লাতিন আমেরিকার মহান নেতা সাইমন বলিভার

সাইমন বলিভার একজন ভেনিজুয়েলান যোদ্ধা ও রাষ্ট্রনেতা। স্প্যানিশ সাম্রাজ্য থেকে লাতিন আমেরিকার দেশসমূহকে স্বাধীন করতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। তিনি ছিলেন ফেডারেল লাতিন আমেরিকার স্বপ্নদ্রষ্টা। তিনি এমন একজন, যিনি কেবল নিজের নয়, আরো পাঁচটি দেশের স্বাধীনতা এনে দেন।

তিনি একাই ছয়টি দেশের স্বাধীনতার ডাক দেন। স্বাধীনতার সংগ্রাম করেন এবং স্বাধীন করেন এবং সফলতার সাথে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেন । ইতিহাস তাঁকে মুক্তিদাতা হিসেবে চেনে। তাকে বলা হয় ‘লাতিন আমেরিকার জর্জ ওয়াশিংটন’। তাঁর নামে একটা দেশের নামকরণ পর্যন্ত করা হয়েছে, বলিভিয়া।

তার ইতিকথার কাছে অনেক সময় ছোট হয়ে যায় রুপকথার গল্প। কখনো গ্রিক মিথকেও তিনি হার মানান। রূপকথার এ রাজকুমারের জন্ম ১৭৮৩ সালের ২৪ জুলাই, ভেনিজুয়েলার অভিজাত পরিবারে । তাঁর বাবা ছিলেন তৎকালীন স্পেনের উপনিবেশ ভেনিজুয়েলার সেনাবাহিনীর কর্নেল। বলা যায় সোনার চামচ মুখে নিয়েই তাঁর জন্ম। কিন্তু, প্রকৃতি তাঁর সুখ সহ্য করেনি। মাত্র তিন তিন বছরে তার পিতাকে হারান তিনি। নয় বছর বয়সে মাকেও হারিয়ে বেড়ে ওঠেন চাচার কাছে। বলা হয়ে থাকে প্রত্যেক খ্যাতিমান মানুষের বিখ্যাত হওয়ার পেছনে থাকে এক বা একাধিক অনুপ্রেরণা। বালক বলিভারের কাছে সেই প্রেরণার নামটি ছিল– সিমন রড্রিগেজ। তাঁর শৈশবের শিক্ষক।

তিনি বলিভারকে কি শেখাননি? ইউরোপের রাজনীতি, সমাজনীতি, দর্শন সবকিছু। লক, রুশো, ভলতেয়ার পাঠ নেন গুরুর থেকে। আর তাঁর জ্ঞানসুধাকে তিনি অমৃত মনে করেই বড় হতে লাগলেন।

মাত্র চোদ্দ বছর বয়সে ১৭৯৭ সালে মিলিশিয়াতে যোগ দেন তিনি। সেখানেও এগিয়ে যাওয়ার যাত্রাটা অব্যহত রাখলেন। হয়ে যান সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট। তারপর পাড়ি জমান স্পেনে ১৭৯৯ সালে, উচ্চশিক্ষার লক্ষ্যে। ১৮০২ সালে নব জ্ঞানের সন্ধানে এই জ্ঞান পিপাসু পাড়ি জমান ইউরোপে।

সেখানে তাঁর পরিচয় হয় প্রকৃতি বিজ্ঞানী হুমবোল্টের সাথে। যেখানে তিনি হুমবোল্টের সাথে আলোচনার এক পর্যায়ে লাতিন আমেরিকার জনগণের ব্যাপারে দুশ্চিন্তাগ্রস্থ হয়ে পড়েন। তিনি ভাবেন ‘ইশ! আমরা যদি স্বাধীন হতে পারতাম।’
তার কিছুদিন পড়েই কাকতালীয়ভাবে দেখা হয় তার প্রাণপ্রিয় শিক্ষক রড্রিগেজের সাথে। তারা ফিরে এলেন রোমে। রোমের এভান্টিন পাহাড়ের পাদদেশে বসে যুবক বলিভার ঐতিহাসিক শপথ নেন গুরুর হাতে হাত রেখে – স্বদেশকে স্পেনের হাত থেকে মুক্ত করবেন তিনি। ১৮০৭ সালে প্রস্তুতি নিয়ে দেশে ফিরে এলেন।

এদিকে ভেনিজুয়েলাকে স্পেনের শোষণ থেকে মুক্ত করার জন্য আন্দোলন করে ফ্রানসিস কো ডি মিরান্ডা ১৮০৬ সালে নির্বাসনে যান। ১৮১০ সালে পাঁচ বছর নির্বাসন শেষে দেশে ফিরে আসেন। ততদিনে বলিভার এগিয়ে গিয়েছেন অনেকটা। ইতিহাসে ভেনিজুয়েলা লাতিন আমেরিকার বুকে প্রথম স্বাধীন দেশ হিসেবে নাম লেখায়।

পরবর্তীতে বলিভার কলম্বিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা দেন। আর এভাবেই তিনি ইকুয়েডর, পেরু, পানামা, বলিভিয়ার মাটিতে স্বাধীনতার বীজ বপন করেন। ১৮২৪ সালে স্প্যানিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ মুক্ত করলেন পেরুর উত্তরাংশ। ১৮২৫ সালে মহান বলিভারের নামানুসারে নাম রাখা হয় বলিভিয়া।

মহান বলিভার ছয়টি দেশ স্বাধীন করেই স্বপ্নকে থামিয়ে দেননি। তাঁর চিন্তা ছিল আরো সূদূরপ্রসারী। তিনি স্বপ্ন বুনেছিলেন একীভূত লাতিন আমেরিকা গড়ার। তা আর হয়ে ওঠেনি। তাঁর দীর্ঘদিনের ক্লান্ত শরীরে বাসা বাধে যক্ষ্মা। তখন সময় ১৮২৮ সাল। তিনি রাজনীতি থেকে অবসর নেন।

জীবদ্দশায় তিনি দেখেছিলেন তাঁর নেতৃত্বে স্বাধীন হওয়া রাষ্ট্র একদল ক্ষমতালোভীদের হাতে পড়েছে। তাঁদের মধ্যে কমতে থাকে একতা। এমন পরিস্থিতে এক ভগ্ন হৃদয় নিয়ে ১৮৩০ সালের ১৭ ডিসেম্বর কলম্বিয়ার শান্তা মারিতায় মাত্র ৪৭ বছর বয়সে পৃথিবী ছেড়ে চলে যান। তাঁর সম্মানে ভেনিজুয়েলার সরকারী নাম রাখা হয় – বলিভিয়ান রিপাবলিক অব ভেনিজুয়েলা। আর মুদ্রার নাম রাথা হয় বলিভার।

শধু তাই নয় ভেনিজুয়েলার প্রতিটি বড় শহরের প্রধান স্কয়ারের নামকরণ করা হয় – ‘প্লাজা বলিভার’ নামে।
এছাড়াও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক, জার্মানির বার্লিন, মেক্সিকো সিটি, লেবাননের বৈরুত, ইরানের তেহরান, মিশরের কায়েরো এবং আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের নয়াদিল্লীতে এ মহান বীরের ভাস্কর্য বানানো হয়েছে।

লাতিন আমেরিকার মানুষ প্রায় ৪০০ বছর ঔপনিবাশিক শোষণের পর সাইমন বলিভার তাদের স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন। স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছিলেন। তাই লাতিন আমেরিকার চোখে তিনি স্বাধীনতার দেবতা। স্বাধীনচেতা মানুষদের জন্য তিনি এক অনুপ্রেরণার নাম!

আজীবন প্রেসিডেন্ট থাকার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে থাকাটাকেই তিনি অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন। তাই ১৮৩০ সালে তিনি প্রেসিডেন্ট পদ থেকে সরে দাঁড়ান।

সে বছরের শেষ দিকেই তিনি যক্ষ্মায় আক্রান্ত হয়ে মারা যান। মৃত্যুর আগে দেয়া এক বিদায়ী ভাষণে তিনি অত্যন্ত আবেগঘন কণ্ঠে বলেছিলেন- “কলম্বিয়াবাসী! আমার জীবনের শেষ ইচ্ছে এই অঞ্চলের সুখ। আমার মৃত্যুতেও যদি এই অঞ্চলের বিভেদ দূর হয় এবং একটি ইউনিয়ন গঠিত হয়, তবে আমি কবরে গিয়েও শান্তিতে থাকব।’

এসএ/