পিট সিগার:  ব্যাঞ্জো হাতে দাঁড়িয়ে আছে প্রতিবাদের ভাষা

Published: Fri, 08 Nov 2019 | Updated: Fri, 08 Nov 2019

প্রদীপ ঘোষ

বিশ শতকের বিশ্ব সাংস্কৃতিক আন্দোলনে পিট সিগার ছিলেন একজন ঐতিহাসিক গণযোদ্ধা। যুদ্ধ করেছিলেন আগ্নেআস্ত্র দিয়ে নয় বরং  গানই ছিল তার যুদ্ধের ভাষা। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত লড়াই করেছেন শোষকের বিরুদ্ধে, রাষ্ট্রীয় অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে জীবনভর কণ্ঠকে কাঁপিয়েছেন। গ্রামীণ লোকসুরকে সঙ্গী করে ঘুরেছেন পৃথিবীর বিভিন্ন জনপদে। 

১৯১৯ সালের ৩ মে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কের ম্যানহাটন শহরের এক সঙ্গীত পরিবারে তার জন্ম। বাবা চার্লস সিগার ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে সঙ্গীত শেখাতেন, আর মা কনস্ট্যান্ট সিগার একজন দক্ষ বেহালাবাদক ছিলেন। এ কারণেই পরিবারের ভেতরে ছিলো সংগীত চর্চা ও গবেষনার পরিবেশ। তিন ভাই-বোনের মধ্যে পিট ছিলেন সবার ছোট। 

শৈশব থেকেই পিট সিগার পড়াশোনায় ছিলেন মনোযোগী। পরিবারের সবচেয়ে মেধাবী এই ছাত্র অ্যভন ওল্ড ফার্মসে পড়াশোনা শুরু করেন। ১৯৩৬ সালে বৃত্তি পেয়ে ভর্তি হন হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে। কিন্তু দুই বছর পর পড়াশোনার গণ্ডির মধ্যে নিজেকে আর আটকে রাখতে পারলেন না। মার্কিন সমাজে তখন তরুণদের মধ্যে হিপি হওয়ার প্রবণতা তাকে আকৃষ্ট করে। হিপিদের সাথে ছন্নছাড়া জীবনে মেতে উঠলেন। পড়াশোনা পর্ব থমকে গেলো। পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারলেন না। ফলে স্কলারশিপ হারালেন। পিট পড়াশোনার ইতি টানেন এখানেই। পরিবারে বাবা, ভাই আর বোনের লোকসঙ্গীতের প্রতি আগ্রহ দেখে ছোটবেলা থেকে পিটেরও লোকসঙ্গীতের উপর আগ্রহ জন্মায় কিন্তু সঙ্গীতের আবেগ জন্মালো আরও বেশ কিছু সময় পর। সংগীত পরিবারের একজন হিসেবে  ঘুরে বেড়াতে বেড়াতে পল্লীর নানা প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা লোকসঙ্গীতের কথা ও গানের সুর সংগ্রহ করতেন।  
বয়স তখন মাত্র ১৬ বছর। এক গ্রীষ্মের দিনে বাবার সাথে তিনি ঘুরতে যান নর্থ ক্যারোলিনার অ্যাশভিলের একটি লোকজ মেলায়। সেই মেলায় বিভিন্ন রকম বাদ্যযন্ত্রের প্রদর্শনী চলছিল। হঠাৎই পিটের চোখ চলে যায় এক অন্য ধরনের বাদ্যযন্ত্রের উপর। আর সিটি হলো ব্যাঞ্জো। ব্যাঞ্জোর প্রেমে পড়লেন পিট সিগার। এই বাদ্যযন্ত্রটি মার্কিন লোকসঙ্গীতের সাথে ঐতিহ্যগত ভাবে যুক্ত ছিল। এই পাঁচ তারের ব্যাঞ্জোই পরবর্তীকালে হয়ে উঠলো শোষনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের হাতিয়ার। 

১৯৪০ সালে পিট সিগার গান লিখতে শুরু করেন। এই সময়ে মিলার্ড ল্যাম্পেল এবং লি হেইসের সাথে যুক্ত হয়ে 'অ্যালম্যান্যাক সিঙ্গারস' নামে প্রথম লোকসঙ্গীতের একটি দল তৈরি করেন। তাদের প্রথমদিকের তৈরি গান The Talking Union Blues  শ্রমিকদের মাঝে ব্যাপক আলোড়ন সৃস্টি করে। এরপর  ফ্যাসিজমের বিরুদ্ধে তাদের  শান্তিবাদী গান The Balled of October 16 আমেরিকার সমাজে গানের এক নতুন ভাষা তৈরি করে। ১৯৪২ সালে এই গানের দলটি  লোকসঙ্গীতের কিছু গান রেকর্ড করার জন্য প্রস্তুুতি নিচ্ছিল। কিন্তু এ সময় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ায় সবকিছু থমকে যায়। যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর পিট 'সিঙ্গ আউট' নামে একটি পত্রিকা সম্পাদনার দায়িত্ব নেন। লেখালেখির পাশাপাশি তিনি একক সঙ্গীতের অনুষ্ঠান করতে শুরু করেন।

১৯৪৯ সালে নিউ ইয়র্কের গ্রামের এক স্কুলে পিট সঙ্গীতের শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। ১৯৫০ সালে অ্যালম্যান্যাক দলটি আবার নতুন করে গড়ে তোলা হয়। এবার দলের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় 'দ্য ওয়েভার্স'। এ দলে নতুন করে যুক্ত হলেন লি  হেইস, রনি গিলবার্ট, ফ্রেড হেলম্যান প্রমুখ। ১৯৫৩ সালের দিকে পিট সমাজতান্ত্রিক ভাবাদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে ওঠেন। তাদের সমর্থনে নানা প্রতিবাদে নিজেকে এবং তার দলকে সম্পৃক্ত করায় তারা মার্কিন সরকারের বিরাগভাজন হয় পড়ে। সরকার থেকে এই গানের দলকে বাম দলগুলোর একটি শাখা হিসেবে চিহ্নিত করতে থাকে। তখন ওয়েভার্সকে কোথাও গান করার অনুমতি দেয়া হতো না। ফলে দলের কার্যক্রম থমকে যায়। বছর দুই অপেক্ষার পরে আবার তারা একসাথে মঞ্চে গান পরিবেশন করতে শুরু করেন। ১৯৫৫ সালে পিট সিগার ‘সিং আউট’ ম্যাগাজিনে Where Have All the Flowers Gone? নামের একটি কবিতা প্রকাশ করেন। পরে জো হিকারসন এই কবিতাটিকে গানে রূপান্তরিত করেন। এই গানটিই যুদ্ধবিরোধী গান হিসেবে মানুষকে সচেতন করে।

প্রথাবিরোধী গান করেই শুধু পিট সিগার কিংবদন্তী হননি। লোকসঙ্গীতের প্রতি তার ভালবাসাই তাকে অন্য এক উচ্চতায় নিয়ে গেছে। শুধু নিজে গান লিখে আর তাতে সুর দিয়ে শ্রোতাদের মাঝে গান গেয়েই ক্ষান্ত ছিলেন না, আমেরিকার বিভিন্ন অঞ্চলের পুরনো হারিয়ে যাওয়া লোকগান পুনরুদ্ধারে তার ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য। ১৯৪০ থেকে ১৯৫০ এর আমেরিকার শ্রমিক আন্দোলন, সামাজিক অধিকার আদায়ের লড়াইয়ের বিষয়টি বারবার উঠে এসেছে পিটের গানের কথা ও সুরে। ১৯৬০ সালে ভিয়েতনাম যুদ্ধবিরোধী গান, ১৯৭০ সালে যুদ্ধবিরোধী ও পরিবেশ রক্ষার আন্দোলনে তার গান অগ্রণী ভূমিকা রেখেছে।

ষাটের দশকের স্নায়ুযুদ্ধের সময় মার্কিন প্রশাসন কমিউনিজম ভয়ে সর্বদা তটস্থ থাকতো। সে সময় পিট সিগারের গাওয়া প্রতিবাদী গণসঙ্গীতকে সরকার ভাল  চোখে কখনোই দেখেনি। এর মধ্যে পিট নিউ ইয়র্কে দুগ্ধজাত শিল্পের কর্মীদের ধর্মঘটে অংশ নিয়ে বামপন্থী রাজনীতির প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েন। ‘উই শ্যাল ওভারকাম’ গানটিকে গির্জার ডায়াসের বাইরে সাধারণ মানুষের প্রাণের সঙ্গীত হিসেবে সবার মাঝে ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হন পিট সিগার।

১৯৬১ সালে তার বিরুদ্ধে হুলিয়া জারি করা হয়। তাকে আন-আমেরিকান অ্যাক্টিভিটিস বলে চিহ্নিত করা হয়। কিন্তু পিট সিগারের রাজনৈতিক বিশ্বাস, ধর্মীয় দর্শন এবং চিন্তা-ধারণাকে কিছুতেই দমাতে পারেনি মার্কিন প্রশাসন। বরং পিট দ্ব্যর্থহীন কন্ঠে বলেছিলেন, একজন মার্কিন নাগরিক হিসেবে তার বিশ্বাস ও রাজনৈতিক চেতনার উপর কারও হস্তক্ষেপ মোটেই কাম্য নয়। ষাটের দশেকের আমেরিকা জুড়ে চলা ‘সিভিল রাইটস আন্দোলনে’র অন্যতম পুরোধা ছিলেন পিট সিগার। মার্কিন সরকারের জনবিদ্বেষী, হঠকারী নীতি এবং রাষ্ট্রীয় বৈষম্যের বিরুদ্ধে, এমনকি ভিয়েতনাম যুদ্ধে আমেরিকা সরকার প্রধান ভূমিকা নেয়ায় মার্কিন জনগণ খুব একটা ভালভাবে নেয়নি।

মুক্তিপাগল মানুষের প্রতিনিধি পিট সিগার বরাবরই যুদ্ধবিরোধী ছিলেন। ১৯৬৩ সালে মিসিসিপিতে ছাত্রদের এক অহিংস আন্দোলনকে সমর্থন জানাতে যোগ দেন পিট সিগার। ভিয়েতনামের যুদ্ধে বিপর্যস্ত আমেরিকার জনগণকে প্রতিবাদের ভাষা চিনতে শিখান পিট। যুদ্ধের বিপক্ষে মানুষকে সচেতন করতে তাই মঞ্চকেই বেছে নিয়েছিলেন তিনি। ম্যানহাটনের স্কুলের বারান্দায়, নিউ ইয়র্কের ব্যস্ত রাস্তার ধারে, সর্বত্রই তার ব্যতিক্রমী সুর ঝড় তুলতে শুরু করে। আর তাই তার বারুদের বিরুদ্ধে ব্যাঞ্জোর মূর্ছনা, অশান্তির বিরুদ্ধে ভালোবাসার গান। 

পিট সিগারের এই ভূমিকায় মার্কিন প্রশাসন ভীতসন্ত্রস্থ হয়ে পড়ে। কারাবন্দী করা হলো তাকে। তারপরও থামানো যায়নি। জেল থেকে মুক্তি পেয়েই গাইলেন তার অনবদ্য গান ‘হোয়ার হ্যাভ অল দ্য ফ্লাওয়ার্স গন’।

যেকোনো যুদ্ধবিরোধী আন্দোলনে সব সময় সোচ্চার ছিলেন পিট সিগার। ভিয়েতনাম যুদ্ধ থেকে ইরাকের যুদ্ধ, পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ আন্দোলন, ওয়াল স্ট্রিট দখল অভিযান থেকে হাডসন নদী বাঁচাও আন্দোলন; সব জায়গাতেই শান্তিকামী জনতা তার গানে আশ্রয় খুঁজে নিয়েছে, পেয়েছে প্রতিবাদের নতুন সব গান আর শ্লোগান। 

১৯৫৪ সালে পান ‘প্রেসিডেন্সিয়াল মেডেল অফ আর্টস’ এবং ‘কেনেডি  সেন্টার অ্যাওয়ার্ড’। ১৯৯৬ সালে সঙ্গীতে তার অসাধারণ ভূমিকার জন্য রক এন্ড রোল এর ‘হল অফ ফেম’ এ তাকে নির্বাচিত করা হয়। সেই বছরেই তিনি হার্ভার্ড আর্টস মেডেল অর্জন করেন। ১৯৯৭ সালে পিট Best traditional folk music album বিভাগে গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ড অর্জন করেন।

কিন্তু সবচেয়ে বড় পুরষ্কার অসংখ্য মানুষের ভালবাসা সারা জীবন ভরসা পেয়েছেন। বিশ্বের লক্ষ লক্ষ নিপীড়িত মানুষের পক্ষে আজীবন লড়াই করে গেছেন এই নির্ভীক শিল্পী। নিজের গানকে তিনি ছড়িয়ে দিয়েছেন আপামর মানুষের কণ্ঠে।  তাই বিশ্বের সকল ভাষায় আজ আমরা গাই ‘ আমরা করবো জয় একদিন’। ২০১৪ সালের ২৭ জানুয়ারি ৯৪ বছর বয়সে থামলো ব্যাঞ্জোর শব্দ। বিশ্বের মুক্তিকামী মানুষের কণ্ঠস্বর আজো আন্দোলিত করছে গোটা মানব সভ্যতাকে। প্রগতির পথে-আগামীর পথে। এই মহান গণশিল্পীর জন্মশতবর্ষে শ্রদ্ধা আর অপার ভালোবাসা।

 

/এসিএন