গে গ্রামে অবস্থান করেন। ২৫ মার্চ রাতে দখলদার পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বাঙালিদের ওপর নৃসংশ হামলা ও গণহত্যা চালায়। কামালউদ্দীনের সদ্য বিবাহিত বড় বোন মাহমুদা আক্তারের স্বামী তৎকালীন ক্যাপ্টেন সুবিদ আলী ভূঁইয়া (বর্তমানে কুমিল্লা-১ আসনের সংসদ সদস্য এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি) তখন সস্ত্রীক ছিলেন চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্টে নিযুক্ত। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অযৌক্তিক ও অতর্কিত বর্বর আক্রমণে সুবিদ আলী ভূঁইয়া বিদ্রোহ করে পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন।

বড় বোনের স্বামী ক্যাপ্টেন ভূঁইয়া বাংলাদেশকে শত্রুমুক্ত করার জন্য পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে লড়াই করছেন এই আক্রোশে একাত্তরের জুলাই মাসে কামালউদ্দীনদের গ্রামের বাড়িতে হামলা করে দাউদকান্দি থানা ও ডাক বাংলোতে অবস্থানরত পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। 
একাত্তরের দুঃসহ স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে ড. কামালউদ্দীন আহমদ লেখককে জানান,  দুলা ভাই মুক্তিযুদ্ধে লড়াই করছেন। ততদিনে এই খবর সবার জানা হয়ে যায়। এ অঞ্চলের দখলে থাকা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এবং তাদের দোসর-রাজাকাররাও এ ব্যাপারে অবগত। তাই প্রতিটি দিন-রাত আমাদের আতংকে কেটেছে। এদিকে ক্যাপ্টেন ভূঁইয়ার স্ত্রী আমার বড় বোন মাহমুদা আক্তার তখন আমাদের গ্রামের বাড়িতেই ছিলেন। বাড়িতে আমার বিবাহের উপযুক্ত আরও ১ বোনসহ মোট ৫ বোন। আমরা শিশুকিশোর। তাই বাবা আমাদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রতিনিয়ত শংকিত ছিলেন।

জুলাই মাসের দিকে এক রাতে আমরা দুই ভাই বাবার সঙ্গে কাচারিঘরে ঘুমাই। রাত ১টার দিকে দাউদকান্দি থেকে আমাদের এক চাচা এসে বাবাকে ঘুম থেকে ডেকে তোলেন। আমাদেরও ঘুম ভেঙে যায়। চাচা হাঁপাচ্ছেন। বাবার চোখেমুখে চিন্তার ভাঁজ। চাচা দাউদকান্দি থানার একটি সোর্স থেকে জানতে পারেন যে, কিছুক্ষণ পরেই অথবা সকালে ক্যাপ্টেন শহীদুল্লাহর নেতৃত্বে পাকিস্তানি সেনার একটি দল আমাদের বাড়ি আক্রমণ করবে (ক্যাপ্টের শহীদুল্লাহ যুদ্ধাপরাধের মামলায় বর্তমানে জেলে)। বাবা তখন গভীর রাতে তাৎক্ষণিকভাবে পরিবারের সবাইকে ডেকে তুলেন। হাতের কাছের দরকারি কিছু জিনিস নিয়েই আমরা দ্রুত বাড়ি ছাড়ি। গভীর রাতে বোনদের দিয়ে চলাফেরা সহজ ছিল না; আমার বড় বোন মাহমুদা আক্তার ছিলেন গর্ভবতী। সবার চোখেমুখে ভয়-উৎকণ্ঠা। আমরা ভাঙ্গা ও কর্দময় পথে হাঁটতে হাঁটতে চক্রতলা গ্রাম হয়ে মারুকার একটি বাড়িতে গিয়ে উঠি।’

মারুকায় আশ্রয় নিয়েও নিরাপদবোধ করতে পারেননি কিশোর কামালউদ্দীনের পরিবার। কারণ লোকজন বলাবলি করে যে, মারুকাতেও পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এসে আক্রমণ করতে পারে। এরপর আবার নিরাপদ আশ্রয়ে বেরিয়ে পড়েন তারা। কামালউদ্দীন বলেন, ’তখন বর্ষাকাল ছিল। দিনের বেলায় সড়ক পথে আশ্রয়ে যাওয়া নিরাপদ ছিল না। তাছাড়া বড় বোনের পেটে সন্তান। তাই দুটি নৌকার ব্যবস্থা করা হয়। আমরা মারুকা থেকে চান্দিনা থানার দক্ষিণাঞ্চলে আমার বড় বোনের স্বামীর বাড়ির দিকে যাই।’

চান্দিনা থানায়ও তো পাকিস্তানি আর্মির ঘাঁটি ছিল। সে এলাকায় নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার কারণ জানতে চাইলে অধ্যাপক কামালউদ্দীন বলেন, বড় দুলা ভাইয়ের বাড়ি ছিল চান্দিনার কৈলান গ্রামে। এটি চান্দিনা এবং চাঁদপুরের কুচুয়া সীমান্তে অবস্থিত। একেবারে ভেতরের দিকে। সেখানে তখন পর্যন্ত পাকিস্তানি আর্মির তৎপরতা ও হামলার খবর পাওয়া যায়নি। আবার বর্ষাকাল হওয়ার ওই জায়গাটি নিরাপদ ভেবে বাবা সেখানে যাওয়ার সিদ্বান্ত নেন। সেদিন আমার কৈলান গ্রামের পৌঁছাতে সন্ধ্যা হয়ে যায়।

ঐদিন সকালেই কী বাড়িতে আক্রমণ করা হয়েছিল? জবাবে কামালউদ্দীন জানান, 'না'। লোক মারফত জানতে পারি, সকালে পাকিস্তানি আর্মি আমাদের বাড়িতে আসেনি। হামলা করা হয় তার পরের দিন। এসেই পুরো বাড়িতে গানপাউডার ছিটিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। আমাদের বাড়ির সব ঘর পুড়ে ছাঁই হয়ে যায়। শুধু চাচার একটি ঘর কিছুটা রক্ষা পায়। কারণ, ঘরটিতে টিনের বেড়া ছিল। টিনের ঘরে সাধারণ আগুনে ধরতে সময় লাগে। বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেওয়ার খবর শুনে আমরা দুই ভাই পরদিন দেখতে যাই। এসে দেখি তখনো কোথাও কোথাও ধোঁয়া উড়ছে। পোড়া গন্ধে বাতাস ভারী হয়ে আছে। বাড়িটি যেন শ্মশানে পরিণত হয়েছে। আমরা তো ছোট, এই দৃশ্য দেখে আবেগ ধরে রাখতে পারিনি। হাউমাউ করে কেঁদেছি।

নিরাপদবোধ না করায় আমরা দুই ভাই আবার ফেরৎ যাই চান্দিনার কৈলান গ্রামে। সেখানে কয়েকদিন থাকার পর শুনি এখানেও পাকিস্তানি আর্মি আসতে পারে। বাবা তখন বিচলিত হয়ে পড়েন। এদিকে ভারতের আগরতলা থেকে সোর্সের মাধ্যমে দুলা ভাই বীর মুক্তিযোদ্ধা সুবিদ আলী ভূঁইয়া খবর পান যে, আমাদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দিয়েছে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। দুলা ভাই তখন আমার বড় বোন মাহমুদা আক্তারের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন। তাঁর গর্ভে তখন ৭ মাসের সন্তান। দুলা ভাই আগরতলা থেকে তাঁর বিশ্বস্ত একজনকে পাঠান আমার বোনকে নিয়ে যাওয়ার জন্য। বাবা বোনকে দিতে রাজি ছিলেন না। তারপরও বোন বড় ঝুঁকি নিয়ে কৈলান গ্রাম থেকে প্রথমে নৌকায় করে, পরে রিকশা ও হেঁটে আগরতলার উদ্দেশে বের হন। সঙ্গে তাঁর দেবরকেও নিয়ে যান। একদিকে মুক্তিযোদ্ধার যুবতী স্ত্রী হওয়ায় বাংলাদেশে থাকা নিরাপত্তার ঝুঁকি, অপরদিকে ক্যাপ্টেন ভূঁইয়ার দুঃশ্চিন্তা কমানো, যাতে তিনি মুক্তিযুদ্ধে মনোযোগী থাকতে পারেন। এ কারণে আমার বোন আগরতলা যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

আমার বোন যাওয়ার পর আমরা নৌকায় করে চাঁদপুরে এক আত্মীয়র বাড়ির উদ্দেশে বের হই। পথে পথে কত দুঃশ্চিন্তা। এক অনিশ্চিত জীবনের দিকে যাযাবরের মত ছুটে চলেছি আমরা। চাঁদপুরের কাছাকাছি গিয়ে নদীতে থাকতেই শুনি, সামনে পাকিস্তানি আর্মির অবস্থান। মাঝিরা জানায়, আর সামনে আগালে বিপদ। বাবা তখন মানসিকভাবে খুবই ভেঙে পড়েন। উনার চোখমুখ অন্ধকার হয়ে আসে। নৌকাতেই অসুস্থ হয়ে পড়েন সে। নৌকায় ডাক্তার পাবো কোথায়? নদীর পানি মাথায় দিয়ে দিয়ে বাবাকে সেবা করি। ছোটভাইবোনেরাও কান্না শুরু করে।

পরে অন্যত্র আমাদের এক আত্মীয়র বাড়িতে গিয়ে উঠি। সেখান কিছু দিন থেকে স্টিমারে করে আবার ঢাকায় আসি। ঢাকায় আসার পথে নৌঘাটে পাকিস্তানি আর্মির চেকপোস্টের মুখোমুখি হই। ভাগ্য ভালো যে, আমাদেরকে তল্লাশি করে ছেড়ে দেয়। এরপর জিন্দাবাহারের বাড়িতে উঠি। ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণ ও বিজয়ের আগপর্যন্ত এখানেই ছিলাম।’

একাত্তরে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আক্রমণ থেকে প্রাণ বাঁচাতে এবং নারীদের সম্ভ্রম রক্ষায় লাখ লাখ মানুষ নিজের বাড়িঘর ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে ছুটেছে। অনেকে ভারতে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নিয়েছে। কত মানুষ পথেও মারা গেছে। যুদ্ধে নিরীহ মানুষকে নিজ বাড়িঘর ছেড়ে পালাতে বাধ্য করা একধরণের নির্যাতন। পাকিস্তানি আর্মির হত্যা, গণহত্যা, নারী ধর্ষণের পাশাপাশি, বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়ে বাঙালিদেরকে অনিশ্চিত জীবনের দিকে ঠেলে দেওয়ার নির্যাতনের শিকার হয়েছেন অসংখ্য মানুষ। মুক্তিযুদ্ধে এই নির্যাতনের শিকার হয়েছেন অধ্যাপক কামালউদ্দীনের পরিবার ।

পাকিস্তান আর্মি বাড়ি আক্রমণের কারণ সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে অধ্যাপক কামালউদ্দীন বলেন, কারণ একটাই। আমার বড় বোনের স্বামী পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর চাকরিকে লাথি মেরে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন। ২৬ মার্চ, ১৯৭১, চট্টগ্রামের উপকণ্ঠে কুমিরায় তীব্র প্রতিরোধ যুদ্ধে নেতৃত্ব দেন তিনি। যুদ্ধে পাকিস্তানি আর্মির কমান্ডিং অফিসারসহ তাদের অনেক সেনা নিহত হয়। এরপর ৩ নম্বর সেক্টরে বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধ করতে থাকেন তিনি। যেহেতু দুলা ভাই পরিচিত ও আলোচিত মুক্তিযোদ্ধা, তাই আমাদের বাড়িতেও মুক্তিবাহিনীর আনাগোনা ও গোপন ঘাঁটি থাকতে পারে। একারণে বাড়িতে আক্রমণ করা হয়। আক্রমণে নেতৃত্বে দেয় ক্যাপ্টেন শহীদল্লাহ। সে এখন জেলে। আমি এই যুদ্ধাপরাধীর উপযুক্ত শাস্তি চাই।’


সাংবাদিক এবং মুক্তিযুদ্ধ গবেষক। 

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন : বাশার খান

 

ডব্লিউইউ

Published: Wed, 12 May 2021 | Updated: Wed, 12 May 2021

রহমান পাগলার-মুক্তিযোদ্ধা হবার গল্প

বয়স ৬৬ ছুই ছুই করছে। মাথায় টুপি। মুখে পাকা দাড়ি। কথা বলেন অনর্গল। বয়সের ভারে দেহ অনেকটাই দুর্বল। কথা কিছুটা জড়িয়ে যায়। তবু কথা বলেন সাধু-চলিত-আঞ্চলিক ভাষা মিশিয়ে অনর্গল। বাড়ী সিরাজগঞ্জ পৌর প্রান্ত সীমানার সন্নিকটে খোকশাবাড়ী ইউনিয়নের তেলকুপী গ্রামে।  নাম আব্দুল রহমান খান। কাছের লোকেরা তার দুরন্তপনায় আদর করে ডাকেন রহমান পাগলা । যৌবনে ছিলেন ৭১ এর যোদ্ধা। 

আব্দুল রহমান বেড়ে উঠেছিলেন তেলকুপীর এক অবস্থা সম্পন্ন গৃহস্থ পরিবারে। বাপ-চাচাদের মিলিয়ে এক সারিতে ১১টি চৌচালা টিনের ঘর। বাবার স্মৃতি ঝাপসা। মারা গেছেন সেই শৈশবে। বড় ভাইয়ের কর্তৃত্বে একান্নবর্তী সংসার।  পৈত্রিক কৃষি জমিতে যা উৎপাদন হতো তাতেই চলতো বার মাসের বছর। বাড়ীর উত্তর আর পূব পার্শ্বে পুকুর, পশ্চিম পার্শ্বে বাঁশঝাড়। সামনে ডানে বামে সারি বেঁধে ছিল আম, কাঁঠাল আর নারিকেল গাছ। বাড়ী থেকে প্রায় হাজার গজ মাটির পথ পেরুলেই পাকা কনক্রিটের রাস্তা। সেই রাস্তা ধরে পঞ্চাশ পয়সা দিলে রিকশায় একটানে পৌঁছে যেতেন শহরের ভিক্টোরিয়া স্কুলে। সব সময় রিকশায় যাওয়া হতো না। কখনো পায়ে হেঁটে, কখনো সাইকেলের প্যাডেল ঘুরিয়ে আসতেন ঐতিহ্যবাহী এই বিদ্যালয়ে। গ্রাম থেকে আসতেন শহরের বিদ্যালয়ে পড়তে কিন্ত পড়াশোনায় মন টিকতো না। পড়াশোনার চাইতে আগ্রহ ছিল নেতৃত্বে। সহপাঠীরা এগিয়ে দিতেন সকল কাজে মাতব্বরীতে। সখ ছিল ভাটিয়ালী আর পল্লীগীতি গানের। মন উৎফুল্ল হতো বাঁশের বাঁশিতে ঠোট লাগিয়ে সুর তুলতে। স্কুল ছুটিতে সেই বাঁশি হাতে নিয়ে ভরদুপুরে ছুটতেন গ্রামের পশ্চিমের নদীর ধারে। সুর তুলতেন- ‘মাঝি বায়া যাও রে অকুল দরিয়ার মাঝে’ কিংবা ‘ভাটিজানে ভাটিয়াল সুরে বাঁশিতে বাজাইয়া যাওরে মাঝি একবার চাও ফিরে’- এরকম পল্লী গানে। অথবা গভীর রাতে বেরিয়ে পড়তেন গ্রামের পাশের মাঠে। রাতের আলো-আঁধারিতে সুর তুলতেন বাঁশের বাঁশিতে। সেই বাঁশির সুর বাতাসে ভেসে যেত আশে পাশের গ্রামে। এর জন্য অনেক সময় তেড়ে আসতেন গ্রামের বয়স্করা। কিন্ত কোন কিছুতেই তাকে তার সুরের জগত থেকে সরাতে পারতো না। এমনিভাবেই বেড়ে উঠছিলেন পাগলা রহমান। 

উনসত্তরে ছিলেন তারুন্য পেরিয়ে যৌবনের প্রারম্ভে। সেই বয়সে অযুত যুবকের মতো তাকেও আন্দোলিত করতো তেজোদীপ্ত আসাদের রক্তমাখা শার্ট। কিশোর মতিয়ুরের আত্মাহুতি। উজ্জীবিত করতো বৃটিশ বিরোধী সংগ্রামে প্রীতিলতা, সুর্যসেনের জীবন। ভাটিয়ালি আর পল্লীগীতির সুর ছেড়ে গুনগুন করে গাইতেন প্রীতিলতার গান- ‘অন্ন হাতে ডাকছো মাগো ফিরে দেখার সময় নাই, ডাক দিয়েছে বঙ্গজননী সেথায় ছুটে যাই, বিজয় বেশে আসতে যদি পারি ফিরে, চরণধুলি নেবো বুকে তুলে, সেদিন মাগো আর্শীবাদ করো দু’ হাত তুলে।’ বাঁশের বাশিতে তুলতেন সেই গানের সুর। বাঁশির সুর বাতাসে তরঙ্গায়িত হয়ে চলে যেত পাশের গাঁয়ে। 

এলো ১৯৭১ সাল। সারা দেশ টালমাটাল। রাজনৈতিক জীবনে প্রচণ্ড উন্মাদনা। পাকিস্তানী শোষণ আর বঞ্চনার বিরুদ্ধে সোচ্চার বাঙালীরা। বাঙালীর সেই ঝড়ে হাওয়ার ঢেউ তরাঙ্গায়িত হয়ে পড়ে তৃণমূলের সমাজ জীবনে। সেই ঢেউয়ের উন্মাদনায় কৈশর যৌবনের সন্ধিক্ষণের এই মানুষটিও আন্দোলিত হলেন। লণ্ডভণ্ড হয়ে গেল বাঁশের বাঁশিতে সুর তোলা আর নদীর তীরে বসে ভাটিয়ালি গানের ছন্দ। বাঙালী জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সমুদ্রসমান ঢেউয়ে আন্দোলিত হয়ে জীবনবাজী রেখে হাতে নিলেন হাতিয়ার। লড়লেন পাকিস্তানীদের বিরুদ্ধে। লড়াই করলেন দেশের স্বাধীনতার জন্য।  রহমানদের মতো লক্ষ যুবকের জীবন বাজি রেখে লড়াইয়ের ফলেই আমরা পেলাম স্বাধীনতা। কথা বলছিলাম এরকম একজন শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ সন্তান মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রহমানের সাথে। 

এর মধ্যে আসে ২৫ মার্চ। ২৫ মার্চের পৃথিবীর ইতিহাসের অন্যতম নিকৃষ্ট গণহত্যার রাতে জ্বলছে ঢাকা শহর। ২৮ এপ্রিল সেই আগুনের লেলিহান শিখায় প্রজ্জলিত হলো সিরাজগঞ্জ। সেদিন পাক আর্মি বগুড়া থেকে তেলকুপি গ্রামের পাশ দিয়ে পাকা রাস্তা ধরে শহরে ঢুকেই গ্রামটি পুড়িয়ে ছারখার করে দিল। পুড়ে গেল আব্দুর রহমানের নিজের বাবা- চাচা আর দাদার স্মৃতি বিজড়িত উত্তর দুয়ারী আর দক্ষিণমুখী এগারটি টিনের ঘর। পাকিস্তানীরা পুড়িয়ে দিল পাশের নওদা তেলকুপি গ্রামের চলচ্চিত্র অভিনেতা সুভাষ দত্তের নানার গ্রাম। গ্রামের জনৈক লুৎফর মেম্বারের আত্মীয়কে পাকি আর্মি ধর্ষণ করে গুলি করে হত্যা করে। দেখলেন নিজ চোখে সেই মৃত মেয়েটির বাম গালে কামড়ের চিহ্ন। আরও দেখলেন নলিছাপাড়া গ্রামের অসুস্থ কালা শুক্কুরের বাড়ী আগুনে জ্বলছে। সেই বাড়ীতে ঢুকে দেখলেন আগুনে পুরে আংগার হয়ে যাওয়া শুক্কর আলীর জীবন্ত দগ্ধ দেহটাকে। এই দু’টি ঘটনা তাকে আগৃনের মতো প্রজ্জলিত করে। 

বাড়ীতে অবসরে ফসলের ক্ষেতে কাজ করতেন আব্দুর রহমান। কিন্ত কাজ করলেও মানসচোখে ভেসে উঠে ওই ধর্ষিত মেয়ে কিংবা শুক্কুর আলীর অঙ্গার হয়ে যাওয়া দেহটাকে।  মনে হলেই চোয়াল শক্ত পাথরের মতো হয়ে ওঠে। মন ছুটে যায় যুদ্ধের জন্য।  ফসলের মাঠে কাজ করতে করতেই একদিন সিদ্ধান্ত নিলেন যুদ্ধে অংশগ্রহনের।  কিন্ত কীভাবে যাবেন? কোথায় যাবেন? বাড়ীর কর্মচারী সমবয়সী জেল হোসেনের সাথে পরামর্শ করলেন। দু’জনই সিদ্ধান্ত নিলেন যুদ্ধে যাবেন। খুঁজতে থাকেন কোথায় গেলে পাওয়া যাবে যুদ্ধের প্রশিক্ষণ। খোঁজও পেয়ে গেলেন। সিদ্ধান্ত নিলেন রৌমারী হয়ে মানকারচর যাবেন। সেখানে যুদ্ধের জন্য ছাত্র-যুবারা সংগঠিত হচ্ছেন। প্রয়োজন হলো পথখরচার অর্থের। তখন তার ছাত্র জীবন, বড় ভাইয়ের ওপর নির্ভরশীল। হাতে টাকাও নেই। জেল হোসেনও কাজ করে তাদের বাড়িতে। তার কাছেও কোন অর্থ নেই। শেষ অব্দি সুযোগ এলো। বড় ভাই পাঠালেন পাওনা টাকা আদায়ের জন্য। সেই টাকা নিয়েই ছুটলেন যুদ্ধের পথে।

বাড়ি থেকে বের হতেই মা টের পেলেন। পিছে পিছে মা কাঁদতে কাঁদতে ছুটলেন। মার চোখ ফাঁকি দিতে পাট ক্ষেতে লুকালেন। পাট ক্ষেতে লুকিয়ে থেকেই দেখলেন মা কাঁদছেন। পরনের শাড়ির আঁচলে চোখের পানি মুছছেন। তা দেখে নিজের চোখেও পানি এলো। শক্ত হলেন। ভাবলেন তিনি তো যুদ্ধে যাবেন। জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করবেন। মায়ের জন্য, দেশের জন্য, দেশের স্বাধীনতার জন্য। এসময় চোখের পানির কাছে পরাজিত হওয়া যাবে না। শেষ পর্যন্ত যুদ্ধে যাবার প্রেরণার কাছে মায়ের চোখের পানি পরাজিত হলো। মায়ের চোখ ফাঁকি দিয়ে ছুটলেন। আগের পরামর্শ মতো গ্রামের এক জায়গায় মিলিত হলেন জেল হোসেন, আনোয়ার, জহুরুল, লুৎফরদের সাথে। পাঁচজনে একসাথে রওনা হলেন যুদ্ধের জন্য। স্বাধীনতার শপথে বলীয়ান হয়ে।
খোঁজ নিয়ে জানলেন সিরাজগঞ্জের কাজিপুর উপজেলার শুভগাছা থেকে নৌকায় শরনার্থীরা যমুনা নদী পথে ভারত যায়। সেই অনুযায়ী ওরা ৬ জনে ওসমানের বাড়ি গেলেন। দু’দিন অপেক্ষা করলেন নৌকার জন্য। দু’দিন পর যখন নৌকায় উঠবেন সেই সময় ওসমানের কাছে শুনলেন অশিক্ষিত লোক যাওয়া যাবে না। অশিক্ষিত লোকদের ওখানে গিয়ে কোন কাজ হবে না। সেই কথায় বিশ্বাস করে জেল হোসেন থেকে গেলেন (পরে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন)।

ওসমান আর ইসমাইলের সাথে সমন্বয় করে শরনার্থী পাঠাতো। রাতে এলেন ইসমাইল। ইসমাইলের নির্দেশে রহমানসহ চারজনকে চার নৌকায় দিলেন। এবং ইসমাইলের গ্রুপের ১১ জনকে এগার নৌকায় দিলেন। ইসমাইলের নির্দেশিত ব্যক্তিরা ওদের সাথে গেলেন নৌকার যাত্রীদের নিরাপত্তা দেয়ার জন্য।  রাতের আধারে ১১ নৌকায়  রওনা হলো ভারত। পাল তুলে নৌকা ভাসিয়ে দিলো যমুনায়। গন্তব্য রৌমারী হয়ে ভারতের মানকার চরে।

রওয়া হয়ে জানলেন মানকার চর যেতে সময় লাগবে সাত দিন সাত রাত। নদীতে দুদিন পার হবার পর তৃতীয় দিন। তারা তখন বাহাদুরবাদ পার হয়ে তিস্তার-সোনাখালী-জিঞ্জিরার মোহনায়। তখন সূর্য ডুবছে। ১১ নৌকা পড়লো ঝড়ের কবলে।  ঝড়ের ঝাপটায় ১১ নৌকার মধ্যে রহমানদের নৌকা ডুবে গেল। নৌকার আরোহী শরনার্থীদের সব মালামাল ভেসে গেল নদীর পানিতে। নৌকার মাঝি অদ্ভুত দক্ষতায় ডুবন্ত নৌকা আবার পানির ওপরে তুলে ফেললেন। আবার যাত্রা হলো শুরু। নৌকাগুলো যমুনায় পানিতে ছলাৎ ছলাৎ করে ঢেউয়ের তালে তালে বেদের বহরের মতো চলতে লাগলো সামনের দিকে। 

রাতে থামলো একটি চরে। স্মৃতি হাতড়ে মনে করে বললেন, গল্লামাড়ী চর কিংবা চেয়ারমানের চর। সেই চরের কাশবনের ভিতর নৌকা আশ্রয় নিল। নৌকার বাদাম, মাস্তুল খুলে লুকিয়ে রাখলেন সবাই। রাত আনুমানিক এগারটার সময় পাকিস্তানী সেনারা তাদের গানবোটের সার্চ লাইটের আলো ছড়িয়ে চারিদিকে দেখতে লাগলো। কাশবনে লুকিয়ে রাখা নৌকাগুলি তাদের চোখ এড়িয়ে যেতে সক্ষম হলো। রাত শেষে ভোর হলো। নৌকা আবার রওনা হলো। এমনি ভাবে ৬/৭ দিনে পৌঁছলেন রৌমারী। গিয়ে পরিচিত নূর, সোহরাব, সাজাহান এর সহযোগিতায় ট্রেনিং নিলেন ১৫ দিনের। ৪০০ শত মুক্তিযোদ্ধা। একটি মাত্র রাইফেল। মন টিকলো না। প্রশিক্ষণ অসমাপ্ত রেখে চলে আসলেন সিরাজগঞ্জ। এসে যোগ দিলেন স্থানীয়ভাবে গড়ে উঠা ইসমাইলের দলে। 

স্মৃতি হাতড়ে মুক্তিযোদ্ধা রহমান বললেন-স্বাধীনতা বিরোধীদের বিরুদ্ধে অপারেশন শুরু করলাম। দালাল চেয়ারম্যান ও সাধারণ মানুষদের ধন সম্পদলুন্ঠনকারী ডাকাতদের অপারেশন করি। বর্ষার সময়ে রহমতগঞ্জ কবরস্থানে রাজাকারের একটি দলে হামলা করি। সন্ধ্যা নাগাদ যুদ্ধ চলে। গোলাবারুদ ফুরিয়ে গেলে কৌশলগত কারণেই যুদ্ধে ক্ষ্যান্ত দেই। লতিফ মির্জার দলে হয়ে ব্রম্মগাছা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করি। সেটা ছিল আগষ্টের মাসে দিকে। সেসময় ইসমাইল একই সাথে ছিল। গুরুদাসপুর থানার ছাইখোলা কাছে কাছিকাটা রাজাকার ক্যাম্পে হানা দেই। ১১/১২ জন রাজাকার জীবন্ত গ্রেফতার করি। ইতোমধ্যে ইসমাইলের দলে সাথে ভালো না লাগার কারনে ছুটি নিয়ে বাড়ি আসি। পরে যোগ দেই আলাউদ্দিনের দলে।  অক্টোবর কিংবা নভেম্বররে রায়গঞ্জ থানা হামলা করি। নভেম্বর রায়গঞ্জ সিও অফিসে পাক আর্মির ক্যাম্পেস হামলা করি। সে যুদ্ধে ৪/৫ জন পাক আর্মিকে হত্যা করি।

তিনি বলেন, ১১ ডিসেম্বর শৈলাবাড়ী যুদ্ধে অংশ নেই। ৯ তারিখে যুদ্ধ শুরু হয়। এ যুদ্ধের মধ্যদিয়েই পাকিস্তানিদের পরাজিত করে সিরাজগঞ্জ মুক্ত করি। ১৪ ডিসেম্বর আমার প্রিয় শহর সিরাজগঞ্জ মুক্ত হয়। স্বাধীন সিরাজগঞ্জে লাল সূর্য শোভিত স্বাধীনতার পতাকা পতপত করে উড়তে শুরু করে। এসময় পলায়নপর পাকিস্তানী সেনাবাহিনীদের ওপর কালিয়াহরিপুরে হামলা করি এবং একশ পাকি সৈনিকদের গাড়ি কবজা করি। ২ জন পাক আর্মি হত্যা করি। দুইজন পাকি আর্মি গ্রেফতার করি। ঐ দুজন পরে পাকিস্তান ফেরত যায়।

রহমান বলেন, এভাবেই মুক্তিযোদ্ধাদের ক্রমাগত হামলায় দিশেহারা হয়ে অবশেষে বাংলাদেশ-ভারতীয় যৌথ বাহিনীর কাছে পাকিস্তানী বর্বর বাহিনীর পতন হয়। ১৪ ডিসেম্বর মুক্ত হয় সিরাজগঞ্জ। ১৬ ডিসেম্বর ওই ঘৃণ্য পাকিস্তানী বাহিনী আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে সূচিত হয় আমাদের বিজয়। আকাশে উড়তে শুরু করে লাল সবুজের স্বাধীন বাংলার পতাকা। বিশ্বের বুকে প্রতিষ্ঠা লাভ করে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। আমার প্রিয় মাতৃভূমি।

অনুলেখক : ইসমাইল হোসেন, গণমাধ্যম কর্মী

/এসিএন

Published: Sun, 21 Mar 2021 | Updated: Sun, 21 Mar 2021

বীর মুক্তিযোদ্ধা কফিল উদ্দিনের যুদ্ধস্মৃতি

সেপ্টেম্বরের প্রথম দিকে সম্ভবত, আমরা প্রথম অ্যাফেক্টেট হই। সেটা হলো, আমরা ঐ আশপাশে, মেঘনা নদীর পাড়ে দরিয়াহালমাইরা বলে একটা গ্রাম আছে, আমাদের ক্যাম্প। ওইখানে আসার পর... আমরা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন গ্রাম চেঞ্জ করি। করে আসার পর গ্রামে খবর আসলো, দুইটা রাজাকার আসছে ওই বাড়িতে।

Published: Thu, 18 Mar 2021 | Updated: Thu, 18 Mar 2021

বীর মুক্তিযোদ্ধা এম এইচ আল আজাদ চৌধুরী’র যুদ্ধস্মৃতি

আমি একজন ফ্রিডম ফাইটার। মূলত আমার রাজনীতির হাতেখড়ি হয় ১৯৬২ সালে, আইয়ূববিরোধী আন্দোলনের সময়। শিক্ষা কমিশনের বিরুদ্ধে আমরা আন্দোলন করি। তখন আমি ক্লাস সিক্সের ছাত্র। ১৯৬৬ এবং ১৯৬৯, এই আন্দোলনের সময় আমি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করি।

Published: Sun, 07 Mar 2021 | Updated: Sun, 07 Mar 2021

ভ্রাম্যমাণ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের পথচলা শুরু

অভিযাত্রা ডেস্ক : মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানার বিষয়ে নতুন প্রজন্মকে উদ্বুদ্ধ করতে ‘ভ্রাম্যমাণ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর’ চালু করছে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের ‘নতুন প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধকরণ’ প্রকল্পের অধীনে এই ভ্রাম্যমাণ জাদুঘর চালু করা হয়ে।

রোববার (৭ মার্চ) সকালে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের শিখা চিরন্তনে জাদুঘর সম্বলিত ২টি বাস উদ্বোধন করেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক এমপি।

মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী েএসময় বলেন, ভ্রাম্যমাণ এ জাদুঘরের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের মাঝে মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস তুলে ধরা হবে। এর মাধ্যমে নতুন প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিসংগ্রামের সঠিক তথ্য জানতে পারবে।

তিনি বলেন, ভ্রাম্যমাণ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর বাসের এই উদ্যোগ আমরা এবারই প্রথম নিয়েছি। এই বাসে মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কিত যাবতীয় তথ্য থাকবে। জাদুঘর বাস শুধু ঢাকায় নয়, সারাদেশেই চলবে।

এসময় মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক সচিব তপন কান্তি ঘোষসহ মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

ও/এসএ/

Published: Sun, 07 Mar 2021 | Updated: Sun, 07 Mar 2021

বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ বাবুল ইসলাম’র যুদ্ধের স্মৃতিগুলো

সাভার থাইক্যা গুলি করতে করতে আর্মিরা আইছে। আর্মিরা আইতে আইতে লুটেরচর আর ওয়াসপুরের মাঝামাঝি গুলি করতেছিল। পাঁচজনে গুলি করতে আইতে আইতে, সব মানুষ দৌড়ায়া যাইতেছিল। ওইখানে বজলুর ভাই আছিল, তারপরে মহিউদ্দিন ভাই আছিল, আমরা ৪-৫ জন। ৭ জনের মধ্যে ৬ জন গ্রেনেড-ট্রেনেড মাইরাহালাইছে। একজন জ্যাতা আছিল। ঐ একজনরে ধরছিল। ধইরা পরে গুলি কইরা মাইরাহালাইছে।

 

Published: Wed, 17 Feb 2021 | Updated: Wed, 17 Feb 2021

বীর মুক্তিযোদ্ধা আমির হোসেন মিয়া’র যুদ্ধস্মৃতি

একদিন বিকালবেলা জিগাতলা থেকে আমি টিউশনি করে আসতেছি। আসার সময় দেখা গেলো যে, মানুষ রাস্তার পাশে আড়ালে আড়ালে দাঁড়ায়া আছে। ‘কি ব্যাপার?’ বলে যে, ‘ওই বাড়ির থেকে একটা মেয়ে ধরে নিয়ে যাচ্ছে, পাক আর্মিতে।’তো  পাক আর্মিতো না, তখন মিলিশিয়া না কি বাহিনী ছিল, তারা। তো আমি একটু পাশে, আমার কাছে সাইকেল, একটু পাশে দাঁড়াইলাম। ওরা বললো, ‘ওইদিকে যাইয়েন না, গেলেই কিন্তু আপনাকে গুলি করবো। ওরা গুলি করে কিন্তু।’ আমি পাশেই দাঁড়াইলাম, দেখলাম আসলেই একটা মেয়েকে তারা ধরে নিয়ে যাচ্ছে। কেউ আগায় না।

Published: Thu, 11 Feb 2021 | Updated: Thu, 11 Feb 2021

বীর মুক্তিযোদ্ধা গোলাম নাজির হোসেন’র যুদ্ধস্মৃতি

ঢাকাতে বিভিন্ন জায়গায় আমাকে দায়িত্ব দেয়া হয় অবজার্ভেশন করার জন্য। কোথায় কি আছে, না আছে। পাকবাহিনী কোনজায়গাতে ঘাঁটি গাঁড়ছে—এবং আমাদের জায়গাটা কোন কোন জায়গাতে সুযোগ-সুবিধা, ইনফরমেশন সব আমাদের দেওয়ার নির্দেশ ছিল। মেজর হায়দার বলে দিয়েছিলেন। সেক্টর কমান্ডার খালেদ মোশাররফ ২১ জুলাই রাত্রে এসে বললেন, ‘আমাদের কিছু ছেলের দরকার, আর্টিলারির জন্য।’সেখান থেকে আমি আর আমার এক সহযোদ্ধা আব্দুল মতিন (সে রিসেন্টলি মারা গিয়েছে) এই দুজনকে সিলেক্ট করা হয়।

Published: Tue, 09 Feb 2021 | Updated: Tue, 09 Feb 2021

যুদ্ধের স্মৃতিচারণে যা যা বললেন বীর মুক্তিযোদ্ধা আমিনুর রহমান আবু

“পরবর্তীতে চিন্তা করলাম যে, এখানে আর থাকা যাবে না। আমার বাড়িতে, আমার দোকানের কর্মচারীও বিহারী। আমার পাশেও বিহারীদের দোকান। তখন চিন্তা করলাম যে, মুক্তিযুদ্ধেই যাবো। কিন্তু কীভাবে যাবো? ওই মুরুব্বি যে বলছিলেন, উনার কাছে গেলাম। উনি বললো, আমাদের একটা কাগজে লিখে দিলেন, তুমি এমনে এমনে যাবা। উনার বাড়ি আবার কুমিল্লার বুড়িচংয়ে। উনারা খুব সম্ভ্রান্ত পরিবারের। বুড়িচংয়ের ভুইঁয়াবাড়ি।”

Published: Tue, 24 Nov 2020 | Updated: Tue, 24 Nov 2020

সাধারণের চোখে মুক্তিযুদ্ধ: খাদেমুল হোসেন (তারা)

আমি মোঃ খাদেমুল হোসেন (তারা)। ১৯৪৯ সালে সিরাজগঞ্জ জেলার তাড়াশ উপজেলার নওগাঁ গ্রামে জন্মগ্রহণ করি। আমার পিতা: মো: ইমান আলী প্রামানিক। আমার বাবা ছিলেন একজন কৃষক। আমার মা আফছুন নেছা ছিলেন গৃহিনী। আমরা চার ভাই ও এক বোন, আমি প্রথম। আমি ১৯৬৫ সালে আমার স্ত্রী সকিতুন খাতুন কে বিয়ে করি। আমার পাঁচ ছেলে মেয়ে। ১৯৭১ সালের যুদ্ধের সময় আমার পেশা ছিল কৃষি। সে বছর অসহযোগ আন্দোলনের সময় আমি বিভিন্ন মিছিল/মিটিংয়ে যোগ দিতাম।

১৯৭১ সাল। সেদিন ছিল বুধবার দিবাগত রাত। আমি সেহরী খেয়ে শুয়ে আছি। আমার ছোট ভাই আমজাদ আর আমার মেজো চাচা আতাব আলী। এরা মুক্তিযোদ্ধাদের নৌকার মাঝি ছিলেন। সেদিন হঠাৎ করে হই হই করে নৌকা বেয়ে আসার শব্দ পাওয়া যায়। আমি মনে করেছিলাম পরের দিন হাটের দিন, মোহনপুর থেকে ছন বিক্রির জন্য হয়তো কেউ আসছে। পরে লক্ষ্য করে দেখি, আমার ছোট ভাইয়ের কন্ঠ। আমি মাকে বললাম, ‘ও মা, আমজাদ মনে হয় পালিয়ে আসছে!’ এই দিকে মুক্তিযোদ্ধাদের কোন খোঁজ-খবর নাই, আর ও আসছে! আসার পরে শুনি যে ও মুক্তিযোদ্ধাদের বাংকারে পৌঁছে দিয়ে খাওয়া দাওয়া করিয়ে তারপর বাড়ি ফিরেছে।

আমজাদকে জিজ্ঞেস  করলাম, ‘কিরে! যুদ্ধর কী পরিস্থিতি?’ তাকে সতর্ক  করে দিয়ে বললাম, ‘তাড়াশে মাঝে মাঝেই  রাজাকাররা আসে, অত্যাচার করে। ওখানে যাবি না’। আমজাদ বলে, ও যাবে। সে বলে, ‘নৌকা নিয়ে আমরা একটু ফাঁকে ছিলাম, এখন তো কাছাকাছি। মনে হয় তাড়াশে রবিবার কিংবা সোমবারে আট্যাক করবে’। বললাম ‘ভাত খা, বড় বাইম ধরেছি’। ও রোজা ছিল না, ভাত খেলো। 

খাওয়া দাওয়া শেষ করে আমজাদ মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে যাবার জন্য বের হয়। আমাদের বাড়ি থেকে দুই কিংবা তিন বাড়ি যেতেই হিমসাগর ফায়ার হয়। মুক্তিযোদ্ধরা প্রথম গুলি করে মিলিটারিদের। প্রতাব- উল্লাপাড়া দিয়ে মিলিটারি নওগাঁ প্রবেশ করে। ওদের দেখেই হঠাৎ করেই  গুলি এল। তারপরই তো শুরু হয়ে যায় তুমুল আকারে যুদ্ধ। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরে আমরা এখন কী করবো, চারদিক দিয়ে শুধু গুলি আর গুলি। বাড়ির সবাইকে নিয়ে পড়লাম মহাবিপদে। পরে কোদাল দিয়ে বাড়ির পাশে লম্বা করে গর্ত করলাম। মা, বউ, ছোট ভাইয়ের বউকে সেই গর্তের মধ্যে রাখলাম। আর ওদের বললাম ‘যে যা জানিস সেই দোয়া কালাম পড়। আজ হয়ত আর বাচঁবো না।’ 

এই যে আরম্ভ হলো, একটানা ১১টা পর্যন্ত শুধু গুলির শব্দ পাওয়া গেল। দুই দিক থেকেই সেই গোলাগুলি হচ্ছে। মা-ঝিদের গর্তে রাখার পর যুদ্ধ চলা অবস্থায় মুক্তিযোদ্ধারা আমাদের বাড়িতে উঠে আসে। আমি ভয়ে কোন কথা বলতে পারছিলাম না তাদের সাথে। পরে মা মুক্তিযোদ্ধাদের বলে, ‘কিরে বাবা! তোরা কি আমাদের মেরে ফেলবি নাকি?’ ওরা বলে, ‘না মা, আমরা আপনাদের বাঁচানোর জন্য এসেছি। আপনারা এই গর্ত ছেড়ে দেন। আমরা এখান থেকে পজিশন নিব’। আমি বললাম ‘ভাই! এদের কী করবো?’ ওরা বলে, ‘ওই যে পুকুরের কাদায় উত্তর সিথানী করে শুইয়ে রাখেন’। কী আর করার, তাই করলাম। কাদার মধ্যে মা-ঝি দের পুকুরে শুইয়ে রাখি। 

সব মুক্তিযোদ্ধারা আমাদের বাড়িতে চলে আসতে লাগলো। আমাদের বাড়ি থেকেই  পজিশন নিয়ে সেই আকারে গুলি করতে থাকে। সেই সময় জমিতে ধান ছিল। মুক্তিবাহিনীর যোদ্ধারা  জিজ্ঞেস করল, ‘ওই যে উঁচু জমি দেখা যায়। সেখানে যাবো, যাবার কোন পথ আছে কি?’ আমি বললাম, ‘হ্যাঁ আছে’। তারা বললো, ‘তা হলে আমাদের সাথে চলেন’। আমি বললাম ‘আমি কি করে যাবো?’তারা বললো ‘কেন, আমরা যে ভাবে যাই সেই ভাবেই যাবেন’। 

পরে তাদের সাথে আমি বুক কনুই আর হাটুতে ভর দিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে গেলামউঁচু জমির নিচে গিয়ে থামলাম, সেখান থেকে গুলি করতে থাকে মুক্তিযোদ্ধরা। তারা আমাকে মাথা তুলতে নিষেধ করে, কারণ মাথা উচু করলেই গুলি লাগবে। প্রচণ্ড গোলাগুলি হয়। মুক্তিবাহিনী ছিল ধানের আড়ালে আর পাকবাহিনী ছিল রাস্তার উপরে। এতে পাকবাহিনীর অনেকেই মারা যায়।

পরে পাকিস্তানি মিলিটারি আত্মসমর্পণ করে। কিন্তু বাঙ্গালীরা কি আর তা মানে! ‘জয় বাংলা’ বলতে বলতে এগিয়ে যায় আর গুলি করতে থাকে। মিলিটারি দৌড়ে পালাতে থাকে বগার বিলের মধ্যে দিয়ে। কিন্তু ওরা তো যানে না বিলে কতটুকু পানি আছে। পানিতে গিয়ে ওরা পড়ে যায়। আমরা তাদের কাছ থেকে বিভিন্ন অস্ত্র নিয়ে নওগাঁ বাজারে মুক্তিবাহিনীদের কাছে পাঠিয়ে দেই। 

তার পরে আমরা পূর্বের দিকে এগিয়ে যেতে থাকি। নবীপুর গিয়ে একটা নৌকা পেলাম। যে কয়জন জীবিত মিলিটারি পেলাম তাদের নৌকায় তুলে দিলাম। রাস্তায় লতিফ মির্জার সাথে দেখা, ডাক দিয়ে বললো, ‘শোন! যে কয়টা মিলিটারি পাবি ধরে নিয়ে এসে আমার কাছে দিবি। দিলে তোদের পুরস্কার দিব।’ পরে আমি আর আফছার বিলের মধ্যে গিয়ে রাজাকার ধরি। ধরে নিয়ে আসছিলাম সেই সময় জামাল চেয়্যারমানের বাড়ি সামনে এসে এম.এ ইসমাইলের সাথে দেখা। ও বলে ‘কি হে! এদের ধরে কোন দিকে যাচ্ছো?’ আমি উত্তর দিলাম ‘লতিফ মির্জা বলছে ধরে নিয়ে গেলে পুরস্কার দিবে সেই জন্য নিয়ে যাচ্ছি।’ ইসমাইল বলে, ‘তুই চলে যেতে পারিস। এদের আমার কাছে দে।’ পরে দিয়ে দিলাম। ও চলে গেল। ধরে নিয়ে আসলাম তাও কিছু নিতে পারলাম না। আফসোস করতে লাগলাম।

 রাস্তা দিয়ে যাচ্ছি। যেতে যেতে দেখি ওলীপুরে তিন-চার জন এক রাজাকারকে রাইফেলসহ নিয়ে আসছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘নানা কই নিয়ে যাও?’ একজন বলে, ‘রাজাকারকে জমা দিয়ে আসি মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে।’ আমি বললাম ‘যাওয়া লাগবে না, যেতে দিচ্ছে না।’ লোকটি বলে, ‘নানা তুমি তাহলে নিয়ে যাও।’ 

পরে রাইফেল আর রাজাকারকে নিয়ে এসে মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে জমা দেই। মুক্তিযোদ্ধারা বললো ‘এই দিকে যেয়ে দেখ, লতিফ মির্জা পুরস্কার দিচ্ছে।’ গিয়ে দেখি আমার ভাই আমজাদ আর মেজো চাচা ভাত রান্না করছে। পুরস্কার নেয়ার জন্য দেখি ক্ষেতের আলের উপরে বড় লাইন ধরে আছে সবাই। লাইনে দাঁড়ালাম। লতিফ মির্জা নৌকা থেকে কিছু টাকা নিয়ে এসে আমাদের দিলেন। 

সেই টাকা নিয়ে গ্রামে ফিরে আসি। গ্রামে ঢুকে দেখি কেউ নাই। বাড়িতে এসে দেখি বাড়ি ফাঁকা। চিন্তায় পড়ে গেলাম। এখন কী করি, কোথায় পাই পরিবারের সবাইকে! পরে চলে গেলাম মামার বাড়ি পাশের গ্রাম সুলতানপুর। গিয়ে দেখি সবাই সেখানেই আছে। শুক্রবার সবাইকে নিয়ে ফিরলাম গ্রামে। শনিবার গ্রামে মিলিটারি ঢুকে গ্রাম পোড়াতে শুরু করলো। গ্রামের পরে গ্রাম আগুন আর আগুন। পোড়াতে পোড়াতে মিলিটারি হান্ডিয়াল চলে যায়। মুক্তিযোদ্ধারা আর যুদ্ধ করলো না মিলিটারিদের সাথে। 

ওই যে মিলিটারি ধরিয়ে দিয়েছিলাম, এখন তারা আমার উপর ক্ষিপ্ত। আমাকে পেলেই গুলি করবে। রহমান নামে এক রাজাকার বিকালে চলে এলো গ্রামে। পালিয়ে পালিয়ে থাকি, কী আর করবো! কিন্তু কয়দিন আর পালিয়ে থাকা যায়। পরে চলে গেলাম শশুর বাড়ি বড়বেলাই।

আমার শ্যালক রহমান রাজাকারও বিয়ে করছে একই গ্রামে। ওরা কীভাবে যেন জানতে পেরেছে আমি বড়বেলাই আছি। জহির মোল্লা, আর রহমানের বাবা বড়বেলাই গ্রামে আসে। এসে গ্রামের প্রধানদের ডাক দিয়ে বলে ‘তারা আলী মিলিটারিদের ধরিয়ে দিয়ে এসে পালিয়ে আছে এই গ্রামে। ও যদি এই গ্রামে থাকে তাহলে মিলিটারিরা এসে গ্রাম পুড়িয়ে দিবে।’ 

পরে আমার শ্বশুর আর গ্রামের প্রধানরা আমার কাছে যান। আমি তখন ক্ষেতে ধান কাটছিলাম। ক্ষেতের মধ্যে গিয়ে আমার শ্বশুর আর বয়োজেষ্ঠ্যরা আমাকে বলেন, ‘জামাই, বিপদ আপদেই আত্মীয় স্বজন। তুমি অনেক দিন যাবত আশ্রয় নিয়ে ছিলে আমাদের গ্রামে। এখন তোমার জন্য যদি বেলাই গ্রাম পুড়িয়ে দেয়? আমাদের গ্রামে কোন মুক্তিযোদ্ধা নাই। একজন আছে পাবনা থেকে পড়াশোনা করা অবস্থায় যুদ্ধে গেছে বলে শুনেছি। কিন্তু গ্রামের সাথে তার কোন সর্ম্পক নাই। তো বাবা তুমি এই গ্রাম থেকে চলে যাও।’ 

পরে আমি সেই ক্ষেত থেকেই চলে যাই শাহজাদপুর আমার ফুফাতো ভাই ছরাব আর ওমরের কাছে। তারা ছিল মুক্তিযোদ্ধা। ভাইদের সাথে ছিলেন ফকরুল, তিনি ছিলেন কমান্ডার। তিনি কোনভাবেই আমাকে মানতে চান না। যাই হোক পরে অনেক কিছু বলার পরে ফকরুল ভাই মেনে নেন আমাকে। সেই জায়গায় বেশ কিছু দিন অবস্থান করি। ভাইদের সাথে এদিক সেদিক যাই। এই ভাবে সেই খানে থাকতে থাকি। 

বেশ কিছুদিন পরে ভারত স্বীকৃতি দিল বাংলাদেশের স্বাধীনতার। পরে আমি চলে আসতে চাই কিন্তু আমকে আসতে দেয় না। ফুফাতো ভাইরা জানায় এখনও রাস্তা ক্লিয়ার হয় নাই। ৩-৪ দিন পরে আমাকে আসতে দেয়। 

গ্রামে আসার আগেই শুনি রাজাকারদের নাকি ফুলের মালা দিয়ে বরণ করে নিবে তার মধ্যে নাকি রহমান রাজাকারও আছে। সেই রহমান রাজাকার এখনও বেঁচে আছে! সেদিন গ্রামে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেই। পরে চলে যাই সেই আমার শশুর বাড়ি বড়বেলাই। ওখানে কিছু দিন থাকার পরে নিজ গ্রামে ফিরে আসি। 

খাদেমুল হোসেন (তারা) বর্তমানে নওগাঁতেই বসবাস করছেন তিনি নওগাঁ মাজারে খাদেম হিসাবে নিযুক্ত আছেন। আজও জীবিত রাজাকার রহমান এর সাথে ঘৃণায় কথা বলেন না তিনি। যুদ্ধের সময় লতিফ মির্জা তাকে একটা কাগজ দিয়েছিলেন। কিন্তু তার মা ভয়ে তার কাগজটা পুড়িয়ে ফেলেন। যুদ্ধের দলিল বলতে এখন শুধু স্মৃতিটাই আছে তার কাছে।

অনুলিখন: ইমরান হোসাইন

/এসিএন