শিশুরা বেড়ে উঠুক নির্বিঘ্নে

Published: Mon, 07 Oct 2019 | Updated: Mon, 07 Oct 2019
সাদিয়া আফরিন মৌরি

শিশুর কোমল পবিত্র মুখের প্রাণবন্ত হাসিতে অয়োময়ের কঠিন হৃদয়ও বিগলিত হয়ে যায় মুহূর্তে। আজকের এই শিশুই আগামীদিনে দেশ ও জাতির ভবিষ্যত কর্ণধার। একটি নবজাতক শিশুর মধ্যে আজ যে প্রাণের সঞ্চার হল তা একদিন জাতির আশা-আকাঙ্ক্ষা ও ভবিষ্যত স্বপ্নকে সফল করবে। 

বিশ্বকে আজকের চেয়েও আরও সুন্দর, সংঘাতহীন ও উন্নত করে তুলবে। বস্তুত শিশুর মধ্যে নিহিত রয়েছে বিপুল সম্ভাবনা। তাই শিশুকে সেভাবে বেড়ে ওঠার সুযোগ ও পরিবেশ দিতে হবে। শিশুর নির্বিঘ্নে বেড়ে ওঠায় মা-বাবা, সমাজ ও রাষ্ট্রের ওপর দায়িত্ব বর্তায়। প্রতিটি শিশুই যেন তাদের অধিকারগুলো সমানভাবে পায় রাষ্ট্রের তা নিশ্চিত করতে সচেষ্ট থাকতে হবে।
 
শিশুর অধিকার: 
মৌলিক পাঁচটি অধিকার ছাড়াও শিশুদের কিছু অধিকার রয়েছে যা জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদে বলা হয়েছে। সনদটিতে ৫৪টি ধারায় শিশুর অধিকার সম্পর্কীত বিভিন্ন বিষয় উল্লেখ আছে। পরিবারের সাথে বসবাস, স্নেহ-ভালবাসাপূর্ণ পরিবেশে বেড়ে ওঠা, সুস্বাস্থ্য ও পুষ্টি, মানসম্মত শিক্ষা, পরিস্কার পানি ও সেনেটারী, লিঙ্গ বৈষম্যহীন সমাজ, মুক্তচিন্তা ও বাকস্বাধীনতা, নিরাপত্তা এসবই শিশুর অধিকার। 

জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদে ঘোষনা করা হয়েছে রাষ্ট্র ও ব্যক্তি সব শিশুর অবিচ্ছেদ্য মানবাধিকার রক্ষা করবে। উন্নত চিকিৎসা ও আদর্শ জীবনমানের ভেতর দিয়ে শিশু যাতে নিরাপত্তা ও সহায়তা পেয়ে বেড়ে উঠতে পারে সনদ অনুমোদনকারী রাষ্ট্রগুলো সে ব্যাপারে স্বীকৃতি দান ও অঙ্গীকার করেছে। কিন্তু স্বীকৃতি দানকারী বহু দেশে এ অধিকারগুলো নানা কারণে বাস্তবায়িত হয়নি। বিশ্বের একটি অংশের শিশুরা যে সব অধিকার ভোগ করছে অপর অংশের শিশুরা তা থেকে বঞ্চিত থাকছে।
 
আমাদের দেশে অধিকারবঞ্চিত শিশুর সংখ্যা চিন্তাগ্রস্থ করার মত। মৌলিক অধিকারগুলোই রাষ্ট্র সকল শিশুর জন্য নিশ্চিত করতে পারছে না। শিশুশ্রম, বাল্যবিবাহ, শিশুর লিঙ্গ বৈষম্য, শিশুর প্রতি সহিংসতা, এমনভাবে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে গেছে যে আইন-কানুন, সচেতনতা বৃদ্ধিমূলক কার্যক্রম থাকা সত্তেও নির্মূল করা যাচ্ছে না। পথশিশু, টোকাইদের হরহামেশাই দেখা যায় বিভিন্ন সিগন্যালে। এসব শিশুরাই আবার জড়িয়ে পড়ছে বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গে ও নেশার জগতে। শিশুরা পাচারের শিকার হচ্ছে। ভিক্ষুক মাফিয়ার কবলে পড়ে অঙ্গহানীর শিকার হচ্ছে। নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর শিশুরা যারা রাস্তায় খেলাধুলা করে সময় কাটায় তারাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে। উচ্চবিত্ত পরিবারের ছেলেমেয়েদের মধ্যেও নৈতিকতার অবক্ষয়, মাদকগ্রহণের মত চিত্র দেখা যাচ্ছে। 
  
কন্যা শিশুরা যেন পিছিয়ে না পড়ে:
লিঙ্গ বৈষম্যের কারণে কন্যা শিশুরা বেশি অবহেলিত। বাল্যবিবাহ কেড়ে নেয় তার সকল সম্ভাবনা। অপরিনত বয়সে গর্ভধারণ স্বাস্থ্য ঝুঁকি এমনকি অনেক সময় মৃত্যুরও কারণ হয়। মানসিক নির্যাতন, যৌন হয়রাণী, হেয় প্রতিপন্ন করা তার এগিয়ে যাওয়ার রাস্তাকে সরু থেকে সলতে পরিণত করে। তবে আশার কথা হচ্ছে মা-বাবার মধ্যে চিন্তার অনেক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। ছেলের পাশাপাশি মেয়ে শিশুকে শিক্ষার সুযোগ দেওয়ার মানসিকতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। সমাজের দৃষ্টিভঙ্গিও অনেকটাই পরিবর্তিত হয়েছে। রাষ্ট্র কন্যাশিশুর শিক্ষায় পৃষ্ঠপোষকতা বৃদ্ধি করেছে। বাল্যবিবাহ বন্ধে সরকার বদ্ধ পরিকর। নির্যাতন ও হয়রাণীর শাস্তিও এখন কঠোর।
       
বিশেষ শিশুদের নিয়ে কিছু কথা:
দার্শনিক ও মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে সব শিশুই বিশেষ। মানব আচরণের বিভিন্ন দিক থেকে যেসব শিশু তাৎপর্যপূর্ণভাবে ভিন্ন তারাই বিশেষ শিশু। এই শিশুরা শারিরীক ও মানসিক প্রতিবন্ধকতা নিয়ে বাঁচে তাই তারা প্রতিবন্ধী নামে পরিচিত। তাদের প্রতি সমাজের নেতিবাচক মনোভাবই বেশি। দৃষ্টি প্রতিবন্ধী, শ্রবণ প্রতিবন্ধী, শারিরীকভাবে বিকলাঙ্গ, বুদ্ধি প্রতিবন্ধী বা অটিজম সবই বিশেষ শিশুর আওতাভুক্ত। এই শিশুদের প্রয়োজন ব্যতিক্রমধর্মী শিক্ষা পদ্ধতি ও উপকরণ। প্রয়োজন বিশেষ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও পুনর্বাসনের। তারাও অধিকার রাখে অন্যান্য শিশুদের মত সাভাবিক জীবনধারণের।  

প্রয়োজন সচেতনার:  
সামাজিক, রাষ্ট্রিয়, আইনগত পরিবর্তন সময়সাপেক্ষ হলেও ব্যক্তিগত পরিবর্তন ও সচেতনতা রাতারাতি সম্ভব। সামাজিকভাবে কিছু বিষয় এতটাই অসংগতিপূর্ন হয়ে আছে যা রাষ্ট্রের পক্ষে সামাল দেয়া কঠিন। আর সেটি প্রভাবিত করছে সমগ্র বিশ্বকে। অথচ সমাজ কিন্তু আমরাই। ব্যক্তি পর্যায় থেকে পরিবর্তন না হলে সমাজ বদলাবে না। সমাজ প্রভাবিত করে রাষ্ট্রকে আর রাষ্ট্র প্রভাবিত করে বিশ্বকে। আজ কোন শিশু রাস্তায় ভিক্ষা করছে, টোকাইয়ের কাজ করছে বা দোকানে খাবার পরিবেশন করছে এসব দৃশ্য আমাদের গা সওয়া হয়ে গেছে। অপ্রাপ্ত বয়স্ক মেয়েটি যার বিয়ে হচ্ছে আমাদেরই কারও আত্নীয়া সে। আপনার আমার সামনেই হয়ত কোন শিশুকে নির্যাতন করা হচ্ছে।

কিন্তু আমরা নির্বিকার, নির্বাক। আমরা আছি এমন এক আত্বকেন্দ্রিকতায় যে যতক্ষণ না নিজের বা নিকটজনের সাথে অন্যায় হচ্ছে আমরা চুপই থাকব। মেনে নেব সব অবিচার। শিশুরা অনুকরণপ্রিয়। আমাদের শিশুরাও শিখছে আমাদের কাছ থেকে  এই মৌন সংস্কৃতি। আজ এখন থেকেই যদি নিজে শপথ নেই যে কোন শিশুর প্রতি অবিচার সহ্য করব না, পারলে অন্তত একটি শিশুর শিক্ষার দায়িত্ব নিজ কাঁধে তুলে নেব, এ জাতির অগ্রযাত্রা অবধারিত। সদিচ্ছাই সব থেকে বড় শক্তি। 

-এমজে