আমাদের লাল সবুজ উত্তরাধিকার

ওয়াহিদা বানু, মানবাধিকার র্কমী

 

দেশে আমাদের অনেক অর্জন রয়েছে। এর মধ্যে শিশু শিক্ষায়, মেয়ে শিশুদের শিক্ষায় অন্তর্ভূক্তি বৃদ্ধি পেয়েছে, নবজাত শিশু ও মাতৃ মৃত্যুর হার হ্রাস, টিকাদান কর্মসূচী, অনলাইন জন্ম নিবন্ধন- জাতীয়ভাবে শুরু করা হয়েছে ও ৮৫.৪৭% জন্ম নিবন্ধন করা হয়েছে ইত্যাদি। বাংলাদেশে শিশুদের সুরক্ষার ও সহায়তা করার লক্ষ্যে ১৯৭৪ সালে তৎকালীন সরকার শিশু আইন প্রণয়ন করেন। 

উক্ত শিশু আইনটির প্রায়োগিক চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলা করার লক্ষ্যে এবং বর্তমান আর্থ-সামাজি- রাজনৈতিক অবস্থানের ভিত্তিতে শিশু আইন ১৯৭৪- ‘শিশু আইন ২০১৩’ (২০১৮ সংশোধনী) দ্বারা প্রতিস্থাপিত হতে যাছে। এই আইনে শিশুদের সুরক্ষাকে আরো গুরুত্ব দিয়ে জোরদার কাঠামো তৈরী করা হয়েছে। এই আইনে বাংলাদেশের সকল শিশুর বয়স ১৮ বছর নির্ধারণ করা হয়েছে। ২০২৫ সালে ঝুকিপূর্ণ শিশুশ্রম বন্ধ করতে, জোর-বলপূর্বক শ্রমবন্ধ করতে, আধুনিক দাসত্ব এবং মানব পাচার বন্ধে অঙ্গীকার, জাতীয় শিশু নীতি ২০১০ ও শিশু সুরক্ষা ও চাহিদাগুলো পূরণের জন্য সমন্বিত পদক্ষেপের উপর জোর দেওয়া হয়েছে। জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদের অনুসাক্ষরের প্রায় ২৫ বৎসর অতিবাহিত হয়েছে। এখনও শিশুদের অধিকারগুলো নিশ্চিৎ করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ যথেষ্ট নয়।
 
বাংলাদেশে অনেক শিশু পরিবারের দারিদ্রতা, পরিবারের বিচ্ছিন্নতা, যৌন হয়রানিসহ নানা ধরনের বৈষম্যের কারনে এবং নির্যাতনের শিকার হয়ে পথ শিশুতে পরিনত হচ্ছে। অনেক শিশু পরিবারে আর্থিক অনটন ও সল্প আয়ের কারনে নগরের বস্তিতে অমানবিক জীবনযাপন করছে। এই সকল শিশুরা বাধ্য হয়ে অল্প বয়সেই নানা প্রকার ঝুঁকিপূর্ণ কাজে অংশগ্রহণ করে। এসব কর্মক্ষেত্রে তারা নানা ধরনের শারীরিক মানসিক নির্যাতনসহ হয়রানি শিকার হয়ে থাকে। নানাবিধ অত্যাচার বঞ্চনায় উপায়হীন শিশুরা বাঁচার তাগিদে চুরি, অবৈধ্য পণ্য বিক্রয়সহ নানা রকম অপরাধে জড়িয়ে পরতে বাধ্য হয়।

এসব শিশুরা অল্প বয়সেই অপরাধের কারণে শারীরিক নির্যাতন, আটক-গ্রেফতারসহ নানা আইনী দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ে। অভিবাবকহীন, পরিবার বিচ্ছন্নতা ও পরিবারের দারিদ্রতার কারনে প্রয়োজনীয় আইনী সহায়তা বা সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়। ফলে এসব পথ শিশু ও দরিদ্র শিশুরা আইনী সহায়তা ছাড়া থানা ও কারাগারে অনাকাক্ষিত ভাবে আটকসহ শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন ভোগ করছে। প্রতিনিয়ত বিভাগীয় ও বড় শহরগুলোতে পথশিশুদের এসব বিষয়ে আইনী সহায়তা ও সামাজিক সহায়তা প্রয়োজন। 

মোট শিশু জনসংখ্যার ৪৬% এখনো দারিদ্র্য সীমার নীচে বসবাস করে। যদিও জাতিয় বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয় যে, বাংলাদেশে শিশু শ্রম, শিশু বিবাহ ক্রমান্ময়ে হ্রাস পাচ্ছে কিন্তু অত্যন্ত ঝুকিপুর্ণ শিশু শ্রম, শিশু বিবাহের ধরন এবং মাত্রার পরিবর্তিত চিত্র দৃশ্যমান। আইএলও এর পরিসংখ্যান মতে বাংলাদেশ এর অর্ধমিলিয়ন পথ শিশুদের মধ্যে ১৯.২% শিশু বিভিন্ন অপরাধে পুলিশ কর্তৃক গ্রেফতার বরন করছে।
 
সাম্প্রতিককালে শিশুরা উদ্বেগজনকভাবে হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন, পাঁচার, অপব্যবহার ও শোষনের শিকার হচ্ছে। ২০১৯ এর এই ৬ মাসে ৪৯৬ শিশুরা ধর্ষণ ও বহুমাত্রিক সহিংসতার শারীরিকভাবে নির্যাতনের শিকার হয়েছে। অত্যাচারীদের বেশীরভাগই ছিলো শিক্ষক, পুলিশ, এলাকার ব্যক্তিবর্গ, এলাকার বড় ভাই বা প্রভাবশালীরা। 

সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্বারা আটক বা গ্রেফতার হবার আগে পর্যন্ত পিতা-মাতা/অভিভাবকবৃন্দ ঘনিষ্ট প্রতিবেশী-এলাকাবাসী, শিক্ষক, পুলিশসহ অন্যান্য যারা পরিচর্যাদনকারীদের দ্বারা শিশুদের নির্যাতিত হওয়ার গুরুত্ব অনুধাবন করেন। ফলশ্রুতিতে শিশু নির্যাতনের ঘটনা অব্যহত থাকে সেক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় আইনী সহযোগিতাও সামান্য এবং ক্ষতিপূরণের ক্ষেত্রে যে সহায়তা পাবার কথা তাও পায়না। ধরে নেওয়া হয় বেশীরভাগ শিশু নির্যাতনের ঘটনা গণমাধ্যমগুলোতে প্রকাশ পায় না। তথাপি প্রতিদিন যেসংখ্যক শিশু ধর্ষণ, হত্যা, কিডন্যাপ, যৌন নির্যাতন, বাল্যবিবাহ ও শিশুর প্রতি নিষ্ঠুর আচরণ, সহিংসতা ও নির্যাতনের খবর গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয় তা নাগরিক সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য উদ্বেগের বিষয়।
 
আমাদের সমাজের প্রান্তিক শিশুরা ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠীর, বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী শিশু, অটিস্টিক শিশু, বিশেষভাবে সক্ষম শিশু, পথশিশু, গৃহকর্মে নিয়োজিত শিশু, চা বাগনে নিয়োজিত শিশু, বিড়ি ফ্যাক্টরীর কাজে নিয়োজিত শিশু, গভীর সমুদ্রে মাছ ধরার কাজে নিয়োজিত শিশু, যৌন পল্লীতে বসবাসরত শিশু, এইচআইভি/এইডস এ আক্রান্ত শিশু, ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমে নিয়োজিত শিশুরা, দলিত শিশুরা, বেঁদে সম্প্রদায়ের শিশুরাসহ শরণার্থী ও রোহিঙ্গা শিশুরা বিশেষভাবে বহুমুখী নির্যাতনের ঝুঁকিতে থাকে। 

শিশু পাচার, যৌন কর্মে-বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারের নিমিত্তে পাচার, শিশুদের অঙ্গ-প্রতঙ্গ কেটে নিয়ে বিক্রি করা ঘটনাও আমাদেরকে বিস্মিত করে। শিশু অধিকার ও উন্নয়নে কর্মরত সংস্থাদের অব্যহত কার্যকরী পদক্ষেপ ও আইন প্রয়োগকরী সংস্থার মাধ্যমে আমরা শিশুদের এই নির্যাতনের চিত্র প্রত্যক্ষ করছি। এমন ঘটনাগুলো আমাদেরকে বারংবার স্মরণ করিয়ে দেয় যে, আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় বিশেষ করে সুবিধাবঞ্চিত শিশুরা কতোটা ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। 

বাংলাদেশ সংবিধান (৮) : রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিসমূহ : ১১ঃ ‘গুণগত মানবাধিকার প্রজাতন্ত্র হইবে একটি গণতন্ত্র, যেখনে মানবাধিকার ও স্বাধীনতার নিশ্চয়তা থাকিবে, মানবস্বত্তার মর্যাদা ও মূল্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ নিশ্চিৎ হইবে।’ জবরদস্তি শ্রম নিষিদ্ধকরণঃ (৩৪): সকল প্রকার জবরদস্তি শ্রম নিষিদ্ধঃ এবং এই বিধান কোনভাবে লঙ্ঘিত হইলে তারা আইনতঃ দণ্ডনীয় অপরাধ বলিয়া গণ্য হইবে। 

সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোল (এসডিজি) এর লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সরকার বদ্ধপরিকর। এসডিজি-এর অন্যতম বিষয় শিশুদের উন্নয়ন ও ক্ষমতায়ন। এই লক্ষ্যে সরকারের রূপকল্প-২০২১ বাসবতবায়নে শিশুদের জন্য সরকারি তহবিল ও বিদেশী সহায়তা সংগ্রহ ও বিনিয়োগ করা হচ্ছে। জাতিসংঘের ‘টেকসই উন্নয়ন সম্মেলনে’ এ পৃথিবীর রাষ্ট্র প্রধানগণ তাদের সর্বোচ্চ অঙ্গিকার ব্যাক্ত করেছেন, ‘শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে, বিশেষ করে যারা সবচাইতে দুর্দশাগ্রস্ত অসহায় জীবন যাপন করে।’ 

বিশ্ব নেতারা অঙ্গিকার করেছেন এই এসডিজি-এর রূপকল্পে, যে তারা তাৎক্ষনিক ও কার্যকরী পদক্ষেপ নেবেন ঝুকিপূর্ণ শিশুশ্রম বন্ধ করতে, জোর/বলপূর্বক শ্রমবন্ধ করতে। আধুনিক দাসত্ব এবং মানবপাচার বন্ধে ২০২৫ (এসডিজি-টারগেট ৮.৭) আর্ন্তজাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রমের সংজ্ঞায় সুস্পষ্ট করেছে যা কিনা এসডিজি-এ সম্পৃক্ত করা হয়েছে। 

এ ছাড়াও শিশুদের বেচা কেনা, পাচার করাসহ পতিতালয়ে ও পর্ণোগ্রাফিতে শিশুদের ব্যবহার বিষয়টিতে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে সন্নিবেশিত করেছে। এসডিজির রূপকল্প প্রনয়নে এবং বিশ্ব নেতাদের এই অঙ্গীকার ব্যক্ত করায় আমরা নিশ্চতভাবে আস্বস্থ হয়েছি। আমরা ক’যুগ ধরে অধিকার আদায়ের জন্য লড়াই করছি, সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলছি। এবং অধিকার ভিত্তিক কর্মযজ্ঞ চালিয়ে যাচ্ছি বৈষম্যহীন সমাজ ব্যবস্থায় সকল মানুষের আধিকার আদায় ও চর্চার পরিবেশ নিশ্চিত করার জন্য।

বিশ্ব নেতাদের এই অঙ্গীকারের অর্থ হলো ‘আমাদের সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের বিজয়।’ শিশু অধিকার ও উন্নয়নের সংগঠক হিসেবে এখন আমাদের কঠিন পরীক্ষার সময়। কেননা আগের তুলনায় আমাদের আরো ও কঠোর পরিশ্রম করতে হবে এবং দৃঢ়তার সাথে সরকারী ও বেসরকারী সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানের সাথে কার্যকরী সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজ করতে হবে। তবেই এই টেকসই উন্নয়ন বা পরিবর্তনের লক্ষ্য সমূহ অর্জনের সময় দ্রুত ঘনিয়ে আসবে।  

সিআরসি এবং ডিএডব্লিউ এর সিগনেটরি হিসেবে বাংলাদেশ সরকারের নিকট শিশুদের অধিকার সংরক্ষন ও তাদের ক্ষমতায়ন গুরুত্বপূর্ন হিসেবে বিবেচিত। জাতীয় শিশু সুরক্ষা নীতি ২০১১ এবং শিশু আইন ২০১৩ অনুযায়ী শিশুর সুরক্ষা ও আইনী সহায়তা প্রদানের সরকার বদ্ধ পরিকর ও অঙ্গিকারবদ্ধ। সরকারের নীতি নির্ধারনী পর্যায় থেকে শিশুর প্রতি নির্যাতন প্রতিরোধে অধিকার সংরক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্ব পাচ্ছে। 

জুভেনাইল জাস্টিস এর ব্যাপারে জাতীয় টাস্কফোর্স গঠিত হয়েছে যা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের আওতাধীন। এক্ষেত্রে নিগৃহিত ও নির্যাতিত শিশুর সর্বত্রম সেবা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। টঘঈজঈ – জবংবৎাধঃরড়হ তুলে নিয়ে এখানে অনুসমর্থন নিশ্চিৎ করা হয়নিঃ অনুচ্ছেদ-১৪ : পিতা-মাতার উপযুক্ত নির্দেশনায়, শিশুর স্বাধীন চিন্তা চেতনা, বিবেক এবং ধর্মীয় পালনের ব্যাপারে রাষ্ট্র সম্মান দেখাবে। 

অনুচ্ছেদ-২১ দত্তক/পোষ্য/পালক গ্রহণ : শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থের কথা বিবেচনা করে অংশগ্রহণকারী রাষ্ট্র দত্তক পদ্ধতিকে স্বীকৃতি ও অনুমোদন দেবে। শুধুমাত্র অনুমোদিত কর্তৃপক্ষই যাতে দত্তক গ্রহণ করতে পারে সে ব্যাপারটি রাষ্ট্রকেই নিশ্চিৎ করতে হবে। রাষ্ট্রের আইনে দত্তক গ্রহণ বা প্রদানে নিষেধ থাকলে এক্ষেত্রে রাষ্ট্রের আইন বহাল থাকবে। 

৫৩তম বাংলাদেশ প্রতিবদনে যা জাতিসংঘে উপস্থাপন করা হয়েছে সেখানে কনক্লুডিং রিমার্কসে তাদের উপসংহার এবং মন্তব্যে তারা বলেছেন- যদিও বাংলাদেশ অনেক নীতি ও আইন প্রণীত করেছে। কিন্তু সেগুলোর কোনটাতেই ‘শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থ’কে সংজ্ঞায়িত করে পরিস্কারভাবে প্রতিফলিত করা হয় নাই। এখনও শারীরিক শাস্তির কারণে বহু সংখ্যক শিশু স্কুল থেকে ঝরে পড়ে। আমাদের পলিসি ও আইন দ্বারা আমাদের শিশুদের স্কুল থেকে ঝরে পড়তে ও শারীরিক শাস্তিসহ সকল শিশুর প্রতি সহিংসতা কতটুকু হ্রাস করা সম্ভব কি-না তাও প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। 

স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশের রাষ্ট্র নায়কগণ তখনই ভেবেছেন কীভাবে সকল নাগরিকদের জন্য একটি নিরাপদ ও ন্যাযতার সমাজ প্রতিষ্ঠা করা যায়।  সেকারণেই সংবিধানে সকল নাগরিকদের মৌলিক চাহিদা, বিনামূল্যে বাধ্যতামলূক শিক্ষা, সবধরনের স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিৎকরণসহ সকল মৌলিক মানবাধিকার ও স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেবে এবং মানুষের মর্যাদাকে শ্রদ্ধা করবে ও নাগরিকদের মানুষ হিসাবে মূল্যায়ন করবে।
 
বর্তমানে সীমিত ও খন্ডিত খন্ডিত ভাবে শিশু ও তরুন সমাজের জন্য জাতিয় ও আন্তর্জাতিক উদ্যেগে অনেক কার্যক্রম চলছে। উল্লেখিত কার্যক্রমগুলো সম্পন্ন করে বিপুল জনগোষ্ঠীর চাহিদা মিটানো সম্ভব নয়। সিভিল সোসাইটি অর্গানাইজেশন এন্ড লোকাল অথরিটিস সাথে নিয়ে কিশোর-কিশোরী অপরাধ সংশোধন আইনের পূর্নগঠনের বিষয়টি নিয়ে সরকারের সঙ্গে পরামর্শ করা।

উদাহরণকৃত আদর্শ পদ্ধতি সমূহের পূনারাবৃত্তি করা। এতদ স্বার্থ সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ পক্ষসমূহের মধ্যে সমন্বয় সাধন ও সামাজিক সুরক্ষা সর্ম্পকিত ব্যাপকভিত্তিক সমন্বিত সেবা সমূহের সহজলভ্যতা বৃদ্ধি করা হবে। সহযোগী সংস্থা সমূহের কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রস্তাবিত বিভাগীয় শহর ও জেলাসমূহে  সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের প্রয়োজনীয় সহায়তাসহ স্থানীয় সামাজিক শক্তি বিশেষ করে সরকারী ও বেসরকারী প্রতিষ্ঠান আইনজীবি, সিভিল সোসাইটি প্রতিনিধিদের মাঝে এ বিষয়ে সহায়তা, জ্ঞান, দক্ষতা বৃদ্ধি করে সমস্যা নিরসনে আন্তঃসম্পর্ক বৃদ্ধি করবে সিভিল সোসাইট গ্রুপ গঠন করার মাধ্যমে।  

শিশু আইন ১৯৭৪ অনেক বছর চালু ছিল। যথেষ্ট পরিমাণ সময় ও অর্থ ব্যয় করাও হয়েছিল- এই আইন সংশ্লিষ্ট সকল পর্যায়ের প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিবর্গকে প্রশিক্ষিত করতে। তথাপি সংখ্যার পরিমিাপে ও জ্ঞানের গুণগত মানের দৈন্যতার কারণে জাতি হিসাবে আমরা এগোতে পারিনি। এই আইন বাস্তবায়নে ও আমাদের শিশুদের সুরক্ষিত রাখতে। এখনও কিশোর বিচার ব্যবস্থায় বিচারের জন্য অপক্ষেমান শিশুদের কারাগারে আটক রাখা হয়। বিচার ব্যবস্থা বিলম্বিত হয়, একই সাথে জাতীয় শিশু নীতিতে উল্লেখিত বিচার চলাকালীন শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিৎ করার বিষয়টি উপেক্ষিত হয়ে থাকে। 

শিশু আইন ২০১৩ সংশোধিত হয়ে শিশু আইনটি ২০১৮ প্রণীত হয় এবং যদি আইনটি ডিগ্রী নিতে সেই পাঠ্যক্রমে সংযুক্ত করা হয় তবেই অপরাধ করার ও অপরাধীর শিকার হওয়া এই শিশুদের সুরক্ষা করা যাবে। অধিকার সংরক্ষন ও তাদের ক্ষমতায়নের ক্ষীণ আলোটুকু ভোরের আকাশের সূর্য্য কিরণের সাথে ছড়িয়ে পরবে সারা বাংলাদেশে। সেই উৎসাহ সেই বঞ্চনা থেকে নিজে আড়াল করার কোন চেষ্টাই মানবাধিকার কর্মীরা করতে পারেনা। তারা যে কোন চ্যালেঞ্জের মুখেও এগিয়ে যায়। 

একটি শিশু বান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলার জন্য ওয়ার্ড-ইউনিয়নের কাউন্সেলদের ভূমিকা রাখতে হবে। যথার্থই ঐ এলাকার শিশুদের অভিভাবক হিসাবে, যেখানে বেসরকারী উদ্যোগ ও জন অংশগ্রহণ খুবই জরুরী। এলাকার জনগন যদি সচেতন ও সামাজিক দায়িত্বের অংশ হিসাবে এগিয়ে আসেন তাহলে তারা একদিকে ঐ এলাকার প্রতিটি শিশুর উপর আমাদের নজরদারী থাকবে। এলাকার প্রকৃত শিশুদের পরিসংখ্যানটাও জানা হবে, শিশুদের জন্ম নিবন্ধন নিশ্চিৎ করা সহজ হবে ফলে তাদের শরীরিক, মানসিক ও আবেগিক বিকাশ নিশ্চিৎ করা যাবে এবং তাদের সুরক্ষা নিশ্চিৎ করা হবে সহজ। 

শিশু সুরক্ষায় ও তাদের মানসিক বিকাশ নিশ্চিৎ করতে মহানগর, জেলা ও পৌর শহরগুলোর প্রতিটি ওয়ার্ডে একটি করে শিশু বিকাশ কেন্দ্র গড়ে তুললে ওই এলাকার প্রতিটি শিশুর সুরক্ষা নিশ্চিৎ করা সম্ভব। এ ব্যাপারে যদি প্রতিটি ওয়ার্ডে শিশু কিশোরদের জন্য সামাজিক ক্লাব তৈরী করা যায় এবং যার কি-না নেতৃত্ব দিবে ইয়ুথরা। যুব সমাজের বিকশিত হওয়ার জন্য যুবকরাই সম্পৃক্ত হতে পারে।
 
বাংলাদেশের শিশুদের বিশেষ করে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে এই শিশুরা কেমন পরিবেশে বেড়ে উঠছে। শিশুরা রাষ্ট্রের বা সমাজের বোঝা নয়; সম্পদ, সামাজিক নেতিবাচক পরিবেশে শিশুটি কখনোই জাতির জন্য আগামীর বাংলাদেশের জন্য সম্পদ হয়ে উঠবার সুযোগ পাবেনা। বরং সমাজের জন্য বড় বোঝা এবং কখন বা বড় চ্যালেঞ্জ তৈরী করতে পারবে সহজেই এই শিশুরা। কেননা তারা বোঝেনা কোনটা সত্য, কোনটা মিথ্যা, কোনটা খারাপ কাজ, ভাল কাজ, কোনটা সামাজিক কোনগুলো অসমাজিক কর্মকাণ্ড। তাদের দরকার প্রতিদিনের প্রতি বেলা বেঁচে থাকার তাৎক্ষণিক খাবারের ব্যবস্থা সে করতে পারে। এক বেলা খেলে দুই বেলা হয়তো না খেয়েই সূর্য্য ডুবে যায়। আবার পরের দিন সকালে একইভাবে সূর্য্য উঠে। আবার তাদের লড়াই শুরু হয়। 

এসব সুবিধাবঞ্চিত শিশুরা চুরি করার কাজে, চুরিতে সহযোগিতা করা, পার্কে, বাগানে পরিত্যক্ত কিংবা গিঞ্জি কোন এলাকায় দেহবিক্রি কিংবা মাদক বেচাকেনা ও বহনের কাজগুলো সহজেই পেয়ে যায়। এসব পিতা-মাতাহীন; অভিভাবক বিহীন, ঠিকানা বিহীন শিশুরা রাস্তায় আসার পর রাস্তায় বসবাস করার সময়গুলোতে সবচেয়ে বেশী নির্যাতিত হয়। শারীরিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতনসহ তাদের অর্থের যোগান যাই থাকুক না কেন তার উপরই আরো অনেকের আধিপাত্য বিস্তারের চেষ্টা করে। শিশুদের বেঁচে থাকার আশাগুলো ভেঙ্গে চুরর্মার করে দেয়। সকল স্বপ্ন ভেঙ্গে দেয়। যার পরে এই শিশুরা মানুষের ও প্রকৃতির বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। বড়দের কাছে কোন কিছু পাবার বা নেবার প্রত্যাশাটাও তারা ছুঁড়ে ফেলে দেয়!!

বাংলাদেশের বড় বড় নগরের রাজপথে বসবাসকারী শিশুদের একটি পরিসংখ্যান প্রকাশ করেছিল- ইওউঝ এবং সরকারের তত্ত্বাবধানের এরাইজ প্রকল্পটি। যেখানে উল্লেখ করা হয়- বাংলাদেশের পথে বসবাসকারী শিশুদের সংখ্যা ৬৭৯, ৭২৪ এবং শুধু মাত্র ৬টি বিভাগীয় শহরে-৩৮৯,৪৯২ এটা ছিল। ২০০৪ সালে এর আনুমানিক পরিসংখ্যান যা কিনা ২০০৮-২০২৪ সাল পর্যন্ত গবেষক-পর্যবেক্ষনগন কঠোর বাস্তবতার নিরোধ শিশুদের আগামী দিনের পদচারণার অনুমানিক সংখ্যা বসিয়ে রেখেছিলেন। 

তাঁদের প্রকাশিত পরিসংখ্যান বলে এই পথশিশুদের সংখ্যা দাড়াবে ২০১৪ সালে ১,১৪৪,৭৫৪ আর ২০২৪ সালে ১,৬১৫,৩৩০ আর সে কারণেই বিগত কয়েক বছর ধরেই বাংলাদেশের ও আর্ন্তজাতিক বিভিন্ন প্রতিবেদনে এই শিশুদের সংখ্যা ১৫ লক্ষের বেশী উল্লেখ করা হচ্ছে। আবার বলা হয় বাংলাদেশের জনসংখ্যার ৪৭% শিশু যারা (১৮ বছর বয়সের নীচে)। আমাদের হাল নাগাদ যেহেতু কোন পরিসংখ্যান নেই সেকারণে এই শিশুদের জন্য জাতীয় বাজেটের বরাদ্দ ও তাদের জন্য বিনিয়োগের মাত্রা ও তার প্রভাব আমাদের জাতীয় সামনে সচারাচর দৃশ্যমান হয় না।

আমাদের দেশে কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্র (কে.ইউ.কে) কয়েকটি থাকলেও সেগুলোর মানসম্মত সেবা নিয়ে সচরাচরই প্রশ্ন বিদ্ধ হয়েছে। সংখ্যায় কম হলেও এখনো মাঝেমধ্যেই শিশুদের প্রাপ্ত বয়স্কদের কারাগারে পাঠানো হয়। শিশুদের সৎ ও সরল মন, বাড়ন্ত দেহ ও স্বাস্থ্যসহ তার জীবনকে অদৃশ্য কঠোর ঝুঁকির মধ্যে ফেলা হয়। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই শিশুদেরকে প্রাপ্ত বয়স্কদের অপরাধী মনোভাব ও অচরনের সাথে পরিচিত হওয়া কিংবা অদূর ভবিষ্যতে এদের সংস্পর্শে এসে সমাজে অসামাজিক ও অপরাধী চক্রের সাথে কাজ করার সুযোগ করে দেয়।
 
কিশোর বিচার ব্যবস্থা রূপে পরিচালিত না হওয়ার মূল কারণগুলো হলো- কিশোর বিচার ব্যবস্থার সাথে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তা, প্রসিকিউর আইনজীবি, আদালতের কর্মচারী, মেজিস্ট্রেট এবং অনেক বিচারকগণ সংশ্লিষ্ট আইন সম্পর্কে অবহিত নন। কিশোর বিচার ব্যবস্থা শিশু অধিকারের প্রতি যথাযথ সম্মান দেখাতে পারছেনা বিধায় প্রায় প্রতিদিন অনেক শিশু অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য সন্দেহভাজন বা অভিযুক্ত হিসাবে সাজা পাচ্ছে। যে বিষয়টি শ্বাসত ও সার্বজনীন তাহলো- বিচার ব্যবস্থা কর্তৃক দোষী সাব্যস্ত না হওয়া পর্যন্ত প্রত্যেকেই আইনের চোখে নিরপরাধ ও মর্যাদা পাবার অধিকার রাখে। 

আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে, কোন (৯৯%) শিশুই অপরাধী হয়ে জন্মগ্রহণ করেনা; এই শিশুরা যখন অপরাধের সাথে জড়িয়ে পড়ে তা আমাদের সমাজ ব্যবস্থার কারণে। কাজেই সামাজিক সুরক্ষা বলয়ের আওতায় আনতে হবে প্রতিটি শিশুকে। একই সাথে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্রিয় ও ইতিবাচক ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। 

শিশুর ব্যক্তিত্ব ও আগ্রহের উপর আস্থা রাখুন। শিশুদের উপর অহেতুক বা তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোন কিছু চাপিয়ে দেবেন না। এতে শিশুর স্বাভাবিক বিকাশ বিঘ্নিত হয়। শিশুদের বিশেষ করে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের সুস্থ্য ও নিরাপদ শৈশব ও কৈশর কালীন অন্তত ৬-১০টি বৎসর সুষ্ঠু পরিবেশের মাধ্যমে বেড়ে ওঠার সুযোগ এবং অধিকার নিশ্চিৎ করতে পারলে আমরা যেমন একটি বর্ণাঢ্য ও ধনাঢ্য আগামী প্রজন্ম পাবো, তেমনি এই শিশুরাও শিক্ষিত, দক্ষ ও উৎপাদনক্ষম সুনাগরিক হিসাবে গড়ে তুলবে তাদের জীবন-মান। এর ফলশ্রুতিতে তারা তাদের পূর্নাঙ্গ জীবনের অন্তত ২৫-৩০ বৎসর দক্ষ ও কর্মক্ষম সময় দিয়ে দেশকে এগিয়ে নেবে সমৃদ্ধির পথে। 

বাংলাদেশের শিশুর সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং তাদের জীবন উন্নয়ন ও বিকাশকে প্রসার করার লক্ষ্যে আমাদের যা করণীয় তা বিবেচনার জন্য তুলে ধরলাম: শিশুর সহায়তায় ‘বাংলাদেশ চাইল্ড হেল্প লাইন ১০৯৮’ সারা দেশে দ্রুত বাস্তবায়ন কার্যকর করা হোক, চাইল্ড হেল্প লাইন-১০৯৮ কে দেশের অপাময় জনগণের কাছে পরিচিত করা এবং প্রাইমারী ও সেকেন্ডারী স্কুলের টেক্স বুকে অর্ন্তভুক্ত করা জরুরী। 

‘জেলা লিগ্যাল এইড ফাণ্ড’ কে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের সহায়তায় ব্যয় করার প্রক্রিয়া সহজতর করা হোক, জেলা লিগ্যাল এইড ফান্ড ও জেলা লিগ্যাল এইড কমিটিকে- আইনী সহায়তা গ্রহণ করার জন্য গণমানুষের দোরগোড়ায় পৌছে দেয়া অত্যাবশ্যক। শিশু আইন শিশু বান্ধব পরিবেশ তৈরির একটি শক্তিশালী মাইল ফলক তার যথাযথ বাস্তবায়ন ও বিধি প্রণয়ন করা জরুরী যা আইনের বাস্তবসম্মত প্রয়োগের জন্য অবশ্যই প্রয়োজনীয়; সকল শিশুর জন্য বাধ্যতামূলক ও গুনগত মান সম্পন্ন  ফ্রি প্রাইমারী শিক্ষা নিশ্চিৎ করা; শিশুর বয়স ও মেধা প্রতিভার গুরুত্ব দিয়ে কারিগরি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সমাজের মূল 
স্রোতধারায় মর্যাদাপূর্ণ কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা; সকল বিপদাপন্ন শিশুদের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে মনো-সামাজিক সহায়তা দিয়ে তাদের নিজেদের জন্য আত্মবিশ্বাস ও মর্যাদা পূনঃ স্থাপন করা; পথশিশু ও নির্যাতিত শিশুদেরকে যা আইনের সংস্পর্শে জরিয়ে পড়েছে তাদেরকে শিশু কল্যাণ কমিটির মাধ্যমে মুক্ত করে সমাজে পূণবাসন করা এবং সেল্টার হোমের মাধ্যমে সেবা নিশ্চিত করা হবে। 

সরকারী উচ্চ কর্মকর্তা মন্ত্রাণালয় প্রতিনিধি, বিচার বিভাগ, আইনজীবী, ম্যাজিস্ট্রেট, পুলিশ অফিসার, সরকারের শিশু নিবাস কেন্দ্র প্রতিনিধি, এনজিও/সিভিওসহ প্রকল্প কর্মকর্তা সমন্বয় করা, অবহিত করা ও দক্ষতা বৃদ্ধি করা। শিশু সুরক্ষা নিদেশিকা, শিশু প্রতিপালন, আদর্শ পরিচালনা পদ্ধতি ও পরামর্শ বিষয়ে জাতীয় মানদন্ড সম্পন্ন প্রশিক্ষণ মডিউল তৈরী করা। পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের মাঝে ইউএন-সিআরসি, জাতীয় শিশু নীতিমালা, শিশু আইন, শিশু সুরক্ষা নিদেশিকা, শিশু প্রতিপালন, আদর্শ পরিচালনা পদ্ধতি ও পরামর্শ বিষয়ে প্রশিক্ষণ এর আয়োজন করা। সরকারী, এনজিও, ল-ইয়ার, সিবিও এবং স্থানীয় নের্তৃত্ব সমন্বয়ে একটি সিসিএল নেটওয়ার্ক গঠন ও এর কার্যক্রম সক্রিয় প্রয়োজনীয় সেবা নিশ্চিত করা।

সংঘটিত শিশু নির্যাতনের বিচারের প্রক্রিয়াকে দ্রুততর গতিতে এগিয়ে নেওয়া অপরিহার্য, যে সকল বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে সেগুলোকে রাষ্ট্রীয়ভাবে মিডিয়াতে পুনঃ পুনঃ প্রচার করে জনগণকে সচেতন ও অবহিত করা প্রয়োজন। তাতে করে শিশুদের প্রতি নির্যাতন করা ও শিশুদের অপরাধ জগতে নিয়োজিত করার প্রবণতা অনেকাংশে হ্রাস পাবে। 

জেলা, উপজেলা ও ওয়ার্ড-ইউনিয়ন পর্যায়ে শিশু সুরক্ষা কমিটি গঠন ও কার্যকর করা; প্রতিটি থানায় ‘শিশু কল্যাণ ডেস্ক স্থাপন’ করা ও প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক রেফারেলসের মাধ্যমে আইনী সহায়তা নিশ্চিৎ করা; থানা সমূহে ‘শিশু কল্যান ডেক্স’ স্থাপন করে শিশুদের আইনী সহায়তা প্রদানের মাধ্যমে  শিশুদেরকে মুক্ত করা। শিশুদেরকে চাহিদা ও প্রয়োজন অনুযায়ী আইনী সহায়তার মধ্যোমে শিশু পরিবারে পূর্ণকত্রিকরণ, শিশুকে সেল্টার হোমে প্রেরণ করা ও শিশুকে ল-ইয়ার প্যানেলের মাধ্যমে সেবা নিশ্চিত করা হবে। 

শিশুর অপরাধ প্রবণতা রোধে মনোসামাজিক সহায়তা নিশ্চিত করাসহ বহুমুখি কার্যক্রম বান্তবায়ন, তথ্য সরবরাহ, পরীবিক্ষণ, মূল্যায়ণ, যথাযথ ফলোআপ ও মনিটরিংসহ সার্বিক সহায়তা ও দায়িত্ব পালন করা। ‘শিশু কল্যান ডেক্স’ সমূহে হতে তথ্য সংগ্রহ ও সরবরাহ করে নেটওয়ার্ক স্থাপিত করে তথ্য ও ডাটা বেইজ করা। সংগ্রহিত তথ্য সমূহ সামাজিক পর্যবেক্ষণে উদাহরণ হিসেবে ব্যবহার করা। সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের সাথে সমন্বয়, ভিকটিম সেন্টার, ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার, স্থানীয় এনজিও, আইন পরামর্শকেন্দ্র, স্থানীয় সংগঠন এবং স্থানীয় নেতৃত্ব সমন্বয় করা। 

পরিবারের গরীবানা মোচনের লক্ষ্যে আর্থিক সহযোগিতা ও তাদের স্বাবলম্বী করার জন্য শক্তিশালী পদক্ষেপ গ্রহণ করা; প্রতিটি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব- কর্তব্য যথাযথভাবে পালন করার জন্য সরকারীভাবে আদেশ/নির্দেশ জারি করা। যাতে করে শিশু সুরক্ষায় প্রতিটি সংস্থা ইতিবাচক ও সক্রিয় অবদান রাখতে সক্ষম হয়; প্রতিটি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের (স্কুল/ কলেজ, হাসপাতাল, স্থানীয় সরকার, পুলিশ, কোর্ট ইত্যাদি) শিশুদের অধিকার প্রতিষ্ঠার, উন্নয়নে ও সুরক্ষা নিশ্চিৎ করার নিরিখে তথ্য প্রবাহের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিৎ করা অপরিহার্য্য। 

এলাকাভিত্তিক শিশু সুরক্ষার জন্য এলাকার পেশাজীবিদের স্বক্রিয় উদ্যোগ জরুরী; একক উদ্যোগের পরিকল্পনা কৌশল তার সুফলগুলো স্বল্পমেয়াদী দৃশ্যমান পদক্ষেপ হতে পারে, তবে সমষ্টিগত কৌশল ও পদক্ষেপ দীর্ঘমেয়াদী শিশু সুরক্ষায় কার্যকরী অবদান রাখতে পারে। ১৫+ বৎসরের শিশুদের লেখাপড়ার পাশাপাশি হালকা কাজের সুযোগ সৃষ্টি করা যাতে তারা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করতে পারে এবং একই সাথে তারা যাতে করে মূলস্রোত ধারার ব্যাংকে ১০ টাকা দিয়ে একাউন্ট খুলতে পারে। যার ফলে তাদের যেমন আত্মবিশ্বাস বাড়বে তেমনি ভাবে তারা তাদেরকে এদেশের মর্যাদাবান, গর্বিত সন্তান ও সুযোগ্য নাগরিক হিসেবে নিজে প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে। পথশিশু/কর্মজীবি শিশু, স্কুলগামী শিশুদের ১০ (দশ) টাকায় মূলস্রোত ধারার ব্যাংকের একাউন্ট/সঞ্চয়ী হিসাব খোলার সুবিধা নিশ্চিৎ করে শিশুদের আত্মমর্যাদা ও আত্মকর্মসংস্থান বাড়ানোর জন্য রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ দ্রুত গতিতে এগিয়ে নেয়া অপরিহার্য্য।

২০১৫ সালে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বলিষ্ঠ ঘোষণা অনুযায়ী রাস্তায় পথে কোন শিশু বসবাস করার কথা নয়, না খেয়েও থাকার কথা নয়। এই ঘোষণা আমাদেরকে অত্যন্ত আশাবাদী করে তুলেছিল। কিন্তু বর্তমানে বাংলাদেশের প্রায় সবগুলো দাতা/আর্ন্তজাতিক সংস্থাই বিশেষভাবে মনোযোগ নিবিষ্ঠ করেছে রহিঙ্গা জনগোষ্ঠির সুরক্ষা ও আস্থা নিশ্চিতকরণে সকল প্রয়াস অব্যহত রেখেছে। আর সেকারণে এ দেশের সুবিধাবঞ্চিত শিশু, কিশোর-কিশোরী, তরুন-তরুনীদের উন্নয়ন, সুরক্ষা ও সেবা প্রাপ্তি, নিরাপদ আশ্রয় প্রাপ্তির সুযোগ সমূহ ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়ে আসছে। শিশুদের জন্য নিরাপদ আশ্রয় না থাকাকে উন্নয়ন/বিকাশ বলা যাবে না বরং তা সমূহ বিপদ ডেকে আনবে এবং শিশু বান্ধব বাংলাদেশ গড়ার অন্তরায় হয়ে উঠতে পারে।
 
আমরা আনন্দিত যে অতি সম্প্রতি তরুণদের প্রতি অবদানের জন্য পুরস্কার পেলেন বর্তমান সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তরুণদের দক্ষতা উন্নয়নের অসামান্য সাফল্যের  স্বীকৃতি হিসাবে ‌‌‘চ্যাম্পিয়ান অব স্কিলস ডেভেলপমেন্ট ফর ইয়্যুথ’ পুরস্কারটি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতে তুলে দেন ইউনিসেফের নির্বাহী পরিচালক হেনরিয়েটা ফোর। গত ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯, যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের ইউ.এন প্লাজার ইউনিসেফ ভবনে প্রধানমন্ত্রীর হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়। বাংলাদেশে টিকাদান কর্মসূচীর সাফল্যের জন্য গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ভ্যাক্সিনস অ্যান্ড ইমিউনাইজেশন (জিএভিআই) মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘ভ্যাকসিন হিরো’ সন্মাননায় ভূষিত করেছেন।
 
বর্তমানে বাংলাদেশকে বলা হয় তারুণ্যের দেশ। আর তাই এই শিশু-কিশোরাই তারুণের পতাকা বহন করবে এটাই আমাদের আকাঙ্খা। রাষ্ট্র ব্যবস্থার সকল প্রতিষ্ঠান গুলোকে এখন শিশু বান্ধব ও তারুণ্যের জন্য নিরাপদ ও সহজ অভিগম্যতার পথ তৈরী রাখতে হবে। যাতে করে এই তরুণ সমাজ, তাদের নব নব স্বপ্ন জাগাতে কিংবা হারানো স্বপ্ন পূনর্বার জাগাতে পারলে তারা তাদের কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌছাতে পারবে। 

লেখক: ওয়াহিদা বানু, মানবাধিকার র্কমী
র্নিবাহী পরিচালক, অপরাজেয়-বাংলাদেশ