এভাবেই বেঁচে আছি, বেঁচে আছে বাংলার মানুষ...

মোহাম্মাদ কামরুজ্জামান

এক.

ধরুন, একা একা রাস্তা দিয়ে হাঁটছেন। হঠাৎ দেখলেন আপনার সামনে একটি ব্যাগ পড়ে আছে। কুড়িয়ে  দেখলেন, তাতে এক লক্ষ টাকা। আপনি কি টাকাটা নেবেন? আপনি যেহেতু সৎ ও চরিত্রবান একজন মানুষ, টাকাটা নিবেন না। আচ্ছা, যদি ব্যাগের মধ্যে এক কোটি টাকা থাকে! তাহলে কি করবেন? নিবেন না? না-না, আশেপাশে কোন লোকজন নেই, যে আপনাকে দেখছে! কি করবেন বলা মুশকিল, তাই তো? ঠিক আছে, ধরুন ব্যাগটির মধ্যে পাক্কা দশ কোটি টাকা আছে। এবার? আপনি যদি তখন ওই টাকাগুলো করায়ত্ত না করেন, তবে আপনি মহামানব পর্যায়ের মানুষ এবং আপনার জন্য আমার এই লেখাটি নয়। 

দুই.

আনুমানিক পাঁচ-ছয় বছর আগে ইংল্যান্ডে ভয়াবহ দাঙ্গা হয়েছিলো। প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে চলা ঐ দাঙ্গায় দেশের আইন-শৃংখলা ব্যবস্থার চরম অবনতি ঘটে। কোনো একদিন দুপুরের পর দাঙ্গা মারাত্মক সহিংসতায় রূপ নেয়। শহরে আইন- শৃংখলা ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙ্গে পড়ে এবং ঘণ্টা তিনেকের মতো সব কিছু সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। আর ঐসময় যা ঘটে তা পত্র-পত্রিকায় অনেকেই হয় তা পড়ে থাকবেন। শহরের অনেক বড় বড় শপিংমল, সুপার শপ নিমিষেই লুট হয়ে যায়। কাজটি যারা করে তারা সবাই সাদা চামড়ার মানুষ, যারা পৃথিবীর সবচেয়ে সভ্য জাতি হিসেবে আজো আমাদের কাছে পরিচিত। এই ইংরেজরাই শতশত বছর ধরে পৃথিবীর বহু জাতিকে সভ্যতা আর সংস্কৃতি শিখিয়েছে। তাহলে কেনো ওই মানুষগুলো সকল ঐতিহ্য ভুলে, নৈতিকতাকে জলাঞ্জলি দিয়ে মুহূর্তের মধ্যে লুটেরা হয়ে গেলো?  তারা কেউ অভাবগ্রস্থ ছিলো, দারিদ্র্যের কষাঘাতে আমাদের মত জর্জরিত ছিলো, তেমন খবর আমরা পাইনি।

তিন.

এ খবর আমরা অনেকেই জেনে গেছি যে খোদ আমেরিকাতে মাত্র দুই মিনিট ব্ল্যাক আউট হলে কত হাজার মেয়ে ধর্ষিতা হয়। এরাই তো বিশ্বের রোল মডেল; আমাদেরকে নীতি-নৈতিকতার শিক্ষা দেয়, মানবাধিকারের কথা বলে!
মানুষ কেনো অপরাধ করে? কেনো মানুষ নিজের লাভা-লাভির জন্য অন্যের ক্ষতি করে, সম্পদ কেড়ে নেয়, এমন কি ধর্ষণ, গুম হত্যার মত ভযংকর সব অপরাধ করে ফেলে। অথচ মানুষ তো সৃষ্টির সেরা জীব। মানুষ আসলে কেনো সেরা? কেবল উন্নত বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ বলেই? গবেষণা করলে দেখা যাবে, পৃথিবীতে মানুষের সভ্যতা সৃষ্টির পর হতে অদ্যাবধি মানুষ সৃষ্টি করেছে যত, ধ্বংস করেছে তারও অনেক বেশি। বুদ্ধিমান মানুষের বুদ্ধির জোরেই তো আজ দেশেদেশে পারমাণবিক বোমা তৈরির মজুদ বাড়ছে - বেশি তেড়িবেড়ি করলে এক বাটন টিপে পুরো পৃথিবী ফিনিশ। এ কারণেই মানুষ শ্রেষ্ঠ! যত অপরাধ, তত ক্ষমতা; যত ক্ষমতা, তত শ্রেষ্ঠত্ব!

আবার ফিরে আসি গোড়ার কথায়- মানুষ কেনো অপরাধ করে। মনোবিজ্ঞান বা সমাজবিজ্ঞানের বই-পত্র ঘাঁটাঘাঁটি করলে এর একাধিক কারণ পাওয়া যাবে। কিন্তু আমি সেদিকে যাব না। কারণ, সেখানে আমার দখল খুবই সামান্য। আমার দীর্ঘদিনের ভাবনায় বিষয়টিকে একটু ভিন্নভাবে উপলব্ধি করার প্রয়াস পেয়েছি। আর তা হলো ‘আসলে মানুষ জন্মগতভাবে অপরাধী’। অর্থাৎ সব মানুষই অপরাধপ্রবণতা নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। সৃষ্টির শুরুতেই আল্লাহতায়ালা কিছু খারাপ গুণ বা রিপু মানুষের মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়েছেন। বংশ পরম্পরায়, দেশ-কাল পেরিয়ে মানুষের জিনের মাধ্যমে এই খারাপ গুণগুলো স্থানান্তরিত হচ্ছে। সব মানুষের মধ্যেই ভালো ও খারাপ উভয় গুণের অবস্থিতি রয়েছে। এই গুণাবলীর এবং দোষাবলির ধরন, বৈশিষ্ট্য এবং তীব্রতা ভিন্ন হতে পারে, তবে তা হয় জিনগত বৈশিষ্ট্যের পার্থক্যের কারণে। তবে প্রতিটি মানুষের মধ্যেই সুপ্ত অবস্থায় অপরাধপ্রবণতা থাকে। এমনকি একটি শিশুর মধ্যেও বেশ কিছু অপরাধপ্রবণতা থাকে। কিন্তু তা ব্যবহার করার বুদ্ধি ও শক্তি তার যথেষ্ট থাকে না। তাইতো আমরা তাদেরকে ফেরশতার মতো বলি।
আসলে মানুষের মধ্যে আইন ভাঙ্গার প্রবণতা সবসময় ছিলো, এখনো আছে, ভবিষ্যতেও থাকবে। অন্যায়-অপরাধের সুযোগ থাকলে মানুষ সেটা করবেই। ১৯৯২সালে গ্যারি বেকার নামে একজন অর্থনীতিবিদ হিউম্যান বিহেভিয়ার নিয়ে বিশেষ নিবন্ধ লিখে নোবেল পুরস্কার পান। যেখানে তিনি বলেন, প্রত্যেক অপরাধী অপরাধ করতে যাওয়ার আগে এইকস্ট-বেনিফিট এনালাইসিসটা করে নেয়। একটা উদাহরণ দেয়া যাক। ধরুন, একজন চোর চুরি করতে যাবে। চুরি করতে যাওয়ার আগে সে কয়েকটি বিষয় সম্পর্কে নিশ্চিত হতে চেষ্টা করে। ক. যেখানে চুরি করতে যাচ্ছে, সেখানে ধরা পড়ার সম্ভাবনা কতটুকু। সে যদি দেখে একাজে তার ধরাপড়ার তেমন সম্ভাবনা নেই, তবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পথে একধাপ এগিয়ে থাকবে। খ. সে যদি এটা নিশ্চিত হয় যে, ধরা পড়লেও থানা থেকে তার মুক্তি পাওয়ার সম্ভাবনা প্রায় শত ভাগ। তাহলে সে অনেকটা যাবে চুরির পথে। গ. সে যদি এটা বোঝে যে, পুলিশ তাকে হাজতে দিলেও জেল তার কখনই হবেনা। আদালত তাকে বেকসুর খালাস দেবে। তবে আর কে ঠেকায়? চুরি সে করবেই। আমার এই গল্পটা শুধু ‘সে’র জন্য নয়; বরং ‘তিনি’, ‘গন্য-মান্য’, ‘মহামান্যদের’ জন্যই বেশি প্রযোজ্য!!

অপরাধপ্রবণতা মানুষের সহজাত হলেও পৃথিবীতে কিন্তু অধিকাংশ মানুষই ভালো এবং অপরাধীদের সংখ্যা গুটিকয়েকমাত্র। এই ভালো মানুষগুলো কেউ কেউ ভালো হয়েছে, আবার কাউকে কাউকে ভালো হতে হয়েছে। একটু বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করছি। ছোটবেলা থেকেই মানুষ শেখে। মানুষ তার পরিবার এবং প্রতিবেশ থেকে শেখে, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে শেখে। এই শিক্ষাই মানুষকে ন্যায় ও অন্যায়ের মধ্যে পার্থক্য করতে শেখায়। পারিবারিক ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান থেকে মানুষ যে নৈতিক ও আদর্শিক শিক্ষা লাভ করে, তা-ই তার ভিতরকার খারাপ ও কুপ্রবৃত্তিগুলো অবদমন করে রাখে। সুতরাং এখানে সঠিক শিক্ষার ভূমিকা অনেক। অন্যদিকে প্রতিটি মানুষই একটি সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মধ্যে বাস করে। সমাজ এবং রাষ্ট্রের কানুনগুলো তাকে মেনে চলতে হয়। তবে রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত সমাজব্যবস্থায় রাষ্ট্রের ভূমিকাই এখানে মুখ্য।

একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সরকারের তিনটি বিভাগ থাকে। জনগণকে অপরাধ থেকে বিরত রাখার জন্য আইন বিভাগ প্রয়োাজনীয় আইন প্রণয়ন করে। শাসন বিভাগ সে আইন যথাযথভাবে প্রয়োগ করে, আর দেশের বিচার বিভাগ স্বাধীনভাবে অপরাধীর বিচার করে, দণ্ড দেয়। রাষ্ট্রের এই তিন বিভাগ সক্রিয় ও সঠিকভাবে কাজ করে বলেই তো জনগণ অপরাধ করতে সাহস পায় না। যে দেশের আইন, শাসন ও বিচার ব্যবস্থায় শক্তিশালী সে দেশের আইন-শৃংখলা ব্যবস্থা তত নিযন্ত্রণে থাকে এবং জনগণ কম অপরাধে লিপ্ত হয়।

আজ আমাদের দেশে যত অপরাধ ঘটছে তার মৌলিক কারণ দুটি। ক. আমাদের পারিবারিক ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যবস্থা ত্রুটি যুক্ত। এখানে নৈতিক ও আদর্শিক শিক্ষার উপর তেমন জোর দেওয়া হয় না। আমাদের ছেলে-মেয়েরা শিক্ষিত হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু তাদের মধ্যে মানবিকতা, মূল্যবোধ, সহনশীলতা, সহমর্মিতা, উদারতা ও সততার মত মানবিক গুণাবলির বিকাশ ঘটছে না। খ. আমাদের রাষ্ট্রের বিভাগগুলো ঠিক মত কাজ করছে না। আমাদের যথাযথ আইন নেই, আইন থাকলে তার প্রয়োগ নেই, আর প্রয়োগ হলেও বিচার নেই। এখানে যার ক্ষমতা বেশি, তার টাকা বেশি; যার টাকা বেশি তার ক্ষমতা বেশি। আর টাকা আর ক্ষমতা যার হাতে আইন তার হাতে, বিচার তার পক্ষে।

বাংলাদেশে কোনো অপরাধ সংঘটিত হলে সাথেসাথে কিছু সমীকরণ দাঁড়িয়ে যায়। যেমন- 

সমীকরণ ক. অপরাধী কি আওয়ামী লীগ করে, না বিএনপি করে। আওয়ামী লীগ করলে এক হিসাব, বিএনপি করলে আরেক হিসাব। 

সমীকরণ খ. অপরাধী কি ক্ষমতাধর, না কি ক্ষমতাহীন; সে কি গডফাদার না কি গডমাদার, নাকি সাধারণ মানুষ। 

সমীকরণ গ. অপরাধীর গোড়া না কি অনেক শক্ত, না কি নরম; হাত কি অনেক লম্বা, নাকি খাটো (পরে আবার চাকরিটা যায়, প্রমোশন বন্ধ, নয় তো খাগড়াছড়ি বদলি)। 

সমীকরণ ঘ. অপরাধী কি কোনো বিশেষ বাহিনীর সদস্য কিনা র‌্যাব, পুলিশ। এরকম হাজারো সমীকরণে পড়ে অপরাধী হয়ে যায় নির্দোষ, আর নির্দোষ হয়ে যায় অপরাধী।

আর এসব কারণেই গুম হয়, খুন হয়; বাড়তে থাকে ঘুষ, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি। এসব কারণেই পদ্মা সেতুর দুর্নীতির প্রমাণ মিললেও মন্ত্রীর কিছু হয় না। গাড়িসহ ঘুষের টাকা ধরাপড়লেও ঘটনা অন্যদিকে ঘুরে যায়। খাম্বা জালিয়াতির কোটি কোটি টাকা সিঙ্গাপুরের ব্যাংকে ধরা পড়লেও বেকসুর খালাস পেয়ে যায় অপরাধী। জয়নাল হাজারী, নিজাম হাজারী, নূর হোসেনের সৃষ্টি হয় – এসব কারণেই। ঠিক এসব কারণেই র‌্যাবের খুনি অফিসারদের সরকার বিচার করতে গড়িমসি করে, মোবাইলে অডিও রেকর্ড প্রকাশ হয়ে গেলেও এমপিকে গ্রেপ্তার না করে চরম নির্লজ্জতার পরিচয় দেয় সরকার!!

আর এভাবেই আমরা বেঁচে আছি। বেঁচে আছে বাংলাদেশের মানুষ। চরম উৎকণ্ঠায় দিন কাটছে এই ভেবে যে – আগামী দিনটা ভালো কাটবে তো?

লেখক : ব্যাংকার ও উপদেষ্টা, শিক্ষামেলা

এসএ/