|

মুক্তিযুদ্ধ

Published: Sun, 21 Mar 2021 | Updated: Sun, 21 Mar 2021

বীর মুক্তিযোদ্ধা কফিল উদ্দিনের যুদ্ধস্মৃতি

সেপ্টেম্বরের প্রথম দিকে সম্ভবত, আমরা প্রথম অ্যাফেক্টেট হই। সেটা হলো, আমরা ঐ আশপাশে, মেঘনা নদীর পাড়ে দরিয়াহালমাইরা বলে একটা গ্রাম আছে, আমাদের ক্যাম্প। ওইখানে আসার পর... আমরা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন গ্রাম চেঞ্জ করি। করে আসার পর গ্রামে খবর আসলো, দুইটা রাজাকার আসছে ওই বাড়িতে।

Published: Thu, 18 Mar 2021 | Updated: Thu, 18 Mar 2021

বীর মুক্তিযোদ্ধা এম এইচ আল আজাদ চৌধুরী’র যুদ্ধস্মৃতি

আমি একজন ফ্রিডম ফাইটার। মূলত আমার রাজনীতির হাতেখড়ি হয় ১৯৬২ সালে, আইয়ূববিরোধী আন্দোলনের সময়। শিক্ষা কমিশনের বিরুদ্ধে আমরা আন্দোলন করি। তখন আমি ক্লাস সিক্সের ছাত্র। ১৯৬৬ এবং ১৯৬৯, এই আন্দোলনের সময় আমি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করি।

Published: Sun, 07 Mar 2021 | Updated: Sun, 07 Mar 2021

ভ্রাম্যমাণ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের পথচলা শুরু

অভিযাত্রা ডেস্ক : মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানার বিষয়ে নতুন প্রজন্মকে উদ্বুদ্ধ করতে ‘ভ্রাম্যমাণ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর’ চালু করছে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের ‘নতুন প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধকরণ’ প্রকল্পের অধীনে এই ভ্রাম্যমাণ জাদুঘর চালু করা হয়ে।

রোববার (৭ মার্চ) সকালে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের শিখা চিরন্তনে জাদুঘর সম্বলিত ২টি বাস উদ্বোধন করেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক এমপি।

মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী েএসময় বলেন, ভ্রাম্যমাণ এ জাদুঘরের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের মাঝে মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস তুলে ধরা হবে। এর মাধ্যমে নতুন প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিসংগ্রামের সঠিক তথ্য জানতে পারবে।

তিনি বলেন, ভ্রাম্যমাণ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর বাসের এই উদ্যোগ আমরা এবারই প্রথম নিয়েছি। এই বাসে মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কিত যাবতীয় তথ্য থাকবে। জাদুঘর বাস শুধু ঢাকায় নয়, সারাদেশেই চলবে।

এসময় মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক সচিব তপন কান্তি ঘোষসহ মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

ও/এসএ/

Published: Sun, 07 Mar 2021 | Updated: Sun, 07 Mar 2021

বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ বাবুল ইসলাম’র যুদ্ধের স্মৃতিগুলো

সাভার থাইক্যা গুলি করতে করতে আর্মিরা আইছে। আর্মিরা আইতে আইতে লুটেরচর আর ওয়াসপুরের মাঝামাঝি গুলি করতেছিল। পাঁচজনে গুলি করতে আইতে আইতে, সব মানুষ দৌড়ায়া যাইতেছিল। ওইখানে বজলুর ভাই আছিল, তারপরে মহিউদ্দিন ভাই আছিল, আমরা ৪-৫ জন। ৭ জনের মধ্যে ৬ জন গ্রেনেড-ট্রেনেড মাইরাহালাইছে। একজন জ্যাতা আছিল। ঐ একজনরে ধরছিল। ধইরা পরে গুলি কইরা মাইরাহালাইছে।

 

Published: Wed, 17 Feb 2021 | Updated: Wed, 17 Feb 2021

বীর মুক্তিযোদ্ধা আমির হোসেন মিয়া’র যুদ্ধস্মৃতি

একদিন বিকালবেলা জিগাতলা থেকে আমি টিউশনি করে আসতেছি। আসার সময় দেখা গেলো যে, মানুষ রাস্তার পাশে আড়ালে আড়ালে দাঁড়ায়া আছে। ‘কি ব্যাপার?’ বলে যে, ‘ওই বাড়ির থেকে একটা মেয়ে ধরে নিয়ে যাচ্ছে, পাক আর্মিতে।’তো  পাক আর্মিতো না, তখন মিলিশিয়া না কি বাহিনী ছিল, তারা। তো আমি একটু পাশে, আমার কাছে সাইকেল, একটু পাশে দাঁড়াইলাম। ওরা বললো, ‘ওইদিকে যাইয়েন না, গেলেই কিন্তু আপনাকে গুলি করবো। ওরা গুলি করে কিন্তু।’ আমি পাশেই দাঁড়াইলাম, দেখলাম আসলেই একটা মেয়েকে তারা ধরে নিয়ে যাচ্ছে। কেউ আগায় না।

Published: Thu, 11 Feb 2021 | Updated: Thu, 11 Feb 2021

বীর মুক্তিযোদ্ধা গোলাম নাজির হোসেন’র যুদ্ধস্মৃতি

ঢাকাতে বিভিন্ন জায়গায় আমাকে দায়িত্ব দেয়া হয় অবজার্ভেশন করার জন্য। কোথায় কি আছে, না আছে। পাকবাহিনী কোনজায়গাতে ঘাঁটি গাঁড়ছে—এবং আমাদের জায়গাটা কোন কোন জায়গাতে সুযোগ-সুবিধা, ইনফরমেশন সব আমাদের দেওয়ার নির্দেশ ছিল। মেজর হায়দার বলে দিয়েছিলেন। সেক্টর কমান্ডার খালেদ মোশাররফ ২১ জুলাই রাত্রে এসে বললেন, ‘আমাদের কিছু ছেলের দরকার, আর্টিলারির জন্য।’সেখান থেকে আমি আর আমার এক সহযোদ্ধা আব্দুল মতিন (সে রিসেন্টলি মারা গিয়েছে) এই দুজনকে সিলেক্ট করা হয়।

Published: Tue, 09 Feb 2021 | Updated: Tue, 09 Feb 2021

যুদ্ধের স্মৃতিচারণে যা যা বললেন বীর মুক্তিযোদ্ধা আমিনুর রহমান আবু

“পরবর্তীতে চিন্তা করলাম যে, এখানে আর থাকা যাবে না। আমার বাড়িতে, আমার দোকানের কর্মচারীও বিহারী। আমার পাশেও বিহারীদের দোকান। তখন চিন্তা করলাম যে, মুক্তিযুদ্ধেই যাবো। কিন্তু কীভাবে যাবো? ওই মুরুব্বি যে বলছিলেন, উনার কাছে গেলাম। উনি বললো, আমাদের একটা কাগজে লিখে দিলেন, তুমি এমনে এমনে যাবা। উনার বাড়ি আবার কুমিল্লার বুড়িচংয়ে। উনারা খুব সম্ভ্রান্ত পরিবারের। বুড়িচংয়ের ভুইঁয়াবাড়ি।”

Published: Tue, 24 Nov 2020 | Updated: Tue, 24 Nov 2020

সাধারণের চোখে মুক্তিযুদ্ধ: খাদেমুল হোসেন (তারা)

আমি মোঃ খাদেমুল হোসেন (তারা)। ১৯৪৯ সালে সিরাজগঞ্জ জেলার তাড়াশ উপজেলার নওগাঁ গ্রামে জন্মগ্রহণ করি। আমার পিতা: মো: ইমান আলী প্রামানিক। আমার বাবা ছিলেন একজন কৃষক। আমার মা আফছুন নেছা ছিলেন গৃহিনী। আমরা চার ভাই ও এক বোন, আমি প্রথম। আমি ১৯৬৫ সালে আমার স্ত্রী সকিতুন খাতুন কে বিয়ে করি। আমার পাঁচ ছেলে মেয়ে। ১৯৭১ সালের যুদ্ধের সময় আমার পেশা ছিল কৃষি। সে বছর অসহযোগ আন্দোলনের সময় আমি বিভিন্ন মিছিল/মিটিংয়ে যোগ দিতাম।

১৯৭১ সাল। সেদিন ছিল বুধবার দিবাগত রাত। আমি সেহরী খেয়ে শুয়ে আছি। আমার ছোট ভাই আমজাদ আর আমার মেজো চাচা আতাব আলী। এরা মুক্তিযোদ্ধাদের নৌকার মাঝি ছিলেন। সেদিন হঠাৎ করে হই হই করে নৌকা বেয়ে আসার শব্দ পাওয়া যায়। আমি মনে করেছিলাম পরের দিন হাটের দিন, মোহনপুর থেকে ছন বিক্রির জন্য হয়তো কেউ আসছে। পরে লক্ষ্য করে দেখি, আমার ছোট ভাইয়ের কন্ঠ। আমি মাকে বললাম, ‘ও মা, আমজাদ মনে হয় পালিয়ে আসছে!’ এই দিকে মুক্তিযোদ্ধাদের কোন খোঁজ-খবর নাই, আর ও আসছে! আসার পরে শুনি যে ও মুক্তিযোদ্ধাদের বাংকারে পৌঁছে দিয়ে খাওয়া দাওয়া করিয়ে তারপর বাড়ি ফিরেছে।

আমজাদকে জিজ্ঞেস  করলাম, ‘কিরে! যুদ্ধর কী পরিস্থিতি?’ তাকে সতর্ক  করে দিয়ে বললাম, ‘তাড়াশে মাঝে মাঝেই  রাজাকাররা আসে, অত্যাচার করে। ওখানে যাবি না’। আমজাদ বলে, ও যাবে। সে বলে, ‘নৌকা নিয়ে আমরা একটু ফাঁকে ছিলাম, এখন তো কাছাকাছি। মনে হয় তাড়াশে রবিবার কিংবা সোমবারে আট্যাক করবে’। বললাম ‘ভাত খা, বড় বাইম ধরেছি’। ও রোজা ছিল না, ভাত খেলো। 

খাওয়া দাওয়া শেষ করে আমজাদ মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে যাবার জন্য বের হয়। আমাদের বাড়ি থেকে দুই কিংবা তিন বাড়ি যেতেই হিমসাগর ফায়ার হয়। মুক্তিযোদ্ধরা প্রথম গুলি করে মিলিটারিদের। প্রতাব- উল্লাপাড়া দিয়ে মিলিটারি নওগাঁ প্রবেশ করে। ওদের দেখেই হঠাৎ করেই  গুলি এল। তারপরই তো শুরু হয়ে যায় তুমুল আকারে যুদ্ধ। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরে আমরা এখন কী করবো, চারদিক দিয়ে শুধু গুলি আর গুলি। বাড়ির সবাইকে নিয়ে পড়লাম মহাবিপদে। পরে কোদাল দিয়ে বাড়ির পাশে লম্বা করে গর্ত করলাম। মা, বউ, ছোট ভাইয়ের বউকে সেই গর্তের মধ্যে রাখলাম। আর ওদের বললাম ‘যে যা জানিস সেই দোয়া কালাম পড়। আজ হয়ত আর বাচঁবো না।’ 

এই যে আরম্ভ হলো, একটানা ১১টা পর্যন্ত শুধু গুলির শব্দ পাওয়া গেল। দুই দিক থেকেই সেই গোলাগুলি হচ্ছে। মা-ঝিদের গর্তে রাখার পর যুদ্ধ চলা অবস্থায় মুক্তিযোদ্ধারা আমাদের বাড়িতে উঠে আসে। আমি ভয়ে কোন কথা বলতে পারছিলাম না তাদের সাথে। পরে মা মুক্তিযোদ্ধাদের বলে, ‘কিরে বাবা! তোরা কি আমাদের মেরে ফেলবি নাকি?’ ওরা বলে, ‘না মা, আমরা আপনাদের বাঁচানোর জন্য এসেছি। আপনারা এই গর্ত ছেড়ে দেন। আমরা এখান থেকে পজিশন নিব’। আমি বললাম ‘ভাই! এদের কী করবো?’ ওরা বলে, ‘ওই যে পুকুরের কাদায় উত্তর সিথানী করে শুইয়ে রাখেন’। কী আর করার, তাই করলাম। কাদার মধ্যে মা-ঝি দের পুকুরে শুইয়ে রাখি। 

সব মুক্তিযোদ্ধারা আমাদের বাড়িতে চলে আসতে লাগলো। আমাদের বাড়ি থেকেই  পজিশন নিয়ে সেই আকারে গুলি করতে থাকে। সেই সময় জমিতে ধান ছিল। মুক্তিবাহিনীর যোদ্ধারা  জিজ্ঞেস করল, ‘ওই যে উঁচু জমি দেখা যায়। সেখানে যাবো, যাবার কোন পথ আছে কি?’ আমি বললাম, ‘হ্যাঁ আছে’। তারা বললো, ‘তা হলে আমাদের সাথে চলেন’। আমি বললাম ‘আমি কি করে যাবো?’তারা বললো ‘কেন, আমরা যে ভাবে যাই সেই ভাবেই যাবেন’। 

পরে তাদের সাথে আমি বুক কনুই আর হাটুতে ভর দিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে গেলামউঁচু জমির নিচে গিয়ে থামলাম, সেখান থেকে গুলি করতে থাকে মুক্তিযোদ্ধরা। তারা আমাকে মাথা তুলতে নিষেধ করে, কারণ মাথা উচু করলেই গুলি লাগবে। প্রচণ্ড গোলাগুলি হয়। মুক্তিবাহিনী ছিল ধানের আড়ালে আর পাকবাহিনী ছিল রাস্তার উপরে। এতে পাকবাহিনীর অনেকেই মারা যায়।

পরে পাকিস্তানি মিলিটারি আত্মসমর্পণ করে। কিন্তু বাঙ্গালীরা কি আর তা মানে! ‘জয় বাংলা’ বলতে বলতে এগিয়ে যায় আর গুলি করতে থাকে। মিলিটারি দৌড়ে পালাতে থাকে বগার বিলের মধ্যে দিয়ে। কিন্তু ওরা তো যানে না বিলে কতটুকু পানি আছে। পানিতে গিয়ে ওরা পড়ে যায়। আমরা তাদের কাছ থেকে বিভিন্ন অস্ত্র নিয়ে নওগাঁ বাজারে মুক্তিবাহিনীদের কাছে পাঠিয়ে দেই। 

তার পরে আমরা পূর্বের দিকে এগিয়ে যেতে থাকি। নবীপুর গিয়ে একটা নৌকা পেলাম। যে কয়জন জীবিত মিলিটারি পেলাম তাদের নৌকায় তুলে দিলাম। রাস্তায় লতিফ মির্জার সাথে দেখা, ডাক দিয়ে বললো, ‘শোন! যে কয়টা মিলিটারি পাবি ধরে নিয়ে এসে আমার কাছে দিবি। দিলে তোদের পুরস্কার দিব।’ পরে আমি আর আফছার বিলের মধ্যে গিয়ে রাজাকার ধরি। ধরে নিয়ে আসছিলাম সেই সময় জামাল চেয়্যারমানের বাড়ি সামনে এসে এম.এ ইসমাইলের সাথে দেখা। ও বলে ‘কি হে! এদের ধরে কোন দিকে যাচ্ছো?’ আমি উত্তর দিলাম ‘লতিফ মির্জা বলছে ধরে নিয়ে গেলে পুরস্কার দিবে সেই জন্য নিয়ে যাচ্ছি।’ ইসমাইল বলে, ‘তুই চলে যেতে পারিস। এদের আমার কাছে দে।’ পরে দিয়ে দিলাম। ও চলে গেল। ধরে নিয়ে আসলাম তাও কিছু নিতে পারলাম না। আফসোস করতে লাগলাম।

 রাস্তা দিয়ে যাচ্ছি। যেতে যেতে দেখি ওলীপুরে তিন-চার জন এক রাজাকারকে রাইফেলসহ নিয়ে আসছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘নানা কই নিয়ে যাও?’ একজন বলে, ‘রাজাকারকে জমা দিয়ে আসি মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে।’ আমি বললাম ‘যাওয়া লাগবে না, যেতে দিচ্ছে না।’ লোকটি বলে, ‘নানা তুমি তাহলে নিয়ে যাও।’ 

পরে রাইফেল আর রাজাকারকে নিয়ে এসে মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে জমা দেই। মুক্তিযোদ্ধারা বললো ‘এই দিকে যেয়ে দেখ, লতিফ মির্জা পুরস্কার দিচ্ছে।’ গিয়ে দেখি আমার ভাই আমজাদ আর মেজো চাচা ভাত রান্না করছে। পুরস্কার নেয়ার জন্য দেখি ক্ষেতের আলের উপরে বড় লাইন ধরে আছে সবাই। লাইনে দাঁড়ালাম। লতিফ মির্জা নৌকা থেকে কিছু টাকা নিয়ে এসে আমাদের দিলেন। 

সেই টাকা নিয়ে গ্রামে ফিরে আসি। গ্রামে ঢুকে দেখি কেউ নাই। বাড়িতে এসে দেখি বাড়ি ফাঁকা। চিন্তায় পড়ে গেলাম। এখন কী করি, কোথায় পাই পরিবারের সবাইকে! পরে চলে গেলাম মামার বাড়ি পাশের গ্রাম সুলতানপুর। গিয়ে দেখি সবাই সেখানেই আছে। শুক্রবার সবাইকে নিয়ে ফিরলাম গ্রামে। শনিবার গ্রামে মিলিটারি ঢুকে গ্রাম পোড়াতে শুরু করলো। গ্রামের পরে গ্রাম আগুন আর আগুন। পোড়াতে পোড়াতে মিলিটারি হান্ডিয়াল চলে যায়। মুক্তিযোদ্ধারা আর যুদ্ধ করলো না মিলিটারিদের সাথে। 

ওই যে মিলিটারি ধরিয়ে দিয়েছিলাম, এখন তারা আমার উপর ক্ষিপ্ত। আমাকে পেলেই গুলি করবে। রহমান নামে এক রাজাকার বিকালে চলে এলো গ্রামে। পালিয়ে পালিয়ে থাকি, কী আর করবো! কিন্তু কয়দিন আর পালিয়ে থাকা যায়। পরে চলে গেলাম শশুর বাড়ি বড়বেলাই।

আমার শ্যালক রহমান রাজাকারও বিয়ে করছে একই গ্রামে। ওরা কীভাবে যেন জানতে পেরেছে আমি বড়বেলাই আছি। জহির মোল্লা, আর রহমানের বাবা বড়বেলাই গ্রামে আসে। এসে গ্রামের প্রধানদের ডাক দিয়ে বলে ‘তারা আলী মিলিটারিদের ধরিয়ে দিয়ে এসে পালিয়ে আছে এই গ্রামে। ও যদি এই গ্রামে থাকে তাহলে মিলিটারিরা এসে গ্রাম পুড়িয়ে দিবে।’ 

পরে আমার শ্বশুর আর গ্রামের প্রধানরা আমার কাছে যান। আমি তখন ক্ষেতে ধান কাটছিলাম। ক্ষেতের মধ্যে গিয়ে আমার শ্বশুর আর বয়োজেষ্ঠ্যরা আমাকে বলেন, ‘জামাই, বিপদ আপদেই আত্মীয় স্বজন। তুমি অনেক দিন যাবত আশ্রয় নিয়ে ছিলে আমাদের গ্রামে। এখন তোমার জন্য যদি বেলাই গ্রাম পুড়িয়ে দেয়? আমাদের গ্রামে কোন মুক্তিযোদ্ধা নাই। একজন আছে পাবনা থেকে পড়াশোনা করা অবস্থায় যুদ্ধে গেছে বলে শুনেছি। কিন্তু গ্রামের সাথে তার কোন সর্ম্পক নাই। তো বাবা তুমি এই গ্রাম থেকে চলে যাও।’ 

পরে আমি সেই ক্ষেত থেকেই চলে যাই শাহজাদপুর আমার ফুফাতো ভাই ছরাব আর ওমরের কাছে। তারা ছিল মুক্তিযোদ্ধা। ভাইদের সাথে ছিলেন ফকরুল, তিনি ছিলেন কমান্ডার। তিনি কোনভাবেই আমাকে মানতে চান না। যাই হোক পরে অনেক কিছু বলার পরে ফকরুল ভাই মেনে নেন আমাকে। সেই জায়গায় বেশ কিছু দিন অবস্থান করি। ভাইদের সাথে এদিক সেদিক যাই। এই ভাবে সেই খানে থাকতে থাকি। 

বেশ কিছুদিন পরে ভারত স্বীকৃতি দিল বাংলাদেশের স্বাধীনতার। পরে আমি চলে আসতে চাই কিন্তু আমকে আসতে দেয় না। ফুফাতো ভাইরা জানায় এখনও রাস্তা ক্লিয়ার হয় নাই। ৩-৪ দিন পরে আমাকে আসতে দেয়। 

গ্রামে আসার আগেই শুনি রাজাকারদের নাকি ফুলের মালা দিয়ে বরণ করে নিবে তার মধ্যে নাকি রহমান রাজাকারও আছে। সেই রহমান রাজাকার এখনও বেঁচে আছে! সেদিন গ্রামে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেই। পরে চলে যাই সেই আমার শশুর বাড়ি বড়বেলাই। ওখানে কিছু দিন থাকার পরে নিজ গ্রামে ফিরে আসি। 

খাদেমুল হোসেন (তারা) বর্তমানে নওগাঁতেই বসবাস করছেন তিনি নওগাঁ মাজারে খাদেম হিসাবে নিযুক্ত আছেন। আজও জীবিত রাজাকার রহমান এর সাথে ঘৃণায় কথা বলেন না তিনি। যুদ্ধের সময় লতিফ মির্জা তাকে একটা কাগজ দিয়েছিলেন। কিন্তু তার মা ভয়ে তার কাগজটা পুড়িয়ে ফেলেন। যুদ্ধের দলিল বলতে এখন শুধু স্মৃতিটাই আছে তার কাছে।

অনুলিখন: ইমরান হোসাইন

/এসিএন

 

Published: Sat, 03 Oct 2020 | Updated: Sat, 03 Oct 2020

সাধারণের চোখে মুক্তিযুদ্ধ : শামসুল আলম

আমি মো. শামসুল আলম ১৯৫৭ সালে সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার নওগাঁ গ্রামে জন্মগ্রহণ করি। আমার পিতা মো. দেলবার প্রামানিক ছিলেন একজন কৃষক ও মাতা সামেদান বেগম ছিলেন গৃহিণী। পাঁচ ভাই দুই বোনের মধ্যে আমি দ্বিতীয়। ১৯৭১ সালে আমি সপ্তম শ্রেণীতে পড়াশোনা করতাম। সেই সময় আমার ১৪ বছর। সেই সময়ে অনেক কিছুই বুঝতাম না। কিন্তু যুদ্ধের সময় আমি বিভিন্ন মিছিল/মিটিংয়ে যেতাম। ইয়াকুব, আজিজ, আনসার মোল্লা, শহিদ ওরাও আমার সাথে যেতো। 

আমাদের অবশ্য কেউ যেতে বলতো না, তবু আমরা যেতাম, এ দেখতে যে, তারা মিটিংয়ে কী করে। লতিফ মির্জা, গেদু মিয়া, আমজাদ হোসেন মিলন, সোবাহান এদের নেতৃত্বে বিভিন্ন জায়গায় মিছিল মিটিং হতো এবং তারা নিজেদের মধ্যে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে ছিল। তাড়াশে যে মিলিটারিরা ক্যাম্প করেছে তা মুক্তিবাহিনীরা জানতে পারে। সেই বিষয়ে আলোচনা করে তারা নিজেদের মধ্যে। মুক্তিবাহিনীরা আমাদের গ্রামের মানুষদের যুদ্ধের সময় কীভাবে পরিবারের সবাইকে নিয়ে নিরাপদে থাকতে হবে, এই দিক নির্দেশনা দিতেন মিটিংয়ে। তারা আমাদের তাড়াশে যে মিলিটারি এলে তা সবাইকে বলে দেয়, যে কোনো সময় নওগাঁতে যুদ্ধ হতে পারে। আমাদের নওগাঁতে  লতিফ মির্জার মুক্তিবাহিনী দিয়ে ঘেরাও করে রেখেছিলো পুরা এরিয়াটা। 

পাকিস্তানের সেনা বাহিনীরা তাড়াশে ক্যাম্প করে। নওগাঁতে মুক্তিবাহিনী চারদিকে ঘিরে রেখেছে, তা হয়তো ওরাও কীভাবে যেন জানতে পারে। সেই সময় বিভিন্ন খোঁজ-খবর দিত রাজাকাররা, হয়তো ওরাই দিয়েছিল এ তথ্য। যুদ্ধের সময় পাক বাহিনীদের বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করতো রাজাকাররা। আমাদের নওগাঁর আশে পাশে কয়েকজন রাজাকার ছিল। রাজাকারদের কমান্ডার ছিলেন বেনেবউ গ্রামের জয়নাল। তার সাথে ছিলেন জফর আলী প্রমানিক, আসমত, আফছার, নওগাঁর মছিম, রহমান, বাট্রা গ্রামের মতিন। এদের মধ্যে এখনও রহমান রাজাকার জীবত আছে। 

আর যুদ্ধের পরে রাজাকারদের বিচার করে মুক্তিবাহিনীরা। কে বড় বড় অপরাধ করেছে দেশের বিরুদ্ধে বা বেশি ক্ষতি করেছে সবকিছু চিন্তা-ভাবনা করে রাজাকারদের কমান্ডার জয়নাল আর বাট্রাগ্রামের মতিন বেশি বিরুদ্ধতা করছে প্রমাণ হয়। পরে তাদের দুই জনকে হত্যা করা হয়। রাজাকাররা পাকিস্তানি মিলিটারিদের নওগাঁতে আসার খবর দেয়। মিলিটারিরা একদিন নওগাঁতে আসে। তারা প্রথমে অবস্থান করে নওগাঁ মাজারে।

মাজার সর্ম্পক জানতে চায় পাক বাহিনীরা। তারা রাজাকারদের জিজ্ঞাসা করে এটা কার মাজার। রাজাকাররা উত্তর দেয় এটা বড় এক ওলির মাজার। পাক বাহিনীরা বিভিন্নভাবে মাজার শরীফকে নিয়ে খারাপ মন্তব্য করে। মিলিটারি নওগাঁর বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতে থাকে। বিভিন্ন বাড়ি-ঘর থেকে গরু-ছাগল রাজাকারদের দিয়ে নিয়ে যায় খাওয়ার জন্য। এইভাবে মিলিটারিরা ঘুরতে ঘুরতে যখনই নওগাঁ উত্তর পাড়া যায়, তখনই মুক্তিযোদ্ধারা তিনটা ফায়ার করে। সেদিন মিলিটারিরা আসে নওগাঁতে আর যুদ্ধ হয় পরদিন ফজরে দিকে। লতিফ মির্জা গেরিলা বাহিনী ও গেদু মিয়ার মুক্তিবাহিনী নিয়ে নওগাঁ এরিয়া ঘিরে রেখেছিল আগেই। 

সেদিন দুপুর পর্যন্ত তুমুল আকারে যুদ্ধ হয়। সেই যুদ্ধটাই আমার চোখের সামনে ভাসে। সেই সময় উত্তর পাড়ার ২টা বাড়ি ছিল। তার মধ্যে আমাদের একটা। যুদ্ধের সময় মুক্তিবাহিনীরা আমাদের বাড়িতে এসে মিলিটারিদের সাথে যুদ্ধ করে। আর আমদের বাড়ির পাশের ডোবাতে পরিবারে সবাইকে নিয়ে থাকতে বলে। কারণ হলো গুলি করলেও আমাদের মাথার উপর দিয়ে চলে যাবে। এমন সময় যুদ্ধটা শুরু হয়, পালানোর কোনো সময় ছিল না। আমরা সবাই ডোবাতে গিয়ে নিচু হয়ে শুয়ে পড়ি। অবশ্য আমাদেরকে মিটিংয়ে এই সতর্ক করা হয়েছিল আগেই।

সেদিন এত ফায়ার হয় যে, ফায়ারের কারণে গাছের পাতা ছিল না। আর শুধু গুলির খোসা পড়ে ছিল। যুদ্ধে মুক্তিবাহিনীর কাছে পরাজিত হতে থাকে মিলিটারিরা। পাক বাহিনীরা দৌড়ে পালাতে থাকে আর আত্মসমর্পন করে কিছু। তাদেরকে আমরা গ্রামের সবাই ধরতে থাকি, আর লতিফ মির্জার কাছে তুলে দিতে থাকি। 

সেদিনের যুদ্ধতে অনেক পাক সৈন্যরা গ্রামের ঘর-বাড়িতে বিভিন্ন জায়গায় পালিয়ে ছিল। তাদের অনেককে আমরা পরের দিনেও ধরি। কিন্তু যুদ্ধের একদিন পরেই হাজার হাজার মিলিটারি আসতে থাকে নওগাঁতে। পাকবাহিনী আসতেই বিনাদভাটা গ্রামে ধানের ক্ষেতে ৫ জন নিরীহ সাধারণ মানুষকে গুলি করে করে হত্যা করে। হত্যা করে বিনাদভাটা গ্রামের হাসান, মুক্তার, শহকত ও হাসানপুর গ্রামের জেনাদ এবং জফের সরকারকে।

মিলিটারিরা আসে আর গ্রামে আগুন দিতে থাকে। সেদিন যুদ্ধে পাকিস্তানি মিলিটারির বিনাদভাটা, হাসানপুর, নবীপুর, নওগাঁ, কুমরুল, বিনয়নগর, রায়নগর, কেসেদপুর গ্রামে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়। শুধু তাই না, ধানক্ষেত পুড়িয়ে দেয়, এমনকী আমাদের বাড়িতে ধানের পালা দেয়া ছিল, সেগুলোও পুড়িয়ে দেয়। মুক্তিবাহিনী এত সৈন্যদের সাথে যুদ্ধ করে পারবে না, কারণ যুদ্ধে গোলা-বারদ শেষ হয়ে গেছে। তাই যুদ্ধ না করে একটু আরাল হয়ে যায়।

আমরা আগেই খোঁজ পাই যে, গ্রামে পাকবাহিনী ঢুকবে। কারণ রাজাকারদের আত্মীয়-স্বজনছিল আমাদের গ্রামে। রাজাকাররা তাদের জানিয়ে দিত। এতে আমরাও জানতে পারতাম। তাই আমি আমার পরিবারের সবার সাথে রাজাকাদের কমান্ডার জয়নালের গ্রাম বেনেবউতে খোরশেদ তালুকদারে বাড়িতে চলে যাই এবং সেইখানে আমার পরিবারকে নিয়ে অবস্থান করি। সেই গ্রামে অনেক মানুষ গিয়েই অবস্থান করে।

৫-৭ দিন পর আমরা গ্রামে ফিরে আসি। এসে দেখি আমাদের কোনো কিছু নেই। আর সাথেও কিছু নিতে পারি নাই। সবার একই অবস্থা। পরে আবার আমরা নতুন করে ছন দিয়ে ঘর তৈরি করি। কিন্তু তখনও দেশ স্বাধীন হয়নি। মিলিটারিরা হান্ডিয়াল ক্যাম্প করে ছিল নওগাঁর যুদ্ধের পরে। আর সাধারণ মানুষদের বিভিন্নভাবে অত্যাচার করত। মা-বোনদের নির্যাতন করাসহ বাড়ি থেকে বিভিন্ন মালামাল লুট করাতো তারা। এগুলো দেখে আমাদের সহ্য হত না। তাই আমরা গ্রামের সমবয়সের ছেলেরা যুদ্ধে যাবার পরিকল্পনা করতে থাকি। 

আমি, খলিল, গোলবার, গোলাম, রফিক, হবি, আজিজসহ আমরা সবাই পরিকল্পনা করলাম, ভারত গিয়ে ট্রেনিং করে এসে দেশে যুদ্ধ করবো। কিন্তু তা আর যাওয়া হলো না। কিছু দিন পরেই বিভিন্ন জায়গায় থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা আসতে থাকে। এদিকে খবর পাই, হান্ডিয়াল পাকবাহিনীরা ক্যাম্প ছেড়ে পালিয়ে চলে গেছে। চারদিক থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা আসতে থাকে। কিছু দিন পরেই দেশ স্বাধীন হয়ে যায়। 

স্বাধীনতার পরে আর পড়াশেনা করা হয় না আমার। পরে আমি কৃষি কাজে যুক্ত হয়ে পড়ি। ১৯৭৬ সালে আমি শাহানাজ বেগমকে বিয়ে করি। আমাদের তিন সন্তান সুমন, মামুন, সাবিনা। আমি বর্তমানে নওগাঁর সেই উত্তরপারা (নবীপুর) গ্রামেই বসবাস করছি।

অনুলেখক : ইমরান হোসাইন

ও/ডব্লিউইউ

Published: Mon, 07 Sep 2020 | Updated: Mon, 07 Sep 2020

যুদ্ধকথা : বীরমুক্তিযোদ্ধা আজিজার রহমান

আমি মো. আজিজার রহমান নীলফামারী মহকুমার জলঢাকা থানার কাঁঠালি ইউনিয়নের কাঁঠালি গ্রামে ১৯৪৭ সালে জন্মগ্রহণ করি। আমার পিতা মো. কাছিম উদ্দিন (কাছুয়া মামুদ) পেশায় একজন কৃষক ছিলেন এবং মাতা মোছা. আছিয়া বেগম একজন গৃহিণী ছিলেন। আমারা দুই ভাই বোন। আমার অবস্থান দ্বিতীয়।

প্রাথমিক শিক্ষা লাভের পর শালডাঙ্গা হাই স্কুলে ভর্তি হই। দিনাজপুর জেলার দেবীগঞ্জ থানার শালডাঙ্গা ইউনিয়নে এক ভগ্নিপতির বাড়িতে থেকে পড়াশোনা করতে থাকি। আমি নিয়মিত রেডিও অনুষ্ঠান শুনতাম। ৭ মার্চের ভাষণ রেডিওতে শুনি। শেখ মুজিবুর রহমান ভাষণে যুদ্ধের আগাম বার্তা পৌঁছে দেন। দেবীগঞ্জে এসে আমি ছাত্ররাজনীতির সাথে যুক্ত হয়ে পড়ি। দেশের হালচাল প্রতিনিয়তই বিবিসি বাংলা খবর থেকে শুনতাম। ২৫ মার্চ রাতের বীভৎস চিত্রগুলো সম্পর্কে রেডিওর মাধ্যমে শুনতে পাই। মাথায় খুন চেপে বসে। দু’-একদিনের মধ্যেই চারদিকে ধরপাকড় শুরু হয়ে যায়। সেনাবাহিনী আর রাজাকার গুণ্ডাদের জ্বালাও-পোড়াও হত্যাযজ্ঞ দিনদিন বাড়তে থাকে।

এদিকে আমার এসএসসি পরীক্ষা। দেশ নাকি পরীক্ষা আগে এই কথা মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল? অবশেষে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলি, যে করেই হোক যুদ্ধে যেতে হবে। এই নরপিশাচের হাত থেকে দেশকে মুক্ত করতে হবে।

বাড়ির সবার জোরজবরদস্তিতে স্কুলে টেস্ট পরীক্ষার হল পর্যন্ত যাই এবং কোনরকম খাতায় নাম বসিয়ে টেবিলের উপর রেখে বের হয়ে আসি। এই অবস্থা দেখে স্যার বলল, কী খবর, আজিজ! বসতে না বসতেই প্রকৃতির ডাক? শরীর খারাপ করলো নাকি?  জ্বি স্যার, শরীর মন দু’টাই খারাপ। বের হয়ে আমার বন্ধু অলিয়ারের সাথে এ বিষয়ে কথা বলি। যে করে হোক ভারতে যেতে হবে। সেখানে নাকি যুদ্ধের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে? আমাদের ট্রেনিং নিতে হবে এবং দেশের এই ক্রান্তিকালে যুদ্ধ করতে হবে। শত্রুমুক্ত স্বদেশ গড়তে হবে। অলিয়ার আমার কথায় রাজি হয়ে গেল।

বাড়ি এসে শুনতে পাই দিন-দুপুরে দেবিগঞ্জ থেকে যুবক ছেলে-মেয়েদের ধরে নিয়ে যাচ্ছে এবং নদীর পারে নিয়ে জবাই করে পানিতে ফেলে দিচ্ছে। কী নরপিশাচ রে বাবা! গা কাঁটা দিয়ে উঠলো। আমার এক বন্ধু নোয়াবু কবিতার ছন্দে বলল,

‘বাঁচতে হলে লড়তে হবে
ছাড়তে হবে এ দেশ,
বীরের বেশে ফিরতে হবে
গড়তে সোনার দেশ।’

তার কথা শুনে বাসার দিকে এগিয়ে আসি। বিকেলের দিকে শুনতে পাই নোয়াবুকে ধরে নিয়ে গেছে রাজাকার। একথা শোনামাত্রই আঙুল দিয়ে দু’কর্ণ চেপে ধরি। কী হচ্ছে দুনিয়ায়? অলিয়ারসহ ভারতের দিকে শুরু করি ম্যারাথন দৌড়। শালডাঙ্গা থেকে করতোয়া নদী পাড়ি দিয়ে ভারতের জলপাইগুড়ি জেলার দেওয়ানগঞ্জের বগদুলঝুলা দিয়ে প্রবেশ করি। সারারাত ধকল সহ্য করতে হয়েছে। সকালবেলা আট আনা দিয়ে একটা রুটি আর চার আনা দিয়ে এক কাপ দুধ দু’জনে ভাগ করে খাই। তারপরে ক্যাম্পের দিকে এগিয়ে যাই। দেওয়ানগঞ্জ যুব শিবিরের দায়িত্বে ছিলেন আফসার আলী আহমদ এমএনএ। সেখানে রিক্রুট করে আমাদের প্রশিক্ষণের জন্য পাঠায়।

ভারতের মেঘালয় রাজ্যের মূর্তি পাহাড়ে মূর্তি ক্যাম্প নামক (মুজিব ক্যাম্প)এ যাই। আমরা যারা যুদ্ধে যাবো তাদেরকে একত্রিত করা হয়। সেখানে ছিল দেবী চরণ (লক্ষ্মীচাব), যাদব (লক্ষ্মীচাব), নবীন চন্দ্র বর্মন (ঐ), মনোধর বর্মন (ঐ), মদন চন্দ্র বর্মন (ঐ), অরবিন্দ রায় (ঐ), সুনীল চন্দ্র মহন্ত (ঐ), দিনাজপুরের অলিয়ারসহ আরো অনেকে।

গাড়িতে উঠলাম। সারাদিন চলে গাড়িটি রাত্রিবেলা ক্যাম্পে গিয়ে পৌঁছল। সেখানে আরো শত শত যোদ্ধা অপেক্ষা করছে। অনেকেই এসে জিজ্ঞেস করল, কে, কোথা থেকে আসা হলো? কোনো পরিচিত কেউ আছে কি না ইত্যাদি। 

আমরা জলঢাকা থেকে ৩২ জনের একটা গ্ৰুপ হলাম। বেশির ভাগ সহযোদ্ধা ছিল লক্ষ্মীচাবের। লক্ষ্মীচাব ইউনিয়ন আগে জলঢাকা থানার অধীনে ছিল এখন নীলফামারী জেলার অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। সবাই মিলে ২১ দিন প্রশিক্ষণ নিলাম। আবার অনেকে ৩০ দিন পর্যন্ত প্রশিক্ষণ নিল। প্রশিক্ষণ শেষে আমাদের চানমারি নিয়ে যাওয়া হয়। পাহাড়ের ঢালু পথ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি। কিছুদূর গিয়ে সবাই চানমারির প্রস্তুতি নেই। অনেকেই প্রথমদিকে টার্গেট করেও লক্ষ্যবস্তুতে হিট করতে পারেনি। কিন্তু আমার প্রথম ফায়ারে লক্ষ্যবস্তু ভেদ করে। ভারতীয় সেনা কর্মকর্তা (নামটা মনে নেই) আমার দিকে তাকিয়ে থেকে বলেন, তুম মুজাহিদ হায়। মুখটা লাল হয়ে গেছে রাগে। আমি তাকাতে পারছি না। আমার হাত ধরে টেনে নিয়ে যেতে থাকে, কিছুই বুঝতে পারি না। কী হচ্ছে এসব? পাশে দেখি আফসার আলী আহমদ এমএনএ, আমিন বিএসসি এমএনএ, জনাব উকিল, আব্দুর রউফ এমএনএ, আজহারুল ইসলাম এমপিএ সকলে বসে আলোচনা করছেন। তাঁদেরকে দেখে দু’চোখ দিয়ে ঝরঝর করে পানি ঝরতে লাগল। কাঁদো কাঁদো গলায় বললাম, ‘রউফ ভাই আমাকে নিয়ে যাচ্ছে।’ আর কিছুই বলতে পারিনি।

রউফ ভাই ইশারা দিয়ে বললেন, উসকো কিয়া করতাথা?
: সাচ্চা মুজাহিদ হ্যায়।
: নেহি উসকা স্টুডেন্ট হ্যায়।
: নেহি উসকো মুজাহিদ হ্যায়, নো আনসার হ্যায়।
: মেরা ঘর কা ছেলে হ্যায়, ছোড়দো উসকো ।
তিনি কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারলেন না। ওই সেনা কর্মকর্তা বললেন, উসকো টারগেট বিলকুল ঠিক হ্যায়, এ মুজাহিদ প্যাহেলা রাউন্ড মিনারকা লাগাতাথা। 

রউফ ভাই কিছু না বলে, আমাকে টেনে নিলেন। মনে মনে বললাম আর এরকম হবে না। টার্গেটে আঘাত করাটা কী আমার অপরাধ? আল্লাহ যা করে মঙ্গলের জন্য। শুকুর আলহামদুলিল্লাহ। 

দু'একদিন পর আমরা পঞ্চগড়ের বোদা থানায় যাত্রা করি। সেখানকার রঙ্গিয়ানী হাটে খরচ করি যাতে ক্যাম্পে রান্না করে খাওয়া দাওয়া করা যায়। অপারেশনের জ‌ন্য প্রস্তুতি নেই। আমার বডি নম্বর হলো ১৫৭/২৮। দিনের বেলা রেকি করে এসে আমাদের সমস্ত খবরা-খবর জানানো হয়। রাত হলেই আমরা হামলা চালাই। ভুল্লীতে পাকিস্তানি বাহিনীর উপর হানা দেই। আমাদের আক্রমণে মারা যায় দুইজন রাজাকার আর পাঁচজন-ছয়জন পাকসেনা। বাকিরা ভীত হয়ে কোনো রকম পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। আমরা ক্যাম্প থেকে দুইজন মেয়েকে উদ্ধার করি বিবস্ত্র অবস্থায়। সমস্ত শরীরে নরপিশাচের খাবায় খানখান হয়ে আছে। নখের আঁচড় আর কামড় দিয়ে সমস্ত শরীরকে বিষিয়ে তুলেছে। সুন্দর মুখখানা ভয়ে-আতঙ্কে নীল বিষ হয়ে আছে। তাঁদের গায়ে চাদর জড়িয়ে দিয়ে চিকিৎসার জন্য পাঠিয়ে দেই। সেদিন এই দৃশ্য দেখে আমার মাথায় খুন চেপে ধরে। হায়েনাদের ধরে ফালি ফালি করে কেটে আগুনে জ্বালিয়ে দেই। তবুও যেন রাগ থামতে চায় না। এখনো বলতে গেলে গা কাঁটা দিয়ে ওঠে।

এরপরে অপারেশনের জন্য প্রস্তুতি নেই ঠাকুরগার উদ্দেশ্যে। দলের সবাই ধীরে ধীরে পজিশন নিয়ে যাই। ফায়ারিং করতে করতে আমরা এগিয়ে যাই। পাকবাহিনীর সাথে মুখোমুখি গোলাগুলি শুরু হয়। একপর্যায়ে একের পর এক ধরাশায়ী হয়ে পড়তে থাকে পাকসেনা আর রাজাকার গুণ্ডারা। সেখানে আর টিকতে পারল না। পাকিস্তানি সেনাসদস্যরা পালাতে লাগল কাঞ্চন ব্রিজের দিকে। ব্রিজ পার হয়ে আমাদের হাত থেকে রক্ষার জন্য গোলার আঘাতে ব্রিজটি ভেঙে দেয়। ঠাকুরগাঁও মুক্ত হয়ে পড়ে। আমরা ফিরে আসি ক্যাম্পে। কোথাও কোনো পাকবাহিনী নেই। 

সকলে মিলে মিলিশিয়া ক্যাম্পে অবস্থান করি। এই ক্যাম্পেই কেউ আনসারে, কেউ পুলিশে, কেউ সেনাবাহিনীতে যোগদান করে। অনেক দিন থেকে বাড়ির বাইরে আছি, মা-বাবাকে দেখার জন্য মন ব্যাকুল হয়ে পড়ে। মিলিশিয়া ক্যাম্প থেকে মেজর ছদর উদ্দিন আমাকে তাঁর বাসায় নিয়ে যান। তিনি আমাকে প্রচন্ড ভালোবাসতেন। বেগম জিয়ার শাসনামলে তাঁকে ফাঁসি দিয়ে মারা হয়।

যুদ্ধ শেষ হলেও আমার যুদ্ধ শেষ হয়নি। চারদিকে ঘুরে ঘুরে দেখতাম। জনমানবশূন্য এলাকা, কোথাও কেউ নেই। কোথায় কী হয়েছে সেসব তথ্য সংগ্রহ করি। ঠাকুরগাঁওয়ের পশ্চিম পাশে একা একা হাঁটি। কোথাও কাউকে চোখে পড়ছে না। একটা গন্ধ। নাকে আসতেই থমকে দাঁড়াই। চোখ তুলে তাকাতে বীভৎস চিত্রটি দৃশ্যমান হয়। সেখান থেকে একদৌড়ে ফিরে আসি মেজর ছদর উদ্দিন সাহেবের কাছে। সব কিছু বলি এবং বেশ কয়েকজন যোদ্ধাসহ চলে যাই সেখানে। মানুষের লাশগুলো স্তুপে স্তুপে পড়ে আছে। কিছু লাশ থেকে পচা দুর্গন্ধ বের হয়ে আসছে। সারি সারি পিঁপড়া লাইন ধরে লাশের ভিতরে প্রবেশ করেছে। মশা-মাছির উৎপাত বেড়ে গেছে।

মেজর ছদর উদ্দিন সাহেব বললেন, দ্রুত কবর দেয়ার ব্যবস্থা করো, এভাবে রাখলে পরিবেশের ক্ষতি হবে। কোনো উপায়ন্তর না দেখে সকলে মিলে একটা পুকুর খনন করি। সেখানেই লাশগুলো শায়িত করে মাটি দেই। বর্তমানে সেখানে শহীদ মিনার তৈরি করেছে বাংলাদেশ সরকার।

পাকবাহিনীর সদস্যরা যে ডাকবাংলোতে থাকতো তার আশেপাশে কিছুই দৃষ্টিগোচর হয় না। কিন্তু রুমের ভিতরে প্রবেশ করে দেখি মদ আর সিগারেটের গন্ধ চারিদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। সামনে এগোতেই একটা মেয়ের লাশ দেখতে পাই। মাথার চুলগুলো পিছন দিক থেকে ঢেকে রেখেছে। দু’জন মিলে এগিয়ে যাই। কাছে গিয়ে দেখি মাথা থেকে রক্ত বের হয়ে রোয়াকে জমাট বেঁধে আছে। শরীরে কোন কাপড় নেই। 

ছেলে মানুষ মারা গেলে চিৎ হয়ে পড়ে থাকে কিন্তু মেয়ে মানুষ মারা গেলে নিজের লজ্জাস্থান ঢেকে উপুড় হয়ে পড়ে থাকে। এটা সেদিনই প্রকাশ পেল আমার সামনে। তাঁকে নিজ হাতে কবর দিয়ে এসেছি। এখনো সে কবরটা আছে। এরপর ঠাকুরগাঁয়ের ইপিআর হেডকোয়াটারে অস্ত্র জমা দেই।

যোদ্ধাজীবন শেষ করে গ্রামে ফিরে আসি। অভাবের সংসারে পড়াশোনার পাঠ চুকিয়ে কাজের সন্ধান করতে হয়। কোথাও কোনো কাজ না পেয়ে রাগে-দুঃখে কৃষি কাজ করতে বাধ্য হই। টানাপোড়েনের সংসারে ১৯৭২ সালের শেষ দিকে বিয়ে করি। বর্তমানে আমি পাঁচ সন্তানের জনক। তারা হলো আফরুজা বেগম, টুলটুলি আক্তার, মিলনুর রহমান মিলন, মশিয়ার রহমান, সাহানাজ পারভিন।

অনুলিখন : হাসান সোহেল

ও/ডব্লিউইউ