ধর্ষকদের রাজনৈতিক বিভাজন গ্রহণযোগ্য নয়‌‌‌‌

Published: Sat, 17 Oct 2020 | Updated: Sat, 17 Oct 2020

নীলকন্ঠ আইচ মজুমদার : চারদিকে শুধু একই আওয়াজ- ‘‌‌‌ধর্ষণমুক্ত বাংলাদেশ চাই ধর্ষকের শাস্তি চাই’। প্রতিটি মিডিয়াও দেখছে এসব নিউজ গুরুত্ব সহকারে; যার ফলে এসব অন্যায় অত্যাচারের প্রতিচ্ছবি চলে আসছে মানুষের সম্মুখে। দেশের রাজধানীসহ প্রত্যন্ত অঞ্চলেও ধর্ষণের বিরুদ্ধে জেগে উঠেছে মানুষ। পুরুষ সমাজের বিকৃত মনের কিছু মানুষের দ্বারা ধর্ষিত এই সোনার বাংলা কলংঙ্কিত হচ্ছে প্রতিনিয়ত। নারীর অগ্রগতির যুগে বর্তমান সময়ে ঘর থেকে বের হতে ভয় পারছে নারীরা। 

সম্প্রতি সিলেটের এমসি কলেজে ছাত্রলীগের কর্মীর দ্বারা দলবদ্ধভাবে গৃহবধুকে ধর্ষণ, নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে নারীকে বিবস্ত্র করে নির্যাতন, গীর্জায় ফাদার কর্তৃক ধর্ষণ, সিলেটে বাসায় ঢুকে গৃহবধুর ধর্ষণ জাতিকে ভাবিয়ে তুলেছে। করোনা মহামারীকালে নতুন এক মহামারী দেখা দিয়েছে এ ধর্ষণ। অন্যসব অপরাধের সাথে সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ধর্ষণের ঘটনা। পত্রিকার পাতায়, ইলেকট্রনিক্স মিডিয়া এবং সোস্যাল মিডিয়া জুড়ে কেবলই ধর্ষণের সংবাদ। 

এক সময় যখন সারাদেশে জঙ্গীবাদের উত্থান দেখা দিয়েছিল তখন সরকার ও জনগণের সম্মিলিত আওয়াজ উঠেছিল। ঠিক এভাবেই আজ সারাদেশে আওয়াজ উঠেছে ধর্ষণ প্রতিরোধের। এ নিয়ে চলছে সারাদেশে মানববন্ধন আর প্রতিবাদ সমাবেশ। বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় ধর্ষিত হচ্ছে নারীরা। যেসব ঘটনা সম্প্রতি ঘটেছে তা যেন আদিমকালের বর্বরতাকেও হার মানিয়েছে। এইসব জঘন্য ঘটনা কোনভাবেই মেনে নেওয়া যায় না এবং এ ঘটনা চরম মানবাধিকার লঙ্গন। 

শুধু ধর্ষণ নয় ধর্ষণের পর হত্যা, এসিড নিক্ষেপ এবং যৌন হয়রানি যেন আমাদের নিত্যসঙ্গী হয়ে উঠেছে। অফিসে বস কর্তৃক, বাসায় গৃহস্বামী দ্বারা, মসজিদের ইমাম, মন্দিরের পুরোহিত, গীর্জায় ফাদার দ্বারা ধর্ষিত হচ্ছে নারীকূল; যেন কেউ কাউকে ছাড় দিতে রাজি নয়। চলছে এক অদৃশ্য প্রতিযোগিতা। সমাজে আশ্রয় হারিয়ে ফেলছে নারী সমাজ। প্রশ্ন হলো কি ঘটছে এসব ? 

কিন্তু এমনতো হওয়ার কথা ছিল । দেশের অর্থনীতির চাকা যখন দুর্বার গতিতে এগিয়ে চলছে করোনাকালীন সময়ে তখনই মাঝে মাঝে থমকে যাচ্ছে জাতি। রাস্তায় বের হতে ভয় পাচ্ছে মা বোনেরা।  নারী শ্রমিকরা যেতে পারছেনা প্রতিষ্ঠানে- কিন্তু কেন ? যেসব বিষয় মিডিয়াতে আসছে সেসব আমরা জানতে পারছি। আমাদের জানার বাইরেও রয়ে যাচ্ছে হাজার ঘটনা যা মিডিয়াতে না আসার কারণে চলে যাচ্ছে লোক চক্ষুর অন্তরালে। লোক লজ্জা অথবা ভয়ে প্রকাশ পাচ্ছে না এসব ঘটনা। 

আবার রাজনৈতিক ও নোংরা সমাজ ব্যবস্থার চাপে অনেক ঘটনাই চাপা দিতে হচ্ছে ভুক্তভোগীদের। অনেক ক্ষেত্রে  টাকার বিনিময়ে হচ্ছে রফাদফা। যা বর্তমান সভ্য সমাজ ব্যবস্থায় কোন ভাবেই কাম্য হতে পারে না। সামাজিক ও রক্ষণশীলতার দিক দিয়ে এমনিতেই আমরা অনেক সংযত তারপরও ঘটছে অনাকাঙ্খিত ঘটনা।

তবে ইদানিংকালে দলবদ্ধ র্ধষণটা যেন প্রতিযোগিতার পর্যায়ে চলে গেছে। কোন ক্ষেত্রে পারিবারিক ঝগড়া আবার পরকীয়ার পর ধর্ষণ অথবা কুপ্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় ধর্ষণ অথবা প্রেমের ফাঁদে চলছে ধর্ষণ। সব যেন মধ্যযুগীয় বর্বরতাকেও হার মানিয়েছে। কোন কোন ক্ষেত্রে প্রেমের পর বিয়ে করার অস্বীকৃতির পর ধর্ষণ মামলার অভিযোগ উঠছে । 

এইসব ধর্ষণকে কেন্দ্র করে সারাদেশে অতিমাত্রায় বাংলাদেশ ছাত্রলীগের মতো সংগঠনকে টেনে আনা হচ্ছে। কিন্তু একটা বিষয় ভুলে গেলে চলবে না যে সব ধর্ষণই কিন্তু ছাত্রলীগ করছে না। গীর্জার ফাদার, মসজিদের ইমাম, মন্দিরের পুরোহিত বা ৮০ বছরের বৃদ্ধ কিন্তু ছাত্রলীগের সাথে জড়িত না। দেশে যখন জাতীয় সংকট আসে তখন এটাকে একপেশে করে ফেললে তা থেকে ভালো ফল আশা করা যায় না। তখন মূল বিষয়টা চাপা পড়ে যায় মিথ্যার জালে। ধর্ষণ বিষয়টা দলীয় কোন এজেন্ডা নয় যে এটাকে দলীয়ভাবে মোকাবেলা করতে হবে। ধর্ষণকারীকে কোন দলের কর্মী হিসেবে না ভেবে দেশের শত্রু হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়, পারিবারিকভাবে সদস্যদের মাঝে ফারাক তৈরি হওয়া, অতি মাত্রায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আসক্ত হওয়া, রাজনৈতিক শেল্টার, সঠিক সময়ে ধর্ষকের বিচার না হওয়া, সর্বোপরি ধর্মীয় অনুশাসনের অভাবে ঘটছে এসব ধর্ষণ। 

স্বাধীনতার এত বছর পরও একটি সুশৃংখল জাতি হিসেবে নিজেদের মেলে ধরতে পারি নি। আধুনিকতার নামে আমরা আমাদের সামাজিক দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে ক্রমান্বয়ে সরে আসছি তাই সমাজের প্রতিটি স্তরেই চরম বিশৃংখলার জন্ম হচ্ছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে ধর্ষণ প্রতিরোধের ক্ষেত্রে যেসব বিষয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে তা হলো পুলিশ বাহিনীর সহযোগিতা। দ্রুত সময়ের মধ্যে অপপরাধীদের খুঁজে বের করে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ পরিহার করে সঠিক সময়ে প্রতিবেদন দাখিল করে বিচার ব্যবস্থাকে ত্বরান্বিত করা। বর্তমানে যে কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে এসব ক্ষেত্রে অব্যশ পুলিশ বাহিনী যথেষ্ট দক্ষতার সাথে অপরাধীদের গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকেও দলমত নির্বিশেষে এসব অপরাধীদের নিরপেক্ষভাবে বিচারের আওতায় আনতে হবে। সরকারকে মনে রাখতে হবে যে, ধর্ষণকারীরা যেন কোন পর্যায়ে দলের কোন নেতার সহায়তা না পায়। দলীয় নেতারা যদি এসব অপকর্মকারীদের সহায়তা করে তবে সরকার পড়ে যাবে জনগণের রোষানলে। 

তবে ইতোমধ্যে সরকার প্রধান তাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে যা কাজের ধরণ দেখে বুঝা যাচ্ছে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা কখনও ধর্ষকদের অভয়ারণ্যে পরিণত হতে পারে না। পরিণত হতে দিবেও না বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা- এটা এদেশের আপামর জনতার বিশ্বাস। 

এইসব ঘটনা প্রতিরোধের ক্ষেত্রে নারীদেরও অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। নারী শক্তি বিকাশের মাধ্যমে এই অপশক্তিকে রোধ করতে হবে। নারীদের এই ভূমিকার পাশে পাওয়া যাবে পুরুষদেরকেও। কারণ নারীদের মনে রাখতে হবে সব পুরুষই কিন্তু ধর্ষক নয়। তাই এই অপরাধ নির্মূলে নারীদের পাশাপাশি পুরুষের সক্রিয় ভূমিকা একান্ত অপরিহার্য। 

ইতোমধ্যে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন সংশোধন করে অধ্যাদেশ জারি করে ধর্ষকদের সাজা বাড়িয়ে মৃত্যুদন্ডের বিধান করা হয়েছে। এই শাস্তি অপরাধীদের ক্ষেত্রে কঠিন এক বার্তা। তবে ধর্ষণের বিরুদ্ধে মৃত্যুদন্ডের বিধান করলেই ধর্ষণ প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে একথা বিশ্বাস করা যায় না। মানুষ হত্যার ক্ষেত্রেও মৃত্যুদন্ডের বিধান রয়েছে তথাপি হত্যা কমেনি। তাই এক্ষেত্রে  মৃত্যুদন্ডের পাশাপাশি সামাজিক প্রতিরোধের গড়ে তুলতে হবে। 

এপর্যন্ত যেসব ক্ষেত্রে মানুষের বিবেককে জাগ্রত করা সম্ভব হয়েছে তার প্রায় সবটুকুই সম্ভব হয়েছে সামাজিক অবক্ষয় রোধ করার মাধ্যমে। অন্যদিকে রাজনৈতিক মিথ্যাচার প্রকৃত ঘটনাকে আড়াল করে। ফলে সঠিক বিচারের পথটি রুদ্ধ হয়ে যায়। অপরাধীর ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিভাজন হলে অপরাধীরা সুযোগ খুঁজতে থাকে। এক সময় সে সুযোগে পার পেয়ে যায় অপরাধীরা। তাই রাজনৈতিক অপরাধীর ক্ষেত্রে বিভাজন নয় এটা সকল রাজনৈতিক দলকে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতে হবে।

লেখক- শিক্ষক ও গণমাধ্যমকর্মী

 

/এসিএন