স্কুলে শিশু পাঠাগার

অধ্যাপক রেজাউল করিম

বই পড়ার মধ্যে এক বিপুল আনন্দ লুকিয়ে আছে। যদি কেউ বইয়ের মধ্যে নিজেকে একবার প্রবেশ করাতে পারে তবে সে অফুরনন্ত ভালো লাগা থেকে আর ফিরবে না।

শৈশব জীবন হলো একটা নির্মল সুন্দর সময়। এই সময় থেকে শিশু কিশোরকে যদি অন্যসব আনন্দের ব্যাপারের সাথে বই পাঠে আগ্রহী করে তোলা যায় তা হলে সে অন্য এক ভুবন খুঁজে পাবে। তাই তাদের হাতে তুলে দিতে হবে ওদের মনের মতো বই, ওদের উপযোগী বই। মজার মজার ছড়া, কবিতা, গল্প, ভ্রমণকথা, বিজ্ঞান রহস্য প্রভৃতি। আমাদের দেশে সেভাবে আমরা প্রতিটি শিশুর কথা চিন্তা করি না। বিদেশে বিশেষ করে উন্নত দেশে শিশুদের মনোজগতের উপর গুরুত্ব গিয়ে প্রচুর বই ছাপা হয়, পাঠাগার গড়ে তোলা হয়।

জ্ঞান বিজ্ঞান চিকিৎসার অভাবনীয় প্রসার ও বিকাশ ঘটছে প্রতিনিয়ত। ডিজিটাল ব্যবস্থারও ব্যবহার বাড়ছে। মানুষ দ্রুত গতিতে চলছে সত্য। কিন্তু মানবিক সমাজ, মানসিক জগৎ ও নৈতিক বোধ সম্পন্ন মানুষ তৈরি- শিশু কিশোর এবং ক্রমান্বয়ে যুবক ও সর্বস্তরের মানুষের মানসিক শক্তি বৃদ্ধির জন্য বইয়ের বিকল্প নেই। নতুন কিছু আবিষ্কার, সৃষ্টির ক্ষেত্রে, গবেষণার ক্ষেত্রে বইয়ের সাহায্য লাগবে।

দিনদিন আবক্ষয় বেড়ে যাওয়ার ফলে মানবিকতা, লৌকিকতা, সামাজিকতা, সৌজন্যবোধ লোপ পাচ্ছে। শুধু অর্থনৈতিক উন্নতির পিছনে দ্রুত গতিতে চললে হবে না। জ্ঞান বৃদ্ধির পাশাপাশি সৃজনশীলতা বৃদ্ধি, আনন্দলাভ, শান্তি স্বস্তি পেতেও বই অপরিহার্য। বই পরম বন্ধু। শিশুদের দেহ গঠনে যেমন খেলাধুলা প্রয়োজন তেমনি মনের গঠন বৃদ্ধিতেও বইয়ের একান্ত প্রয়োজন। হাসির গল্প, ছড়া, কবিতা মনকে ভালো রাখে। পৃথিবীর ছোট বড় নানা ঘটনা, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, নদী, আকাশ, সাগর, বন, জীবজন্তু, পাহাড় পর্বত সম্পর্কে জানা যায়। দৈনন্দিন জীবন, জীবনের নানা ঘটনা, পরিবশে পরিস্থিতি পারিপার্শ্বিকতা পারিবারিক সমস্যাও ফুটে উঠে বইয়ের পাতায়।

আমাদের জনগোষ্ঠীর একটা বৃহৎ অংশই শিশু কিশোর। এবং বড় শহরের চেয়ে ছোট শহর ও গ্রামাঞ্চলেই বেশিরভাগ শিশুর বাস। এদেরকে শিক্ষিত করার চেষ্টা হচ্ছে। নতুন নতুন বিদ্যালয় স্থাপন করা হচ্ছে। পাঠ্য বইয়ের মধ্যেই তারা আটকে থাকছে। এতে তাদের মনের বিকাশ ঘটছে না। এদেরকে আরো বেশি কিছু জানার, আরো বেশি কিছু শেখার সুযোগ করে দিতে হবে। জানার আগ্রহ জন্মাতে হবে। ছোট বেলা থেকেই পাঠাভ্যাস গড়ে তুলতে পারলে যে জ্ঞান অর্জন হবে, অন্য অনেক বিষয়ের পরিচয় ঘটবে তা বেশি সময় ধরে স্মরণে থাকবে।

বাংলাদেশে বই পড়ার আন্দোলন বা পাঠাগার স্থাপন যে হয়নি, তা নয়। তবে তা সীমিত আকারে রাজধানী, জেলা ও কিছু উপজেলা পর্যায়ে। এসবের কার্যক্রম মূলত হাইস্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও আগ্রহী পাঠকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ। অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সাঈদ বই পড়ার মহৎ কাজের আন্দোলনটি অত্যন্ত সুচারুভাবে দীর্ঘদিন ধরে আন্তরিকতার সঙ্গে অক্লান্ত পরিশ্রমে করে যাচ্ছেন। কিন্তু এটা গোটা দেশের জন্য নয়। এই পরিপ্রেক্ষিত সামনে রেখে বর্তমান প্রজন্মের এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের একটা বৃহৎ অংশের কথা ভেবে গ্রামে, প্রত্যন্ত অঞ্চলে, উপজেলায়, এমন কি জেলায়ও ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পাঠাগার গড়ে তোলা অপরিহার্য। এবং এটা সম্ভব যদি সরকার সামান্য উদ্যোগ নেয়। এই পাঠাগারের জন্য নতুন ভবন বা অবকাঠামোর প্রয়োজন নেই। প্রতিটি প্রাইমারি স্কুলে এই পাঠাগার হবে। প্রথমত একটি আলমারি থাকলেই চলবে। সরকারের গণশিক্ষা ও প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রমের আওতায় কাজটি করা সম্ভব। প্রাথমিক বিদ্যালয় ভিত্তিক এই পাঠাগার দেখভাল করবেন প্রধান শিক্ষক অথবা দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষক। প্রতি স্কুলে শিক্ষক কাম লাইব্রেরিয়ান একটি পদ সৃষ্টি করাও যেতে পারে। এইসব পাঠাগারে শিশুদের উপযোগী বই সংগ্রহ হতে পারে শিশু একাডেমী, গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তর থেকে; জেলা পরিষদ উপজেলা পরিষদ ও জেলা প্রশাসকের তহবিলের অর্থায়নে। এছাড়াও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও দাতাব্যক্তিদের অনুাদানে বই সংগ্রহ হতে পারে। শুধুমাত্র আন্তরিকতা, সক্রিয়তা এবং সরকারি সিদ্ধান্তেই এই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পাঠাগার স্থাপন করা সম্ভভ। এই পাঠাগারগুলি স্থাপিত হলে শিশু কিশোর ছাত্রছাত্রী কিছু সময় স্কুলেই অথবা বাড়ি ফেরার সময় একটি করে বই নিয়ে যাবে। পাঠ্যসূচীর বাইরে ছড়া, কবিতা, জীবনী, প্রকৃতি বিষয়, ভ্রমণ সম্পর্কে পড়তে নিশ্চয়ই ওদের ভালো লাগবে, আনন্দ পাবে।

/এসিএন