গণতান্ত্রিক সুশাসন প্রতিষ্ঠায় প্রয়োজন জনসম্পৃক্ততা

Published: Tue, 10 Nov 2020 | Updated: Tue, 10 Nov 2020

মো. আশরাফুল আলম : দারিদ্রের অবিচার থেকে মুক্ত ভবিষ্যৎ গড়তে বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন সংস্থার আন্দোলন অব্যাহত রয়েছে। স্বাধীনতার পর থেকেই বাংলাদেশ ন্যায়সঙ্গত সমাজ গড়ে তুলতে নানা পদক্ষেপে কাজ করছে। বিভিন্ন সেবামূলক প্রতিষ্ঠান নারী ও পুরুষের অংশগ্রহনের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই এগিয়ে চলছে লক্ষ্য অর্জনে।

নানাভাবে চলছে জ্ঞান, দক্ষতা আর নেতৃত্বের মহড়া। রাষ্ট্রীয় এবং বেসরকারিভাবে নাগরিকের সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন রকমের সামগ্রিক কর্মসূচি গ্রহণ করেও যেন দারিদ্র নির্মূলে ধীরগতি লক্ষ্যণীয়। তাই সুশাসনের গুরুত্ব এবং নাগরিক সম্পৃক্ততার গুরুত্ব অপরিসীম। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার দীর্ঘ সময় ধরে মানুষ শাসন ব্যবস্থার উপর ভরাসা করেও আশানুরুপ ফল না পাওয়া হতাশ। তাই গ্রাম থেকে শহরে সবখানেই যেন আফসোসের মন্তব্য শোনা যায়।

একজন নাগরিক সুষ্ঠু শাসন ব্যবস্থার আওতায় থেকে পরিবার পরিজন নিয়ে নাগরিক সেবা গ্রহনের মাধ্যমে সুষ্ঠুভাবে ও নিরাপদে জীবন যাপনের সুন্দর স্বপ্ন দেখে। বিগত সময়ে রাজা জমিদারগণ প্রজাদেরকে শাসনের নামে অত্যাচার নির্যাতন এবং শোষনের মত ঘটনার ইতিহাস রচিত করেন। তাই যুগে যুগে মানুষ পরিবর্তনের ধারায় শাসন ব্যবস্থাকে আরও বেশি সমৃদ্ধ, জবাব দিহিতা,স্বচ্ছতা, আইনের শাসন এবং ন্যায্যতার অগ্রাধিকার বিবেচনায় নাগরিক সেবা পরিপূর্ণ করতে সুশাসন প্রতিষ্ঠার দাবি ওঠে। তবে সুশাসন সম্পর্কে ভালোভাবে জানতে হলে দুর্বল শাসন ব্যবস্থার দিকসমূহ জানা প্রয়োজন। সুশাসনের সঠিকতা অর্জনের মাধ্যমে নাগরিকের দৈনন্দিন সুখকর বিষয়গুলির আগমন ঘটে থাকে। তাই সুন্দর সৃষ্টিশীল জীবন যাপনের জন্য সুশাসন ব্যবস্থার স্বিকৃতি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ।

সমাজে মধ্য বিত্তদের ছোট আকারে হলেও সুশাসন ব্যবস্থার উপরে সামান্য ধারনা থাকা জরুরী। সুশাসন (Good Governances)  ‘সু’ কথার অর্থ হলো ভালো, উত্তম, উৎকৃষ্ট, সুন্দর, মধুর অথবা শুভ ইত্যাদি। সুশাসন হলো ন্যায্যতা বা ন্যায়নীতি অনুসারে উত্তমরুপে সুষ্ঠুভাবে ও নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে নাগরিক সেবার জন্য দেশ বা রাষ্ট্র শাসন করা। সুশাসন হলো একটি কাঙ্খিত রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার প্রতিফলন। সময়ের প্রয়োজনে এবং শাসক ও শাসিতের মাঝে সম্পর্কের ভিত্তিতে কোন দেশের শাসন পদ্ধতির বিবর্তন হয়ে থাকে। এখানে শাসিতের কাম্য শুধু শাসন নয়, সুশৃঙ্খল ও নিয়মতান্ত্রিক শাসন যাকে আমরা সুশাসন বলতে পারি। কোন দেশে সুশাসন আছে কিনা তা বোঝার জন্য দেখতে হবে সে দেশে শাসকের বা সরকারের জবাবদিহিতা আছে কি-না এবং গণতান্ত্রিক পরিবেশে দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসনিক স্বচ্ছতা আছে কি-না। সুশাসন একটি রাষ্ট্র ও সামাজব্যবস্থাকে কাঙ্খিত উন্নয়নের চরম শিখরে পৌঁছে দিতে পারে। 

সুশাসনকে এক ধরনের মানদন্ডও বলা যায়, যে মানদন্ডের সাহায্যে একটি রাষ্ট্র বা সমাজের সামগ্রিক অবস্থা যাচাই করা যায়। একজন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী সুশাসনের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেছেন ‘সুশাসন হলো একটি দেশের সামাজিক এবং অর্থনৈতিক সম্পদের কার্যকরী ব্যবস্থা, তবে ব্যবস্থাটি হবে উম্মুক্ত, স্বচ্ছ, জবাবদিহিতামূলক ও ন্যায্য সমতাপূর্ণ।’ এক্ষেত্রে সুশাসনের জন্য কিছু উপাদান রয়েছে যা একটি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য অত্যন্ত জরুরী। যেমন- সকল ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও জনঅংশগ্রহণ নিশ্চিত করা, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, নাগরিকের মানবাধিকারের প্রতি সম্মান,স্বাধীন বিচার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা, দুর্নীতি রোধ প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা ও দক্ষতা বৃদ্ধি,তথ্য অধিকার নিশ্চিত করা ইত্যাদি।

কথা হলো আমাদের দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে শুরু করে শহুরে উচ্চ বিত্ত পর্যন্ত কতজনই বা এই সুশাসনের উপাদান সম্পর্কে ওয়াকিবহাল। দেখাগেছে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলের সাধারণ দরিদ্র অসহায় মানুষ এখনও তাদের ব্যক্তি চাহিদানুসারে সেবা পেতে অনেকটাই বঞ্চিত। গ্রাম, ইউনিয়ন, পৌরসভা, উপজেলা এবং জেলা পর্যায়ে সরকারি বেসরকারি ভাবে সেবাদানকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সেবার মান পূর্বের তুলনায় উন্নতি হলেও স্বাধীনতার এতো বছর পরেও তা অনেক পিছিয়ে। স্থানীয় প্রান্তীক ও বিপদাপন্ন নারী পুরুষের অর্থনৈতিক ন্যায্যতা, নারীর ক্ষমতায়ন, জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে খাপ খাওয়ানো, দুর্যোগ ঝুঁকিহ্রাসসহ নানাবিধ কর্মকান্ড গ্রহণ করলেও স্থানীয় নাগরিকদের সংগঠনিক সম্পৃক্ততা তুলনামূলক দুর্বল। গ্রামে গঞ্জে সরকারি ও বেসরকারিভাবে রয়েছে গ্রাম উন্নয়ন কমিটি, কোথাও গ্রাম ইউনিয়ন এবং উপজেলা ফেডারেশন, কৃষক দলসহ বিভিন্ন সংগঠন। তৃনমুল পর্যায়ে কোন উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহনের শুরু থেকে যদি সংশ্লিষ্ট এলাকার নাগরিকের অংশগ্রহন এবং মতামত প্রদানের সুযোগ থাকে তবে তা যথাযথ বাস্তবায়নের ফলে নাগরিকগণ সুফল ভোগে যেমন আনন্দ পায় তেমনি তাদের জীবন ও জীবিকায়নের অগ্রগতিতে সহায়ক হয়। এক্ষেত্রে Community Action Plan (CAP), Participatory Rural Appraiser (PRA), Community Vulnerability Assessment (CVA) ইত্যাদি পদ্ধতির সহায়তায় স্থানীয় সুফলভোগীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা যেতে পারে। বাঁধ ও রাস্তা নির্মাণ, ব্রীজ ও কালভার্ট তৈরী, খাল খনন, নদী  ড্রেজিং, কৃষি বহুমুখী পরিকল্পনাসহ বিভিন্ন উন্নয়ন কাজের উদ্যোগ গ্রহণ করা হলেও সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ দেখা যায় না। ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান তার ইচ্ছে মতো নির্মাণ কাজ করেন। যাদের জন্য প্রতিরোধ অথবা নিরাপদ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত ছাড়া সেই কাজের দীর্ঘ মেয়াদী ফল প্রত্যাশা শুধু কাগজে কলমেই এটা বেশিরভাগ মানুষেরই জানা।

বর্তমানে সরকারের গৃহিত সমাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি হিসেবে দরিদ্র মা ও শিশু স্বাস্থ্যের উন্নয়নে মাতৃত্বকালীন ভাতা, বয়স্ক নারী পুরুষের সুরক্ষায় বয়স্ক ভাতা, অস্বচ্ছল প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য ভাতা প্রদান কর্মসূচি, দরিদ্র ও অসহায় নিয়মিত শিক্ষার্থীর জন্য শিক্ষা উপবৃত্তি, বিধবা ও স্বামী পরিত্যাক্ত দুঃস্থ মহিলাদের জন্য ভাতা প্রদান কর্মসূচি, দরিদ্র নারীর উন্নয়নে ভিজিডি কর্মসূচি, অতি দরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচি ও টিআরসহ বিভিন্ন কর্মসূচি। কর্মসূচিসমূহ নিশ্চিন্তে ভালো উদ্যোগ কিন্তু এর যথাযথ ব্যবস্থাপনায় এখনও ঘাটতি রয়েছে। সরকারি সংশ্লিষ্ট দপ্তরের মাধ্যমে নিরপেক্ষতার সাথে মনিটরিং ব্যবস্থাকে আরও মজবুত করা জরুরী। তা না হলে দিনের পর দিন চলে যাবে অভীষ্ট্য লক্ষ্য অর্জনের পথ দীর্ঘতম আর কঠিনতর হতে থাকবে আর পড়তে  দুর্বল সূচকে। 

তৃনমুল পর্যায়ে নির্বাচিত হওয়ার পরেই বেশির ভাগ প্রতিনিধির আচরণ আর মানসিকা পরিবর্তন হয় ভোটের আগের মানসিকতার তুলনায়। অন্যদিকে দেখা যায় কোন কোন কর্মকর্তা অফিসে বসেই প্রকল্প তৈরী আর বাস্তবায়নের রুপরেখা তৈরী করেন। ফলে দীর্ঘমেয়াদী সুফল পাওয়ার বিপরীতে বিপর্যস্ত হয় মানুষ। গ্রাম ঘুরতে ঘুরতে কথা হয় গজারিয়া ইউনিয়নের বাউশি গ্রামের বাসিন্দা রমিজ উদ্দিন শেখ এর সাথে। তিনি জানান, তাদের গ্রামের একটি রাস্তা যা বছরের প্রায় চার মাস পানিতে ডুবে থাকে রাস্তা উঁচু না করেই যাতায়াতের জন্য রাস্তার উপর পাশাপাশি দুটি কালভার্ট নির্মাণ করা হলো। ফলে পানিতে ডুবে যাওয়া রাস্তার ব্রীজ গ্রামবাসীর কোন কাজে আসলো না। রাস্তা উচুঁ না করেই ব্রীজ করা হয়েছে যার ফলে রাস্তা পানিতে ডুবে গিয়ে ব্রীজ জেগে ছিল প্রায় চার ফিট উচুঁতে। পক্ষান্তরে, একটি নৌকার জরুরী প্রয়োজন থাকলেও তার কোন সমাধানের উদ্যোগ নেয়নি কেউ। 

বলা হয় জনগনই সকল ক্ষমতার উৎস। সবাইকে সাথে নিয়ে আমরা স্বপ্ন দেখছি এসডিজি অর্জনের তাই বলছি কাউকে পিছনে ফেলে নয়। এই বক্তব্য নিরিখেই গ্রামীণ দরিদ্র অসহায় নারী পুরুষের শারীরিক, মানসিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ বটে। এখনও মানুষ পেটের দায়ে ভিক্ষা করছে, এখনও ঝিয়ের কাজ করছে, এখনও আর্থিকভাবে সম্মানিত করে প্রতিবন্ধী ভাতার কার্ড নিতে হয়, এখনও শিশুদের ভাতা গ্রহনে খরচ করতে হয় অতিরিক্ত অর্থ। এখনও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির বাহিরে রয়েছে অনেক মানুষ। কথায় বলে সময়ের এক ফোর অসময়ের দশ ফোর। সময়ের কাজ সময়ে করতে না পারলে  আর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে জানা অজানা দুর্নীতির মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা জরুরী। কারণ দুর্নীতি গণতান্ত্রিক সুশাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বড় বাধা। দূর্নীতি জাতীয় সম্পদের সঠিক বন্টনে বাঁধা প্রদান করে এবং ধনী ও গরীবের মধ্যে বৈষম্য সৃষ্টি করে। তাই এখুনি সময়ে এইসব চিহ্নিত করবার আর নির্মূল করবার। তা না হলে এসডিজি’র অভীষ্ট্য লক্ষ্য অর্জন হবে চ্যালেঞ্জিং। দেশ পড়তে পারে দুর্বল সমীক্ষায় মুখে। তাই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা এবং নাগরিক সেবা নিশ্চিত করতে সর্বক্ষেত্রেই জনসম্পৃক্ততা অত্যন্ত জরুরী।  

লেখক : উন্নয়ন কর্মী

ও/এসএ/