এর্নেস্তো চে গুয়েভারা

Published: Tue, 22 Oct 2019 | Updated: Tue, 22 Oct 2019

- মামুন কবীর 
 
এর্নেস্তো চে গুয়েভারা, জন্ম ১৪ জুন, ১৯২৮, মৃত্যু ৯ অক্টোবর, ১৯৬৭। বিপ্লবী এর্নেস্তো ছিলেন একাধারে একজন চিকিৎসক, লেখক, বুদ্ধিজীবী, গেরিলা নেতা, কূটনীতিবিদ, সামরিক তত্ত্ববিদ। তিনি কিউবার বিপ্লবের অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব। তার প্রকৃত নাম ছিল এর্নেস্তো গেভারা দে লা সের্না। তবে তিনি সারা বিশ্ব লা চে বা কেবলমাত্র চে নামেই পরিচিত। 

১৯২৮ সালের ১৪ জুন তিনি আর্জেন্টিনায় জন্ম গ্রহণ করেন। পরিবারের পাঁচ সন্তানের মধ্যে তিনি ছিলেন জেষ্ঠ্য। ছোটবেলা থেকেই তার চরিত্রে অস্থির চপলতা দেখে তার বাবা বুঝতে পেরেছিলেন যে আইরিস বিদ্রোহের রক্ত তার এই ছেলের ধমনীতে বহমান। খুব শৈশব থেকেই সমাজের বঞ্চিত, অসহায়, দরিদ্রদের প্রতি এক ধরনের মমত্ববোধ তার ভেতর তৈরি হতে থাকে। একটি সমাজতান্ত্রিক রাজনৈতিক ধারার পরিবারে জন্ম হওয়ার কারণে খুব ছোট বয়সেই তিনি রাজনীতির জ্ঞানে পারদর্শী হয়ে উঠেন।  
 
তরুণ বয়সে ডাক্তারি ছাত্র হিসেবে চে সমগ্র লাতিন আমেরিকা ভ্রমণ করেছিলেন। এই সময় এই সব অঞ্চলের সর্বব্যাপী দারিদ্র তার মনে গভীর রেখাপাত করে। এই ভ্রমণকালে তার অর্জিত অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে তিনি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে এই অঞ্চলে বদ্ধমূল অর্থনৈতিক বৈষম্যের স্বাভাবিক কারণ হল একচেটিয়া পুঁজিবাদ, নব্য ঔপনিবেশিকতাবাদ ও সাম্রাজ্যবাদ; এবং এর একমাত্র সমাধান হল বিশ্ব বিপ্লব। এই বিশ্বাসের ফলেই তিনি রাষ্ট্রপতি জ্যাকব আরবেনজ গুজমানের নেতৃত্বাধীন গুয়েতেমালার সামাজিক সংস্কার আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন। 

১৯৫৪ সালে সিআইএ-এর ষড়যন্ত্রে গুজমানকে ক্ষমতাচ্যুত করা হলে চে-র বৈপ্লবিক আদর্শ চেতনা বদ্ধমূল হয়। পরবর্তীকালে মেক্সিকো সিটিতে বসবাসের সময় তার সঙ্গে আলাপ হয় রাউল ও ফিদেল কাস্ত্রোর। চে তাঁদের ছাব্বিশে জুলাই আন্দোলনে যোগ দেন। মার্কিন-মদতপুষ্ট কিউবান একনায়ক ফুলগেনসিও বাতিস্তাকে উৎখাত করার জন্য যুদ্ধে সামিল হন এবং বিপ্লবী সংঘের এক অত্যান্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিতে পরিণত হন। 

সেকেন্ড-ইন-কম্যান্ড পদে তার পদোন্নতি হয় এবং বাতিস্তা সরকারকে উৎখাত করার লক্ষ্যে দুই বছর ধরে চলা গেরিলা সংগ্রামের সাফল্যের ক্ষেত্রে একটি অত্যান্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।  
 
মোটর সাইকেল অভিযান 
চে গেভারা ১৯৪৮ সালে ব্যুয়েন্স আয়ার্স বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসাবিজ্ঞান বিষয়ে পড়ালেখার জন্য ভর্তি হন। ১৯৫১ সালে পড়ালেখায় এক বছরের বিরতি দিয়ে তিনি তার বন্ধু আলবার্টো গ্রানাডোর সাথে মোটর সাইকেলে দক্ষিণ আমেরিকা ভ্রমণে বেরিয়ে পড়েন যার অভিজ্ঞতা পরবর্তীতে তার লেখা মোটরসাইকেল ডায়রিজ নামে প্রকাশিত হয়।

তার এই ভ্রমণের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল পেরুর সান পেবলোর লেপার কলোনিতে (কুষ্ট রোগী দের জন্য বিশেষ কলোনি) স্বেচ্ছা সেবক হিসেবে কিছুদিন সপ্তাহ কাজ করা। এই ভ্রমণে তিনি মাচু পিচ্চুর যাওয়ার পথে প্রত্যন্ত অঞ্চলের দরিদ্র কৃষকদের চরম দারিদ্রকে অতি নিকট থেকে দেখেন। এ সময় তিনি প্রত্যক্ষ করেন এ কৃষকরা ধনি মহাজনদের অধিনে কিভাবে নিপীড়িত। তার এই ভ্রমণে তিনি আর্জেন্টিনা, চিলি, পেরু, ইকুয়েডর, কলম্বিয়া, ভেনিজুয়েলা, পানামা ও মিয়ামির মধ্য দিয়ে ফিরে যান ব্যুয়েন্স আয়ার্সে। ভ্রমণের শেষ দিকে তিনি এই মত পোষণ করেন যে দক্ষিণ আমেরিকা আলাদা আলাদা দেশের সমষ্টি নয় বরং এক অভিন্ন অস্তিত্ব যার প্রয়োজন মহাদেশ ব্যপী স্বাধীনতার জাগরণ ও স্বাধীনতার পরিকল্পনা। পরবর্তীতে তার নানা বিপ্লবী কর্মকান্ডে এই একক, সীমানাবিহীন আমেরিকার চেতনা ফিরে আসে বার বার।   
 
কিউবার বিপ্লব বিপ্লবের পরিকল্পনায় কাস্ত্রোর প্রথম পদক্ষেপ ছিল মেক্সিকো হতে কিউবায় আক্রমণ চালান। ১৯৫৬ সালের ২৫শে নভেম্বর তারা কিউবার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে। পৌঁছানোর সাথে সাথেই বাতিস্তার সেনাবাহীনি কতর্কৃ আক্রান্ত হন। তার ৮২ জন কমরেড মারা যান অথবা কারাবন্দী হন। 

মাত্র ২২জন কমরেড বেঁচে যায় এ যাত্রায়। গেভারা লিখেছিলেন সেটা ছিল সেই রক্তক্ষয়ী মুখোমুখি যুদ্ধেও সময় যখন তার চিকিৎসা সামগ্রীর সাথে একজন কমরেডের ফেলে যাওয়া একবাক্স গোলাবারুদও নিয়েছিলেন যা তাকে শেষ পর্যন্ত চিকিৎসক থেকে বিপ্লবীতে পরিণত করে। সিয়েরা মস্ত্রা পর্বতমালায় বিপ্লবীদেও একটা অংশ পুনরায় একত্রিত হতে পেরেছিলেন। সেখানে তারা ২৬ জুলাই আন্দোলনের গেরিলা এবং স্থানীয় মানুষদের সহযোগিতা লাভ করেছিলেন।  
 
যুদ্ধচলাকালীন চে বিদ্রোহী সেনাবাহিনীর অখন্ড অংশ হয়ে গিয়েছিলেন। তিনি ফিদেল কাস্ত্রোকে বিভিন্ন প্রতিযোগিতা, কূটনীতি এবং অধ্যবসায়ের কথা জানিয়েছিলেন। গেভারা গ্রেনেড তৈরির কারখানা, রুটি সেকানোর জন্য চুলি- প্রস্তুত এবং নিরক্ষর সঙ্গীদের লেখাপড়ার জন্য পাঠশালা তৈরি করেন। তাছাড়াও তিনি একটি স্বাস্থ্য কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা, সামরিক প্রশিক্ষনের কর্মশালা আয়োজন এবং তথ্য সরবরাহের জন্য পত্রিকা প্রচার করতেন। বিখ্যাত টাইম ম্যাগাজিন তিন বছর পর তাকে ‌‘কাস্ত্রোর মস্তিষ্ক’ বলে আখ্যায়িত করেছিল। তারপর তিনি বিদ্রোহী বাহিনীর কমান্ডার হিসেবে পদোন্নতি পান।  
 
আন্তর্জাতিক কূটনীতি 
১৯৬৪ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে গেভারা বিশ্বের বিপ্লবীদের কূটনীতিক হিসেবে পরিচিতি পান। তাই তিনি কিউবার প্রতিনিধি হয়ে জাতিসংঘ অধিবেশনে যোগদান করার জন্য নিউইয়র্ক শহরে যান। ১১ ডিসেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ১৯তম অধিবেশনে আবেগ অভিভতূ বক্তৃতায় তিনি দক্ষিণ আফ্রিকার জাতিগত বৈষম্যের কঠোরনীতি দমনে জাতিসংঘের দুর্বলতার কথা বলেন। এটাকে বন্ধ করার জন্য জাতিসংঘের কোন পদক্ষেপ আছে কি না জানতে চেয়ে প্রশ্ন তোলেন। 

গেভারা তখন নিগ্র জনগনের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের নীতির কঠোর নিন্দা জ্ঞাপন করেন। ক্রোধান্বিত গুয়েভারা ‘সেকেন্ড ডিক্লেরেশন অব হাভানা’ নামক একটি আবেগপূর্ণ ঘোষণার উল্লেখ করে তার বক্তৃতা শেষ করেন। তিনি বলেন, যে তার এই ঘোষণার জন্ম হয়েছে ক্ষুধার্ত জনগন, ভূমিহীন কৃষক, বঞ্চিত শ্রমিক ও প্রগতিশীল মানুষের দ্বারা। বক্তব্যের শেষে তিনি আরো বলেন, সারা বিশ্বের শোষিত জনগোষ্ঠীর একমাত্র চিৎকার এখন, ‘হয় স্বদেশ অথবা মৃত্যু’। 

চে গুয়েভারা হত্যা বলিভিয়ার সেনাবাহিনীর ভাষ্যমতে তারা গুয়েভারাকে ৭ অক্টোবর গ্রেপ্তার করে এবং তার মৃত্যু হয় ৯ অক্টোবর ১৯৬৭ সাল বেলা ১.১০ টায়। মৃত্যুর এ সময়কাল এবং ধরণ নিয়ে মতভেদ এবং রহস্য এখনো আছে। ধারণা করা হয় ১৯৬৭ সালের এই দিনটিতে লা হিগুয়েরা নামক স্থানে নিরস্ত্র অবস্থায় নয়টি গুলি করে হত্যা করা হয় বন্দী চে গুয়েভারাকে। ১৯৯৭ সালে ভ্যালেগ্রান্দের একটি গণ-কবরে চে ও তার সহযোদ্ধাদের দেহাবশেষ আবিষ্কৃত হয়। 
 
লেখক : সদস্য, বাংলাদেশ যুব ইউনিয়ন, কেন্দ্রীয় কমিটি