আমরা মরবো, জাগবে দেশ

বিংশ শতাব্দীর শুরুর একটা সময় কুষ্টিয়ার কয়া গ্রামের মানুষ আতংকিত হয়ে উঠল। পাশের জঙ্গলে বিশাল একটি বাঘ দেখা গেছে। বাঘটির ভয়ে দিনের বেলায়ও কেউ রাস্তা-ঘাটে বের হয় না। রাতে তো কথাই নেই। বাঘটি প্রায়ই গ্রামের গরু, ছাগল খেতে শুরু করল। অতিষ্ঠ হ’য়ে উঠল গ্রামের মানুষ।

কয়া গ্রামে একটিই বন্দুক আর তা ছিল ফণিভূষণ বাবুর। গ্রামের জান-মাল রক্ষায় তিনি জীবনবাজী রেখে বাঘটিকে মারার সিদ্ধান্ত নিলেন। সেই সময়ে কৃষ্ণনগর থেকে মামা বাড়ি বেড়াতে এসেছিলেন তরুণ যতীন্দ্রনাথ। মামাত ভাই ফণিভূষণ বাঘ মারতে যাবেন শুনে যতীন্দ্রনাথ তাঁর সাথে যাওয়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠলেন। মামাবাড়ির সবাই যতীন্দ্রনাথকে যেতে নিষেধ করলেন। কারণ বন্দুক একটি, খালি হাতে যতীন্দ্রনাথ যাবেন কি করে, বাঘ যদি তাকে আক্রমণ করে? কিন্তু যতীন্দ্রনাথ কারও কথা শুনলেন না। খালি হাতে যাওয়া ঠিক হবে না ভেবে তিনি একটি ভোজালি নিয়ে দুপুরের পর ভাই ফণিভূষণের সাথে বাঘ মারতে রওনা হলেন।

শুরু হল বাঘ খোঁজা। ফণিবাবু ও যতীন্দ্রনাথ গ্রামের পাশের জঙ্গলের কাছে একটি বড় মাঠের মাঝে গিয়ে উপস্থিত হলেন। যতীন সেই মাঠের চারদিক দেখছিলেন আর ফণিভূষণ মাঠের এক প্রান্তে বন্দুক তাক করে দাঁড়িয়ে আছেন। গ্রামের মানুষ জঙ্গলের পাশে দাঁড়িয়ে বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে চলেছে। কিছুক্ষণ পর যতীন যেখানে দাঁড়িয়েছিলেন, সেইদিক দিয়ে বাঘ বেরিয়ে এল। বাঘ দেখে গ্রামের মানুষ ভয়ে পালাতে শুরু করল। ফণিভূষণ বাঘটি লক্ষ্য করে গুলি ছুড়ল। গুলি বাঘের মাথা স্পর্শ করে চলে গেল। বাঘ আহত না হয়ে বরং আরো ক্ষিপ্ত হয়ে যতীনের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। আক্রান্ত যতীন বাঘটিকে বাম বগলের মধ্যে চেপে ধরে বাঘের মাথার উপর সমস্ত শক্তি প্রয়োগ করে ভোজালি দিয়ে আঘাত করতে শুরু করল। বাঘও যতীনকে কামড়াবার আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগল। চলতে থাকে বাঘে-মানুষে লড়াই। বাঘ নখ দিয়ে যতীনের সমস্ত শরীর ক্ষত-বিক্ষত করে চলল। তাঁর হাঁটুতে একটা কামড়ও বসিয়ে দিল। কিন্তু যতীন জানতেন বাঘটিকে না মারতে পারলে তাঁর রক্ষা নেই। তাই জীবন বাঁচানোর লড়াই চালিয়ে গেলেন তিনি। অন্যদিকে বাঘটিকে গুলি করার জন্য ফণিভূষণ বারবার চেষ্টা করে ব্যর্থ হচ্ছিলেন। কারণ বাঘের সাথে যতীন যেভাবে গড়াগড়ি করছিলেন, তাতে গুলি ছুড়লে সেটি যতীনের শরীরে লেগে যেতে পারে। এভাবে প্রায় ১০ মিনিট লড়াই করবার পর যতীন বাঘটিকে মেরে ফেললেন এবং নিজে জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে পড়ে গেলেন।

মৃত বাঘ ও অচেতন যতীনকে বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হল। গ্রাম্য ডাক্তার দেখানোর পর যতীন একটু সুস্থ হলেন। কিন্তু তার শরীরের প্রায় ৩০০ স্থানে ক্ষত দেখা গেল। ডাক্তার তাঁর অবস্থা দেখে তাড়াতড়ি কলকাতায় নিয়ে যেতে বললেন। যতীনের মেজ মামা হেমন্তকুমার তখন কলকাতায় ডাক্তারি করতেন। মামার কাছে তাঁকে পাঠানো হল। হেমন্তকুমার ভাগ্নের অবস্থা আশংকাজনক দেখে কলকাতার সেকালের বিখ্যাত সার্জন লেফটেন্যান্ট কর্ণেল সুরেশপ্রসাদ সর্বাধিকারীর উপর চিকিৎসার ভার দিলেন। প্রখ্যাত এই ডাক্তারও যতীন্দ্রনাথকে বাঁচানোর ও পুরাপুরি সুস্থ করার আশা প্রায় ছেড়েই দিলেন। যতীন মাসখানেক পর একটু সুস্থ হলেন কিন্তু তাঁর পায়ে পচন ধরল। ডাক্তার তাঁর পা কেটে ফেলার সিদ্ধান্ত নিলেন। কিন্তু যতীনের মামাদের আপ্রাণ চেষ্টা ও ডাক্তারদের সুচিকিৎসার ফলে শেষ পর্যন্ত তাঁর পা দুটি রক্ষা পেল। ডাক্তার সুরেশ প্রসাদ সর্বাধিকারী যতীনের বীরত্ব আর অদম্য আত্মবিশ্বাসে বিস্মিত হলেন এবং তাঁকে ‘বাঘা যতীন’ নামে ভূষিত করলেন। মানুষের কাছে যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় হ’য়ে উঠলেন ‘বাঘা যতীন’।

বাঘা যতীন যার পূর্ণ নাম যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, জন্মেছিলেন ১২৮৬ সালের ২১ অগ্রহায়ণে (১৮৭৯ সালের ৭ ডিসেম্বর)। তৎকালীন নদীয়া জেলার কুষ্টিয়া মহকুমার কয়া গ্রামের মাতুলালয়ে। বাবা উমেশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়। মা শরৎশশী দেবী। তাঁদের আদি নিবাস ছিল যশোর জেলার ঝিনাইদহ মহকুমার রিশখালী গ্রামে। বাঘা যতীনের ৫ বছর বয়সে তাঁর বাবা মারা যান। এরপর মা ও বড়বোন বিনোদবালার সাথে তিনি মাতামহের বাড়ি কয়া গ্রামে চলে আসেন। স্বভাব কবি মায়ের আদর-স্নেহে মাতুলালয়েই তিনি বড় হতে থাকেন। এখানেই কেটেছে তাঁর শৈশব-কৈশোর।

পরিবারেই যতীনের লেখাপড়ায় হাতেখড়ি। শরৎশশী দেবী ছেলেকে আদর্শবান ও স্পষ্টভাষী হিসেবে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। প্রাথমিক লেখাপড়া শেষে বড় মামা বসন্ত কুমার দুরন্ত স্বভাবের যতীনকে কৃষ্ণনগরের অ্যাংলো ভার্ণাকুলার হাইস্কুলে ভর্তি করিয়ে দেন। স্কুলের পড়াশুনা আর খেলাধূলার পাশাপাশি ঘোড়ায় চড়া, শিকার করা, মাছ ধরা, গাছে চড়া, দৌড়-ঝাঁপসহ নানা দুরন্তপনায় মেতে থাকতেন যতীন। পড়াশুনায় ভাল, দুষ্টমিতে সেরা ও স্পষ্টভাষী, এসব গুণের কারণে যতীন তাঁর সহপাঠী ও শিক্ষক মহলে প্রিয় হয়ে উঠেছিলেন। পাড়া-মহল্লা ও স্কুলে নাটকে অভিনয়ও করতেন তিনি। মামারা খুব ভালবাসতেন ভাগ্নেকে। তাই বড় মামা যতীনকে নিয়ে যেতেন সবখানে এমনকি কুস্তি খেলা দেখতেও নিয়ে যেতেন তাঁকে। রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগে বড়বোন বিনোদবালা যতীনকে রামায়ণ, মহাভারত, পুরাণের গল্প, রানাপ্রতাপ, শিবাজী, সীতারাম রায়ের কাহিনী শোনাতেন। এসব ইতিহাস শুনে শিশু যতীন বড়বোনকে প্রায়ই বলতেন, “আমি বড় হয়ে ইংরেজদের অত্যাচারের প্রতিশোধ নেব”।

অ্যাংলো ভার্ণাকুলার হাইস্কুল থেকে তিনি ১৮৯৮ সালে কৃতিত্বের সঙ্গে এন্ট্রান্স পাস করেন। এরপর ক্যালকাটা সেন্ট্রাল (বর্তমানে ক্ষুদিরাম বোস কলেজ) কলেজে ফাইন আর্টস এ পড়ার জন্য মেজমামার কাছে কলকাতার শোভাবাজারে চলে যান। এখানেই তিনি উপার্জনের লক্ষ্যে অ্যাটকিনসনের কাছে শর্টহ্যান্ড ও টাইপরাইটিং শিখতে শুরু করেন। এই সময়েই তিনি স্বামী বিবেকানন্দের সান্নিধ্যে আসেন এবং বিবেকানন্দ তাঁকে শরীরচর্চা শিক্ষার জন্য অম্বুগুহের কুস্তির আখড়ায় পাঠিয়ে দেন। সেখানে যতীন অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের সংস্পর্শে আসেন এবং দেশপ্রেমের মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ হন। তখনই তিনি প্রখ্যাত জীবনী লেখক পণ্ডিত যোগেন্দ্র বিদ্যাভূষণের পুত্র মোহন বাগান ফুটবল ক্লাবের ক্যাপ্টেন শচীন বন্দ্যোপাধ্যায়ের সান্নিধ্যে আসেন, শচীন তাঁকে নিয়ে যান নিজের বাসায় এবং পিতা পণ্ডিত যোগেন্দ্র বিদ্যাভূষণের সাথে পরিচয় করিয়ে দেন, যার প্রভাবেই তিনি দেশের কাজে ব্রতী হন। এসময় সিস্টার নিবেদিতার সহযোগী হিসেবে যতীন তাঁর বন্ধুদের নিয়ে নানা রোগে আক্রান্ত রোগীদের সেবা ও সমাজ সেবামূলক কাজও শুরু করে দেন।

টাইপরাইটিং শেখা শেষে তিনি কলকাতার একটি ইউরোপীয় সওদাগরী অফিসে মাসে ৫০ টাকা বেতনে চাকরী নেন। এখানে বেশ কিছুদিন চাকুরী করার পর তিনি ১৮৯৯ সালে মোজফফরপুরে ব্যারিষ্টার প্রিঙ্গল কেনেডির স্টেনোগ্রাফার হিসেবে ৫০ টাকা বেতনে নিযুক্ত হন। তিনি অচিরেই একজন আন্তরিক, সৎ, দক্ষ কর্মচারী হিসেবে নিজের দক্ষতা প্রমাণ করতে সক্ষম হন। চাকুরীর কারণে তাঁর আর এফ.এ. ফাইনাল পরীক্ষা দেওয়া হলো না। ব্যারিস্টার কেনেডী যতীনকে তাঁর সততার জন্য পছন্দ করতেন। কেনেডির উৎসাহে মোজফফরপুরের তরুণদের জন্য যতীন ফুটবল ও অ্যাথলেটিক ক্লাব গড়ে তোলেন।

১৯০০ সালে যতীন ব্যারিস্টার কেনেডীর সুপারিশে বাংলা সরকারের অর্থসচিব হেনরি হুইলারের স্টেনোগ্রাফার হিসেবে ১২০ টাকা বেতনের একটি চাকুরী পেয়ে আবার কলকাতায় চলে আসেন। ওই বছর তিনি ইন্দুবালাকে বিয়ে করেন। তাঁদের পরিবারে ৪টি সন্তানের জন্ম হয় – অতীন্দ্র, আশালতা, তেজেন্দ্র, ও বীরেন্দ্র।

বেঙ্গল গভর্ণমেন্টের চাকরীসূত্রে দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘুরে বেড়াতে হত যতীনকে। তেমনই এক সফরে ১৯০৮ এর এপ্রিল মাসে দার্জিলিং এর পথে শিলিগুড়ি ষ্টেশনে প্রথমে তর্ক তার পরে হাতাহাতি এবং একা হাতে শেষে তুমুল উত্তম মধ্যম দিয়ে দিলেন গুর্খা বাহিনীর ৪ ইংরেজ সদস্যকে। এদের মাঝে ছিল ক্যাপ্টেন মার্ফি ও লেফটেন্যান্ট সামারভিল প্রমুখ। চারজনের চোয়াল ভেংগে ধরাশায়ী করে দেবার অপরাধে যতীনের নামে মামলা হলে সারাদেশে সারা পড়ে যায়, কাগজে কাগজে এই নিয়ে লেখালেখির বহর দেখে সরকার চাপ দিয়ে মামলা প্রত্যাহার করে। ঠাট বজায় রাখতে ম্যাজিস্ট্রেট যতীনকে শাসিয়ে দেন, “এমনটি আর যেন না ঘটে!” দর্পভরে যতীন জবাব দেন: “নিজের সম্মান বা দেশবাসীর সম্মান বাঁচাতে যদি প্রয়োজন হয়, এমনটি যে আবার করব না, এ শপথ আমি করতে অপারগ।” স্যার হেনরি হুইলার ঠাট্টা করে যতীনকে জিজ্ঞাসা করেন: “আচ্ছা, একা হাতে ক’টা লোককে আপনি শায়েস্তা করতে পারেন?” হেসে যতীন বলেন, “ভাল মানুষ হয় যদি, একটাও নয়: দুর্বৃত্ত হলে যতগুলি খুশি সামলাতে পারব।” একবার ফোর্ট উইলিয়ামের কাছে গোরাবাজারে অন্যায় কাজের জন্য এক গোরা সৈন্যকে বেধড়ক পিটুনি দিয়েছিলেন যতীন।

১৯০২ সালে স্বদেশী আন্দোলনের নেতা অরবিন্দ ঘোষ বারোদায় ৭০০ টাকা বেতনের চাকুরী ছেড়ে কলকাতায় চলে এসে শ্যামপুকুর স্ট্রীটে পন্ডিত যোগেন্দ্রনাথের বাড়ীতে অবস্থান নেন। এখানে অবস্থান করে তিনি কলকাতার বিভিন্ন স্থানে ঘুরে গোপনে ইংরেজ শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে বিপ্লবের বাণী প্রচার করতে শুরু করেন। ১৯০৩ সালে অরবিন্দের সাথে পরিচিত হয়ে যতীন বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে যুক্ত হন। অরবিন্দ ঘোষের সাথে যতীন, যোগেন্দ্রনাথ, লোলিতনাথ চট্যোপাধ্যায় ভারত মুক্তির উপায় নিয়ে দীর্ঘ আলোচনার সুযোগ পান এসময়ই। মনে করা হয় এই সমস্ত আলোচনারই ফল “যুগান্তর”। যতীন বুঝতে পেরেছিলেন, সশস্ত্র সংগ্রাম ছাড়া ভারতবর্ষ থেকে ব্রিটিশকে তাড়ানো সম্ভব নয়। সে কারণে তিনি ব্রিটিশের কবল থেকে দেশমাতৃকাকে স্বাধীন করার জন্য সশস্ত্র বিপ্লবী পথ বেছে নেন। বাঘা যতীন সরকারি চাকরিরত অবস্থায় অত্যন্ত সুকৌশলে ও গোপনে বিপ্লবী সংগঠনের নেতৃত্ব দেন। “যুগান্তর” দলে কাজ করার সময় সম্ভবতঃ ১৯০৬ সালে এম.এন রায়ের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়।

১৯০৮ সালে কলকাতার মানিকতলায় গোপন বোমার কারখানার বিপ্লবীরা পুলিশের হাতে ধরা পড়ে। পুলিশ জানতে পারে, এই বিপ্লবীদের মধ্যে একজন সরকারি কর্মচারী রয়েছে। তাঁর নাম বাঘা যতীন। তিনি ওই দলের নেতা। তাঁর “বিপ্লবী” পরিচয় পেয়ে সরকারি মহল ও পুলিশ প্রশাসন স্তম্ভিত হয়ে পড়ে। তাঁর উপর কঠোর নজরদারি শুরু হয়।

ওই সময় থেকে যতীন সতর্ক হয়ে যান। দমে যাননি একটুও বরং এই সময়েই সারাভারতে বিপ্লবী কর্মকান্ড ছড়িয়ে দিয়েছেন। গড়ে তুলেছেন অসংখ্য সশস্ত্র বিপ্লবী। বিপ্লবী কর্মকান্ড সংগঠিত করেছেন খুব সর্তকতার সাথে।

১৯০৯ সালের ৩০ নভেম্বর ব্রিটিশ সরকার ম্যাজিস্ট্রেট সামসুল আলমকে স্পেশাল ক্ষমতা দেন, সে ক্ষমতাবলে তিনি যে কাউকে গ্রেফতার করতে পারবেন। ব্রিটিশ সরকারের দেয়া এই ক্ষমতাবলে ম্যাজিস্ট্রেট সামসুল আলম বিপ্লবীদের উপর চড়াও হয়ে একের পর এক বিপ্লবীকে গ্রেফতার করতে শুরু করেন। বিপ্লবী যতীন তখন সামসুল আলমকে হত্যার ষড়যন্ত্র করেন। ২৪ জানুয়ারী সামসুল আলম যখন কলকাতা হাইকোর্ট থেকে সিড়ি বেঁয়ে নামছিলেন, তখন ১৮ বছরের বিপ্লবী বীরেন্দ্রনাথ দত্তগুপ্ত যতীনের নির্দেশে তাকে গুলি করে হত্যা করেন।

যতীনের নির্দেশে সামসুল আলম হত্যাকান্ডের পর ব্রিটিশ সরকার যতীনের উপর গ্রেফতারি পরওয়ানা জারি করে। টেগার্টকে পাঠানো হলো যতীনকে গ্রেফতার করার জন্য। যতীন তখন কয়েকজন সহযোদ্ধাকে সাথে নিয়ে কলকাতার ২৭৫ নং আপার চিৎপুর রোড়ের বাড়িতে তাঁর এক অসুস্থ মামার সেবাযত্ন করছিলেন। সেই বাড়ি থেকে যতীনকে টেগার্ট গ্রেফতার করে। এরপর যতীনকে আটক রেখে চালানো হয় অত্যাচারের স্টিম রোলার। কিন্তু একটি তথ্যও বের করতে পারেনি। তাঁকে বিভিন্ন ধরনের লোভ ও প্রলোভন দেখানো হয়। এতেও কোনো কাজ হয়নি। হতাশ হয়ে সরকারি মহল তাঁকে প্রথমে প্রেসিডেন্সি জেলে, পরে আলীপুর সেন্ট্রাল জেলে পাঠায়। তাঁর নামে দেয়া হয় বিখ্যাত “হাওড়া ষড়যন্ত্র মামলা”। এ মামলা চলে এক বছরেরও বেশী সময় ধরে। এই মামলায় যতীনসহ কয়েকজন বিপ্লবীকে জড়ানো হয়। এ সময় “অনুশীলন সমিতি”কে বেআইনি ও নিষিদ্ধ ঘোষণা করে ব্রিটিশ সরকার। ব্রিটিশদের নির্মম অত্যাচারের ফলে কয়েকজন বিপ্লবী মারা যান এবং অনেকে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। যথাযথ প্রমাণের অভাবে যতীনকে দোষী প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয় ব্রিটিশ সরকার। ১৯১১ সালের একুশ ফেব্রুয়ারী যতীন এ মামলা থেকে মুক্তি লাভ করেন।

জেল থেকে মুক্তি লাভের পর যতীন তাঁর দিদি বিনোদবালা, স্ত্রী ইন্দুবালা, কন্যা আশালতা আর দু’বছরের ছেলে তেজেন্দ্রনাথকে নিয়ে যশোরের ঝিনাইদাতে বসবাস শুরু করেন এবং ঠিকাদারী ব্যবসা শুরু করেন। যশোর শহরে আর মাগুরাতে দুটি শাখা অফিস করেন। ব্রিটিশ সরকারের চোখে ধূলো দিতে তিনি পুরোপুরী সংসারী হওয়ার ভান করেন। ব্যবসার আড়ালে গোপনে গোপনে বিপ্লবী কার্যক্রম পরিচালনা করেন। এ সময় তিনি নরেন সন্ন্যাসীর ছদ্মবেশে পুরো ভারত চষে বেড়ান এবং বিভিন্ন স্থানে বিপ্লবীদের একত্রিত করবার কাজ চালিয়ে যান।


১৯১৩ সালের ভয়াবহ বন্যা ও মহামারীর সময় যতীন তাঁর দলবল নিয়ে বর্ধমান ও কাশীতে বন্যার্তদের সেবাদানে যুক্ত হন। তিনি সমস্ত জেলার বিপ্লবী নেতাকর্মীদের বন্যার্তদের পাশে দাঁড়াবার জন্য সেখানে চলে আসার নির্দেশ দেন। বন্যার্তদের মাঝে কাজ করার ফাঁকে ফাঁকে যতীন গোপন বৈঠকে সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে ইংরেজকে হঠানোর পরবর্তী কর্মপন্থা ঠিক করে নিয়েছিলেন। এসময় নিষিদ্ধ সশস্ত্র বিপ্লবী দলগুলো যতীনকেই তাঁদের সর্বাধিনায়ক নির্বাচন করেন। এরপর থেকে তাঁর কমান্ডেই সমস্ত বিপ্লবী কার্যক্রম পরিচালিত হতে থাকে। ওই বছর শেষের দিকে উত্তর ভারত থেকে রাসবিহারী বসু সর্বাধিনায়ক যতীনকে সাংগঠনিক কাজে সহায়তা করতে চলে এলেন। শচীন স্যানালও যুক্ত হলেন এই বিপ্লবী পরিকল্পনার সাথে।

১৯১৪ সালের ৪ আগস্ট ইংরেজ-জার্মান যুদ্ধ বাধে। এ যুদ্ধ বাধার ২২ দিন পর সর্বাধিনায়ক যতীনের নেতৃত্বে সারা কলকাতায় বিপ্লবীদের কর্মকাণ্ড ব্যাপক আকারে সংগঠিত হতে থাকে। নভেম্বর মাসে আমেরিকা থেকে সত্যেন্দ্রনাথ বসু ভারতে এসে যতীনকে জানালেন, গদার পার্টির চার হাজার সদস্য আমেরিকা থেকে বিদ্রোহের জন্য ভারতে এসেছেন। বিদ্রোহ শুরু হলে আরো ২০ হাজার সদস্য ভারতে আসবেন। তারপর সত্যেন্দ্রনাথ বসু ও বিষ্ণু গনেশ পিঙ্গল যতীনের কাছে পরিচয় পত্র নিয়ে কাশীতে রাসবিহারী বসুর সঙ্গে দেখা করে সমস্ত ঘটনা বললেন এবং বিপ্লবী সংগঠনের কাজে যুক্ত হলেন।

১৯১৪ সালে যুদ্ধসংক্রান্ত ব্যস্ততার সুযোগ নিয়ে ভারতীয় বংশোদ্ভূত সৈন্যবাহিনীর মধ্যে সশস্ত্র বিদ্রোহের জাগরণ সৃষ্টি করতে অবিরত কাজ চালিয়ে গেলেন সর্বাধিনায়ক যতীন। গোপনে বিপ্লবীদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করা হল। দেশ-বিদেশ থেকে বিপ্লবী গদার পার্টির হাজার হাজার সশস্ত্র সদস্যের অংশগ্রহণও নিশ্চিত হল। সংগ্রহ করা হল বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ।

১৯১৫ সালে সর্বাধিনায়ক যতীন সমগ্র ভারত নিয়ে একটি বিপ্লবের চিন্তা করেন। তিনি রাসবিহারী বসু ও শচীন্দ্রনাথ স্যানালের সহযোগিতায় বেনারস, দানাপুর, সিকোল, এলাহাবাদ, জব্বলপুর, মীরাট, দিল্লি, রাওয়ালপিন্ডি, লাহোর, আম্বালা, পাঞ্জাব প্রভৃতি স্থানের সৈন্যদের “জাতীয় অভ্যূত্থানের” জন্য অনুপ্রাণিত করে তাঁদেরকে প্রস্তুতি নিতে বলেন।

১৯১৫ সালের জানুয়ারী মাসের শেষ দিকে সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন হল। বিদ্রোহ ঘটানোর দিন ধার্য করা হল ২১ ফেব্রুয়ারী মধ্যরাত। কিন্তু পরে ২১ ফেব্রুয়ারীর পরিবর্তন করে ১৯ ফেব্রুয়ারী করা হল। প্রধান লক্ষ্যস্থল পাঞ্জাব প্রদেশের লাহোর। সেইসঙ্গে বারাণসী ও জব্বলপুর সেনা ঘাঁটিও প্রস্তুতি নিয়ে অপেক্ষা করতে লাগল অধীরভাবে। রাসবিহারী বসু, শচীন স্যানাল ও হেরাম্বলালগুপ্ত এই সশস্ত্র বিপ্লবী বাহিনীর প্রধান গুপ্ত দপ্তর স্থাপন করেন লাহোর শহরের ৪টি গুপ্তস্থানে।

অবাঙালী বিপ্লবী রামশরণ দাসের বাড়িতে বিদ্রোহের আদেশ প্রদানের সময়টুকুর প্রতীক্ষায় ছিলেন তাঁরা। কিন্তু বিদ্রোহের ঠিক ৪ দিন পূর্বে এই ষড়যন্ত্রের খবর ফাঁস করে দেয় রামশরণ দাস। ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ সৈন্য পাঠিয়ে যেখানে যেখানে সম্ভব দেশীয় সৈন্যদেরকে অস্ত্রহীন করে এবং ১৯ ফেব্রুয়ারী ৪ প্রধান দপ্তরের একটিতে অকস্মাৎ হামলা চালায়। বিপ্লবীদের একটি দল ১৯ তারিখ সন্ধ্যেবেলায় লাহোরে নিযুক্ত ব্রিটিশ সেনানিবাসে হামলা চালিয়ে আগুন জ্বালিয়ে দেয়। এই সশস্ত্র হামলায় দুপক্ষের অনেক লোক মারা যায়। দ্রুত সমস্ত লাহোরব্যাপী এই ঘটনার সংবাদ ছড়িয়ে পড়ে। প্রশাসন সমস্ত শক্তি দিয়ে এই সশস্ত্র বিদ্রোহের ষড়যন্ত্র দমন করতে সক্ষম হয়। এটাই ঐতিহাসিক “লাহোর ষড়যন্ত্র” নামে পরিচিত।

এই পরিকল্পনা ব্যর্থ হওয়ার পর যতীন বিপ্লবীদের নিয়ে একটা বৈঠক করেন এবং একেকজনকে তাঁর দায়িত্ব বুঝিয়ে দেন। সকলে ভারতের স্বাধীনতার জন্য নতুন আঙ্গিকে কাজ শুরু করেন। নানা চড়াই-উৎরাই পার হয়ে সবাই বিপ্লব করার জন্য লড়ে যান। এসময় বিপ্লবীদেরকে সুরেশ নামে এক পুলিশ অফিসার প্রায়ই জ্বালাতন করতো এবং বিনা কারণে ধরে নিয়ে যেতো। বিপ্লবীরা একদিন সুরেশকে সুযোগ বুঝে মেরে ফেলেন। মৃত্যুর আগে লিখিত বক্তব্যে সুরেশ বলেন, যতীনের সঙ্গীরা তাকে মেরেছে। তাই ব্রিটিশ সরকার যতীনের উপর আবার গ্রেফতারী পরোয়ানা জারি করে এবং তাঁকে জীবিত অথবা মৃত ধরিয়ে দেওয়ার জন্য মোটা অংকের টাকা ঘোষণা করে।

১৯১৫ সালের মার্চ মাসে লর্ড হার্ডিঞ্জ ভারত রক্ষা আইন চালু করে দেশপ্রেমিক বিপ্লবীদের একের পর এক গ্রেফতার করে বিনা বিচারে বন্দী রাখার ব্যবস্থা করে। আগস্ট মাসের প্রথম দিকে গুপ্ত সমিতির পররাষ্ট্র বিভাগের দপ্তর-এ পুলিশ হানা দিয়ে ওই দপ্তরে নিয়োজিত বিপ্লবীদের গ্রেফতার করে। এরপর থেকে বিপ্লবীদের আস্তানাগুলোতে পুলিশ একের পর এক হানা দিতে থাকে। ইতঃমধ্যে সর্বাধিনায়ক যতীন জার্মান সরকারের সহায়তায় ভারত থেকে ইংরেজকে বিতাড়িত করার পরিকল্পনা করেন। জার্মানির সাহায্য কামনা করলে জার্মান সরকার সম্মত হয়। সিদ্ধান্ত নেয়া হয় যে, জার্মান জাহাজ মাভেরিক থেকে অস্ত্র নিয়ে বালেশ্বর রেললাইন অধিকার করে ইংরেজ সৈন্যদের মাদ্রাজ থেকে কলকাতা যাওয়ার রাস্তা বন্ধ করা হবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী চারজন সহযোদ্ধাকে নিয়ে বুড়িবালাম নদীর তীরে অপেক্ষা করতে থাকেন যতীন্দ্রনাথ।

কিন্তু ব্রিটিশ গোয়েন্দারা লোভী গ্রামবাসীর মাধ্যমে তাঁদের আত্মগোপন করার কথা জানতে পারে। ওই গ্রামবাসীরা এই বিপ্লবী দলকে পালানোর সুযোগ দেয়নি। তারা বিপ্লবীদের পিছু নিয়ে পুলিশকে খবর দেয়। ১৯১৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর এই বিপ্লবী দলকে পুলিশ ও সেনাবাহিনী ঘিরে ফেলে। তবে “আমরা মরবো, জাগবে দেশ” এই মন্ত্রে যতীন তাঁর চার সহযোদ্ধাকে সাথে নিয়ে ইংরেজ পুলিশের বিরুদ্ধে লড়ে যান। লড়াইয়ের এক পর্যায়ে যতীন গুরুতর আহত হন এবং পরদিন ১০ সেপ্টেম্বর বালেশ্বর হাসপাতালে শহীদ হন।

বিপ্লবী বাঘা যতীনের ৩৬ বছরের ছোট্ট জীবনে তিনি তাঁর জীবন-সংগ্রাম দিয়ে ইতিহাসের পাতায় নাম লিখে গেছেন। তিনি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের নিষ্পেষণের যাঁতাকল থেকে ভারতের স্বাধীনতা, মানুষের অধিকার ও শোষণমুক্তির আন্দোলন সংগ্রামে চির ভাস্বর হয়ে বেঁচে রইলেন মানুষের মাঝে। বাঙালী জাতির গর্ব ‘বাঘা যতীন’ বেঁচে থাকবেন যুগ-যুগান্তর ধরে বাঙালীর চেতনায়, কর্মে ও বিপ্লবে।

তাই তো বিপ্লবী বাঘা যতীনের হলদিঘাট বুড়ি বালামের তীরের বীরত্বপূর্ণ সংগ্রামের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বাংলার বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছিলেন:

বাঙালীর রণ দেখে যা তোরা
রাজপুত, শিখ, মারাঠী জাত
বালাশোর, বুড়ি বালামের তীর
নবভারতের হলদিঘাট।

লেখক: সাগর লোহানী

 

/এসিএন